মঙ্গলবার | ডিসেম্বর ১০, ২০১৯ | ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

প্রথম পাতা

ট্যুরিস্ট ভিসায় বিদেশের ড্যান্স বারে নারী পাচার

মনজুরুল ইসলাম

প্রথমে আমন্ত্রণ প্রাপ্তি, তারপর ট্যুরিস্ট ভিসায় বিদেশ ভ্রমণ। এরপর সেখানে গিয়ে ড্যান্স বারে নাচের কাজে যুক্ত হচ্ছেন বাংলাদেশী তরুণী। তাদের নির্বিঘ্নে আসা-যাওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করছে একটি আন্তর্জাতিক চক্র। সম্প্রতি এমন এক চক্রের সন্ধান পেয়েছে সরকারের একটি নিরাপত্তা সংস্থা। অনুসন্ধান করে সংস্থাটি এরই মধ্যে দুই শতাধিক তরুণীর পরিচয়, পাসপোর্ট, ভিসা টিকিটের নথি সংগ্রহ করেছে, যাদের প্রত্যেকেই গত এক বছরে কমপক্ষে তিনবার ভ্রমণ ভিসায় বিদেশে গিয়ে এক থেকে তিন মাস করে থেকেছেন। এসব তরুণীর বেশির ভাগের বয়সই ২৫ বছরের মধ্যে।

নিরাপত্তা সংস্থাটি জানায়, স্থানীয় এজেন্টদের মাধ্যমে সুন্দরী নারীদের প্রলোভনে ফেলে সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন ড্যান্স বারে সরবরাহ করছে চক্রটি। চক্রের অধীনে পাঁচ হাজারের বেশি বাংলাদেশী নারী এসব দেশের বিভিন্ন বারে কাজ করছেন।

আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে ঢাকার বেশ কয়েকটি ট্র্যাভেল এজেন্সিরও। রাজধানীর নয়াপল্টন, কাকরাইল মতিঝিলে অবস্থিত এসব ট্র্যাভেল এজেন্সির মূল কাজ ভ্রমণ ভিসায় যাওয়া তরুণীদের টিকিট থেকে শুরু করে নির্বিঘ্নে বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন অতিক্রমের ব্যবস্থা করা। আর কাজে সহায়তার জন্য বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) বিমানবন্দর ইমিগ্রেশনের একটি সিন্ডিকেটকে জনপ্রতি ৩০ হাজার টাকা করে মাশুল দেয় তারা। এসব তরুণীর টিকিট ক্রয় বিমানবন্দর পার করার সব খরচ বহন করে বিদেশের ড্যান্স বার হোটেলের মালিকপক্ষ।

অনুসন্ধানে এরই মধ্যে প্রায় ৩৫ জন স্থানীয় এজেন্টের পরিচয় পেয়েছে নিরাপত্তা সংস্থাটি। তাদের মধ্যে দুজন নারী পাচারে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জানিয়েছেন, গত এক বছরেই শুধু তাদের মাধ্যমেই বিদেশের ড্যান্স বারে কাজ করে এসেছেন প্রায় ৫০০ তরুণী।

আবুধাবি, মালয়েশিয়া, দুবাই আর সিঙ্গাপুরের ড্যান্স বার চালানো ১৫ জন মালিকের তথ্যও পেয়েছে সংস্থাটি। ড্যান্স বার হোটেলগুলোর অধিকাংশের মালিকানায় রয়েছে বাংলাদেশী, যাদের একজন কুমিল্লার আনিস।

মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের আশিকি নামে এমনই একটি ড্যান্স বার আছে আনিসের। অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রায় ১২ বছর আগে মালয়েশিয়ায় গিয়ে একটি ড্যান্স বারে কাজের সূত্রে তিনি শিখে ফেলেন মেয়েরা কীভাবে এখানে আসছেন আর কীভাবে এসব ড্যান্স বারে কাজ পাচ্ছেন। এরপর থেকে আনিস নিজেই নেমে পড়েন নেটওয়ার্কে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে। প্রথমাবস্থায় আনিস একজন দালালের ভূমিকা পালন করলেও পরে নিজেই চালু করেন ড্যান্স বার আশিকি বারে নাচার জন্য বাংলাদেশ থেকে এজেন্টের মাধ্যমে প্রতিনিয়তই সুন্দরী তরুণীদের সংগ্রহ করে যাচ্ছেন তিনি।

শুধু আনিস নয়, নরসিংদী থেকে মালয়েশিয়ায় গিয়ে তাজমহল ড্যান্স বারের মালিক হয়েছেন আবেদ। একইভাবে দি তাজ, ঢাকা বলিউড ইস্তানা কারি হাউজ নামে তিনটি ড্যান্স বারের মালিক হয়েছেন ইসমাইল। অন্যদিকে দুবাইয়ের বিলাসবহুল ফরচুন গ্র্যান্ড ড্যান্স বারের মালিকও আজম নামে এক বাংলাদেশী। এছাড়া দুবাইয়ে প্যানিসিয়া নামে একটি বার চালান বাংলাদেশী মহিউদ্দিন, ওয়াসিমের রয়েছে প্যারিস নামে একটি ড্যান্স বার। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ড্যান্স বার হোটেলের মালিকানায় আরো রয়েছেন দিদার, বিরাজ, রিয়াজ সজীব। সিঙ্গাপুরে বার আছে সোহাগ, মজিদ, নাজিম, ইমন চন্দনের। তারা সবাই ভ্রমণ ভিসায় বাংলাদেশ থেকে তরুণীদের নিয়ে যাচ্ছেন। তাদের নিয়োজিত এজেন্ট বাংলাদেশের পাশাপাশি কাজ করছেন পাশের দেশ ভারত, শ্রীলংকা নেপালে।

বিদেশী ড্যান্স বারগুলোর এজেন্ট হিসেবে ঢাকায় কাজ করছেন এমন দুজনের সঙ্গে কথা হয় বণিক বার্তার। তাদের একজন ময়মনসিংহ জেলার ধোবাউড়া এলাকার অনিক হোসেন এবং অন্যজন নোয়াখালীর চাটখিল এলাকার মনির হোসেন সোহাগ। তাদের মধ্যে সোহাগের আগামী ২০২০ সাল পর্যন্ত দুবাইয়ের রেসিডেন্স পারমিট রয়েছে। আর অনিক হোসেন জানান, প্রায় ১০ বছর আগে তিনি সজীব হোসেন বাচ্চু নামের এক ব্যক্তির কাছে প্রথমে আধুনিক (বলিউড) নৃত্য শিখেছিলেন। বাচ্চুই তাকে প্রথমে দুবাইয়ের একটি হোটেল কাম ড্যান্স বারে ভ্রমণ ভিসায় তিন মাসের জন্য চাকরির ব্যবস্থা করে দেন। সেখানে গিয়ে অনিক দেখতে পান শত শত বাংলাদেশী তরুণী তার মতোই ভ্রমণ ভিসায় ড্যান্স বার হোটেলে কাজ করছেন। পরবর্তী সময়ে তিনিও দেশে এসে শুরু করেন নিজের নাচের দল গোছানোর কাজ। মূলত দরিদ্র সুন্দরী তরুণীদের ফাঁদে ফেলে কাজে যুক্ত করেন তিনি। দুবাইয়ে বাংলাদেশী মালিকানাধীন পাঁচটি হোটেলের মালিকদের সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে বলে জানান অনিক।

অনিক আরো জানান, দুবাইয়ে সিঙ্গেল মেয়েদের জন্য ট্যুরিস্ট ভিসা পেতে বেশ কঠিন হলেও তাদের নেটওয়ার্কে ভিসা পেতে সময় লাগে মাত্র ৭২ ঘণ্টা। একটি মেয়ে সর্বোচ্চ তিন মাসের মেয়াদের ভ্রমণ ভিসা পান এবং সেখানে যাওয়ার পর দুবাইয়ের স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে ওয়ার্ক পারমিটের ব্যবস্থাও করেন হোটেল মালিকরা। এছাড়া বাংলাদেশ থেকে যাওয়ার উড়োজাহাজ ভাড়া, বিমানবন্দরের সিন্ডিকেটের টাকাও মালিকরা আগেই পাঠিয়ে দেন। অনিক তার কাছে থাকা একটি তালিকা দেখিয়ে জানান, গত দুই মাস আগেই দুবাই পাঠাতে ১৮ জন মেয়ের জন্য তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দুবাই থেকে অ্যাডভান্স বাবদ ১০ লাখ টাকা পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল।

বিমানবন্দরের টাকার ব্যাপারে অনিক জানান, একটি মেয়ে বছরে কমপক্ষে তিনবার দুবাই ভ্রমণে যাবেনএমন বিষয় রহস্যজনক। তাছাড়া এসব মেয়ে ভ্রমণ ভিসা নিয়ে বিদেশে গিয়ে কী কাজ করেন সেটাও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানে। তাই নির্বিঘ্নে মেয়েদের ইমিগ্রেশন সিভিল এভিয়েশনের নিরাপত্তা বেষ্টনী পার করতে মাথাপিছু ৩০ হাজার টাকা করে দিতে হয়।

জানতে চাইলে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক তৌহিদ-উল আহসান প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ভ্রমণ ভিসা নিয়ে তরুণীরা বিদেশের ড্যান্স বারে কাজ করছে এমন কোনো তথ্য আমাদের জানা নেই। আর ভ্রমণ ভিসায় কে কোন দেশে কতবার ভ্রমণ করছেন, সেটি ইমিগ্রেশন বিভাগ দেখে। কোনো যাত্রী ভ্রমণ ভিসায় গিয়ে দীর্ঘ সময় থাকছেন কিনা সেটার তথ্যও ইমিগ্রেশনের কাছে থাকে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিভিন্ন সংস্থা কাজ করে, এর মধ্যে বেবিচক একটি অংশ কেবল। পাচারের মতো সিন্ডিকেটে বেবিচকের কেউ জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অন্যদিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের কাছেও ধরনের কোনো তথ্য নেই। গতকাল সন্ধ্যায় দায়িত্বে থাকা শাহজালাল বিমানবন্দর ইমিগ্রেশনের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, বিমানবন্দরে গিয়ে প্রতিনিয়তই যাত্রীরা যাওয়া-আসা করছেন। এর মধ্যে নারী যাত্রীও যেমন যান, পুরুষ যাত্রীও তেমন যাচ্ছেন। কে বিদেশে গিয়ে কী করছেন, সেটা তো বোঝা সম্ভব নয়। এছাড়া কোনো যাত্রীর কাছে যদি বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা ভ্রমণের আনুষঙ্গিক সব নথি থাকে, তখন তাকে ইমিগ্রেশনে আটকানোর কোনো কারণ নেই। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা সরকারের অন্যান্য সংস্থা থেকে যদি কোনো যাত্রী বা পাসপোর্টের তথ্য দেয়া হয়, সে ক্ষেত্রে নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়।

জানা যায়, বিমানবন্দরের টাকাটা লেনদেন হয় ট্র্যাভেল এজেন্সির মাধ্যমে। ঢাকার পল্টন কাকরাইল এলাকার তিনটি ট্র্যাভেল এজেন্সি নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত। হোটেল মালিকদের পাঠানো অ্যাডভান্স থেকে বিমানবন্দরের টাকাটা অনিক সোহাগের মতো এজেন্টরাই ট্র্যাভেল এজেন্সিকে দিয়ে আসে এবং এখান থেকেও মাথাপিছু তাদের হাজার টাকা কমিশন দেয় ট্র্যাভেল এজেন্সিগুলো।

ট্র্যাভেল এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাসোসিয়েশন অব ট্র্যাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব) মহাসচিব আবদুস সালাম আরেফ বণিক বার্তাকে বলেন, কোনো যাত্রীর যদি বৈধ পাসপোর্ট ভিসা থাকে, তবেই কেবল এজেন্সিগুলো টিকিট বিক্রি করতে পারে। এখানে যাত্রীর ভ্রমণের উদ্দেশ্য কী, সেটা কিন্তু ট্র্যাভেল এজেন্সিগুলোর পক্ষে বের করা সম্ভব নয়। তবে কোনো ট্র্যাভেল এজেন্সি যদি জেনে-বুঝে ধরনের কাজের সঙ্গে জড়িত হয়, সে ক্ষেত্রে সেটা অপরাধ। এক্ষেত্রে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন