শুক্রবার| জানুয়ারি ২৪, ২০২০| ১১মাঘ১৪২৬

সম্পাদকীয়

শেষ হলো আয়কর রিটার্ন জমা দেয়ার সময়সীমা

উন্নয়নকে টেকসই ও বেগবান করতে কর জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হবে

শেষ হলো ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাদের বার্ষিক আয়কর বিবরণী বা রিটার্ন জমা দেয়ার সময়। তবে যারা নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দিতে পারেননি, তাদের সব শেষ হয়ে গেল, তা নয়। নির্ধারিত করের ওপর মাসে শতাংশ হারে সুদ দিলেই কর কর্মকর্তারা রিটার্ন জমা নিয়ে নেবেন। দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো। কোনো একটি দেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় সরকারের রাজস্ব আহরণের পরিমাণ সহজভাবে দেখানো হয় কর জিডিপি অনুপাত দিয়ে। যাতে প্রতিফলিত হয় অর্থনীতির স্বাস্থ্য এমনকি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার রূপরেখাও। আমাদের বাস্তবতা হলো, আনুপাতিক হার হিসাব করলে বাংলাদেশের রাজস্ব হার দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম। দেশের কর জিডিপি অনুপাত এখনো দুই অংকের ঘরে পৌঁছতে পারেনি। গত ১০ বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়লেও অর্থাৎ থেকে শতাংশে উন্নীত হলেও কর জিডিপি অনুপাত শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়েনি। অথচ ২০২১ সাল নাগাদ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে হলে এটি ১৩ শতাংশে নিতে হবে। এক্ষেত্রে আশানুরূপ অগ্রগতি নেই। জাতীয় কর দিবসের অনুষ্ঠানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানও বলেছেন, উন্নয়ন চাইলে কর জিডিপির অনুপাত বাড়াতে হবে।

আমাদের দেশে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় দক্ষতার অভাবে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কর প্রদানের আইনি জটিলতা দূর কর ব্যবস্থা সহজ করা এবং জনগণের করের টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে করের অনুপাত যে বাড়বে, তা নিশ্চিত করে বলা যায়। শুধু নতুন করদাতা খুঁজে বের করলেই হবে না, একই সঙ্গে তাদের ফাইলগুলো অব্যাহতভাবে তদারকির মধ্যে রাখতে হবে। স্থানীয় কর কার্যালয়কে দক্ষ করে তুলতে হবে। জরিপ পরিচালনার পাশাপাশি জনগণকে কর প্রদানে উদ্বুদ্ধ করতে নানা উদ্যোগও নেয়া দরকার। অবৈধ অর্থ নামমাত্র করের বিনিময়ে বৈধ করার সুযোগ দিলে মানুষ উচ্চহারে কর প্রদানে উৎসাহিত হয় না। ফলে অবৈধ অর্থ বৈধকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। কর প্রদানে উৎসাহিত করতে একটি আদর্শ পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, যেখানে নিয়মিত কর পরিশোধকারীরা অধিক সুবিধা পাবেন। নতুন করদাতা খুঁজে বের করতে আয়কর মেলা গত কয়েক বছরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর সময়সীমা পরিধি বাড়ানো প্রয়োজন। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, শুধু জরিপের মাধ্যমে করজালে নতুন করদাতাদের আটকানো যায় না। নতুন করদাতার সংখ্যা বাড়াতে প্রক্রিয়া সহজীকরণ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে আনা দরকার।

অর্থনীতির আকার বাড়ছে। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়াতে হবে সরকারি বিনিয়োগ। এজন্য সরকারের আয় বাড়ানোর বিকল্প নেই। সেক্ষেত্রে রাজস্ব একটি বড় খাত। এর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি কমিয়ে সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে অনেকে কর প্রদানে উৎসাহী হবেন। লক্ষ্যে আয়কর আইন সংস্কার, প্রযুক্তি সম্প্রসারণ, আধুনিক ব্যবস্থা চালুসহ নানা পদক্ষেপ নিতে হবে। এনবিআর কিছু ক্ষেত্রে সংস্কার এনেছে এবং কিছু প্রক্রিয়াধীন। সেগুলো শেষ করতে উদ্যোগ নিতে হবে। করের আওতা বাড়ানোর লক্ষ্যে সারা দেশেগ্রোথ সেন্টারঅনুসন্ধান গবেষণা করছে এনবিআর। গ্রোথ সেন্টারের মাধ্যমে এনবিআরের তালিকায় নতুন করদাতা যুক্ত হচ্ছেন। এক্ষেত্রে শহরের পাশাপাশি গ্রামেও নতুন করদাতা খুঁজে বের করার কার্যক্রম জোরদার করা দরকার। বর্তমানে বড় একটি সমস্যা হলো যারা আয়কর দিচ্ছেন, তারা আরো দেন না কেন বা কতটা ফাঁকি দিচ্ছেন, সেদিকে বেশি জোর দেয়া হয়। ধরেই নেয়া হয়েছে যিনি যত ধনী, তিনি তত কর ফাঁকি দেন। কর ফাঁকি অবশ্যই দেয়া হচ্ছে, এটা ঠিক। কিন্তু মূল কথা হলো, এসব করদাতা করজালের আওতায় আছেন। করজালে যারা নেই, তাদের এর আওতায় আনা গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে কর সম্পর্কে জনগণের ভীতি দূর করা ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই মনে ধারণা পোষণ করেন যে করদাতা হওয়ার মানেই নতুন ঝামেলায় জড়িয়ে পড়া। কর কর্মকর্তারা তাদের হয়রানি করবেন। এমন ধারণা পরিবর্তনের জন্যও উদ্যোগ নেয়া জরুরি।

প্রতি বছরই করহার রীতি-পদ্ধতি-নিয়ম সুযোগ-সুবিধার পরিবর্তনের কারণে করদাতাকে নতুন করে জানতে শিখতে আসতে হয়। কর দেয়ার পদ্ধতিকে যদি সহনশীল টেকসই করতে হয়, তাহলে বারবার হার কর হিসাব কষার পরিবর্তন করা ঠিক নয়। কর আইনের ধারা-উপধারায় ঘন ঘন পরিবর্তন আনা উচিত নয়। তাহলে করদাতা এবং কর আইন প্রয়োগকারী উভয় পক্ষেরই তা অনুসরণ প্রয়োগে গলদ্ঘর্ম হতে হয় না, এমনকি তৃতীয় কোনো পেশাজীবীর পরামর্শ নেয়ার প্রয়োজনটা কমে আসে। কর পরিশোধে ব্যয় বৃদ্ধি পেলে কিংবা কর আহরণে উদ্বুদ্ধ করতে বা সহায়তাদানের ব্যয় বৃদ্ধি পেলে নিট রাজস্ব আয় কম হবে। করদাতাকে একযাত্রায় প্রশিক্ষিত, উৎসাহিত, অবহিত কর প্রদানে শামিল করা যায় না। প্রতি বছর অর্থ বিলের মাধ্যমে কর আইনে অনেক বেশি পরিবর্তন আনা হয়। এসব অনুসরণে করদাতারা কেন, কর কর্মকর্তাও থিতু হতে অসুবিধায় পড়েন। সমন্বয় ভারসাম্য রাখতে পারা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এক্ষেত্রে আমাদের পদ্ধতিগত সংস্কারগুলো ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখতে হবে যে কর জমা দেয়ার প্রক্রিয়াকে লোকেরা কেন জটিল মনে করছেন? কেন কর প্রদানের ক্ষেত্রে মানুষ কর মেলা ঘিরে আগ্রহী হচ্ছেন? কারণ তারা কর মেলায় সব প্রশ্নের উত্তর ব্যাখ্যাগুলো সহজে পাচ্ছেন। কর মেলার গুরুত্বকে বড় করে দেখার জন্যই মেলার উপযোগিতা পর্যালোচনা প্রয়োজন। কর মেলা থেকে কতটা আয়কর আদায় হচ্ছে, তা ফলাও করে প্রচারের চল আছে। বিষয়টি এমন নয় যে কর মেলা হচ্ছে বিধায় কর বাড়ছে। বরং আমাদের দেখতে হবে কতজন নতুন টিআইএন নিয়েছেন, বছর কতজন নতুন করদাতা যোগ হলেন এবং তাদের জমা দেয়া করের পরিমাণ কত। দীর্ঘদিন ধরে নতুন আয়কর আইন হবে বলে শুনছি। আমরা এখনো ১৯৮৪ সালের ইনকাম ট্যাক্স অর্ডিন্যান্স অনুসারে চলছি। এটি কিন্তু আইন নয়, একটি অধ্যাদেশ, যা ব্রিটিশ আইনটির রেপ্লিকা। বিদ্যমান আয়কর অধ্যাদেশটি বর্তমানের বাংলাদেশের জন্য যথাযথ নয়। নব্বইয়ের দশক থেকে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে মানুষের অর্থনৈতিক ব্যাপ্তি বেড়েছে। পর্যায়ে পুরনো আয়কর আইন দিয়ে মুক্তবাজার অর্থনীতির মানুষের কর আদায়ের প্রসঙ্গগুলোকে খুব সহজ করা যাচ্ছে না।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন