শুক্রবার | ডিসেম্বর ০৬, ২০১৯ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

প্রথম পাতা

বাংলাদেশ রেলওয়ে

ট্রেন বেড়েছে, আধুনিকায়ন হয়নি সিগন্যাল ব্যবস্থা

শামীম রাহমান

গত ১০ বছরে ১৩১টি নতুন ট্রেন চালু করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। রুট সম্প্রসারণ করা হয়েছে আরো ৩৮টি ট্রেনের। বিদ্যমান রেলপথে এসব নতুন ট্রেন যুক্ত করলেও সে অনুপাতে সিগন্যাল ব্যবস্থা আধুনিকায়নে মনোযোগ দেয়নি রেলওয়ে। ফলে সিগন্যাল ব্যবস্থার দুর্বলতায় একের পর এক ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মন্দবাগ স্টেশনে দুই ট্রেনের মুখোমুুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন ১৬ জন। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় লাইনচ্যুত হয় রংপুর এক্সপ্রেস। দুটি ট্রেন দুর্ঘটনায় সিগন্যাল ব্যবস্থার দুর্বলতাকে দায়ী করেছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা। অবস্থায় রেলওয়ের সিগন্যাল ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বেসরকারি সংস্থা ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্টের প্রকল্প পরিচালক আতিকুর রহমান, যিনি দীর্ঘদিন ধরে রেলওয়ের উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছেন। তিনি বলেন, এখনো অনেক স্টেশনে তারের কুণ্ডলী দিয়ে সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এটা তো ব্রিটিশ আমলের সিগন্যালিং পদ্ধতি। ব্রিটিশ আমলের পদ্ধতি এখন কেন ব্যবহার করা হবে? গত ১০ বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করেও রেলওয়ের বেহাল দশা আসলে খুবই কষ্টের।

বাংলাদেশ রেলওয়ের অনুমোদিত মাস্টারপ্ল্যানে বলা আছে, আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে রেলপথে ট্রেন চলাচলের সক্ষমতা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। এক্ষেত্রে সেন্ট্রাল ট্রাফিক কন্ট্রোল (সিটিসি) কম্পিউটার বেজড ইন্টারলকিং (সিবিআই) সিগন্যাল ব্যবস্থা প্রবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দেশের সিংহভাগ রেলওয়ে স্টেশনকে ধরনের আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থায় আনার জন্য পৃথক ছয়টি প্রকল্প বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয় মাস্টারপ্ল্যানে। তবে দেশের ৩৪২টি স্টেশনের মধ্যে মাত্র ১০৮টিতে ব্যবহার করা হচ্ছে ধরনের সিগন্যাল ব্যবস্থা।

বর্তমানে পাঁচ ধরনের সিগন্যাল ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়েতে। এর মধ্যে সর্বাধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থাটি হচ্ছে রিলে ইন্টারলকিং সিগন্যালিং। ব্যবস্থাটি পুরোপুরি কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত। সাধারণত যেসব স্টেশনে ট্রেন চলাচল বেশি, সেসব স্টেশনে সিগন্যাল ব্যবস্থা রাখা হয়। রেলওয়েতে ধরনের সিগন্যাল ব্যবস্থা সম্পন্ন স্টেশনের সংখ্যা ৩৩টি। এর ৩১টিই রয়েছে পূর্বাঞ্চলে। অন্যদিকে সিবিআইয়ের মতো আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থার সংস্থান আছে ১০৮টি রেলওয়ে স্টেশনে। মাত্র ১২টি স্টেশনে ব্যবহার করা হচ্ছে সিটিসি সিগন্যাল ব্যবস্থা।

বাকি ২১১টি রেলওয়ে স্টেশনে এখনো পুরনো পদ্ধতিতে সিগন্যাল নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। পুরনো পদ্ধতিগুলোর একটি হলো মেকানিক্যাল ইন্টারলকড সিগন্যাল ব্যবস্থা। রকম সিগন্যালের জন্য লাইনের পাশে এক ধরনের তার ব্যবহার করা হয়, যা সংযুক্ত থাকে স্টেশন এলাকায় স্থাপিত লিভারের সঙ্গে। লিভারে টান দিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের ৭২টি স্টেশনের সিগন্যাল নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। লাল-সবুজ বাতি ব্যবহার করে ট্রেনের সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করা হয় দেশের ৯১টি রেল স্টেশনে। আবার ৪৮টি স্টেশনে সেই ব্যবস্থাও নেই। সেসব স্টেশনে ট্রেন প্রবেশের আগ মুহূর্তে স্টেশন মাস্টার ঠিক করেন, কোন লাইন দিয়ে ট্রেনটি যাবে। সে অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরা ট্রেন যাওয়ার লাইনটি ঠিক করে দেন।

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রেন চলাচলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সিগন্যালিং ব্যবস্থা। এটিতে সামান্য ভুল হলেই ঘটতে পারে মারাত্মক দুর্ঘটনা। গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাংলাদেশ রেলওয়েতে সিগন্যালিং ব্যবস্থার আধুনিকায়নের বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক . সামছুল হক। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, উন্নত বিশ্বে ট্রেনের সিগন্যাল ব্যবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। প্রযুক্তি এসে জটিল কাজটি সহজ করে দিয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা সেসব দেশে ট্রেন পরিচালনাকেও সহজ করে দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে ঘটছে উল্টোটি। এখানে কোনো ধরনের পরিকল্পনা ছাড়াই নামানো হয় একের পর এক ট্রেন। কিন্তু ট্রেনগুলো সুশৃঙ্খল ঝুঁকিমুক্তভাবে চলাচলের জন্য যে সিগন্যাল ব্যবস্থা দরকার, সেদিকে নজর দেয়া হচ্ছে না। এখানে উন্নয়নটা হচ্ছে বড় বড় প্রকল্পকেন্দ্রিক। যেসব উন্নয়নে প্রচুর দুর্নীতির সুযোগ রয়েছে, সেসব উন্নয়নকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছি আমরা। সিগন্যাল ব্যবস্থার আধুনিকায়ন না করে একের পর এক ট্রেন নামাচ্ছি। যার খেসারত দিতে হচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বা উল্লাপাড়ার মতো দুর্ঘটনার মাধ্যমে। পাশাপাশি তিনি এসব দুর্ঘটনার জন্য রেলওয়েতে অদক্ষ জনবলের আধিক্যকেও দায়ী করেছেন।

রেলওয়েতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সিগন্যালিং ব্যবস্থার উন্নয়নের বিষয়ে রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি এজন্য রেল খাতকে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত অবস্থায় ফেলে রাখাকে দায়ী করেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, রেলের উন্নয়ন শুরু হয়েছে ১০ বছর ধরে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে একের পর এক প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। আমরা সিগন্যাল ব্যবস্থার আধুনিকায়ন নিয়েও কাজ করে যাচ্ছি। তবে দীর্ঘদিন ধরে যে একটা বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, সেটি চাইলেই একদিনে দূর করা সম্ভব নয়। রেলের উন্নয়নে মন্ত্রণালয় নিরলস কাজ করে যাচ্ছে বলে সময় জানান তিনি।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন