বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ২১, ২০১৯ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সংকেত

আইপিওর পর শীর্ষ স্টার্টআপদের তিক্ত অভিজ্ঞতা

য়াল স্ট্রিটে গত বছর বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় স্টার্টআপ কোম্পানির আইপিওতে আসার গুঞ্জন চলছিল। এরই মধ্যে বছর অন্যতম শীর্ষ স্থানীয় স্টার্টআপ কোম্পানি লিফট উবার আইপিওতে এসেছে। উইওয়ার্ক এয়ার বিএনপিরও বছরের মধ্যে আইপিওতে আসার কথা ছিল। কিন্তু উইওয়ার্কের হাজার ৭০০ কোটি ডলার ভ্যালুয়েশন নিয়ে এর শেয়ারহোল্ডাররা প্রশ্ন তুললে কোম্পানিটি সামনের বছর আইপিওতে আসার ঘোষণা দেয়। উইওয়ার্কের পর এয়ার বিএনপিও আগামী বছর আইপিওতে আসার কথা জানিয়েছে। তাছাড়া আরো বেশকিছু শীর্ষস্থানীয় র্স্টাটআপ কোম্পানিও আইপিও পাইপলাইনে রয়েছে। সম্ভাবনাময় এসব স্টার্টআপ কোম্পানি তাদের শেয়ারের ভ্যালুয়েশন বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যত্ বিনিয়োগের পথ মসৃণ করতেই আইপিওতে আসছে বলে মনে করছেন ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকাররা। তবে লোকসানের কারণে আইপিওতে আসার পরই লিফট উবারের মতো শীর্ষস্থানীয় স্টার্টআপ কোম্পানির শেয়ারের ভ্যালুয়েশনে ধস নেমেছে। অন্যদিকে মুনাফা করায় জুম ভিডিওর ভ্যালুয়েশন বেড়েছে।

লিফট ইনকরপোরেশন: ক্যালিফোর্নিয়ার সানফ্রান্সিকোভিত্তিক রাইড শেয়ারিং কোম্পানি লিফট ইনকরপোরেশন বছরের মার্চে আইপিওতে আসে। শেয়ারপ্রতি ৭২ ডলারে লেনদেন শুরুর পর প্রথম দিনেই কোম্পানিটির শেয়ার ৭৮ দশমিক ডলারে দাঁড়ায়। এতে কোম্পানিটির শেয়ারের ভ্যালুয়েশন দাঁড়ায় হাজার ৬৬০ কোটি ডলারে। তবে বছরের মার্চ প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফলে লোকসানের কারণে কোম্পানিটির শেয়ারদর ২৭ শতাংশ কমে যায় এবং এতে কোম্পানিটির ভ্যালুয়েশন বছরের সেপ্টেম্বরে হাজার ৫০০ কোটি ডলারে নেমে আসে। সর্বশেষ গত শুক্রবার নাসডাকে কোম্পানিটির শেয়ার ৪৩ দশমিক ২৩ ডলারে লেনদেন হয়েছে এবং কোম্পানিটির ভ্যালুয়েশন দাঁড়িয়েছে হাজার ২৮৭ কোটি ডলারে। গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কোম্পানিটির ৩৯ শতাংশ মার্কেট শেয়ার ছিল। ২০১৮ সালে কোম্পানিটির ৯১ কোটি ডলার লোকসানের বিপরীতে ২২০ কোটি ডলারের রেভিনিউ হয়েছে।

উবার টেকনোলজিস ইনকরপোরেশন: সানফ্রান্সিকোভিত্তিক আরেক শীর্ষস্থানীয় রাইড শেয়ারিং স্টার্টআপ উবার টেকনোলজিস ইনকরপোরেশ বছরের মে মাসে আইপিওতে আসে। গত বছরের অক্টোবরে কোম্পানিটির ভ্যালুয়েশন ১২ হাজার কোটি ডলার থাকলেও আইপিওতে আসার সময় এটি হাজার ৫০০ কোটি ডলারে নেমে আসে। মূলত একই খাতের আরেক কোম্পানি লিফটের নড়বড়ে শেয়ারদরের কারণে উবারকে নিয়েও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সন্দেহ দেখা দেয়। তার ওপর বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফল অনুসারে উবারের ৫২০ কোটি টাকা লোকসানের প্রভাব পড়েছে কোম্পানিটির শেয়ারদরে। আইপিওতে আসার সময় উবারের শেয়ার ৪৫ ডলারে লেনদেন হলেও সর্বশেষ গত শুক্রবার এর শেয়ারদর ২৭ ডলারে নেমে এসেছে। কোম্পানিটির ভ্যালুয়েশন দাঁড়িয়েছে হাজার ৬০৭ কোটি ডলার। উবারের সিইও দারা খাসরোশাহী ২০১৯ সালকে কোম্পানিটির বিনিয়োগের বছর উল্লেখ করে জানান, ২০২০ ২০২১ সালে কোম্পানির লোকসান কমে আসবে।

জুম ভিডিও কমিউনিকেশনস: চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে আইপিওতে আসা জুম ভিডিও কমিউনিকেশনস মুনাফার ধারায় থাকায় বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে লিফট উবার বিপরীত প্রতিক্রিয়া পেয়েছে। লেনদেন শুরুর দিনে কোম্পানিটির প্রতি শেয়ার ছিল ৩৬ ডলার, যেটি সর্বশেষ গত শুক্রবার ৬৯ দশমিক ৮৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে। কোম্পানিটির সর্বশেষ ভ্যালুয়েশন হয়েছে হাজার ৯১১ কোটি ডলারে, যেখানে লেনদেন শুরুর দিনে কোম্পানিটির ভ্যালুয়েশন ছিল ৯০০ কোটি ডলার।

পিন্টারেস্ট: জুম ভিডিওর সঙ্গে একই দিনে নাসডাকে পিন্টারেস্টের শেয়ার লেনদেন শুরু হয়। শুরুতে এর প্রতি শেয়ারের দাম ছিল ১৯ ডলার এবং ভ্যালুয়েশন দাঁড়ায় হাজার কোটি ডলারে। সর্বশেষ শুক্রবার কোম্পানিটির প্রতি শেয়ার ২০ ডলারে লেনদেন হয়েছে এবং ভ্যালুয়েশন দাঁড়িয়েছে হাজার ১২০ কোটি ডলারে।

স্ল্যাক টেকনোলজিস: ক্লাউডভিত্তিক সফটওয়্যার স্টার্টআপ স্ল্যাক টেকনোলজিস বছরের জুনে আইপিওতে আসে। লেনদেনের শুরুতে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি দর ছিল ৩৮ দশমিক ডলার ভ্যালুয়েশন ছিল হাজার ৪০০ কোটি ডলার। সর্বশেষ শুক্রবার কোম্পানিটির শেয়ার ২০ দশমিক ৫০ ডলারে লেনদেন হয়েছে এবং ভ্যালুয়েশন দাঁড়িয়েছে হাজার ১১৫ কোটি ডলারে। মূলত অন্যান্য ছোট সফটওয়্যার কোম্পানির মতো স্ল্যাকও মাইক্রোসফটের মতো বড় কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় কুলিয়ে উঠতে পারছে না, যার প্রভাব পড়ছে কোম্পানিটির শেয়ারদরে।

উইওয়ার্ক: যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন খাতের স্টার্টআপ উইওয়ার্কের বছরের সেপ্টেম্বরে আইপিওতে আসার কথা থাকলেও বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণে ব্যর্থ হওয়ার কারণে কোম্পানিটি সামনের বছর আইপিওতে আসার ঘোষণা দিয়েছে। বছরের শুরুতে কোম্পানিটির ভ্যালুয়েশন হাজার ৭০০ কোটি ডলার থাকলেও আইপিও আবেদনের সময় ওয়াল স্ট্রিটের নির্বাহীরা এর ভ্যালুয়েশন হাজার ৫০০ কোটি ডলারের বেশি হবে না বলে মত দিয়েছেন। উবার লিফটের মতো উইওয়ার্কও ১৬০ কোটি ডলার লোকসান করেছে এবং কোম্পানিটির রেভিনিউ ছিল ১৮০ কোটি ডলার।

ক্রাউডস্ট্রাইক হোল্ডিংস: চলতি বছরের জুনে নাসডাক স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয় ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক সাইবার সিকিউরিটি টেকনোলজি কোম্পানি ক্রাউডস্ট্রাইক হোল্ডিংস। বর্তমানে কোম্পানিটির ভ্যালুয়েশন হাজার ৬৭ কোটি ডলার।

ক্লাউডফ্লেয়ার: বছরেরই আগস্টে নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়েছে মার্কিন ওয়েব ইনফ্রাস্ট্রাকচার ওয়েবসাইট সিকিউরিটি কোম্পানি ক্লাউডফ্লেয়ার, যার বর্তমান ভ্যালুয়েশন ৪৮১ কোটি ডলার।

মেইতুয়ান-ডায়ানপিং: বেইজিংভিত্তিক গ্রুপ বায়িং ওয়েবসাইট কোম্পানি মেইতুয়ান-ডায়ানপিং তালিকাভুক্ত হংকং স্টক এক্সচেঞ্জে। বর্তমানে এর ভ্যালুয়েশন ৫৫ হাজার ১৩৪ কোটি ডলার।

টেনসেন্ট মিউজিক এন্টারটেইনমেন্ট: চীনের শেনঝেনভিত্তিক টেনসেন্ট মিউজিক এন্টারটেইনমেন্ট গ্রুপের বর্তমান ভ্যালুয়েশন হাজার ২৮৯ কোটি ডলার। কোম্পানিটি নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত।

এছাড়া হাজার ৫০০ কোটি ডলার ভ্যালুয়েশনের চীনা ইন্টারনেট টেকনোলজি কোম্পানি বাইটড্যান্স (টিকটকের মূল কোম্পানি) আগামী বছরের প্রথম প্রান্তিকে পুঁজিবাজারে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর হাজার ৮০ কোটি ডলার ভ্যালুয়েশনের ভারতীয় স্টার্টআপ ফ্লিপকার্ট ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্টক মার্কেটে তালিকাভুক্ত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

ওয়াল স্ট্রিটের ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার বিশ্লেষকেরা বলছেন, সাধারণত প্রতি ১০০টি স্টার্টআপের মধ্যে ৭৫টিও ব্যর্থ হয়। প্রতিযোগিতার দৌড়ে যেগুলো টিকে যায়, তাদেরও একটি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ব্যবসাকে একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানোর জন্য ক্রমাগত বিনিয়োগ করে যেতে হয়। যেসব স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে, সেগুলোতে যারা ইকুইটি বিনিয়োগ করেন, তাদের বিনিয়োগ ফেরত দেয়ার জন্য আইপিওতে আসা অন্যতম একটি অপশন। তাছাড়া বিনিয়োগের জন্য তহবিল সংগ্রহ করাও আইপিওতে আসার অন্যতম কারণ। বর্তমানে অনেক স্টার্টআপ কোম্পানির ব্যবসা ক্রমবর্ধমান। পর্যায়ে কোম্পানিগুলোর লোকসান হতেই পারে। কিন্তু ভবিষ্যতে এর ব্যবসার পরিধি ব্যাপক পরিসরে বিস্তৃত হলে ভালো মুনাফা আসবে। তখন এসব কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ আরো বেড়ে যাবে, যা কোম্পানিগুলোর শেয়ারের ভ্যালুয়েশনকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে। এক্ষেত্রে তারা ফেসবুকের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ২০১২ সালে আইপিওতে আসার সময় ফেসবুকের ভ্যালুয়েশন ছিল ১০ হাজার ৪০০ কোটি ডলার, যা সর্বশেষ ৫৪ হাজার ৪২৩ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছরই ফেসবুকের গ্রাহক বাড়ছে আর এর সঙ্গে কোম্পানিটির রেভিনিউও বাড়ছে।

বাংলাদেশেও বেশকিছু স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান ভালো ব্যবসা করছে। এর মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলো দেশের বাইরে নিবন্ধিত। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের। বর্তমানে দেশের শীর্ষস্থানীয় স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে বিকাশ, পাঠাও, দারাজ, চালডাল ডটকম, সেবা ডট এক্সওয়াইজেড, শপআপ, শিওরক্যাশ, সহজ ডটকম, আজকের ডিল ডটকম, ক্লাউড ওয়েল, ওভাই, সিন্দাবাদ ডটকম হ্যান্ডিমামা। ওয়াল স্ট্রিটের মতো দেশের পুঁজিবাজারেও ভবিষ্যতে এসব স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে।

 

ইনক ডটকম, দ্য সিইও ম্যাগাজিন মিডিয়াম ডটকম অবলম্বনে

মেহেদী হাসান রাহাত

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন