শুক্রবার | ডিসেম্বর ১৩, ২০১৯ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

শেষ পাতা

দেশে সোলার হোম সিস্টেমের সংখ্যা ৫০ লাখ ছাড়িয়েছে

জেসমিন মলি

২০২০ সালের মধ্যে দেশে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত থেকে উৎপাদনের মহাপরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। পরিকল্পনার একটি বড় অংশজুড়ে আছে সৌরবিদ্যুৎ। এরই মধ্যে সোলার হোম সিস্টেমে বড় সাফল্য এসেছে দেশে। অফ গ্রিড এলাকায় ৫০ লাখ ছাড়িয়েছে সোলার হোম সিস্টেমের সংখ্যা।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য বলছে, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সোলার হোম সিস্টেম ব্যবহার হয় বাংলাদেশে। সারা দেশে অফ গ্রিড এলাকায় স্থাপিত সোলার সিস্টেমের মোট সংখ্যা ৫০ লাখ ৫৯ হাজার ৬৯। আর সারা দেশে স্থাপিত এসব সোলার হোম সিস্টেমের মোট গ্রাহকসংখ্যা ৫৮ লাখ হাজার ২২৩ জন।

দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির মূল সাফল্য এসেছে সোলার হোম সিস্টেমের মাধ্যমে। গত ১০ বছরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত থেকে যোগ হয়েছে ৩৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ, যার সিংহভাগ হচ্ছে সোলার হোম সিস্টেমের। বর্তমানে সৌরভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা (গ্রিড অফ গ্রিড) প্রায় ৩৪০ মেগাওয়াট বায়ুভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা (গ্রিড অফ গ্রিড) প্রায় মেগাওয়াট।

দেশের ৬৪ জেলায় স্থাপিত সোলার হোম সিস্টেম এর গ্রাহকসংখ্যার তথ্য সম্প্রতি সংসদে উপস্থাপন করেছেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। বিদ্যুৎ বিভাগের করা এই পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সারা দেশে সবচেয়ে বেশি সোলার হোম সিস্টেম ব্যবহার হয় সুনামগঞ্জে। সেখানে লাখ ৫০ হাজার ২৯৯টি সোলার হোম সিস্টেম রয়েছে। এরপর রয়েছে পটুয়াখালী। সেখানে লাখ ২২ হাজার ৬৪৩টি সোলার হোম সিস্টেম রয়েছে। বরিশালে রয়েছে লাখ ৭৫ হাজার ৫১ সোলার হোম সিস্টেম। এছাড়া লক্ষাধিক সোলার হোম সিস্টেম ব্যবহারকারী রয়েছে একাধিক জেলায়। এর মধ্যে হবিগঞ্জে লাখ ২৪ হাজার ৩৩৯, সাতক্ষীরায় লাখ ১২ হাজার ৯৬৩, খুলনায় লাখ হাজার ৯২৪, চট্টগ্রামে লাখ ৩১ হাজার ১৭৫, মৌলভীবাজারে লাখ ৩৮ হাজার ৪২, নোয়াখালীতে লাখ ৩৬ হাজার ৮৬৩, ভোলায় লাখ হাজার ২৬১, কুড়িগ্রামে লাখ হাজার ৫৬৫, লক্ষ্মীপুরে লাখ ৩৮ হাজার ৫৬৪, টাঙ্গাইলে লাখ ১০ হাজার ৫৫২, নেত্রকোনায় লাখ ৪৬ হাজার ৭৬৭, কুমিল্লায় লাখ ৭৮ হাজার ৬১৯, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় লাখ ১৩ হাজার ১১১, চাঁদপুরে লাখ ৬০ হাজার ৯৩৬, ময়মনসিংহে লাখ ৬৭ হাজার ৩৭২, বরগুনায় লাখ ৪১ হাজার ৯৭৮, ফরিদপুরে লাখ ২২ হাজার ৬০৬, শরীয়তপুরে লাখ ৫৭ হাজার ৩৮০ এবং কিশোরগঞ্জে লাখ হাজার ৭৮৮টি সোলার হোম সিস্টেম রয়েছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশ বিজ্ঞান শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ কমিয়ে আনতে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। গবেষণায় বেশকিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফলও মিলেছে, যাতে কমে আসবে উৎপাদন খরচও।

বিসিএসআইআর দেশীয় প্রেক্ষাপটে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সম্ভাব্যতা যাচাই সমস্যাসমূহ নিরূপণের লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে স্বল্পমূল্যের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রযুক্তির উন্নয়নের মাধ্যমে স্বল্পমূল্যের সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তি উন্নয়নের পাশাপাশি আমদানীকৃত সোলার প্যানেলের গুণগত মান নিরূপণ, জনশক্তি উন্নয়নে জ্বালানি গবেষণা উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের জনবলের সোলার প্যানেল প্রস্তুতকরণের গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি, গ্রিন হাউজ গ্যাস নির্গমন প্রশমন জাতীয় গ্রিড লাইনের ওপর নির্ভরতা কমানোর বিভিন্ন উপায় খুঁজে বের করা হবে।

বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, আন্তর্জাতিক কমিটি জাতিসংঘের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি মোতাবেক বাংলাদেশ মোট গ্রিন হাউজ গ্যাসের শতাংশ হ্রাস করবে এবং উন্নয়ন-সহযোগী দেশ গ্রিন হাউজ গ্যাস নির্গমনের জন্য দায়ী উন্নত দেশগুলোর আর্থিক সহায়তা প্রদান সাপেক্ষে ২০৩০ সালের মধ্যে তা ১৫ শতাংশ হ্রাস করবে। এর ওপর ভিত্তি করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি তৈরি করা হয়। বেসরকারি বিনিয়োগ খাতে সরকারের কমিটমেন্ট অনুযায়ী, ২০২০ সালের মধ্যে মোট উৎপাদনের ১০ শতাংশ নবায়ণযোগ্য জ্বালানি খাত থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে কয়লা, ডুয়েল ফুয়েল নিউক্লিয়ার এনার্জির পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। লক্ষ্যে ২০১২ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা অনুমোদন করা হয়। নীতিমালায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির মূল উৎস হিসেবে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, বায়োমাস, হাইড্রো, বায়ো ফুয়েল, জিও থার্মাল, নদীর স্রোত, সমুদ্রের ঢেউ ইত্যাদিকে শনাক্ত করা হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে আর্থিক প্রণোদনার পাশাপাশি নীতিমালায় অন্যান্য সুযোগও রাখা হয়েছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, প্রয়োজনীয় জমির সংকট এর উচ্চমূল্যের কারণে বাংলাদেশে  সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়বহুল। তা সত্ত্বেও সরকার সৌরসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। শুধু সৌরবিদ্যুৎ নয়, সব ধরনের নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার।

২০১০ সালে বিদ্যুৎ খাতের জন্য সরকারের গৃহীত মহাপরিকল্পনায় নবায়নযোগ্য খাত থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতির আলোকে ২০১৫ সালের মধ্যে দেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের শতাংশ ২০২০ সালের মধ্যে মোট উৎপাদনের ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য খাত থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনা নেয়া হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২০ সালের মধ্যে দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালে জাপানের আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার (জাইকা) করা বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা খসড়ায় দেখানো হয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত থেকে মোট হাজার ৬৬৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এর মধ্যে শুধু সৌরশক্তি কাজে লাগিয়ে মোট হাজার ৬৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। এছাড়া বায়ুবিদ্যুৎ থেকে ৬৩৭ মেগাওয়াট, বায়োগ্যাস থেকে ২৮৫ মেগাওয়াট উৎপাদন করা সম্ভব।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন