শনিবার | ডিসেম্বর ০৭, ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সম্পাদকীয়

স্থপতির ভুয়া স্বাক্ষরে অনুমোদন পাচ্ছে ভবনের নকশা

দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হোক

ভবন নির্মাণে গাফিলতি বাংলাদেশে নিত্যবিষয়ে পরিণত হয়েছে। নকশার সঙ্গে মিল না রেখে একাধিক বিষয় সংযুক্ত করার উদাহরণও রয়েছে। এ কারণে অগ্নিকাণ্ডসহ নানা দুর্ঘটনাও ঘটছে। কিন্তু গতকাল যে ভয়াবহ খবরটি বণিক বার্তায় প্রকাশিত হয়েছে তা উদ্বেগজনক। এতে বলা হয়েছে, স্থপতিদের ভুয়া স্বাক্ষরে বা স্বাক্ষর জাল করে ভবনের নকশা অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। দু-একটি জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়লেও অনেক ঘটনাই অধরা থেকে যাচ্ছে। জালিয়াতি করে নকশা অনুমোদনের এসব ঘটনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে যাদের নাম-পদবি ব্যবহার করা হচ্ছে, তারা তা জানেনই না। আবার কোনো কোনো স্থপতি ভবনের নকশা তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না থেকেও টাকার বিনিময়ে নিজেদের নাম ব্যবহারের অনুমতি দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে আমাদের নির্মাণ খাতটি ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়ছে। ভুয়া স্থপতি বা স্থপতির ভুয়া স্বাক্ষর প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তথা রাজউকের সক্রিয়তা জরুরি। এক্ষেত্রে রাজউক থেকে ভুয়া স্থপতি গ্রেফতারের খবরও গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু এ ধরনের তত্পরতা বন্ধ করা যায়নি। আগে ভবনের নকশা রাজউকের ওয়েবসাইটে দেয়া হতো যাচাইয়ের জন্য। এখন নাকি সেটিও বন্ধ। এটি আবার চালু করা প্রয়োজন। প্রতি বছর রাজউক থেকে প্রায় চার হাজার ভবনের নকশা অনুমোদন দেয়া হয়, এর মধ্যে তিন হাজারের মতো নকশা অনুমোদনে স্থপতির স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে। এটি অবশ্যই তদন্ত হওয়া আবশ্যক। নতুবা অগ্নিকাণ্ড বা দুর্ঘটনা ঘটার পর নকশার অনুমোদন বা স্থপতির স্বাক্ষর জাল ইত্যাদি নিয়ে যতই আলোচনা বা পর্যালোচনা হোক না কেন, এটি বন্ধে কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতা জরুরি।

ভবন নির্মাণে বিধিমালা লঙ্ঘনের এ অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। নকশা জালিয়াতিসহ নানা অনিয়মের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ইমারত। নিয়মকানুন না মেনে গড়ে ওঠা রাজধানীর কতটি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ, তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান সরকারের কোনো সংস্থার কাছেই নেই। তবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় অঞ্চলভিত্তিক সমীক্ষা করে প্রায় ৭০ হাজার ভবন ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানিয়েছে। বিশেষজ্ঞ তত্ত্বাবধান ছাড়াই গড়ে ওঠা এসব ভবন ঝুঁকির মুখে ফেলছে মানুষের জীবন। যথাযথ প্রক্রিয়ায় ছাড়পত্র নেয়ার ক্ষেত্রে ইমারত মালিক ও নির্মাতাদের নিরুৎসাহিত করেন রাজউকের একশ্রেণীর কর্মকর্তা। অনেক ক্ষেত্রে ইমারত মালিক ও নির্মাতারাও জানেন না এসব ছাড়পত্র ভুয়া। অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে তারা এসব নকশা অনুমোদন করিয়ে দেন। অনেক আবাসন প্রতিষ্ঠান আবার অনুমোদনের অতিরিক্ত উচ্চতার ভবন তৈরি করে। এসব ক্ষেত্রে রাজউক দায়সারা গোছের নোটিস পাঠিয়েই তাদের দায়িত্ব শেষ করে। অনেক সময় ভবন মালিকরা অতিরিক্ত অংশ ভাঙার নোটিস পেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন। অনুমোদন ছাড়া নির্মিত অংশ ভেঙে ফেলাসহ জরিমানা আদায়ের ক্ষমতা আছে রাজউকের। যদিও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ হিসেবে তারা তা প্রয়োগ করছে না, যা কাম্য নয়।

ভবনের নকশা প্রণয়ন থেকে অনুমোদন প্রতিটি ধাপ আরো সহজ ও চেক অ্যান্ড ব্যালান্স প্রক্রিয়া অনুসরণে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে তুলতে হবে। স্থপতিদের স্বাক্ষর জালিয়াতি রোধে স্থাপত্য অধিদপ্তর থেকে শুরু করে স্থপতিদের সংগঠন আইএবির তদারকি বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের নিবিড় সম্পর্ক তৈরি প্রয়োজন। নকশা ও স্বাক্ষর যাচাইয়ে প্রযুক্তির ব্যবহার জরুরি। যেসব স্থপতি ও ইনস্টিটিউট এসব অনৈতিক কাজের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থপতিদের দিয়ে নকশা যাচাইও করা চাই। রাজউকও বর্তমান পরিস্থিতির দায় এড়াতে পারে না। রাজউকের ভেতরের কিছু লোক এ কাজে জড়িত বলে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে জানা যায় না। এটি বন্ধে রাজউকের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে।

 

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন