রবিবার | ডিসেম্বর ০৮, ২০১৯ | ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

শেষ পাতা

রাকাব নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ নিরীক্ষা

ছোট ব্যাংকে বড় অনিয়ম

হাছান আদনান

চলতি বছরের ৩০ জুন টাকা গণনার একটি যন্ত্র ক্রয় করে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) ৫৪ লাখ হাজার ৩০০ টাকায় ক্রয়কৃত যন্ত্রটির ভাউচার দুটি খাতে দেখিয়েছে ব্যাংকটি। একবার দেখানো হয়েছে কম্পিউটার অন্যান্য উপকরণ হিসেবে। একই যন্ত্র দেখানো হয়েছে আসবাব হিসেবেও। একই যন্ত্র দুই খাতে ক্রয় দেখানোর মাধ্যমে ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

টাকা গণনার যন্ত্র ক্রয়েই শুধু নয়, সরকারের বিশেষায়িত ব্যাংকটির অন্যান্য খাতেও অনিয়ম অসামঞ্জস্যের প্রমাণ পেয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিয়োগকৃত নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান। নিরীক্ষায় বিভিন্ন ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ধার করা ১৬৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকার কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ গঠন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে নগদ জমা সংরক্ষণ, আর্থিক বিবরণীতে সাবসিডিয়ারি কোম্পানিতে বিনিয়োগকৃত অর্থের পরিমাণ ৪২ কোটি টাকা কম দেখানোসহ মৌলিক বিভিন্ন খাতে অনিয়মের কথা উঠে এসেছে নিরীক্ষায়। পরিমাণ যা- হোক, এসব অনিয়ম ছোট-বড় যেকোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় ধরনের অনিয়ম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অর্থ মন্ত্রণালয় নিযুক্ত নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন হলো, ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা দুর্বল।

রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর প্রকৃত অবস্থা জানতে একাধিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে রাকাবে নিরীক্ষা চালায় সিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোং এমএম রহমান অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস। চলতি বছরের ২০ সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়, ঢাকা করপোরেট শাখাসহ গুরুত্বপূর্ণ শাখাগুলো নিরীক্ষা করা হয়। সম্প্রতি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান দুটি রাকাবের ওপর পরিচালিত নিরীক্ষা প্রতিবেদন অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। এর একটি কপি ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছেও পাঠানো হয়েছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনের একটি কপি বণিক বার্তার হাতেও এসেছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাকাবের প্রধান কার্যালয়ের সঙ্গে শাখাগুলোর অসমন্বিত অর্থের পরিমাণ ৩১ কোটি টাকা। ১৭৩ কোটি টাকা অসমন্বিত রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সঙ্গে। আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে অসমন্বিত অবস্থায় রয়েছে ৪৬ লাখ টাকা। অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে দীর্ঘদিনেও এসব হিসাবের সমন্বয় করা যায়নি।

নিরীক্ষা দলের আপত্তির জবাবে রাকাবের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বলেছে, অসমন্বিত দায়গুলো বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত। উভয় ব্যাংকের দেনা-পাওনার বিষয়গুলো এখনো প্রক্রিয়াধীন। কৃষি ব্যাংক থেকে বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রত্যয়ন পেলে হিসাব খাতগুলো সমন্বয় করা হবে।

নিরীক্ষা দলের মন্তব্য হলো, রাকাবের হিসাবরক্ষণের কাজে ব্যবহূত সফটওয়্যারটি ত্রুটিপূর্ণ অপ্রচলিত। সফটওয়্যারটি থেকে প্রাপ্ত তথ্যেও বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। ব্যাংকটির শাখাগুলোয় সফটওয়্যার ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু প্রধান কার্যালয়ের হিসাব সম্পাদনের জন্য কোনো সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয় না।

২০১৮-১৯ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, বিভিন্ন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এজেন্ট থেকে হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা ধার করেছে রাকাব। কিন্তু নিরীক্ষা দল হাজার ৩০৮ কোটি টাকার হিসাব মেলাতে পেরেছে। বাকি ১৬৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা যাচাই করা যায়নি। টাকার কোনো বিবৃতিপত্র প্রত্যয়নপত্রও খুঁজে পাননি নিরীক্ষকরা।

বিষয়ে নিরীক্ষা দলের কাছে রাকাবের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দেয়া বক্তব্য হলো, কৃষকদের মধ্যে সহজ শর্তে ঋণ দেয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পুনঃঅর্থসংস্থান হিসেবে ঋণ নেয়া হয়। ঋণের বিপরীতে বিবৃতিপত্র প্রত্যয়নপত্র পাওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।

রাকাবের কর্মচারী সাধারণ ভবিষ্য তহবিলের সুদ হিসাবায়নের ক্ষেত্রেও অনিয়ম পেয়েছেন নিরীক্ষকরা। ব্যাংকগুলোকে তার মোট তলবি মেয়াদি দায়ের দশমিক শতাংশ দ্বিসাপ্তাহিক গড় ভিত্তিতে এবং ন্যূনতম শতাংশ দৈনিক ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকে নগদ জমা (সিআরআর) হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়। যদিও রাকাব সিআরআর সংরক্ষণ করতে পারছে না বলে নিরীক্ষা দলের পর্যবেক্ষণে তুলে ধরা হয়েছে।

রাকাব এসএমই ফিন্যান্স কোম্পানি লিমিটেড নামে রাকাবের একটি সাবসিডিয়ারি কোম্পানি রয়েছে। ওই কোম্পানিতে বিনিয়োগকৃত অর্থের পরিমাণ ৪১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা কম দেখিয়েছে রাকাব। একইভাবে আইন অনুযায়ী সাবসিডিয়ারি কোম্পানিতে বিনিয়োগকৃত অর্থের পুনর্মূল্যায়নও করা হয়নি। অবচয় ধার্য করা হয়নি ব্যাংকটির ভূমি দালানকোঠার উপরেও। একইভাবে রাকাবের নওগাঁ, বগুড়া উত্তর দক্ষিণ, জয়পুরহাট জোনের অব্যাংকিং সম্পদও সমন্বিত করা হয়নি। ব্যাংকটির যানবাহন ক্রয় বিক্রয়ের ক্ষেত্রে অনিয়ম পেয়েছে নিরীক্ষা দল।

জনপ্রশাসনের পরিপত্র, বাংলাদেশ ব্যাংক রাকাবের নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক কর্মকর্তা টানা তিন বছরের বেশি একই দায়িত্বে থাকতে পারেন না। যদিও রাকাবের অভ্যন্তরে নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে না। ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়, ঢাকা করপোরেট শাখাসহ জোনাল অফিসগুলোয় একই ব্যক্তিকে টানা ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। এতে ওই কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট শাখাগুলোয় অনিয়ম-দুর্নীতির একটি বলয় গড়ে উঠছে বলে সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছেন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাকাবের ঢাকা করপোরেট শাখায় ২০১১ সাল থেকে শফিকুর রহমান নামে এক কর্মকর্তা একই পদে থেকে দায়িত্ব পালন করছেন। গাইবান্ধা জোনাল অফিসে টানা নয় বছর ধরে রয়েছেন জেসমিন আক্তার পপি নামে আরেক কর্মকর্তা। পাবনা জোনাল অফিসে ১০ বছর ধরে আছেন আজিজুর রহমান।

প্রায় পাঁচ মাস ধরে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদ শূন্য রয়েছে রাকাবের। ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মো. ইদ্রিস। অর্থ মন্ত্রণালয় নিযুক্ত নিরীক্ষা দলের প্রতিবেদনের বিষয়ে চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে গতকাল সোনালী ব্যাংকের ডিএমডি একেএম সাজেদুর রহমান খানকে রাকাবের এমডি পদে নিয়োগ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন