মঙ্গলবার | ডিসেম্বর ১০, ২০১৯ | ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

প্রথম পাতা

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দুই ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত ১৬

সিগন্যাল পেয়েও মানেননি তূর্ণা নিশীথার চালক

বণিক বার্তা প্রতিনিধি কুমিল্লা

রাত তখন আনুমানিক পৌনে ৩টা। শশীদল অতিক্রম করে মন্দবাগ স্টেশনের দিকে ছুটছে তূর্ণা নিশীথা। আর কসবা স্টেশন ছেড়ে মন্দবাগে প্রবেশের অপেক্ষায় উদয়ন এক্সপ্রেস। স্টেশন মাস্টারের সংকেত পেয়ে উদয়ন এক্সপ্রেস নম্বর লাইনে প্রবেশ করে। এর মধ্যেই উদয়ন এক্সপ্রেসের মাঝামাঝি বগিতে ঢুকে পড়ে দ্রুতগামী তূর্ণা নিশীথা। এরপর রক্ত, আর্তনাদ আর মৃতদেহ। ভয়াবহ দুর্ঘটনায় গতকাল বিকাল পর্যন্ত ১৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আহত হয়েছে আরো শতাধিক নারী-পুরুষ-শিশু।

তূর্ণা নিশীথার চালকের গাফিলতিতে দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ মন্দবাগ রেলওয়ে স্টেশনমাস্টার স্টেশনে প্রবেশের আগেই আউটারে থামার সংকেত দিলেও তূর্ণা নিশীথার চালক তা আমলে নেননি। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে তূর্ণা নিশীথার লোকোমোটিভ মাস্টার (চালক) সহকারী মাস্টারকে এরই মধ্যে বরখাস্ত করা হয়েছে।

রেলওয়ে স্টেশন, প্রত্যক্ষদর্শী আহত যাত্রী স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা আন্তঃনগর ট্রেন ঢাকাগামী তূর্ণা নিশীথা মঙ্গলবার ভোররাত পৌনে ৩টার দিকে শশীদল রেলওয়ে স্টেশন অতিক্রম করে মন্দবাগ রেলওয়ে স্টেশনের দিকে রওনা দেয়। মন্দবাগ রেলওয়ে স্টেশনমাস্টার স্টেশনে প্রবেশের আগেই আউটারে থামার জন্য লালবাতি জ্বালিয়ে সংকেত দেন। অন্যদিকে সিলেট থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সপ্রেস কসবা রেলওয়ে স্টেশন ছেড়ে মন্দবাগ রেলওয়ে স্টেশনে প্রবেশপথে স্টেশনমাস্টার তাকে মেইন লাইন ছেড়ে দিয়ে নম্বর লাইনে আসার সংকেত দেন। ওই ট্রেনের চালক নম্বর লাইনে প্রবেশ করার সময় ছয়টি বগি প্রধান লাইনে থাকতেই বিপরীত দিক থেকে আসা তূর্ণা নিশীথার চালক সিগন্যাল অমান্য করে দ্রুতগতিতে ট্রেন চালান। সময় উদয়ন ট্রেনের মাঝামাঝি তিনটি বগির সঙ্গে তূর্ণা নিশীথার ইঞ্জিনের সংঘর্ষ হয়। এতে উদয়ন এক্সপ্রেসের তিনটি বগি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। এতে ট্রেনটির ১৬ যাত্রী নিহত হন। আহত হন আরো শতাধিক যাত্রী।

নিহত ১৬ জনের মধ্যে সাতজনের বাড়িই হবিগঞ্জে। তারা হলেন হবিগঞ্জ শহরতলির আনোয়ারপুর গ্রামের মৃত হাসান আলীর পুত্র আলী মো. ইউসুফ (৩২), বানিয়াচং উপজেলার মদন মোরাদ গ্রামের আইয়ুব আলীর পুত্র আল আমিন (৩৪), একই উপজেলার টাম্বুলিটুলা মহল্লার সোহেল মিয়ার দুই বছর বয়সী কন্যা আদিবা আক্তার, হবিগঞ্জ শহরতলির বহুলা গ্রামের আলমগীর মিয়ার পুত্র ইয়াসিন মিয়া (১২), চুনারুঘাট উপজেলার পীরেরগাঁও গ্রামের মৃত আব্দুল হাশেমের পুত্র হবিগঞ্জ সরকারি বৃন্দাবন কলেজের ছাত্র আশিকুর রহমান সুজন (২৫), একই উপজেলার উলুকান্দি গ্রামের ফরিদ মিয়ার পুত্র রুবেল মিয়া (২২) চুনারুঘাট উপজেলার আমরোড এলাকার বাসিন্দা আব্দুস সালামের স্ত্রী পিয়ারা বেগম (৬২) নিহত অন্যরা হলেন চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম রাজারগাঁও গ্রামের মুজিবুর রহমান (৫৫), তার স্ত্রী কুলসুম বেগম (৩০), চাঁদপুর সদর উপজেলার উত্তর বালিয়া গ্রামের বিল্লাল মিয়াজীর মেয়ে ফারজানা (১৫), শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ তিরাশি গ্রামের মাইনুদ্দিনের স্ত্রী কাকলী বেগম (২০), কাকলীর মামাতো ভাই জাহাঙ্গীরের স্ত্রী আমাতুন বেগম (৪০) আমাতুনের মেয়ে মরিয়ম (), মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার গাজীপুর গ্রামের মসলিম মিয়ার স্ত্রী জাহেদা খাতুন (৩০) নোয়াখালীর মাইজদীর শংকর হরিজনের ছেলে রবি হরিজন (২৩)

মন্দবাগ রেলওয়ে স্টেশনমাস্টার মো. জাকের হোসেন চৌধুরী বলেন, তূর্ণা নিশীথা ট্রেনটিকে আউটারে মেইন লাইনে থামার সংকেত দেয়া হয়েছিল। আর উদয়ন এক্সপ্রেসকে মেইন লাইন থেকে নং লাইনে আসার সংকেত দেয়া হয়। সেই হিসাবে উদয়ন নম্বর লাইনে প্রবেশ করছিল। সময় তূর্ণা নিশীথার চালক সংকেত অমান্য করে উদয়ন এক্সপ্রেসের উপরে উঠে যায়।

নিশীথার লোকোমোটিভ মাস্টার সহকারী মাস্টারকে বরখাস্ত: দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে তূর্ণা নিশীথার লোকোমোটিভ মাস্টার সহকারী মাস্টারকে বরখাস্ত করা হয়েছে। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার মন্দবাগ রেলওয়ে স্টেশনে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের কথা জানান রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন।

দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় তিনি বলেন, তূর্ণা নিশীথা এক্সপ্রেসের লোকোমোটিভ মাস্টার সিগন্যাল ভঙ্গ করেছেন। আমরা বিস্তারিত জানার জন্য জেলা প্রশাসন রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। নিহতের পরিবারের ক্ষতি টাকা দিয়ে পূরণ করা সম্ভব না।

তদন্ত কমিটি: ঘটনা তদন্তে পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে। ঘটনায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। রেল সচিব মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে রেলের মহাপরিচালকের দপ্তর থেকে। অন্যটি করা হয়েছে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল মহাব্যবস্থাপক কার্যালয় থেকে। কমিটিতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রয়েছেন। রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে লাখ টাকা করে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২৫ হাজার টাকা করে দেয়া হবে।

রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর শোক: দুই ট্রেনের সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঘটনায় অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামালও শোক প্রকাশ করেছেন। পৃথক শোকবার্তায় তারা নিহতদের আত্মার মাগফিরাত এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন। শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতিও গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেন তারা।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন