রবিবার | ডিসেম্বর ০৮, ২০১৯ | ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

শেষ পাতা

পদ্মা সেতু: ধীরগতির নদীশাসনে পিছিয়ে নির্মাণকাজ

শামীম রাহমান, জাজিরা থেকে ফিরে

পদ্মা সেতুর সুরক্ষার জন্য সাড়ে ১২ কিলোমিটার পাড় বাঁধাই করা হবে জাজিরা প্রান্তে। ২০১৪ সালের নভেম্বরে পরীক্ষামূলকভাবে এক কিলোমিটার পাড় বাঁধাইয়ের কাজ শুরু করে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো করপোরেশন। পরীক্ষামূলক কাজটি শেষ করতেই দেড় বছর দেরি করে ফেলে প্রতিষ্ঠানটি। এর প্রভাব পড়েছে মূল সেতুর নির্মাণকাজে। সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়ার জন্য যেসব বিষয় জড়িত, তার মধ্যে অন্যতম নদীশাসনে ধীরগতি।

চলতি বছরের ডিসেম্বরে নদীশাসন কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কাজে অগ্রগতি ৬৩ শতাংশ। এরই মধ্যে পুরো প্রকল্পের ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত বাড়িয়ে নিয়েছে সেতু বিভাগ।

জানা গেছে, সব মিলিয়ে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে পদ্মা সেতু নির্মাণে। এর মধ্যে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে নদীশাসনে। নদীর পাড় বাঁধাই, কংক্রিটের ব্লক, পাথর জিও ব্যাগ ফেলা, নদী খননসহ বহুমাত্রিক কাজ করা হচ্ছে নদীশাসনের জন্য। মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে দশমিক কিলোমিটার শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে ১২ দশমিক কিলোমিটার পাড় বাঁধাই করছে সিনোহাইড্রো। সেতু বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দুই পাড় মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ছয় কিলোমিটার পাড় বাঁধাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে।

মঙ্গলবার সেতুর জাজিরা প্রান্তসংলগ্ন এলাকায় নদীর পাড়ে কংক্রিটের ব্লক স্থাপনের কাজ করছিলেন একদল বাংলাদেশী শ্রমিক। তাদের তদারকিতে ছিলেন কয়েকজন চীনা শ্রমিকও। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রান্তে মোটামুটি অর্ধেক অংশের কাজ শেষ হয়েছে।

প্রকল্প কার্যালয়ের তথ্য বলছে, দুই পাড়ে প্রায় ১০ লাখ পাথরের ব্লক ফেলার কথা। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত লাখ ১৪ হাজারের মতো পাথরের ব্লক ফেলার কাজ শেষ হয়েছে। প্রস্তুত করা হয়েছে আরো প্রায় সাড়ে সাত লাখ পাথরের ব্লক। নদীর তীর সংরক্ষণের জন্য ৮০০ কেজি ১২৫ কেজি ওজনের বালিভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হবে। এর মধ্যে ৮০০ কেজির জিও ব্যাগ ফেলা হবে ৩৯ লাখের মতো। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৮০০ কেজির জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে ২০ লাখের বেশি।

একইভাবে ১২৫ কেজি ওজনের জিও ব্যাগ ফেলার কথা কোটি ৭২ লাখ পিসের মতো। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ফেলা হয়েছে ৪৫ লাখের মতো। নদীর পাড়ে স্থাপন তীরে স্থাপন করার কথা কোটি ৩৩ লাখ পিস কংক্রিটের (সিসি) ব্লক। এর মধ্যে ৫৩ লাখ সিসি ব্লক স্থাপন শেষ হয়েছে। প্রায় লাখ কিউবিক মিটারের মতো নদীর তলদেশ ড্রেজিং করার কথা। কিন্তু সেপ্টেম্বর পর্যন্ত লাখ কিউবিক মিটার ড্রেজিং সম্পন্ন করেছে সিনোহাইড্রো।

নদীশাসন, মূল সেতু, সংযোগ সড়ক টোলপ্লাজা নির্মাণ পুনর্বাসনমোটাদাগে পাঁচটি কাজ বাস্তবায়ন হচ্ছে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের আওতায়। এর মধ্যে সংযোগ সড়ক টোলপ্লাজার কাজ শেষ হয়েছে নির্ধারিত সময়ের আগেই। মূল সেতুরও ৮৪ শতাংশ কাজ শেষ। শেষপথে রয়েছে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার কাজও। সবচেয়ে পিছিয়ে আছে নদীশাসনের কাজ।

গত আগস্টে পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) একটি প্রতিনিধি দল। তাদের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, জাজিরা প্রান্তে পরীক্ষামূলকভাবে নদীশাসন কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে পারেনি ঠিকাদার। পরীক্ষামূলক কাজ বিলম্ব হওয়ায় মূল নদীশাসন কাজেও দেরি হচ্ছে। এটা পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নকে পিছিয়ে দিয়েছে বলে পর্যবেক্ষণে তুলে ধরেছেন আইএমইডির কর্মকর্তারা।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে যোগাযোগ করা হলে সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত বাড়িয়েছে। সময় বাড়ানোর ক্ষেত্রে আমাদের কিছু শর্ত দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নির্দিষ্ট সময় পরপর প্রকল্পের অগ্রগতির তথ্য মন্ত্রণালয়ে দেয়া এবং একই সঙ্গে আগামী বছরের জুনের মধ্যে নদীশাসন কাজ শেষ করা। সব মিলিয়ে ১২ কিলোমিটারে নদীশাসন করতে হবে। এখন পর্যন্ত ছয় কিলোমিটার এলাকায় কাজ শেষ হয়েছে। পুরো কাজ শেষ করার জন্য ঠিকাদারকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে।

সিনোহাইড্রোর কাছ থেকে নতুন নির্ধারিত সময়ে কাজ আদায় করে নিয়ে সেতু বিভাগের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালককে এরই মধ্যে প্রকল্প এলাকায় পাঠানো হয়েছে তাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য। আমি নিজেও কয়েকদিন আগে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে এসেছি। সেখানে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করার জন্য ঠিকাদারকে নির্দেশনা দিয়েছি। কাজটি যেন নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়, সেজন্য আমরা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছি।

পদ্মা সেতুর মূল কাজ করছে চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড। এখন পর্যন্ত মূল সেতুর ৮৪ শতাংশ কাজ শেষ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। পাইলিংয়ের কাজ পুরোপুরি শেষ। মাওয়া প্রান্তে কয়েকটি পিয়ারের কাজ সামান্য বাকি। বিভিন্ন পিয়ারে চলছে স্প্যান বসানোর কাজ। এখন পর্যন্ত ১৫টি স্প্যান বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। রকম ৪১টি স্প্যান বসবে পুরো সেতুতে। স্টিলের স্প্যানের ওপর কংক্রিটের পাত (রোডওয়ে স্ল্যাব) বসানোর কাজও চলমান রয়েছে। কংক্রিটের পাতের ওপর হবে চার লেনের সড়কপথ। আর স্টিলের স্প্যানের ভেতর হবে রেলপথ।

সেতুর কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল চলতি বছরের ডিসেম্বরে। তবে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) সংশোধন করে কাজের মেয়াদ ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত বাড়িয়ে নেয়া হয়েছে। অনুযায়ী পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হবে ২০২১ সালের জুনে।

পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম প্রসঙ্গে বলেন, কয়েকটি কারণে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। শুরুর দিকে যে গতিতে কাজ এগিয়ে নেয়া সম্ভব হয়েছে, কারিগরি কারণেই এখন সেই গতিতে কাজ এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। তবে নতুন করে কাজ শেষ করার যে সময় নির্ধারণ করা হয়েছে, আমরা আশা করছি তার আগেই সব কাজ শেষ হয়ে যাবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন