মঙ্গলবার | ডিসেম্বর ১০, ২০১৯ | ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

শেষ পাতা

গরুর লাম্পি স্কিন ডিজিজ

ছড়িয়ে পড়েছে চট্টগ্রামের ২০ শতাংশ খামারে

দেবব্রত রায় চট্টগ্রাম ব্যুরো

দেশে প্রথমবারের মতো গরুর লাম্পি স্কিন ডিজিজ শনাক্ত হয় চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহায়। পাঁচ মাস আগে প্রথম শনাক্ত হওয়া রোগ এখন পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, কেবল চট্টগ্রামেই ২০ শতাংশের বেশি খামারের গরু রোগে আক্রান্ত।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের ২০ শতাংশ খামার আক্রান্ত হয়েছে বললেও বাস্তবে হার আরো বেশিই হবে। কারণ খামার ছাড়াও গৃহস্থদের পালিত অনেক গরু রোগে আক্রান্ত হয়েছে, যার কোনো হিসাব নেই সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে। লাম্পি স্কিন ডিজিজের প্রাদুর্ভাব দেশের ডেইরি শিল্পের ওপর বড় ধরনের আঘাত বলে মনে করছেন তারা।

চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) অধ্যাপক . মো. রায়হান ফারুক বণিক বার্তাকে বলেন, রোগটি আমাদের কাছে একেবারেই নতুন। তাছাড়া রোগে আক্রান্ত গরুর জন্য কোনো প্রতিষেধক এখনো আবিষ্কার করা হয়নি। তবে প্রাথমিক কিছু চিকিৎসা প্রদান করলে গবাদিপশু সুস্থ হয়ে ওঠে। চিকিৎসা সময়মতো করা না হলে রোগ প্রাণঘাতী হতে পারে। এমনকি গরুর মাংস দুধ উৎপাদন ব্যাপকভাবে হ্রাস পেতে পারে, যা ডেইরি শিল্পের জন্য বড় ধরনের হুমকি।

জানা গেছে, লাম্পি স্কিন ডিজিজ রোগটি ১৯২৯ সালে প্রথম আফ্রিকা মহাদেশের জাম্বিয়ায় দেখা যায়। পরে রোগ মহাদেশটির অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় দক্ষিণ আফ্রিকা, বতসোয়ানা, মোজাম্বিকসহ পার্শ্ববর্তী অনেক দেশে গরু আক্রান্ত হয়ে মারা যায় এবং শত শত খামার বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে সত্তর আশির দশকে আফ্রিকার প্রায় সব দেশের গরু রোগে আক্রান্ত হয় এবং হাজার হাজার খামার বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৩ সালে মধ্যপ্রাচ্যে এবং ২০১৫ সালের দিকে আজারবাইজান, আর্মেনিয়া, কাজাখস্তানে রোগ আবার সামনে চলে আসে। ২০১৬ সালে গ্রিস, সাইপ্রাস, বুলগেরিয়া, সার্বিয়া, কসোভোয় ছড়িয়ে পড়ে লাম্পি স্কিন ডিজিজ। চলতি বছর এশিয়া মহাদেশের চীন ভারতের কিছু অঞ্চলে রোগ দেখা দেয়। সর্বশেষ ভারতের উড়িষ্যা এবং অন্যান্য প্রদেশ থেকে বাংলাদেশে রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশে চোরাকারবারিদের মাধ্যমে অনেক ভারতীয় পশু প্রবেশ করেছে। এসব পশুর মাধ্যমেই লাম্পি স্কিন ডিজিজ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা কোয়ারান্টাইন করেও ঠেকানো যায়নি।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, চলতি বছর চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহায় রোগটি দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দেখা দেয়। বর্ষার শেষে, শরতের শুরুতে অথবা বসন্তের শুরুতে মশা-মাছি অধিক বংশবিস্তার করে, সেই সময়ে প্রাণঘাতী রোগটি ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। রোগ মশা, মাছি, আটালি, আক্রান্ত পশুর লালা, নাক-চোখের ডিসচার্জ, ব্যবহূত ইনজেকশনের সিরিঞ্জ ইত্যাদির মাধ্যমে ছড়ায়। অনুকূল পরিবেশে ভাইরাস ছয় মাস পর্যন্ত জীবিত থাকতে পারে। ভাইরাসজনিত রোগে গবাদিপশু দুর্বল হয়ে ওজন কমে যায়, দুধ উৎপাদন হ্রাস পায় এবং চামড়ার গুণগতমান নষ্ট হয়। আক্রান্ত গবাদিপশুর শরীরে ১০৪-১০৬ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রা দেখা দিতে পারে এবং গরু খাওয়া ছেড়ে দেয়। অনেক সময় বুকের নিচে পানি জমে ক্ষত সৃষ্টি হয়ে ক্ষতস্থান ফেটে মাংস খুলে পড়ে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ রেয়াজুল হক বণিক বার্তাকে জানান, কর্ণফুলী থানার শিকলবাহায় প্রথম দেখা গেলেও বর্তমানে জেলার অন্যান্য উপজেলায় রোগটি ছড়িয়ে পড়ছে। আমরা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি। আমাদের কাছে আপাতত যে তথ্য আছে, তাতে চট্টগ্রামে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ খামার রোগে আক্রান্ত হয়েছে। যেহেতু রোগটি আমাদের কাছে একেবারেই নতুন, সেজন্য আমরা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে রোগ নির্মূলে কাজ শুরু করেছি।

চট্টগ্রামের গরুর খামারের মালিকদের সংগঠন চিটাগং ডেইরি ফার্ম অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম জেলাজুড়ে প্রায় দুই হাজারের বেশি গরুর খামার আছে। তাছাড়া ঘরে গৃহপালিতভাবে গরু লালন-পালন করা হয়। বর্তমানে চট্টগ্রামের প্রায় হাজার ২০০ খামার কোনো না কোনোভাবে আক্রান্ত হয়েছে রোগে।

এদিকে চিটাগং ডেইরি ফার্ম অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. শাহেদ আয়েতুল্লাহ খান বণিক বার্তাকে বলেন, চট্টগ্রামের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর যে ২০ শতাংশ খামার আক্রান্ত হয়েছে বলছে, এটা সত্য নয়। চট্টগ্রাম জেলায় প্রায় দুই হাজার গবাদিপশুর খামার আছে, যার মধ্যে ৬০ শতাংশ খামারই লাম্পি স্কিন ডিজিজে আক্রান্ত। এমনকি আমার নিজের খামারেই ৭০টি গরুর মধ্যে ৫০টিই রোগে আক্রান্ত হয়েছে। অনেক গরু আমি বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি। চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য এলাকার প্রতিটি উপজেলায় রোগে আক্রান্ত গরুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন