মঙ্গলবার | ডিসেম্বর ১০, ২০১৯ | ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

শেষ পাতা

পুলিশের তথ্য

সড়ক দুর্ঘটনা ১০ বছরে সর্বোচ্চে

নিজস্ব প্রতিবেদক

সরকারের পরিকল্পনা, ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা নেমে আসবে অর্ধেকে। যদিও পরিসংখ্যান বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনার সংখ্যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) গত ১০ বছরের রেকর্ড ছাড়িয়েছে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা। বাংলাদেশ পুলিশের দেয়া তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে তিন হাজারের বেশি সংখ্যক, যা এমনকি বার্ষিক হিসেবেও ২০০৯ সালের পর সর্বোচ্চ। অন্যদিকে এসব দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ বছরে সর্বোচ্চে।

বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে হাজার ৯টি। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন হাজার ৬০ জন। আহত হয়েছেন আরো হাজার ২৯২ জন। এর আগে ২০০৯ সালে এর চেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছিল, হাজার ৩৮১টি। অন্যদিকে সড়ক দুর্ঘটনায় চলতি বছরের তুলনায় বেশি প্রাণহানি ঘটেছিল সর্বশেষ ২০০৮ সালে। ওই বছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন হাজার ৭৬৫ জন।

প্রসঙ্গত, সরকারের বিভিন্ন দপ্তর সংস্থা সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানে বাংলাদেশ পুলিশের দেয়া তথ্য ব্যবহার করে থাকে। যদিও বেসরকারি হিসাবে এসব দুর্ঘটনা হতাহতের সংখ্যা আরো বেশি।

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। একইভাবে পরিবহন ব্যবস্থাপনাও ত্রুটিপূর্ণ। নিয়ন্ত্রক আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যেও রয়েছে সমন্বয়হীনতা।

দেশের পরিবহন খাতের বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দুর্বলতার পাশাপাশি সড়ক ব্যবহারকারীদের অসচেতনতাও দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৯ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা ছিল হাজার ৯৫৮। পরের বছর তা নেমে আসে হাজার ৬৪৬-এ। ২০১১ সালে তা আরো কমে দাঁড়ায় হাজার ৫৪৬ জনে। এরপর ২০১২ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা ছিল হাজার ৫৩৮। ২০১৩ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান হাজার ৯৫৭ জন। ২০১৪ সালে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় হাজার ৬৭-তে। এর পর থেকেই ঊর্ধ্বমুখিতার ধারা বজায় রেখেছে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা। ২০১৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান হাজার ৩৭৬ জন। ২০১৬ সালে সংখ্যা আরেকটু বেড়ে দাঁড়ায় হাজার ৪৬৩। এরপর ২০১৭ সালে হাজার ৫১৩ জন গত বছর হাজার ৬৩৫ জন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান।

তবে পুলিশের দেয়া দুর্ঘটনার তথ্য ভরসা করার মতো নয় বলে মনে করছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শতভাগ দুর্ঘটনার তথ্য পুলিশের প্রতিবেদনে উঠে আসে না। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক . সামছুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, কী কারণে দুর্ঘটনা ঘটে, কতজন হতাহত হয়, কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়এগুলো না জেনে আসলে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। যেহেতু সড়ক দুর্ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলার বিষয় রয়েছে, সেহেতু তথ্য সংগ্রহের কাজটি পুরো বিশ্বে পুলিশই করে থাকে। কিন্তু আমাদের এখানে তা হয় না। পুলিশ সঠিক তথ্য-উপাত্ত রাখে না। আন্ডাররিপোর্টিং করে। সরকারের প্রশ্রয় থাকায় তাদের জবাবদিহিও করতে হয় না। 

তিনি আরো বলেন, আমরা যদি সত্যিকার অর্থে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে চাই, তাহলে প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে অনুসন্ধানী হতে হবে, যার ওপর ভিত্তিতে করে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানা যাবে। প্র্যাকটিসটা ফলো করে যুক্তরাজ্যের একটা সংস্থা বাংলাদেশে পাঁচ বছর ধরে কাজ করে জিনিসগুলোকে সিস্টেমেটিক করে দিয়েছিল। একটা অ্যাকসিডেন্ট রিপোর্ট ফর্ম তৈরি করে দিয়েছিল, যা সংসদেও পাস হয়েছিল। পুলিশের একটি অ্যাকসিডেন্ট ডাটা ইউনিট তৈরি করা হয়েছে। একটি সফটওয়্যারও তৈরি হয়েছে। তবে এগুলো কোনো কাজেই লাগানো হচ্ছে না।

চলতি বছরের প্রথম নয় মাসের তথ্য নিয়ে দুর্ঘটনা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট। ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদনে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত হাজার ১৩১টি দুর্ঘটনার তথ্য তুলে ধরা হয়ছে। এসব দুর্ঘটনায় হাজার ৪৮৮ জন নিহত হাজার ৮৬৩ জন আহত হয়েছেন বলে জানানো হয় প্রতিবেদনে।

বুয়েটের হিসাব বলছে, চলতি বছরে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে মোটরসাইকেল। মোট দুর্ঘটনার ২৫ শতাংশ ঘটেছে মোটরসাইকেলে। মোটরসাইকেলের পরই সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনাকবলিত হয়েছে ট্রাক, ২২ শতাংশ। বাস দুর্ঘটনার হার ২১ শতাংশ বাস। ১৩ শতাংশ ক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় জড়িয়েছে তিন চাকার মোটরযান। একই ভাবে শতাংশ ক্ষেত্রে পিকআপ কাভার্ড ভ্যান, শতাংশ ক্ষেত্রে নসিমন, শতাংশ ক্ষেত্রে প্রাইভেট কার শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে অন্য মোটরযানে।

সম্প্রতি ঢাকার আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (এআইইউবি) আয়োজনে সড়ক পরিবহন আইন নিয়ে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় সড়ক পরিবহন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বেড়ে যাওয়ার জন্য দায়ী ছোট ছোট যানবাহন, যেগুলো নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মহাসড়কে চলাচল করে।

সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সরকার কাজ করে যাচ্ছে জানিয়ে ওই সময় তিনি বলেন, নতুন আইন কার্যকর হয়েছে। আইনটি মেনে চললে দুর্ঘটনার পাশাপাশি সড়কের বিশৃঙ্খলাও কমে আসবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন