বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ২১, ২০১৯ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

শেয়ারবাজার

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ: বয়স যেখানে হার মানে

চাকরি বা ব্যবসা থেকে অবসর গ্রহণের পর বেশির ভাগ মানুষই চুপসে যান। শেষ বয়সে ঝুঁকি নেয়ার বা নতুন কিছু করার মানসিকতা অনেকেরই থাকে না। ধরনের অনেক ধ্যান-ধারণাকেই নিমিষে ভেঙে দিতে পারে ৭৭ বছর বয়সী বিনিয়োগকারী পল গ্ল্যানডর্ফের গল্প। অবসরপ্রাপ্ত ব্যবসায়ীর পুঁজিবাজারে আগমন এবং সফলতা যে কাউকে নতুন উদ্দীপনা জোগাতে পারে।

পল গ্ল্যানডর্ফ ছিলেন একজন নির্মাণ ব্যবসায়ী। ওহাইয়োর সিনসিনাটিতে ছিল তার ব্যবসা। পেশাগতভাবে তিনি ছিলেন একজন পাইপফিটার। পুঁজিবাজার নিয়ে ভাবা তো দূরের কথা, নিজের কাজ বা ব্যবসার বাইরে কোনো কিছু ভাবার সুযোগ তার কখনই হতো না। ব্যবসা থেকে অবসর নেয়ার কিছুদিন আগে থেকে তার মনে হতে লাগল অন্য অনেক প্রফেশনালের চেয়ে অর্থব্যবস্থাপনায় তিনি বেশি দক্ষ। এখান থেকে তার মনে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ সম্পর্কে আগ্রহ জন্ম নেয়। ধীরে ধীরে সম্পর্কে জানা শুরু করেন তিনি।

জানা শুরু করলেও বিনিয়োগ করার মতো আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারছিলেন না গ্ল্যানডর্ফ। এরই মধ্যে হঠাত্ একটি বিনিয়োগ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ পান তিনি। প্রতিযোগিতার নিয়ম ছিল প্রত্যেক বিনিয়োগকারীকে পাঁচটি করে শেয়ার কিনতে হবে এবং এক বছর শেয়ারগুলো ধরে রাখতে হবে। গ্ল্যানডর্ফ তখন যে শেয়ারগুলো কিনেছিলেন সেগুলো ছিললিংকডইন, থ্রিডি সিস্টেমস, ফিডেল্টি ন্যাশন, ভ্যালিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যালস লুলুলেমন। বছর শেষে পোর্টফোলিও থেকে ৭১ শতাংশ রিটার্ন আসে এবং প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন গ্ল্যানডর্ফ। এর মধ্য দিয়েই শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন তিনি।

বয়স ৬০ পার হওয়ার পরপর একটি স্টক ক্লাব চালু করেন গ্ল্যানডর্ফ। সিনসিন্নাটিতে অবস্থিত গ্ল্যানডর্ফের পাইপফাইটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ক্লাবের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম বৈঠকে হাজির হয় মাত্র ১৫ জন বিনিয়োগকারী, যাদের সবার বয়স ছিল ষাটের বেশি। ক্লাবটির নাম এখন সাইকামোর সিনিয়র সেন্টার। মূলত জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের বিনিয়োগ বিষয়ে উত্সাহ জোগানোই ক্লাবের মূল উদ্দেশ্য।

একসময় গ্ল্যানডর্ফের বিনিয়োগ কৌশল সঠিকভাবে কাজ করতে শুরু করে এবং নিয়মিতভাবে তার বিনিয়োগ থেকে ভালো রিটার্ন আসা শুরু হয়। তিনি সাধারণত একটি শেয়ারে ১০ হাজার ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেন না। তার পোর্টফোলিওতে শেয়ার থাকে ৭৫ থেকে ৮০টি। সেই হিসেবে পুঁজিবাজারে তার বিনিয়োগ সবসময় লাখ ৫০ হাজার ডলার থেকে লাখ ডলারের মধ্যেই থাকে।

নিজের বিনিয়োগ কৌশলের বিষয়ে গ্ল্যানডর্ফ বলেন, আমি যখন বিনিয়োগ করি, তখন মূলত একটি শেয়ারের ফান্ডামেন্টাল টেকনিক্যাল বিষয়গুলোকে বিবেচনা করি। অনেক সময় আমি জানিই না কোম্পানির নাম কী। আমি শুধু কোম্পানিগুলোর সংক্ষিপ্ত নাম জানি।

শেয়ার কেনার পর গ্ল্যানডর্ফ কিছুদিন এটি হাতে রাখেন এবং প্রতিদিন এর ওঠানামা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। তার মতে, যেসব শেয়ারের গ্রোথ খুবই অ্যাগ্রেসিভ সেগুলোতে বিনিয়োগ করুন।

নিজের পরিচিতদের নিয়ে স্টক উইজার্ড নামে একটি গ্রুপ করেছেন তিনি। কিছুদিন পরপরইপল লিস্টনামে একটি তালিকা চলে যায় গ্রুপের নতুন পুরনো সব সদস্যের কাছে। গ্রুপের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা কিছু বন্ধু মিলে গ্রুপ পরিচালনা করি। এখানকার কেউই শেয়ার বেশিদিন ধরে রাখেন না। সবাই স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ এবং নতুন নতুন শেয়ারে বিনিয়োগের দিকে বেশি আগ্রহী।

উইজার্ডের একেক সদস্য একেক উপায়ে বিনিয়োগ করলেও গ্ল্যানডর্ফ নিজে সবসময় সেসব শেয়ারই কেনেন যেগুলোর গ্রোথ অ্যাগ্রেসিভ। তিনি বলেন, সাধারণত আাামি যেসব শেয়ার বাছাই করি, তার ৮০ শতাংশ থেকেই মুনাফা হয় এবং ২০ শতাংশ হয়তো লোকসান করে। ২০০৭ সালের শেষ সময় বাদে নিয়মিতভাবেই ধারা বজায় রাখতে রয়েছে।

গ্ল্যানডর্ফের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, ২০০৭ সালের আর্থিক মন্দার আগেই তিনি সব শেয়ার বাজার থেকে নিরাপদে তুলে নিতে পেরেছিলেন। এর আগেই এসব শেয়ার থেকে তার ৫০ শতাংশ মুনাফা হয়ে যায়। তিনি আগেই বুঝতে পেরেছিলেন, শেয়ারবাজার শিগগির পতনের দিকে যাবে। সে অনুযায়ী সবাইকে তিনি শেয়ার বিক্রি করে দেয়ার পরামর্শও দিয়েছিলেন। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারায় তাকে আর লোকসান করতে হয়নি। তখনকার সিদ্ধান্তের জন্য গর্ববোধও করেন গ্ল্যানডর্ফ। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে গ্ল্যানডর্ফ সবসময় বন্ডকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন। শেয়ারে বিনিয়োগের দিকেই বেশি মনোযোগ দেন তিনি।

২০১৩ সালে নিজের সামগ্রিক পোর্টফোলিও থেকে ৫৭ শতাংশ রিটার্ন পান গ্ল্যানডর্ফ। সে বছর সব শেয়ার ভালো করলেও রিটার্ন ছিল চোখে পড়ারমতো। কেননা, এসঅ্যান্ডপি ৫০০-এর শেয়ারগুলোর চেয়ে তার পোর্টফোলিওর শেয়ারগুলোর পারফরম্যান্স ছিল ভালো। বছরটিতে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক বেড়েছে ৩০ শতাংশ।

বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে গ্ল্যানডর্ফ বলেন, সবসময় সেই পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করুন, যা পুরোপুরি হারালেও আপনার খুব বেশি ক্ষতি হবে না। যদিও তার বিনিয়োগ কৌশল অনুসরণ করলেও এতটা হারানোর সম্ভাবনা কখনই থাকে না।

পুঁজিবাজার থেকে অল্প সময়ে বড় ধরনের সফলতা পেলেও গ্ল্যানডর্ফের লাইফস্টাইলে খুব বেশি পরিবর্তন আসেনি। শেয়ার বাছাইয়ের বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের পরামর্শ দিতে তিনি সবসময় পছন্দ করেন। তবে পরামর্শ দিলেও নিজের শেয়ার নিজেকেই বাছাই করতে বলেন তিনি। ব্যক্তিগতভাবে সাধারণ জীবনযাপনেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তিনি। যারা নতুন কিছুতে সম্পৃক্ত হতে ভয় পান, তাদের জন্য তিনি একজন সত্যিকার প্রেরণা।

বেশির ভাগ মানুষই অবসরে যাওয়ার চিন্তা করার পর পরই সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। সবাই মনে করেন, তার ক্যারিয়ার বা অর্থ উপার্জনের এখানেই সমাপ্তি। কিন্তু নিজের মন সহজাত প্রবৃত্তিকে সবসময় উন্মুক্ত রাখা গেলে আরো নতুন নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। গ্ল্যানডর্ফের গল্প থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায়, মৃত্যুর আগেই নিজেকে মৃত ভাবা যাবে না। মনকে স্থির রাখতে পারলে যেকোনো অবস্থান থেকেই নতুন করে শুরু করা সম্ভব। গ্ল্যানডর্ফ শুধু জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের জন্যই অনুপ্রেরণা নয়, তরুণদের যারা মাত্র ক্যারিয়ার শুরু করেছেন তাদের জন্য তিনি বড় ধরনের অনুপ্রেরণা।

 

সিএনএন বিজনেস স্পিকিং অব সেন্টস অবলম্বনে

মেহেদী হাসান সবুজ

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন