শনিবার | ডিসেম্বর ০৭, ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

প্রথম পাতা

পেঁয়াজের পর লবণ নিয়ে অস্থিরতা

নিজস্ব প্রতিবেদক

এতদিন অস্থিরতা চলছিল পেঁয়াজ নিয়ে। গতকাল আরেক নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য লবণ নিয়ে শুরু হয় একই পরিস্থিতি। সরবরাহ সংকটের গুজবে দেশজুড়েই লবণ কেনার হিড়িক পড়ে। ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাড়তে থাকে দাম। ৩০ টাকা কেজি দরের লবণ কোথাও কোথাও ১৫০ টাকা ছাড়িয়ে যায়।

সারা দেশে লবণ নিয়ে লংকাকাণ্ডে নড়েচড়ে বসে মন্ত্রণালয় অধিদপ্তর। দেশে লবণের কোনো সংকট নেই বলে প্রচার চালায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) নিয়ে কথা বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশিও। তিনি বলেন, লবণের সংকট হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। দাম বাড়ারও কারণ নেই। লবণের দাম বাড়াতে একশ্রেণীর ব্যবসায়ী গুজব ছড়াচ্ছেন।

পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে এমনিতেই শঙ্কায় রয়েছেন ভোক্তারা। এর মধ্যেই লবণ সংকটের গুজবে পণ্যটির ক্রয় বাড়িয়ে দেন ক্রেতারা। প্রতি কেজি লবণের প্যাকেটে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৩৫ টাকা লেখা থাকলেও রাজধানীর কোনো কোনো খুচরা বাজার মুদি দোকানে তা ১০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। কোনো কোনো দোকানি ১৫০ টাকা কেজি দরেও লবণ বিক্রি করেন।

চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামেও গতকাল লবণ কিনতে ক্রেতাদের ভিড় বেড়ে যায়। নগরীর পশ্চিম মাদারবাড়ী এলাকার মেসার্স নিউ সন্দ্বীপ স্টোরের স্বত্বাধিকারী বিপ্লব সাহা বণিক বার্তাকে বলেন, বিকালে হঠাৎ করেই লবণ কিনতে ভিড় করেন খুচরা ক্রেতারা। সবাই তিন-পাঁচ কেজি পর্যন্ত লবণ সংগ্রহ করেন। দোকানে তিন বস্তা (প্রতিটি ২৫ কেজি) মোড়কজাত ব্র্যান্ডেড লবণ ছিল। ঘণ্টার মধ্যেই তা বিক্রি হয়ে যায়।

চট্টগ্রামের কোনো কোনো বাজারে গতকাল ১০০ টাকা কেজি দরেও লবণ বিক্রি হয়। নগরীর কাজীর দেউড়ি এলাকার সিডিএ মার্কেটের মেসার্স জীবন গ্রোসারিতে বিকালে লবণ কিনতে চাইলে দোকানি প্রতি কেজি ৮০ টাকা দাম চান। সন্ধ্যার পর ফের লবণ কিনতে গেলে মজুদ নেই বলে জানানো হয়। দোকানের এক কর্মচারী বলেন, বিকালের মধ্যেই মজুদ লবণ শেষ হয়ে গেছে। প্রতি কেজি লবণ ৮০-১০০ টাকায় বিক্রি করেছেন তারা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে লবণের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। তবে কয়েক মাস ধরে পেঁয়াজের বাজার নিয়ে অস্থিরতার সুযোগে একটি শ্রেণী গুজব সৃষ্টির চেষ্টা করছে। কারণে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে লবণ কেনা বাড়িয়ে দিয়েছে।

খাতুনগঞ্জের চাক্তাই এলাকার মেসার্স লাল মিয়া সল্ট অ্যান্ড ক্রাশিং কোম্পানির স্বত্বাধিকারী মো. খোরশেদ বণিক বার্তাকে বলেন, দেশে লবণের কোনো ঘাটতি নেই। নভেম্বর লবণের নতুন উৎপাদন মৌসুমও শুরু হয়ে গেছে। আগামী মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত দেশে লবণ উৎপাদন হবে। ফলে লবণের ঘাটতি নিয়ে গুজবে কান দেয়ার কারণ নেই।

সিলেট: লবণের দাম বাড়তে যাচ্ছেসোমবার সন্ধ্যার পর সিলেটে এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ে। নগর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম সবখানে ছড়িয়ে পড়ে লবণের মূল্যবৃদ্ধির গুজব। এরপর রাতভর লবণ নিয়ে চলে কাড়াকাড়ি। দোকানে দোকানে লবণ কেনার জন্য ক্রেতাদের ভিড়, লবণ না পেয়ে দোকান ভাংচুর, সুযোগ পেয়ে ব্যবসায়ীদের লবণের দাম বাড়িয়ে দেয়া, ৩০ টাকা কেজির লবণ ১৫০ টাকায় বিক্রি করা, প্রশাসনের অভিযান-জরিমানা, গুজবে বিভ্রান্ত না হতে মাইকিংসবকিছুই হয় সোমবার রাতে।

নগরীর কালীঘাটে লবণভর্তি দুটি ভ্যান জব্দ করে অতিরিক্ত দাম রাখার দায়ে দুই ব্যবসায়ীকে অর্থদণ্ড কারাদণ্ড দেন সিলেট মহানগর পুলিশের ভ্রাম্যমাণ আদালত। অতিরিক্ত দামে লবণ বিক্রির দায়ে রাতে সিলেটের গোয়াইনঘাট জকিগঞ্জ, সুনামগঞ্জের ছাতক, মৌলভীবাজারের বড়লেখাসহ বিভিন্ন উপজেলায় অভিযান চালিয়ে প্রায় লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। হবিগঞ্জে অতিরিক্ত দামে লবণ বিক্রির দায়ে দুই ব্যবসায়ীকে ১০ দিন করে কারাদণ্ড দুজনকে অর্থদণ্ড দেয়া হয়।

লবণের বাজার স্থিতিশীল রাখতে মধ্যরাত পর্যন্ত বিভাগের প্রায় সবকটি উপজেলায় অভিযান চালায় প্রশাসন। গোয়াইনঘাট, শ্রীমঙ্গলসহ কয়েকটি উপজেলায় গুজবে বিভ্রান্ত না হতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাতে মাইকিং করা হয়।

ব্যাপারে গতকাল দুপুরে সিলেটের জেলা প্রশাসক কাজী এমদাদুল ইসলাম বলেন, কে বা কারা গুজব ছড়িয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করেছিল। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে তা এখন অনেকটাই প্রশমিত হয়েছে। লবণ নিয়ে আর কোনো অস্থিরতা নেই।

আর গুজব সৃষ্টিকারীদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন সিলেটের পুলিশ সুপার মো. ফরিদ উদ্দিন।

তবে মঙ্গলবার সিলেটের বিভিন্ন মুদি দোকান সুপার শপে গিয়ে দেখা গেছে, লবণের সংকট দেখা দিয়েছে। আগের রাতেই ফুরিয়ে গেছে তাদের লবণের মজুদ। দক্ষিণ সুরমার গোটাটিকরের মুদি দোকানি কয়েছ উদ্দিন কুটি বলেন, সোমবার সন্ধ্যার পর আচমকা কেবল লবণ কেনার জন্য ক্রেতারা এসে দোকানে ভিড় করতে থাকেন। অল্প সময়ের মধ্যেই আমার দোকানের সব লবণ শেষ হয়ে যায়। গতকাল পাইকারি বাজারে গিয়েও লবণ পাইনি।

নগরীর লামাবাজার এলাকায় লবণ কিনতে আসা সাইফুল ইসলাম নামে এক ক্রেতা বলেন, আমি শুনেছি লবণের দাম অনেক বেড়ে যাবে। তাই প্রতি কেজি ৮০ টাকা দরে চার কেজি লবণ কিনে নিয়েছি। কার কাছ থেকে মূল্যবৃদ্ধির খবর পেয়েছেন, তা জানাতে পারেননি সাইফুল।

বগুড়া: ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় দেখে বগুড়ায়ও এদিন লবণের দাম বাড়িয়ে দেন দোকানিরা। কেজিপ্রতি ২০ টাকা বেশি দামে লবণ বিক্রি করেন তারা।

জানা যায়, গতকাল সকাল থেকে হঠাৎ করে জেলার রাজাবাজার, ফতেহ আলী বাজার, বউবাজারসহ বিভিন্ন বাজারে কে বা কারা গুজব ছড়ায়, পেঁয়াজের মতো লবণেরও সংকট এবং দামও দ্বিগুণ হবে। এর পর থেকে সাধারণ ক্রেতারা লবণ কিনতে থাকেন। দুপুরের পর থেকে গুজব আরো ছড়িয়ে পড়লে বিকালে শহরের সব দোকান বাজারে লবণ কেনার হিড়িক পড়ে। সুযোগে দোকানদাররা সব ধরনের লবণ দ্বিগুণ দামে বিক্রি শুরু করেন। কাউকে কাউকে লাইনে দাঁড়িয়ে ১০ কেজি পর্যন্তও লবণ কিনতে দেখা গেছে।

বগুড়া শহরের ফতেহ আলী বাজারের দুলাল স্টোরের বিক্রয় প্রতিনিধি সবুজ মিয়া জানান, সকালে কিছু ক্রেতা হঠাৎ করেই বাজারের বিভিন্ন দোকানে লবণ কিনতে ভিড় করেন। তারা লবণ সংকট দাম বাড়বে বলে বেশি করে লবণ কেনেন। এরপর যতই সময় গড়িয়েছে, ততই লবণ ক্রেতার ভিড় বেড়েছে। সন্ধ্যায় লবণ শেষ হয়ে যায়।

বগুড়ার শাজাহানপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবুল কালাম আজাদ জানান, গুজব ছড়িয়ে বেশি দামে লবণ বিক্রির চেষ্টা করছিলেন কিছু ব্যবসায়ী। কিন্তু গুজবের বিষয়টি বোঝানোর পর আগের দামেই লবণ বিক্রি করেন দোকানিরা। বেশি দামে বিক্রির সংবাদ পেলেই অভিযান চালিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

যশোর: মূল্যবৃদ্ধির গুজবে লবণ কেনার ধুম পড়ে যশোরেও। একেকজন -১০ কেজি পর্যন্তও লবণ কিনেছেন। এতে কিছু সময়ের মধ্যে বাজারে লবণ সংকট দেখা দেয়। তবে যাতে কেউ লবণ সংকট সৃষ্টি করতে না পারে, সেজন্য প্রশাসন কঠোর হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

গতকাল শহরের চুড়িপট্টি এলাকার বাসিন্দা রেশমা বেগম বলেন, পেঁয়াজ আগেই কিনে রেখেছিলাম। এখন শুনছি লবণের দাম বাড়বে। সেজন্য পাঁচ কেজি লবণ কিনলাম। সদর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামের সাইদুল ইসলাম বলেন, আমি গতকাল ১০ কেজি লবণ কিনেছি ৩৫ টাকা কেজি দরে। সবখানে শোনা যাচ্ছে, পেঁয়াজের মতো লবণের দামও বাড়বে।

ঝালকাঠি: গতকাল দুপুর থেকে জেলায় লবণের দাম বাড়তে থাকে। একসময় প্রতি কেজি লবণের দাম ১০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়।

বিষয়টি জানাজানি হলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন দোকানে অভিযান চালানো হয়। বিকালে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডাকেন জেলা প্রশাসক মো. জোহর আলী। তিনি বলেন, ঝালকাঠিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পর্যাপ্ত লবণ মজুদ রয়েছে। কেউ বিভ্রান্ত হবেন না। কোথাও লবণের দাম বাড়েনি। আগের মতোই আছে।

বরিশাল: লবণ নিয়ে গতকাল দুপুর থেকে বরিশালে লংকাকাণ্ড ঘটে। লবণের দাম বেড়েছে এমন খবরে লবণ কেনার হিড়িক পড়ে। নগরীর ফড়িয়াপট্টি, বাজার রোডের পাইকারি দোকানসহ অধিকাংশ মুদি দোকানের সামনে দেখা যায় ক্রেতাদের দীর্ঘ সারি। সুযোগে ৩৫ টাকা কেজি দরের লবণ ৬০-৭০ টাকায় বিক্রি হয়।

বেলা আড়াইটায় নগরীর বাজার রোডের খোকন স্টোরসে দেখা যায়, ৬৫ টাকা দরে লবণ বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতা মাইনুল ইসলাম জানান, লবণের দাম বাড়বে শুনে তিনি ১৩০ টাকায় দুই কেজি লবণ কিনেছেন। বরিশাল নগরী ছাড়াও জেলার বিভিন্ন উপজেলায়ও গুজব ছড়িয়ে বেশি দামে লবণ বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বরিশাল জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়ার রহমান সাংবাদিকদের বলেন, লবণের কোনো সংকট নেই। গুজব ছড়িয়ে একটি মহল ফায়দা লুটতে চাইছে। অসাধু মহলের বিরুদ্ধে অভিযানে একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে নেমেছেন।

হিলি: সংকট দেখা দিয়েছে এমন গুজবে দিনাজপুরের হিলিতেও বাড়তি দামে লবণ বিক্রি হয়েছে। অতিরিক্ত দাম নেয়ার কারণে চার দোকানিকে লাখ টাকা জরিমানাও করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

হাকিমপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুর রাফিউল আলম জানান, কিছু ব্যবসায়ী নির্ধারিত দামের চেয়ে বাড়তি দাম নেয়ার সত্যতা পেয়ে জরিমানা করা হয়েছে। ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। দেশে লবণের কোনো সংকট নেই।

ময়মনসিংহ: জেলায়ও গুজব ছড়িয়েছে লবণের বাজারে। গতকাল এক লাফেই প্রতি কেজি লবণের দাম ১২০ টাকায় উঠে যায়। অতিরিক্ত দামে লবণ বিক্রির দায়ে ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এক ব্যবসায়ীকে ১০ হাজার টাকা জরিমানাও করেন।

ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল জাকির জানান, বেশি দামে লবণ বিক্রির কারণে এক দোকানিকে জরিমানা অন্য দোকানিদের সতর্ক করা হয়েছে।

জানা গেছে, দেশে প্রতি বছর লবণের চাহিদা আছে ১৮ লাখ টন। সে হিসাবে প্রতি মাসে ভোজ্য লবণের চাহিদা কম-বেশি দেড় লাখ টন। চাহিদার বিপরীতে লবণের মজুদ আছে সাড়ে ছয় লাখ টন। এছাড়া দেশের করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর মিলের গুদামে প্রায় আড়াই লাখ টন লবণ মজুদ রয়েছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলো লবণের দামও বাড়ায়নি।

এসিআই সল্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আলমগীর বণিক বার্তাকে বলেন, বাজারে লবণের সংকট সম্পূর্ণ গুজব। সরবরাহের কোনো ঘাটতি নেই। আমরা একটি টাকাও দাম বাড়াইনি। পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে আমরা কোম্পানির ডিলার, পাইকারি খুচরা বিক্রেতাদের কাছে সরবরাহ বাড়িয়েছি। আমরা লবণের দাম কোনোভাবেই বাড়াইনি। নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে কেউ আমাদের লবণ বিক্রি করছে কিনা, সেটি তদারক করা হচ্ছে। ক্রেতাদের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন