শনিবার | ডিসেম্বর ০৭, ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

প্রথম পাতা

অদক্ষ কর্মীরাই শিল্প চালাচ্ছেন

বদরুল আলম

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশের শিল্প বলতে ছিল মূলত পাটকল। পরে রফতানিমুখী পোশাক খাত দিয়ে শুরু হয় উৎপাদনমুখী শিল্পের অগ্রযাত্রা। ধারাবাহিকতায় গত চার দশকে অনেকগুলো শিল্প বিকশিত হয়েছে, যেগুলোর চালিকাশক্তি ছিল অদক্ষ কর্মী। আন্তর্জাতিক সংস্থার পর্যবেক্ষণ বলছে, এখনো অদক্ষ কর্মীরাই চালাচ্ছেন বাংলাদেশের শিল্প।

বাংলাদেশের বেসরকারি খাত নিয়ে একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন সম্প্রতি প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা ইউএসএআইডি। প্রতিবেদনে শিল্পভিত্তিক অদক্ষ কর্মীর হার প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, শিল্পভেদে অদক্ষ কর্মীর হার সর্বনিম্ন ৭৩ দশমিক ৮০ থেকে সর্বোচ্চ ৯৯ দশমিক শতাংশ।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে শিল্পের পত্তনে অদক্ষ শ্রমিকরাই মূল ভূমিকা রেখেছেন। তবে অদক্ষতা বা স্বল্পদক্ষতা দিয়ে আগামীতে শিল্পের বিকাশ কঠিন হবে। ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার সময় হয়েছে।

পোশাক শিল্পের বাইরে সম্ভাবনাময় খাতগুলোর অন্যতম ওষুধ শিল্প। বাংলাদেশের ওষুধ খাতের বাজার এরই মধ্যে ২৪৪ কোটি ডলার। উৎপাদিত ওষুধ ১২৭টি দেশে রফতানিও করছে দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো, যার বার্ষিক পরিমাণ ১০ কোটি ডলার। খাতটিতে কর্মসংস্থান হয়েছে লাখ ৭২ হাজার মানুষের, যাদের ৯৭ দশমিক ৪০ শতাংশই অদক্ষ।

ওষুধ শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের (বিএপিআই) ভাইস প্রেসিডেন্ট রেনাটা লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সৈয়দ এস কায়সার কবির বণিক বার্তাকে বলেন, ওষুধ শিল্প শ্রমঘন নয়। বড় আকারের উৎপাদন ব্যবস্থা অনেক বেশি স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির। আধুনিক ওষুধ শিল্প হোয়াইট কলার কর্মীর ওপরই বেশি নির্ভরশীল যেমন ফার্মাসিস্ট, কেমিস্ট, প্রকৌশলী আইটি পেশাজীবী। ধরনের কর্মীদের বড় একটি অংশ বর্তমানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বের হচ্ছেন। আমাদের ঘাটতি আছে শীর্ষ পর্যায়ের বিজ্ঞানীর, যারা পণ্য উন্নয়ন গবেষণার বাস্তবতা নিয়ে কাজ করেন।

দেশের অন্যতম শিল্প খাত কৃষি ব্যবসা। ৩৫৪ কোটি ডলার বা ২৯ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে খাতের আকার। খাতে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় তিন লাখ মানুষের। ইউএসএআইডির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এদের ৯৯ দশমিক শতাংশই অদক্ষ।

দেশে অটোমোবাইল খাতের আকার দাঁড়িয়েছে হাজার ৩৮৯ কোটি ডলারের। খাতে ট্রাক-বাসের সংযোজন করে অটোমোটিভ পণ্য রফতানিও হচ্ছে। বর্তমানে খাতে নিয়োজিত আছেন ৫০ হাজার কর্মী। কর্মীদেরও প্রায় ৮৫ শতাংশ অদক্ষ।

সম্ভাবনাময় বেসরকারি খাতগুলোর অন্যতম সিরামিক। বাংলাদেশে খাতটির আকার দাঁড়িয়েছে ৬৬ কোটি ডলারে। অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি ৫০টি দেশে রফতানিও হয় সিরামিক পণ্য। শিল্পটিতে কর্মরত আছেন ৪৮ হাজার কর্মী। এদের ৯২ দশমিক ৫০ শতাংশই অদক্ষ।

এরই মধ্যে ৫৯২ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের বাজার। খাতে কর্মসংস্থান হয়েছে লাখ ৫০ হাজার মানুষের। এদের এক-তৃতীয়াংশ বা ৩৩ দশমিক শতাংশ অদক্ষ বলে ইউএসএআইডির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।

স্বাস্থ্যসেবা খাতের হাত ধরে বড় হচ্ছে মেডিকেল ইকুইপমেন্টের বাজার। বর্তমানে খাতের স্থানীয় বাজারের আকার ৩৫ কোটি ডলার, যেখানে কর্মরত আছেন ১০ হাজারের মতো কর্মী। এদেরও ৮৯ দশমিক ৭০ শতাংশ অদক্ষ।

বহু শিল্পে এখনো অদক্ষ শ্রমিকরাই কাজে প্রবেশ করেন বলে জানান বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি কামরান টি চৌধুরি। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, কাজ শুরুর পর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই স্বল্পদক্ষ হয়ে ওঠেন তারা। কর্মকালীন প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই তাদের কর্মোপযোগী করা হচ্ছে। দক্ষ কর্মী পাওয়া যাচ্ছে না বলেই এটা করতে হচ্ছে। তবে ব্যবস্থা থাকলেই হবে না। বর্তমানে খুব আলোচনা হচ্ছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব নিয়ে। বিপ্লব অনেক বেশি গতিশীল। এতে গতিটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আগে যে গতিতে পরিবর্তন হয়েছে এখনকার গতি তার কয়েক গুণ বেশি। কারণ প্রশিক্ষিত করার পর কিছুদিনের মধ্যেই তা অকার্যকর হতে শুরু করবে। ফলে আবারো প্রশিক্ষণের প্রয়োজন পড়বে। কারণে নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার একটা প্রস্তুতি থাকতে হবে।

দেশের বর্ধনশীল খাতগুলোর অন্যতম আইসিটি অ্যান্ড আউটসোর্সিং। ১১০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে খাতের আকার। খাতটিতে নিয়োজিত আছে লাখ ৪০ হাজার মানুষ, যাদের ৯২ দশমিক ৫০ শতাংশেরই প্রয়োজনীয় দক্ষতা নেই।

বাংলাদেশের আরেক বড় শিল্প খাত চামড়া চামড়াজাত পণ্য। ১৯০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে খাতের স্থানীয় বাজার। পাশাপাশি ৮৪টি দেশে বার্ষিক ১০০ কোটি ডলারের চামড়াজাত পণ্য রফতানিও হচ্ছে। খাতটিতে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ছয় লাখ মানুষের, যাদের ৯৯ দশমিক শতাংশই অদক্ষ।

৩১২ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে দেশের হালকা প্রকৌশল শিল্পের স্থানীয় বাজার। পাশাপাশি ৩৩টি দেশে হালকা প্রকৌশল পণ্য রফতানি হয়। লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে খাতটিতে। এদের সিংহভাগ অর্থাৎ ৮৬ দশমিক ৭০ শতাংশই অদক্ষ।

বাংলাদেশ লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, শিল্পের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে আরো প্রায় ৬০ লাখ লোক জীবিকা নির্বাহ করছে। নানা সমস্যা, সংকট প্রতিকূলতার মধ্যে পড়ে সম্ভাবনাময় শিল্পটি জাতীয় অগ্রগতিতে কাঙ্ক্ষিত অবদান রাখতে পারছে না। খাতকে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় দাঁড় করাতে হলে সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ বাস্তবায়ন করতে হবে।

প্লাস্টিক খাতে বাংলাদেশের বাজার দাঁড়িয়েছে ১৮০ কোটি ডলারের। আন্তর্জাতিক বাজারে ৬৮টি দেশে বার্ষিক গড়ে ১০০ কোটি ডলারের প্লাস্টিক পণ্য রফতানিও করছে বাংলাদেশ। খাতটিতে কাজ করছে ১২ লাখ মানুষ, যাদের ৮৪ দশমিক ৭০ শতাংশই অদক্ষ।

বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির বাজার ৫১ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। খাতে নিয়োজিত মাত্র এক হাজার কর্মী। তাদেরও ৭৩ দশমিক ৮০ শতাংশ অদক্ষ।

দেশের জাহাজ নির্মাণ খাতের আকার এখন ২২০ কোটি ডলারের। বিশ্বের ১৫টি দেশে বাংলাদেশে নির্মিত জাহাজ রফতানি হয়েছে কোটি লাখ ডলারের। শিল্প খাতটিতে নিয়োজিত কর্মী প্রায় দেড় লাখ। এদের ৮৪ দশমিক ৭০ শতাংশেরই কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা নেই।

চিংড়ি খাতের অভ্যন্তরীণ বাজারের আকার ৩৭ কোটি ডলারের। বিশ্বের ২০টি দেশে রফতানিও হয় পণ্যটি। খাতে কর্মরত লাখ ৫০ হাজার কর্মীর ৯৯ দশমিক শতাংশই অদক্ষ।

৩৮০ কোটি ডলারের টেলিযোগাযোগ খাতে কর্মরত আছে লাখ ৪৫ হাজার মানুষ। এদের ৯০ শতাংশের বেশি অর্থাৎ ৯২ দশমিক ৫০ শতাংশই অদক্ষ।

দেশের পর্যটন শিল্পে কর্মরত আছে ১১ লাখ মানুষ। এদেরও ৯২ দশমিক ৮০ শতাংশের প্রয়োজনীয় দক্ষতা নেই। যদিও খাতটির আকার দাঁড়িয়েছে ৫৩০ কোটি ডলারে।

জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনএসডিএ) নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. ফারুক হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, কখনো দক্ষ কখনো অদক্ষ কর্মী দিয়েই আমরা পর্যায়ে এসেছি। স্বীকৃত দক্ষ শ্রমিক আমরা কখনো পাইনি। দক্ষতার ঘাটতিতে বিপুল পরিমাণ বিদেশী মুদ্রাও খরচ করতে হয় আমাদের। এখন আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি, যাতে করে দক্ষতার একটি আন্তর্জাতিক মান স্থানীয়ভাবে নিশ্চিত করা যায়। প্রশিক্ষণের মানের স্বীকৃতিও আমরা এনএসডিএ দেব। অনেক দেরিতে হলেও আমরা দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছি। সামনে এগিয়ে যেতে আমাদের অনেক চ্যালেঞ্জ আছে, সবগুলোই আমাদের মোকাবেলা করতে হবে। এর মধ্যে আছে আমাদের দক্ষ প্রশিক্ষণকেন্দ্র নেই, আমাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষকও নেই। আমাদের দক্ষতার জাতীয় চাহিদা সম্পর্কেও আমরা ওয়াকিবহাল নই। এগুলো কাটিয়ে প্রকৃত দক্ষতা উন্নয়ন নিশ্চিত করে সামনে এগোতে হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন