শুক্রবার | ডিসেম্বর ১৩, ২০১৯ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

প্রথম পাতা

বেদখল বরেন্দ্র অঞ্চলের ১৪ হাজার খাস পুকুর

সাইদ শাহীন

নওগাঁ সদর উপজেলার বরুণকান্দি সরদারপাড়ার প্রায় দুই বিঘা আয়তনের খাস পুকুরটি এখন সোনালী দিন যুব সংঘ নামে একটি ক্লাবের দখলে। ২০১৪ সালে পুকুরটি দখলে নিয়েছে ক্লাবটি। স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণের লক্ষ্যে পুকুরের একাংশ দখল করে চলছে আরসিসি পিলার তৈরির কাজ। বাকি অংশে চলছে মাছ চাষ। কোনো রকম ইজারা ছাড়াই খাস পুকুরটি ভোগদখল করছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা।

একই উপজেলার বলিহার ইউনিয়নে একর ৩৮ শতাংশ আয়তনের আরো একটি খাস পুকুরও ভোগদখল করছেন স্থানীয় ইউপি সদস্য হামিদুল ইসলাম। উপজেলার কীর্ত্তিপুর ইউনিয়নের জালম গ্রামের একর শতাংশ আয়তনের তেলিপুকুরটি দখলে রেখেছেন পৌর কর্মচারী মুকুল। খাস পুকুর দখলের এমন মহোৎসব চলছে জেলাজুড়ে। এরই মধ্যে বেদখল হয়ে গেছে নওগাঁর হাজার ৩০৭টি খাস পুকুর।

শুধু নওগাঁ নয়, বরেন্দ্র অঞ্চলের অন্যান্য জেলা তথা রাজশাহী চাঁপাইনবাবগঞ্জেও ধরনের ঘটনা ঘটছে। ভূমি কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, বেদখল কিংবা ভরাট হয়ে গেছে তিন জেলার ১৪ হাজার ১৯৭টি খাস পুকুর। এর মধ্যে রাজশাহীতে হাজার ৩৬৮ চাঁপাইনবাবগঞ্জের হাজার ৫২২টি পুকুর রয়েছে।

যদিও অকৃষি খাস জমি ব্যবস্থাপনা বন্দোবস্তের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা আছে সরকারের। ১৯৯৫ সালে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা -সংক্রান্ত গেজেটে বলা হয়েছে, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মত্স্য খামার স্থাপনের জন্য সরকারি খাস পুকুর দীর্ঘমেয়াদে বন্দোবস্ত দেয়া যাবে। তবে বন্দোবস্তের প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন না হলে বা যথাযথভাবে পরিচালিত না হলে বন্দোবস্ত বাতিল করা হবে। যদিও সরকারকে রাজস্ব না দিয়েই সরকারি খাস পুকুর ভোগদখল করছে অনেকে। এমনকি তা ভরাট করে স্থাপনাও নির্মাণ করা হচ্ছে।

সরকারি পুকুর বেদখলের এমন ঘটনা আছে নাটোরেও। সরকারকে সামান্য কিছু ফি দিয়ে নব্বইয়ের দশক থেকে ২১৭ নং খতিয়ানের ৬০৮ দাগের ৬১ শতক পুকুরে মাছ চাষ করে আসছিলেন নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার চেউখালী গ্রামের পুরান মন্ডলের ছেলে মান্নান মন্ডল। ২০০৭ সালে তার কাছ থেকে পুকুরটি কেড়ে নেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। এর পর থেকে সরকারের কোষাগারে কোনো ধরনের অর্থ না দিয়েই জোরপূর্বক খাস পুকুরটি ভোগদখল করছেন তারা। দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালীদের দখলে থাকা তিনটি খাস পুকুর গতকাল উদ্ধারও করেছে স্থানীয় ভূমি অফিস।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেদখল হওয়া এসব পুকুর উদ্ধার করে খনন বা পুনঃখনন করা গেলে পানির আধার যেমন তৈরি হবে, তেমনি বহুমুখী কাজেও আসতে পারে পুকুরগুলো। পাশাপাশি পানির স্তর নেমে যাওয়ার কারণে যে ধরনের পরিবেশ বিপর্যয়ের ঝুঁকি রয়েছে, সেটিও প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। কারণ ফসল আবাদে ভূ-উপরিস্থ পানির পরিবর্তে অতিমাত্রায় সেচনির্ভরতার কারণে গত ২০ বছরে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোয় পানির স্তর নেমে গেছে ১৬ সেন্টিমিটারের বেশি। পরিবেশগত বিপর্যয় ঠেকাতে গভীর নলকূপ স্থাপনের অনুমতি দেয়া সীমিত করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) অবস্থায় সেচের অন্যতম বিকল্প হতে পারে পুকুর।

জানা গেছে, বেদখল কিংবা ভরাট হওয়া পুকুর উদ্ধারে কৃষি মন্ত্রণালয় ভূমি মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজ করছে। কৃষি সচিব মো. নাসিরুজ্জামান বণিক বার্তাকে জানান, গত কয়েক দশকে উত্তরাঞ্চলে পানির স্তর নেমে যাওয়া এবং শস্য আবাদে সেচের খরচ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি ভাবাচ্ছে মন্ত্রণালয়কে। তাই বেদখল কিংবা ভরাট থাকা খাস পুকুরগুলো সেচকাজে ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। পুকুর দীঘি পুনঃখননের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি ভূ-উপরিস্থ পানি সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নেয়া হবে। সেটি করা গেলে অঞ্চলে নতুনভাবে মত্স্য চাষের সুযোগ সৃষ্টি হওয়া ছাড়াও পুকুরগুলোকে বহুমুখী কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। সেচকাজে বিদ্যুৎ সাশ্রয় পুকুরের বহুমুখী ব্যবহারের মাধ্যমে প্রান্তিক চাষীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে কিছু পুকুর উদ্ধার করে কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।

উত্তরাঞ্চলের সেচের পানির সংকট এর প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক। সংস্থাটির তথ্যমতে, এক দশক আগেও অঞ্চলে প্রতি হেক্টর জমিতে বোরো আবাদে সেচ খরচ ছিল হাজার টাকা। ২০১৬ সালে তা ১০ হাজার টাকা ছাড়িয়েছে। জ্বালানি খরচসহ অন্যান্য উপকরণ ব্যয় স্থির থাকলে ২০৩০ সালে খরচ ১৭ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

উত্তরবঙ্গের পাঁচটি জেলায় ১৯৮১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া নিয়েও পর্যবেক্ষণ রয়েছে ব্র্যাকের। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ বলছে, সবচেয়ে বেশি পানির স্তর নেমে গেছে রাজশাহী নওগাঁ জেলায়। তবে রাজশাহীর পবা, গোদাগাড়ী, পুঠিয়া, নওগাঁর সাপাহার, পোরশা, নিয়ামতপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল নাটোরের বেশকিছু অঞ্চলে পানির স্তর অস্বাভাবিক নেমে যাওয়ায় গভীর অগভীর নলকূপে পানি কম উঠছে।

ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়াতে বরেন্দ্র অঞ্চলের তিন জেলায় বেশকিছু পুকুর সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে কৃষি মন্ত্রণালয় পরিকল্পনা কমিশনের তথ্যে জানা গেছে। এর মধ্যে রাজশাহী জেলায় ৭৪৭টি, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৮৭০ নওগাঁয় হাজার ৪৭৩টি পুকুর খনন সংস্কার কার্যক্রম শেষের পথে।

সামনের দিনে দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে তিন একরের বেশি আয়তনের পুকুরগুলোকে উদ্ধারের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। প্রায় ৭২৫টি পুকুর খনন বা পুনঃখননের মাধ্যমে ব্যাপক পরিমাণ জমিকে আবাদের আওতায় নিয়ে আসা এবং সেচ সুবিধা বাড়াতে চায় বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। এসব পুকুরের মধ্যে রাজশাহী জেলায় ২৩৫টি, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১০৬, নওগাঁয় ২৫৫, বগুড়ায় ৫৭ নাটোরে ৭২টি পুকুর খনন করা হবে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে হাজার ৫৮ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে। এসব জমিতে সেচ সুবিধা দেয়া গেলে প্রতি বছর অতিরিক্ত প্রায় ১৮ হাজার ৩৪৮ টন ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হবে।

বিষয়ে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) নির্বাহী পরিচালক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আবদুর রশীদ বণিক বার্তাকে বলেন, দেশে ব্যবহূত সেচ পাম্পের প্রায় অর্ধেকই রয়েছে রাজশাহী রংপুর অঞ্চলে। অবাধে গভীর নলকূপ স্থাপনের কারণে উত্তরাঞ্চলের বেশকিছু এলাকায় পানির স্তর নেমে গেছে। তাই অঞ্চলে পুকুর পুনঃখনন ভূ-উপরিস্থ পানি উন্নয়নের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। উদ্ধারকৃত পুকুরগুলোকে ব্যবহার উপযোগী করে তোলা হবে। স্থানীয়দের উপরেই এগুলো পরিচালনার দায়িত্ব থাকবে। ফলে এখানে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডও পরিচালিত হবে। একটি সমন্বিত বাস্তবমুখী কর্মসূচির মাধ্যমে অঞ্চলের সমস্যাগুলোকে নির্মূল করা হবে, তেমনি গ্রামভিত্তিক অর্থনীতিকে বেগবান করা হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন