শনিবার | ডিসেম্বর ১৪, ২০১৯ | ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সংকেত

বেসরকারি প্রকল্পে বিনিয়োগে আগ্রহী চীনা বিনিয়োগকারীরা

চলতি মাসের তারিখে চীনের সাংহাইতে দ্বিতীয়বারের মতোইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্সিয়াল কো-অপারেশন সামিট ২০১৯অনুষ্ঠিত হয়। চীনের মিনিস্ট্রি অব কমার্স ইন্টারন্যাশনাল ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট ব্যুরোর সহযোগিতায় সামিটের মূল উদ্যোক্তা ছিল চায়না ইউরোপ ইকোনমিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কো-অপারেশন অ্যাসোসিয়েশন, শানসি প্রভিন্সিয়াল অফিস অব চায়না ইউরোপ ইকোনমিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কো-অপারেশন অ্যাসোসিয়েশন এবং দি আরব কান্ট্রিজ বিজনেস ওয়ার্ক কমিটি অব চায়না ইউরোপ ইকোনমিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কো-অপারেশন অ্যাসোসিয়েশন। সামিটে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শীর্ষস্থানীয় মার্চেন্ট ব্যাংক ট্রিপল ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্ট লিমিটেড অংশগ্রহণ করে। সামিটে চীনের বিনিয়োগ ব্যাংকগুলোর অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের কনগ্লোমারেটদের বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগ কারিগরি সহযোগিতা প্রদানের আগ্রহ ব্যক্ত করে। সম্প্রতি বণিক বার্তার কাছে সামিটে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ট্রিপল ফিন্যান্সের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান খাজা আরিফ আহমেদ এবং পরিচালক প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) মোহাম্মদ ফেরদৌস মাজিদ। কথা বলেছেন মেহেদী হাসান রাহাত।

খাজা আরিফ আহমেদ: সম্প্রতি আমরা চীনের সাংহাইতে একটি আন্তর্জাতিক সামিটে অংশ নিয়েছিলাম। এখানে চীনের সরকার, তাদের অর্থ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, আরো বেশ কিছু সরকারি সংস্থাসহ দুবাই, বাহরাইন, কাতার কুয়েতের শীর্ষস্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেছেন। প্রোগ্রামে চীনা সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সমর্থন ছিল। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সামিটের উদ্বোধন করেন। চীনা প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণে বাংলাদেশ থেকে একমাত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরা ট্রিপল ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের পক্ষ থেকে সামিটে উপস্থিত ছিলাম। মূলত মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক কারিগরি সহযোগিতা জোরদার করাই ছিল সামিটের মূল লক্ষ্য। চীনা সরকার মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে আরো নিবিড় অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছে। সামিটের প্রতিপাদ্য ছিল—‘বিশ্বকে চীনের প্রয়োজন এবং বিশ্বেরও চীনকে প্রয়োজন কাজেই বুঝতেই পারছেন তারা কী চায়। সেখানে আমি চীনা প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে অবাক হয়েছি যে বাংলাদেশের অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে চীনের বড় বিনিয়োগ থাকলেও বিষয়ে সেখানকার অনেকেই জানে না। এমনকি আমাদের এখানো কোন কোন খাতে বিদেশী বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে, সে বিষয়েও তাদের জানার ঘাটতি রয়েছে। অথচ তাদের কাছে বিনিয়োগ করার মতো পর্যাপ্ত অর্থ রয়েছে। এর বিপরীতে আমাদের অর্থনীতিকে আরো বেগবান করতে হলে বিপুল পরিমাণ বিদেশী বিনিয়োগ প্রয়োজন। মূলত বিষয়টি নিয়েই আমরা কাজ করছি। ফিন্যান্সিয়াল ইন্টারমিডিয়ারিজ হিসেবে আমাদের কাজই হচ্ছে উদ্যোক্তা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সংযোগ করে দেয়া। দেশের পুঁজিবাজারে তো আমাদের কার্যক্রম আছেই। এর পাশাপাশি আমরা দেশে বিদেশী বিনিয়োগ আনার জন্য কাজ করতে চাচ্ছি। এরই মধ্যে আমরা ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) মূল স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হিসেবে কাজ করছি। আমাদের মাধ্যমে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত আইডিবি ১৩ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। এবার আমরা চীনা বিনিয়োগ দেশে নিয়ে আসার জন্য কাজ করছি। সামনের বছরের জানুয়ারিতে জংগুয়ানকুন প্রাইভেট ইকুইটি অ্যান্ড ভেঞ্চার ক্যাপিটাল অ্যাসোসিয়েশনের (জেডভিসিএ) একটি প্রোগ্রাম রয়েছে, সেখানে আমরা বাংলাদেশের বড় বড় ব্যবসায়ী গ্রুপের প্রতিনিধিদের নিয়ে অংশগ্রহণ করতে চাই। এসব গ্রুপের বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প রয়েছে। সেসব প্রকল্পের জন্য একদিকে যেমন অর্থ প্রয়োজন, অন্যদিকে কারিগরি সহায়তাও প্রয়োজন। আর চীনের আর্থিক কারিগরি সক্ষমতা দুটোই রয়েছে। বাংলাদেশী উদ্যোক্তারা যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন কিংবা করার পরিকল্পনা নিয়েছেন, সেগুলোয় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে হয়তো কোনো চীনা বিনিয়োগকারীর আগ্রহ রয়েছে। এখানে আমরা বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে চীনের বিনিয়োগকারীদের কানেক্টিভিটি তৈরি করে দিতে চাইছি।


মোহাম্মদ ফেরদৌস মাজিদ: চীন এখন ডিজিটালাইজেশনের ক্ষেত্রে বেশি ফোকাস করছে। ডিজিটাল ব্যাকিং, ফিন্যান্সিয়াল মার্কেটের ইনোভেশন, ডিজিটাল কারেন্সি, ব্লকচেইনের মতো বিষয়গুলোয় চীনের দক্ষতা অনেক বেশি। সারা বিশ্বেই এখন ব্লকচেইন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আমাদের এখানে কীভাবে ব্লকচেইন প্রযুক্তিকে আর্থিক খাত  পুঁজিবাজারের কাজে লাগানো যায়, সেটি আমরা চিন্তাভাবনা করছি। আমাদের দেশে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম খুবই সীমিত। ইস্যু ব্যবস্থাপনা, অবলেখন আর পোর্টফোলিও ম্যানেজ করাটাই মার্চেন্টের মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে চীনে গিয়ে আমরা যেটা দেখলাম, তাদের ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম অনেক ব্যাপক। তাদের কাছে চীনের অনেক বিনিয়োগকারীর পুল অব ফান্ড রয়েছে। জেডভিসিএর সব সদস্যের কাছে ৪০ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি সম্পদ রয়েছে। সেখানে আমাদের এমন বেশকিছু ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। সামিটে আমরা যখন বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি, বিভিন্ন অর্থনৈতিক নির্দেশকে আমাদের অবস্থান তুলে ধরলাম, তখন সবাই বাংলাদেশের প্রশংসা করল। তারা বলল যে আমরা আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন জার্নালের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির বিষয়টি জানতে পেরেছি। কিন্তু বাংলাদেশের বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে যে চীনের বড় ধরনের বিনিয়োগ রয়েছে, সেটা সেখানকার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকারদের কাছে অনেকটাই অজানা ছিল। তখন জেডভিসিএর প্রতিনিধিরা আমাদের বলল যে তোমাদের সরকারের সঙ্গে আমাদের অনেক প্রকল্প রয়েছে, এবার আমরা তোমাদের বেসরকারি খাতের সঙ্গেও কাজ করতে চাই। তখন তারাই আমাদের প্রস্তাব দিল যে বাংলাদেশের যেসব বড় ব্যবসায়িক গ্রুপ রয়েছে, তাদের নিয়ে আগামী বছরের জানুয়ারির ১৫ তারিখে একটি বেসরকারি খাত নিয়ে অনুষ্ঠিতব্য সম্মেলনে অংশগ্রহণ করার জন্য। সেখানে এসব ব্যবসায়িক গ্রুপের বিভিন্ন প্রকল্পের বিষয়ে চীনা বিনিয়োগকারীরা বিস্তারিত জানার সুযোগ পাবে। চীনা বিনিয়োগকারীদের কেউ হয়তো তথ্যপ্রযুক্তিতে বিনিয়োগে আগ্রহী, আবার কেউ হয়তো আর্থিক খাতে বিনিয়োগ করতে চায়, আবার কেউ চায় অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করতে। ফলে চীনা বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের সংযোগ তৈরি হলে তখন দুই পক্ষই তাদের নিজেদের সুবিধামতো কাজ করতে পারবে। যেহেতু আমাদের সঙ্গে চীনা ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের একটি যোগাযোগ তৈরি হয়েছে, সেহেতু তারা আমাদের বাংলাদেশের কিছু ব্যবসায়ী গ্রুপকে চীনে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব দিয়েছে। দেশে আমরা দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন করপোরেট গ্রাহকের সঙ্গে কাজ করেছি। এর মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠানের ইস্যু ব্যবস্থাপনার সঙ্গে আমরা জড়িত ছিলাম। আবার কিছু প্রতিষ্ঠানের জন্য আমরা বিদেশী ঋণ এনে দিয়েছি। আমরা দেশের এমন কিছু বড় গ্রুপ, যাদের সক্ষমতা ভালো তাদের বাছাই করতে চাইছি। যেমন বসুন্ধরা, স্কয়ার, পারটেক্স, ওয়ালটন, আনোয়ার গ্রুপের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলোসহ ১০ থেকে ১৫টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমরা চীনা বিনিয়োগকারীদের প্রস্তাবের বিষয়ে আলোচনা করব। যারা এতে আগ্রহী হবে, তাদের নাম আমাদের আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে চীনে পাঠাতে হবে। শুধু যে আমরা বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে কাজ করব, এমন নয়। চীনা বিনিয়োগকারীরা এসএমই স্টার্টআপ প্রকল্পের বিষয়েও আগ্রহী। এসব প্রতিষ্ঠানকে নিয়েও আমাদের কাজ করার আগ্রহ রয়েছে। চীনারা অর্থের পাশাপাশি প্রযুক্তি সরবরাহের জন্যও সমানভাবে আগ্রহী। তাছাড়া আমরা সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, বিশেষ করে আর্থিক খাতসংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা যেমনবাংলাদেশ ব্যাংক, বিডা, বিএসইসি, এনবিআরসহ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বিষয়ে আলোচনা করব। পাশাপাশি আমরা আমাদের অ্যাসোসিয়েশন অন্য যেসব বড় ইন্টামিডিয়ারি রয়েছে, তাদের সঙ্গেও আলোচনা করব। এখানে আমাদের বিশাল সুযোগ রয়েছে। আমাদের একার পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয়। আমরা সবাইকে নিয়ে কাজ করতে চাই।

তারা সুনির্দিষ্ট কোনো মডেলে অর্থায়ন করবে না। বরং এক্ষেত্রে সব ধরনের মডেলেই অর্থায়নের সুযোগ রয়েছে। যে প্রকল্পের জন্য যে ধরনের অর্থায়ন প্রয়োজন, তারা সেভাবেই অর্থায়ন করবে। যেমনকিছু প্রকল্পের জন্য হয়তো তারা ঋণ দেবে, আবার কিছু প্রকল্পে ইকুইটি অর্থায়ন করবে, কোনো কোনো প্রকল্পে হয়তো ঋণ ইকুইটি দুটোই থাকবে। প্রয়োজন অনুসারে তারা অর্থায়ন মডেল বিল্ডিং মিক্সআপ করবে। এমনও হতে পারেচীনারা যেহেতু আমাদের ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জেরও অংশীদার, কোনো প্রকল্পকে হয়তো তারা পুঁজিবাজারেও নিয়ে আসবে। জেডভিসিএর সদস্যদের কাছে মিউচুয়াল ফান্ড, প্রভিডেন্ট ফান্ড, পেনশন ফান্ডসহ বড় আকারের পুল অব ফান্ড রয়েছে। সে ফান্ড থেকেই তারা বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করবে। মোদ্দাকথা, আর্থিক কারিগরি মিলিয়ে তারা একটি পূর্ণাঙ্গ ইনভেস্টমেন্ট সলিউশন দিতে চায়। আমাদের জন্য এটি অনেক বড় একটি সুযোগ এবং কীভাবে সুযোগের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করা যায়, সে ব্যাপারে আমাদের কাজ করতে হবে। 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন