মঙ্গলবার | ডিসেম্বর ১০, ২০১৯ | ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

শেষ পাতা

ন্যূনতম স্যানিটেশন সুবিধা নেই ৬৭% পরিবারে

দেবাশীষ দেবু, সিলেট

বাগানের ভেতর বাঁশের বেড়া দিয়ে আড়াল করা গর্তের মতো একটি জায়গা। সেটিই শৌচাগার হিসেবে ব্যবহার করে মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দেওড়াছড়া চা বাগানের শ্রমিক রবি বুনার্জির পরিবার। আগে বাগানের ভেতরের খোলা জায়গাতেই শৌচকর্ম সারতেন তারা। বছর পাঁচেক হলো, বাঁশের বেড়ায় ঘেরা জায়গাটি নির্দিষ্ট করে নিয়েছেন।

প্রায় ৬০ বছর বয়সী রবি বুনার্জি বলেন, সরকার আর এনজিওর লোকজন কয়েকবার এসে কথাবার্তা বলে গেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কেউ পাকা পায়খানার ব্যবস্থা করে দেয়নি। নিজেরা করার মতো সংগতিও নেই আমাদের।

কুলাউড়ার লুহাইনি চা বাগানের অলক সাংমাদের রিং দেয়া পাকা পায়খানা আছে। কিন্তু পরিবারের বেশির ভাগ সদস্য, বিশেষত বয়স্ক পুরুষরা এটি ব্যবহার করেন না। কেন করেন না জানতে চাইলে অলক বলেন, বাইরে অভ্যাস হয়ে গেছে।

সিলেট অঞ্চলের কয়েকটি চা বাগান ঘুরে স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিয়ে এমন দুরবস্থা আর অদ্ভুত সংস্কারের দেখা মিলেছে। মাত্র ১০২ টাকা দৈনিক মজুরি পাওয়া চা শ্রমিকরা জীবনযাত্রার অন্যান্য সূচকের মতো স্যানিটারি ল্যাট্রিন ব্যবহারেও পিছিয়ে রয়েছে। ফলে সহজেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে তারা। শিশুরা ভুগছে কৃমি, পেটের পীড়াসহ জীবাণুবাহিত নানা রোগে।

মৌলভীবাজারের বিভিন্ন বাগানে চা শ্রমিকদের স্যানিটেশন ব্যবস্থা উন্নয়নে কাজ করেন এনজিওকর্মী রাব্বি ইসলাম। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, চা শ্রমিকদের মধ্যে, বিশেষত প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাগানগুলোর শ্রমিকদের মধ্যে অদ্ভুত সংস্কার রয়েছে। পরিবারের বয়স্করা যে পায়খানা ব্যবহার করেন, ছোটরা তা ব্যবহার করতে চান না। একে তারা অভদ্রতা মনে করেন।

সিলেটের তিন জেলার চা বাগানগুলোর ওপর পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, বাগানের মাত্র ৩৩ শতাংশ পরিবারে স্যানিটেশন সুবিধা রয়েছে। ৬৭ শতাংশ পরিবার ন্যূনতম স্যানিটেশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত। জরিপের তথ্য বলছে, বাগানের মাত্র ২৫ দশমিক শতাংশ শিশুর মল স্বাস্থ্যসম্মতভাবে পরিষ্কার করা হয়। আর সাবান দিয়ে সবসময় হাত ধোয়ার ব্যবস্থা আছে মাত্র ৪৯ শতাংশ পরিবারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সহযোগিতায় জরিপ পরিচালনা করে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ। দেশে কেবল চা শ্রমিকদের নিয়ে এটাই প্রথম বড় ধরনের জরিপকাজ।

জরিপের তথ্যের সঙ্গে মিল পাওয়া যায় সিলেট বিভাগীয় পরিচালকের (স্বাস্থ্য) দপ্তরের একটি প্রতিবেদনেও। গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিতে সিলেট বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক পর্যালোচনা সভায় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর থেকে দেয়া প্রতিবেদনে সিলেটের চা বাগান হাওড়ের ৬৬ শতাংশ লোক স্যানিটেশন সুবিধাবঞ্চিত বলে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, প্রথাগত ল্যাট্রিন ব্যবহারে অভ্যস্ততার (মাইন্ড সেটআপ) কারণে চা শ্রমিকদের স্যানিটেশনের আওতায় আনা যাচ্ছে না। এজন্য চা বাগানে বিশেষ কর্মসূচি প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।


চা বাগানে স্যানিটেশন বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিতে কাজ করে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা আইডিয়া। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নজমুল হক বলেন, চা বাগানের মালিকদেরই শ্রমিকদের উন্নত স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করে দেয়ার কথা। কিন্তু তা করেন না। সরকার এনজিওগুলোর উদ্যোগে শহরের আশপাশের চা বাগানগুলোর চিত্র কয়েক বছরে কিছুটা বদলেছে। তবে প্রত্যন্ত এলাকার বাগানগুলোর অবস্থা খুবই করুণ। ওসব বাগানে স্যানিটেশন ব্যবস্থা বলতে কিছু নেই। আবার অনেক ক্ষেত্রে স্যানিটেশন ব্যবস্থা করেও শ্রমিকদের তা ব্যবহার করানো যায় না। দীর্ঘদিনের অভ্যস্ততার কারণে তারা বাগানের ভেতরেই পয়োনিষ্কাশন করেন।

তবে চা বাগানের মালিকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, শ্রমিকদের নিজেদের মধ্যেই স্যানিটারি ল্যাট্রিন ব্যবহারে অনীহা আছে। চা শিল্পের উদ্যোক্তা সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি আফজাল রশীদ চৌধুরী বলেন, আমরা শ্রমিকদের জন্য রিং দিয়ে কিছু টয়লেট তৈরি করে দিয়েছিলাম। কিন্তু এগুলো তারা ব্যবহার করতেন না। পরে শ্রমিকরা দাবি করল যেন তাদের নগদ টাকা দিয়ে দিই। আমরা পরিবারপ্রতি হাজার টাকা করে দিলাম। কিন্তু টাকা দিয়ে বেশির ভাগই টয়লেট তৈরি করেনি। এখন সিদ্ধান্ত নিয়েছি আর নগদ টাকা দেব না, আবার টয়লেট করে দেব। মূলত অভ্যাসগত কারণেই চা শ্রমিকরা টয়লেট ব্যবহারে অভ্যস্ত হতে পারছে না বলে জানান তিনি।

এদিকে দেশের চা বাগানগুলোয় কাজ করা শ্রমিকদের জন্য বিশুদ্ধ খাবার পানি নিশ্চিত করা স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা সম্প্রসারণের জন্য একটি প্রকল্প নিয়েছে সরকার। গত বছর একনেকে পাস হওয়া প্রায় সাড়ে ৬১ কোটি টাকার প্রকল্পে স্যানিটেশন ব্যবস্থার সম্প্রসারণে দেশের সাত জেলার চা বাগানগুলোতে ১০০টি বায়োফিল টয়লেট, ১০৭টি কমিউনিটি ল্যাট্রিন হাজার ৩৯৮টি স্যানিটারি ল্যাট্রিন নির্মাণ করা হবে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক রওশন আলম বলেন, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জসহ সাত জেলায় ৬২ চা বাগানে প্রকল্পের অধীনে বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করার কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। তবে স্যানিটেশন কাজের টেন্ডার হতে একটু দেরি হয়েছে। সম্প্রতি টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। তবে তিনি বলেন, টয়লেট নির্মাণে যে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে, তাতে ঠিকাদাররা আপত্তি জানাচ্ছে। তারা ব্যয় বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছে। ফলে পুনঃদরপত্র আহ্বানের প্রয়োজন হতে পারে। এমনটি হলে কাজ শুরু হতে একটু দেরি হবে। আগামী বছরের ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে না হলে বড়জোর আরো ছয় মাস বেশি সময় লাগতে পারে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন