রবিবার | ডিসেম্বর ০৮, ২০১৯ | ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

প্রথম পাতা

ব্যয়বহুল সড়ক, পণ্য পরিবহনও ব্যয়বহুল

নিজস্ব প্রতিবেদক

পণ্য পরিবহনে ফেরি পারাপার থেকে শুরু করে ওয়েব্রিজ স্টেশনসবখানেই অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়। জেলায় জেলায় নির্দিষ্ট হারে চাঁদাও পরিশোধ করতে হয়। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পণ্য পরিবহন সহজ করতে ব্যয় হওয়া বাড়তি অর্থের পরিমাণ ট্রিপপ্রতি (যাওয়া-আসা) হাজার ২০০ থেকে সর্বোচ্চ হাজার ২০০ টাকা। সেই সঙ্গে আছে যানজট। এসব কারণে ব্যয়বহুল হচ্ছে সড়কে পণ্য পরিবহন। আর যে সড়কপথে পণ্য পরিবহন হচ্ছে, তার নির্মাণ ব্যয়ও বিশ্বে অন্যতম সর্বোচ্চ।

বাংলাদেশের লজিস্টিক সেবার একটি সামগ্রিক মূল্যায়ন করেছে বিশ্বব্যাংক। বাছাইকৃত বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশে সড়ক নির্মাণ পণ্য পরিবহনের তুলনামূলক ব্যয় বিশ্লেষণ করে মুভিং ফরওয়ার্ড: কানেক্টিভিটি অ্যান্ড লজিস্টিকস টু সাসটেইন বাংলাদেশ সাকসেস শীর্ষক একটি প্রতিবেদন গতকাল প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। ওই প্রতিবেদনেই বাংলাদেশের ব্যয়বহুল সড়ক সড়কপথে পণ্য পরিবহনে উচ্চব্যয়ের বিষয়টি উঠে এসেছে।

বাছাইকৃত কয়েকটি দেশের শহরে চার লেন সড়কের নির্মাণ ব্যয় বিশ্লেষণ করে বিশ্বব্যাংক দেখিয়েছে, বাংলাদেশের প্রতি কিলোমিটার চার লেন সড়ক নির্মাণে ব্যয় হয় ৬১ লাখ ডলারের বেশি। একই ধরনের সড়ক নির্মাণে চীনে ব্যয় হয় কিলোমিটারপ্রতি ৪০ লাখ ডলারের কাছাকাছি রাশিয়ায় ৩৭ লাখ ডলারের নিচে। এছাড়া পাকিস্তানে প্রতি কিলোমিটার চার লেন সড়ক নির্মাণে ব্যয় পড়ে ৩০ লাখ, ইন্দোনেশিয়ায় ২০ লাখ ফিলিপাইনে ১১ লাখ ডলারের মতো। আর ভারত তুরস্কে চার লেন সড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়ে ১৫ থেকে ১৭ লাখ ডলার। হিসাবে বাছাই করা দেশগুলোর মধ্যে ব্যয়বহুল সড়ক বাংলাদেশে।

ব্যয়বহুল সড়কে পণ্য পরিবহনেও উচ্চব্যয় করতে হয় বলে বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। সংস্থাটি বলছে, নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পণ্য পৌঁছাতে ফেরি পারাপার, বর্ডার পোস্ট ওয়েব্রিজ স্টেশনে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হয়। চাঁদা পরিশোধ করতে হয় পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন পুলিশকেও। নিয়ে মধ্যস্বত্বভোগী এজেন্সিও গড়ে উঠেছে।


বিশ্বব্যাংকের হিসাব বলছে, প্রতি ট্রাকে ট্রাফিক পুলিশ পায় ৭০০ শ্রমিক ইউনিয়ন ১০০ টাকা। আর ফেরিঘাটে দিতে হয় অতিরিক্ত হাজার টাকা। এক জেলা থেকে আরেক জেলায় প্রবেশ করলেই অর্থ পরিশোধ করতে হয় পণ্যবাহী যানবাহনকে।

বিশ্বব্যাংকের ভাষায় ফ্যাসিলিটেশনের নামে অতিরিক্ত ব্যয় আবার রুটভেদে ভিন্ন হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-রংপুর, ঢাকা-রাজশাহী ঢাকা-আখাউড়া রুটে ট্রিপপ্রতি (আসা-যাওয়া) অতিরিক্ত ব্যয় হয় সাকল্যে হাজার ২০০ টাকা। তবে ঢাকা-খুলনা, ঢাকা-যশোর ঢাকা-বেনাপোল রুটে ব্যয় আরো বেশি, হাজার ২০০ টাকা।

পণ্য পরিবহন সহজ করার নামে খরচ হওয়া অতিরিক্ত অর্থ সড়কপথে পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সড়কে পণ্য পরিবহন কম্বোডিয়ার পর সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে। কম্বোডিয়ায় সড়কপথে এক টন পণ্য পরিবহনে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হয় ১৬ সেন্ট। সেখানে বাংলাদেশে ট্রেইলারে একই পরিমাণ পণ্য পরিবহনে কিলোমিটারপ্রতি খরচ পড়ে ১২ সেন্ট। এছাড়া সাত টনের ট্রাকে খরচ হয় দশমিক , ১০ টনের ট্রাকে দশমিক ১৬ টনের ট্রাকে সেন্ট। অন্যান্য দেশের মধ্যে আইভরি কোস্টে একই পরিমাণ পণ্য পরিবহনে কিলোমিটারপ্রতি খরচ হয় ১১ সেন্ট, আফ্রিকায় ১১, মেক্সিকোয় ১০, মালাওয়িতে দশমিক ইন্দোনেশিয়ায় সেন্ট। এছাড়া চীন ফ্রান্সে খরচ পড়ে সেন্ট, ইথিওপিয়ায় দশমিক , অস্ট্রেলিয়ায় দশমিক , যুক্তরাষ্ট্রে দশমিক , ব্রাজিলে দশমিক , আর্জেন্টিনায় দশমিক , ভারতে দশমিক পাকিস্তানে মাত্র সেন্ট।

বাংলাদেশের উচ্চপরিবহন ব্যয়ের পেছনে সড়কের যানজটকেও দায়ী করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি বলছে, বাংলাদেশে একটি ট্রাক ঘণ্টায় প্রায় ১৯ কিলোমিটার যেতে পারে। কিন্তু যানজট পরিস্থিতির উন্নতি ঘটিয়ে  গতি দ্বিগুণ বাড়ানো যায়। যদি রাস্তায় যানজট না থাকত, তাহলে লজিস্টিক ব্যয় থেকে ৩৫ শতাংশ কমানো যেত। এক্ষেত্রে ডেইরি, চাল, হর্টিকালচার, কাঠজাতীয় পণ্য পরিবহন ব্যয় সবচেয়ে বেশি কমত।

এসব কারণে লজিস্টিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ দুর্বল। সূচকে বিশ্বের ১৬১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০০তম। বাংলাদেশের পয়েন্ট -এর মধ্যে মাত্র দশমিক ৫৮।

রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা . মসিউর রহমান। অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, দেশের লজিস্টিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে কাজ শুরু হয়েছে। ডুয়িং বিজনেস সূচকে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেশে পণ্য পরিবহনে ট্রাকনির্ভরতা বেড়েছে। রেলনির্ভরতা কমে যাওয়া এর অন্যতম কারণ। তবে যেসব উদ্যোগ চলমান আছে, সেগুলো সমাপ্ত হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ (পরিবহন) মেটিয়াস হারেরা ডিপি। বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্সি মিয়াং টেম্বন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতি এখন বেশ ভালো। এটিকে আরো বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। লজিস্টিক আরো দক্ষ করে তোলার মাধ্যমে যোগাযোগ, ব্যবসার পরিবেশ প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো যেতে পারে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন