রবিবার | ডিসেম্বর ০৮, ২০১৯ | ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

প্রথম পাতা

ঈগল পরিবহনের ব্যবসায় সংকোচন

ব্যাংকের শতকোটি টাকা ফেরত দিচ্ছে না কাপুড়িয়া পরিবার

হাছান আদনান ও আবদুল কাদের

সীমিত পরিসরে ট্রেডিং ব্যবসা দিয়ে শুরু। দুই দশক আগে নাম লেখান পরিবহন ব্যবসায়। ঈগল পরিবহন নামে পবিত্র কাপুড়িয়া অপু কাপুড়িয়ার ব্যবসা বিস্তৃত হয়েছে সারা দেশে। পাশাপাশি ভোগ্যপণ্য আমদানিতেও নামে কাপুড়িয়া পরিবার। বছর পাঁচেক আগে মসুর ডালের বড় চালান আমদানি করে তারা। ডালের সে ব্যবসাই ডুবিয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যবসায়ী পরিবারকে। পরিবারের কাছে চার ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় শতকোটি টাকা। দফায় দফায় পুনঃতফসিল করার পরও তা পরিশোধ করছে না কাপুড়িয়া পরিবার।

ভোগ্যপণ্যে বড় লোকসানের ধাক্কা লেগেছে ঈগল পরিবহনেও। জানা গেছে, কোম্পানিটির অনেক বাস এখন বসে আছে। যান্ত্রিক ত্রুটি নিয়ে পরিবহন পুলে পড়ে আছে প্রায় ২০০ বাস।

ব্যাংকাররা বলছেন, কাপুড়িয়া পরিবারের সদস্যরা দেশের বাইরে টাকা পাচার করেছেন। ব্যাংকঋণের অর্থ সরিয়ে নেয়ার কারণেই অপু কাপুড়িয়া পবিত্র কাপুড়িয়ার ব্যবসায় ধস নেমেছে। দেশে দেশের বাইরে প্রচুর সম্পদ থাকলেও ব্যাংকের টাকা ফেরত দিচ্ছেন না দুই ভাই। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছেন দফায় দফায়। তাদের লক্ষ্য ব্যাংকের টাকা ফেরত না দেয়া।

যশোরের কাপুড়িয়া পরিবারের প্রতিষ্ঠানগুলো হলো এমকে মোটরস, আরজি ট্রেডার্স অর্ণব এন্টারপ্রাইজ। প্রতিষ্ঠানগুলোয় ঋণ রয়েছে এনসিসি, আইএফআইসি, ব্যাংক এশিয়া সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের। সব মিলিয়ে ঋণের পরিমাণ প্রায় শতকোটি টাকা।

কাপুড়িয়া পরিবারকে ঋণ দিয়ে বিপদে আছে এনসিসি ব্যাংক। পরিবারের দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাংকটির ঋণ দাঁড়িয়েছে ৩৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা রয়েছে এমকে মোটরসের কাছে। বাকি ১২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা আছে অর্ণব এন্টারপ্রাইজের নামে। ঋণ নিয়ে অনেক দিন থেকেই বেকায়দায় রয়েছে ব্যাংকটি। শ্রেণীকৃত হওয়ায় এখন পর্যন্ত চারবার পুনঃতফসিল করা হয়েছে ঋণটি। সর্বশেষ পুনঃতফসিলের পর এখন পর্যন্ত কোনো কিস্তি পরিশোধ করেনি কাপুড়িয়া পরিবার। ফলে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই ঋণটি আবারো খেলাপির খাতায় তুলবে এনসিসি ব্যাংক।

বহুবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও কাপুড়িয়া পরিবার ব্যাংকের অর্থ পরিশোধ করেনি বলে জানান এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ। তিনি বলেন, মসুরের ডালসহ ভোগ্যপণ্য আমদানির জন্য আমরা এলসি সুবিধা দিয়েছিলাম। কিন্তু পাঁচ বছর পার হলেও অপু কাপুড়িয়া পবিত্র কাপুড়িয়া ব্যাংকের অর্থ পরিশোধ করেননি। ঈগল পরিবহনের বিপরীতেও আমাদের ঋণ আছে। সে ঋণও তারা পরিশোধ করছে না। ব্যাংকের পক্ষ থেকে পুনঃতফসিলের একাধিক সুযোগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু তারা সে সুযোগের সদ্ব্যবহার করেনি। ব্যাংকের টাকা আদায়ে চূড়ান্তভাবে আমরা আইনি পথে হাঁটছি। এরই মধ্যে পবিত্র কাপুড়িয়ার বিরুদ্ধে ২০ কোটি ৬০ হাজার টাকার চেক ডিজঅনারের মামলা করা হয়েছে।

কাপুড়িয়া পরিবারের প্রতিষ্ঠান অর্ণব এন্টারপ্রাইজের কাছে প্রায় ২২ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে ব্যাংক এশিয়ার। ভোগ্যপণ্য আমদানি ঈগল পরিবহনের জন্য ঋণ দিয়েছে ব্যাংকটি। যদিও সে ঋণ ফেরত দিচ্ছে না কাপুড়িয়া পরিবার।

ব্যাংক এশিয়া বলছে, ডালসহ ভোগ্যপণ্য আমদানির জন্য অর্ণব এন্টারপ্রাইজকে ব্যাংকিং সুবিধা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংকের টাকা ফেরত দেয়নি। ডালসহ ভোগ্যপণ্য আমদানির পর বিক্রি না হলে প্রতিষ্ঠানটির গোডাউনে তা থাকার কথা। যদিও গোডাউনে গিয়ে মজুদকৃত কোনো পণ্য পাননি ব্যাংক এশিয়ার যশোর শাখার ব্যবস্থাপক।

ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণ মিসম্যাচ হয়েছে বলে মনে করেন ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরফান আলী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, অর্ণব এন্টারপ্রাইজের ঋণ খেলাপি হয়ে যাওয়ায় পুনঃতফসিল করে দেয়া হয়েছে। ব্যাংকের টাকা ফেরত দেয়ার জন্য আমরা পথ সহজ করে দিয়েছি। এখন কাপুড়িয়া পরিবার নিজেদের দায়িত্ব পালন করলে ভালো। অন্যথায় আমাদের জন্য আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া বিকল্প থাকবে না।

মো. আরফান আলী জানান, ব্যাংক এশিয়ার কাছে কাপুড়িয়া পরিবারের কোটি টাকার একটি এফডিআর জামানত হিসেবে আছে। মেয়াদ পূর্ণ হলে সে আমানত আমরা ঋণের সঙ্গে সমন্বয় করব। এছাড়া ব্যাংকের কাছে আরো কিছু সম্পদ জামানত হিসেবে আছে।

কাপুড়িয়া পরিবারের প্রতিষ্ঠান আরজি ট্রেডার্সের কাছে প্রায় ৩০ কোটি টাকা পাবে আইএফআইসি ব্যাংক। ঋণ নিয়েও বিপদে আছে ব্যাংকটি। এছাড়া অর্ণব এন্টারপ্রাইজের কাছে কোটি ৫১ লাখ টাকা পাবে এসবিএসি ব্যাংক। সর্বশেষ পুনঃতফসিল করার পর এখন পর্যন্ত ঋণটি নিয়মিত আছে। তবে কাপুড়িয়া পরিবারের ব্যবসার পরিস্থিতি যে ভালো নয়, তা স্বীকার করছেন এসবিএসি ব্যাংকের কর্মকর্তারা। ব্যাংকটির শীর্ষস্থানীয় একজন কর্মকর্তা বলেন, ডালের ব্যবসা করতে গিয়ে কাপুড়িয়া পরিবার আর্থিক বিপর্যয়ে পড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মনোরঞ্জন কাপুড়িয়ার চার সন্তানের মধ্যে অশোক রঞ্জন কাপুড়িয়া (অপু) পবিত্র রঞ্জন কাপুড়িয়া দেশে ব্যবসা করেন। অপু কাপুড়িয়া পবিত্র কাপুড়িয়ার সন্তানরা অস্ট্রেলিয়া আমেরিকায় বসবাস করেন।

জানতে চাইলে অপু কাপুড়িয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ডাল আমদানি করে বড় অংকের লোকসান হয়েছে আমাদের। কারণে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে পারছি না।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন