শুক্রবার | ডিসেম্বর ১৩, ২০১৯ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সম্পাদকীয়

পেঁয়াজ বেপারির উড়োজাহাজের খবর

আব্দুল বায়েস

বিশ্ববিখ্যাত চিলিয়ান কবি পাবলো নেরুদাকে একবার তাঁর বন্ধু মধ্যাহ্নভোজে আমন্ত্রণ জানালেন। সেই বন্ধুটি খেয়ালি কবিকে নিয়ে গেলেন তাঁর বাগান দেখাতে। বাগানে তো অনেক কিছুর চাষ থাকেফুল, ফলফলারি, শাকসবজি কিংবা মসলা। কিন্তু তাঁর দৃষ্টি নিক্ষিপ্ত হলো একটা খুবই পরিচিত এবং অতি সাধারণ পণ্যের ওপর। পণ্যটির নাম পেঁয়াজ। পেঁয়াজ সম্পর্কে তাঁর তেমন কোনো ধারণা ছিল না বললেই চলে, কিন্তু পেঁয়াজের পরতে পরতে ভাঁজ এর ঝাঁজ নিয়ে লিখে ফেললেন সাড়া জাগানো এক কবিতা:

Ode to the Onion

Onion,

luminous flask,

your beauty formed

petal by petal,

crystal scales expanded you

...............

You make us cry without hurting us.

I have praised everything that exists,

but to me, onion, you are

more beautiful than a bird

of dazzling feathers,

heavenly globe, platinum goblet,

unmoving dance

of the snowy anemone

and the fragrance of the earth lives

in your crystalline nature.

দুই.

আমাদের খাদ্যপ্রণালিতে আদা, রসুন পেঁয়াজ বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বস্তুত তিন মসলা ছাড়া রান্নাই হয় না; ইউরোপ কিংবা আমেরিকায় এশিয়ার রেস্তোরাঁয় গেলে দেখা যায় বিদেশীরাও চরম ভক্ত মসলাযুক্ত খাবারের। অথচ কত অবজ্ঞা করে বলি, আদার বেপারির জাহাজের খবর ক্যান? মানে, এত ছোট এবং কম পরিমাণ পণ্য ঝুড়িতেই বহন করা যায়, তার জন্য আবার জাহাজ! অথবা বংশানুক্রমিক কিংবা পাতানো বিষয় হলে বলে থাকি, রসুনের কোয়া এক জায়গায় তো তাই এমন হলো। পেঁয়াজ নিয়েও পাঁচালি আছেতোমার চোখে জল কেন জানতে চাইলে শাশুড়ির বকুনি খাওয়া বউয়ের উত্তর, তেমন কিছু না। রান্নাঘরে পেঁয়াজ কাটছিলাম; ঝাঁজে চোখে জল এসে গেছে। পাবলো নেরুদা বলেছেন, পেঁয়াজ তুমি আমাদের আঘাত না করেই কাঁদাও।

তিন.

কিন্তু কবি সম্ভবত বুঝতে পারেননি যে পেঁয়াজ আঘাত দিয়েও মানুষকে কাঁদায়। মানুষ অর্থনৈতিক জীব, দাম বা মূল্য অর্থনৈতিক একটা বিষয় বিধায় পেঁয়াজের দাম মানুষকে যেমন হাসাতে পারে, তেমনি পারে কাঁদাতে। এখানে মানুষ বলতে দরিদ্র কিংবা সীমিত আয়ের মানুষের কথা বলা হচ্ছে। তার অর্থ এই নয় যে বেশি বা কম দাম সচ্ছল ভোক্তাকে স্পর্শ করে না, তবে তারা সামলে নিতে সক্ষম হয়। যা- হোক, খুব অল্প দামে পণ্য ক্রয় করতে পারলে ভোক্তা ধন্য হয়; তার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। অন্যদিকে উচ্চমূল্য সীমিত বাজেট আরো সংকুচিত করে ভোক্তার ভোগান্তি বাড়ায়, তার চোখে জল ঝরায়।

একবার দিল্লিতে পেঁয়াজের দাম চূড়ায় উঠল। স্মর্তব্য, ভারত কিংবা পাকিস্তানে পেঁয়াজ খাদ্যতালিকায় প্রথম কাতারে থাকে। আমরা যে পেঁয়াজ ব্যবহার করি, তা দেখতে ছোট সাইজের, মোট খাদ্য বাজেটে এর অংশ বেশ কম বিধায় দামের ওঠা-নামা খুব একটা ঘাম ঝরায় না। এর বিপরীতে দিল্লি কিংবা লাহোরে অথবা বেলুচিস্তানে বড় বড় রুটির সঙ্গে আপেল মার্কা বড় বড় পেঁয়াজঅর্থনীতির নিরেট অর্থে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, কারণ রুটি প্রধান খাদ্য। তো, পেঁয়াজের উচ্চমূল্যে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে দিল্লিবাসী, যার চরম মূল্য দিতে হয়েছিল ক্ষমতাসীন দলকে।

বাংলাদেশে দিন ধরে পেঁয়াজ না হলেও পেঁয়াজের দাম সবার মুখে মুখে। ২০-৩০ টাকা কেজির পেঁয়াজ হুড়হুড় করে বেড়ে ২০০-২৫০ টাকায়! বর্তমানে এক কেজি পেঁয়াজের দাম গত বছরের পাঁচ-ছয় কেজি পেঁয়াজের দামের সমান। অর্থাৎ গত বছর একটা পাঁচ সদস্যের পরিবার প্রয়োজনীয় পাঁচ কেজি পেঁয়াজ কিনেছিল ২০০ টাকায় আর এখন কিনতে হচ্ছে হাজার ২০০ টাকার মতো। সরকার সংকট সমাধানে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে সত্য, কিন্তু উড়োজাহাজে উড়িয়ে আনার পরও কেজিপ্রতি ২২০ টাকা গুনতে হচ্ছে ক্রেতাকে।

চার.

পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতার সংকটের মূলে কী উপাদান কাজ করে? প্রথমত, চাহিদা জোগানের ফারাক বা ঘাটতি। বাংলাদেশে পেঁয়াজের যে পরিমাণ চাহিদা, সরবরাহ তার চেয়ে কম। ঘাটতি মোকাবেলায় ভারত থেকে আমদানি করতে গিয়ে বাধল বিপত্তি কারণ ওই দেশটিতে নাকি অভ্যন্তরীণ সমস্যা মোকাবেলা করতে গিয়ে রফতানি সীমিত অথবা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ২০০৮ সালে চালের সংকটের সময় ঠিক এমনটি করেছিল ভারতচালের রফতানি বন্ধ করে দিলে বাংলাদেশ বিপাকে পড়েছিল। বৈশ্বিক অর্থনীতির বর্তমান অবস্থায় একজনের হাঁচিতে অন্যজনের জ্বর হয়। ভারত তার নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দেবে এটাই স্বাভাবিক। দ্বিতীয়ত, সিন্ডিকেট। বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশে সিন্ডিকেট যত শক্তিশালী, সরকারও বোধ হয় ততটা শক্তিশালী নয়। এর প্রধান কারণ, আজকাল ব্যবসায়ী রাজনীতি করেন আর রাজনীতিবিদ করেন ব্যবসা। শুধু পণ্যের বাজারে নয়, সিন্ডিকেট আছে শেয়ারবাজারে, টেন্ডারে অন্যান্য জায়গায়। প্রায় ৩০০ বছর আগে অ্যাডাম স্মিথ বলেছিলেন, যখন দেখবে দুজন ব্যবসায়ী কানে কানে কথা বলছে, তখন ধরে নেবে যে এরা ভোক্তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। নিন্দুকরা বলে, এসব সিন্ডিকেট যত দক্ষভাবে কার্যকর, বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট যদি অমন হতো, তাহলে তো কথাই ছিল না। তৃতীয়ত, গুজব। যেকোনো পণ্যের চাহিদার অনেকগুলো নিয়ামক থাকে, যার মধ্যে অন্যতম প্রধান হচ্ছে ভবিষ্যতের দাম সম্পর্কে প্রত্যাশা। ভোক্তা যদি ভাবে যে পেঁয়াজের দাম হু হু বেড়ে যাবে, তাহলে সে আজই বেশি করে কিনে রাখবে। আবারবুদ্ধিমানসিন্ডিকেট যদি খবর পায় যে ভারত কিংবা পাকিস্তানে পেঁয়াজের ঘাটতি আছে বলে বাংলাদেশের ঈশানকোণে সংকট ঘনীভূত হচ্ছে, তাহলে টন কে টন পেঁয়াজ বাজার থেকে অল্প দামে কিনে পরবর্তী সময়ে বেশি দামে বিক্রি করে মুনাফা স্ফীত করবে। বাস্তবে হয়েছেও তাই। চতুর্থত, নিয়মিত বাজার পরিদর্শন বাজারমূল্যের পরিবীক্ষণের অভাব। মুক্ত বাজারের প্রবক্তা অ্যাডাম স্মিথ যুক্তি দেখিয়ে বলেছেন, দক্ষ নজরদারি না থাকলে বাজার অর্থনীতি যথাযথ কাজ করবে না। বাংলাদেশে বাজার ব্যবস্থাপনা অনেকটা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মতোশুধু দুর্যোগ মুহূর্তেই দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়; তারপর যেই লাউ সেই কদু। সবশেষে সুশাসনের অভাব। পঞ্চমত, সময় এসেছে যখন চালমুখী নীতিমালা অবকাঠামো থেকে দৃষ্টি চালবহির্ভূত শস্যের ওপর দেয়া উচিত। কীভাবে এসব পণ্যের সাপ্লাই চেন উন্নত করা যায়, কী করে এসব পণ্যের উৎপাদন বাড়াতে আর্থিক গবেষণামূলক প্রণোদনা দেয়া যায়, সেদিকে লক্ষ রাখা জরুরি। শামুকে যেমন পা কাটে, আপাতদৃষ্টে এমন সব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিমাণে উৎপাদিত পণ্য যথা আদা, রসুন, পেঁয়াজ জীবন জেরবার করার ক্ষমতা রাখে। এবং সবশেষে খাদ্যাভ্যাস নিয়ে আমাদের প্রথাগত চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রে পরিবর্তন জরুরি। কথায় আছে, নেসেসিটি ইজ দ্য মাদার অব ইনভেনশন। পাঁচ কেজির জায়গায় চার কেজি পেঁয়াজ খেলে তেমন স্বাস্থ্যহানি ঘটবে বলে মনে হয় না।

পাঁচ.

পেঁয়াজ কিংবা অন্যান্য কৃষিপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী দাম নিয়ে অত হইচই করার কিছু নেই, আবার আছেও। কৃষিপণ্যের দাম বাড়া মানে কৃষকের আয় বৃদ্ধি। জাপানিরা আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি দাম দিয়ে তাদের কৃষকের চাল খায়, আমদানি করে না। কারণ তারা মনে করে, জাপানের আজকের অবস্থানে কৃষি তথা কৃষক যে ভূমিকা রেখেছেন, সেই ঋণ কিছুটা হলেও পরিশোধ করা। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে অনুভূতি অনুপস্থিত। পেঁয়াজের চলমান অস্বাভাবিক দামের কথা আপাতত বাদ দিলাম, এমনিতেও চালের দাম, সবজির দাম বাড়লে আমাদের বুকে জ্বালা ধরে যায়। অথচ আমরা কথায় কথায় বলে থাকি যে আমরা কৃষকের সন্তান, কৃষক জাতির মেরুদণ্ড ইত্যাদি।

তবে হইচই করার ক্ষেত্র একটা আছে, আর সেটা হলো খুচরা দামের কত অংশ কৃষকের ঘরে যায়। এই যে ৪০ টাকার পেঁয়াজ ২০০ টাকার উপরে উঠল, অর্থাৎ কেজিপ্রতি অতিরিক্ত ১৬০ টাকার কতটুকু কৃষক তথা উৎপাদক পেয়েছেন? বস্তুত কিছুই পাননি। লাভের গুড় যেমন পিঁপড়ায় খায়, কৃষকের কপাল পোড়ে সিন্ডিকেটে। এটা চিরায়ত যে কৃষক তার ন্যায়সংগত হিস্যা থেকে বঞ্চিত থাকেন।

ছয়.

এর একটা বিহিত হওয়া দরকার। সিন্ডিকেটের কালো হাত ভাঙতে না পারলে কৃষক মরবেন না খেয়ে আর অন্যদিকে ভোক্তা মরবে হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে। উড়োজাহাজে উড়িয়ে আনার পরও স্বস্তি দুরস্ত, যদি সিন্ডিকেট, অসাধু ব্যবসায়ী কিংবা অবৈধ লেনদেন বন্ধে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি শুধু মুখের কথা হয়, মাঠের বাস্তবতা না হয়।

 

আব্দুল বায়েস: সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন