বুধবার | নভেম্বর ২০, ২০১৯ | ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

শিল্প বাণিজ্য

‘টেকসই ওষুধ শিল্পের জন্য চাই উদ্ভাবনী পণ্য’

আদ্রিয়ানো এন্তোনিও ত্রেভ, --  তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সুইজারল্যন্ডভিত্তিক বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি রোশ ফার্মার বিভিন্ন পদে কর্মরত ছিলেন, তিন দশক পূর্বে রোশ বাংলাদেশ এর সূচনাও তার হাত ধরে, বর্তমানে তিনি মধ্য ও পূর্ব ইউরোপীয় এবং একইসাথে ভারতীয় উপ-মাহদেশের আঞ্চলিক প্রধান হিসেবে কর্মরত আছেন।" 

 ইতালিতে জন্ম নেয়া আদ্রিয়ানো এখন তুরস্কে বসবাস করেন। সম্প্রতি বাংলাদেশে এসেছিলেন এ প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারিত কার্যক্রম দেখভাল করার জন্য। ঢাকাতে আগেও এসছেন। তবে এবার ঢাকায় পা রেখে নানান কর্মযজ্ঞ দেখে একরকম বিস্মিত হয়েছেন। কর্মব্যস্ত সময়ের মধ্যে বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন সুদীর্ঘ ক্যারিয়ারের ইতিবৃত্ত। সাথে এদেশে রোশ ফার্মার কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিয়ে ক্যান্সারের মত মরণব্যাধির সাথে যুদ্ধ ঘোষণার কথায়; মাত্রা পেয়েছে মানবিকতার জন্য ভাবনা। কম সময়ের এ আলোচনায় উঠে এসেছে বাংলাদেশ ও ইউরোপের ওষুধ শিল্পের নানান সঙ্কট ও সম্ভবনার গল্প। সম্প্রতি আলেচনায় আসা বিদেশী ওষুধ কোম্পানির বাংলাদেশ ছাড়ার সময়ে স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারী এই প্রতিষ্ঠান এদেশে বাজার সম্প্রসারন করার পরিকল্পনা এ শিল্পের জন্য কী বার্তা দিতে চাইছে?- এসবের আদ্যোপান্ত থাকছে আজকের এই সাক্ষাৎকার পর্বে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ফয়জুল্লাহ ওয়াসিফ

রোশের যেসব পণ্য নিয়ে আপনারা বাংলাদেশে কাজ করছেন সেগুলো সম্পর্কে জানাবেন।
স্বাস্থ্যসেবায় ‘রোশ’ বিশ্বব্যাপী নিজেদের উদ্ভাবিত পণ্যের জন্য সমাদৃত একটি কোম্পানি। মূলত আমাদের উদ্ভাবিত পণ্য নিয়ে কাজ করে থাকি, যার লক্ষ্য থাকে রোগীদের সেবা প্রদান করা। সেই সূত্রে বাংলাদেশেও কার্যক্রম চলেছে। ভালো লাগার ব্যাপার হচ্ছে রোগীরা আমাদের পণ্য ও সেবা গ্রহণে বেশ আগ্রহী। এবং আমরা আমাদের সাধ্যমত সেবা দেয়ার চেষ্টা করছি। রোশ এর ঔষধ সারা বিশ্বেই সমাদৃত।

ছবি: পলাশ শিকদার

আপনাদের উদ্ভাবিত পণ্য কোন ধরনের রোগীদের জন্য প্রস্তুত করছেন?
আমাদের অন্যতম মূল লক্ষ্য ক্যান্সার রোগীদের সেবা দেয়া এবং দূরারোগ্য ব্যধির চিকিৎসাসেবা উদ্ভাবন।  

বাংলাদেশকে কেমন দেখলেন? এখানে রোশের কার্যক্রম এবং এদেশের ওষুধ শিল্পের ব্যাপারে আপনার মূল্যায়ন কী?
বাংলাদেশে বেশ আগেই আসা হয়েছিল। এবার এসে বিমানবন্দরের কোন পরিবর্তন দেখতে না পেয়ে কিছুটা হতাশ হয়েছিলাম। কিন্ত পরবর্তীতে অনেক বড় বড় নির্মাণ প্রকল্প, উঁচু ইমারত, ঢাকার ব্যস্ত সড়ক ইত্যাদি দেখে মনে হয়েছে সময়ের সাথে ঢাকার অনেক পরিবর্তন এসেছে। রোশের ব্যাপারে বলব, বাংলাদেশে আমাদের যাত্রার শুরু থেকে আমরা বেশ রোমঞ্চিত। আগে বাংলাদেশে যখন এসেছিলাম তখন এই শিল্প কেবল মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। এবার এসে যেটা মনে হয়েছে, জনসংখ্যা বাড়ার সাথে এই শিল্পের আকার বাড়লেও মৌলিক গবেষণা এবং উদ্ভাবিত পণ্যের ব্যাপারে এখনো বেশ উদাসিনতা আছে। তবে গবেষণার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। 

আমার কাছে মনে হয়েছে, নিজেদের উদ্ভাবিত পণ্য না থাকায় বড় ধরনের একটি সংকট বিদ্যমান। যদিও এখন দেশীয় বেশ কিছু কোম্পানি জেনেরিক পণ্য (অন্যের গবেষণালব্ধ) বর্জন করে নিজেদের উদ্ভাবিত পণ্যের ব্যাপারে সচেতন হয়েছে। কিন্ত এত বড় একটি বাজারের জন্য তা যথেষ্ট নয়। আমাদের মতো কোম্পানিগুলো বছরের পর বছর টিকে যাওয়ার পেছনে অন্যতম একটি হচ্ছে নিজেদের উদ্ভাবিত পণ্য। 

বাংলাদেশের বাজারে আপনারা নিজেদের কীভাবে প্রাসঙ্গিক মনে করছেন?
এ পরিস্থিতিতে সরকারের সাথে সুসম্পর্ক রেখে কাজ করে যেতে চাই। সাথে সাথে আমরা আমাদের পণ্য নিয়ে ক্রেতাদের কাছে গিয়ে আস্থা অর্জনের মাধ্যমে নিজেদের পোর্টফোলিও বাড়াতে চাইব। আপনাদের দেশে কম দামে ভালো কিছু পণ্য পাওয়া যাচ্ছে এটা সত্য। কিন্তু অধিকাংশই জেনেরিক পণ্য নিজেদের উদ্ভাবিত পণ্য কতটি আছে সেটা ভাবার বিষয়। আমাদের পণ্যগুলো নিজেদের উদ্ভাবিত হওয়ায় আমরা বাজারে কিছুটা হলেও সুবিধা পাবো। যদি আমরা এদেশের বাজার নিয়ে গবেষণা অব্যহত রাখতে পারি তাহলে আমরা টিকে থাকতে পারবো বলে বিশ্বাস করি। 


বাংলাদেশে আপনাদের কোন কারখানা করার পারিকল্পনা আছে?
আমাদের অধিকাংশ পণ্য বায়োলজিক্যাল। এধরনের পণ্য উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশকে আমরা এখনি উপযুক্ত মনে করছি না। বিশ্বের সুনির্দিষ্ট কিছু স্থানে আমাদের প্ল্যান্ট রয়েছে। বেশিরভাগ দেশেই আমাদের প্ল্যান্ট নেই। 

সানোফির মতো বিশ্বখ্যাত কোম্পানি কিছু অভিযোগ তুলে বাংলাদেশ ছাড়ছে। সেখানে রোশ আরো বিনিয়োগ বাড়িয়ে দিতে চাইছে। কোন কোন বিষয়ের উপর নির্ভর করে আপনারা এমন পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন?
অন্য কোম্পানির বিষয়ে আমরা মন্তব্য করতে পারি না, তবে আমরা মনে করি বাংলাদেশে এখনো নৈতিকতার সাথে রোগীদের সেবা দেয়ার যথেষ্ঠ সুযোগ রয়েছে। আমরা আমাদের উদ্ভাবন দিয়ে সেবার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছি। সাধারণের কাছে পণ্যের সহজলভ্যতা নিয়ে আমরা কাজ করছি। রোগীদের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে আমরা পোর্টফোলিও ভারি করতে চাইব।

বাংলাদেশের বাজারে কোন ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখছেন?
(একটু হেসে) দেখেন ব্যবসা মানেই তো চ্যালেঞ্জ। এটা মাথায় নিয়েই ব্যবসা করতে হয়। আমরা আমাদের সেবা দিয়ে চেষ্টা করে যাব, বাকীটা সময় বলে দেবে। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি বাংলাদেশ আমাদের ব্যবসার জন্য একটি আদর্শ ক্ষেত্র হবে।

একটি আন্তর্জাতিক ওষুধ কোম্পানি বাংলাদেশের দুর্নীতিগ্রস্থ বিপণন ব্যবস্থা নিয়ে অভিযোগ করেছে। এক্ষেত্রে আপনাদের বিপণন পদ্ধতি কেমন হবে?
আমরা মনে করি বাংলাদেশে এখনো নৈতিকতার সাথে রোগীদের সেবা দেয়ার যথেষ্ঠ সুযোগ রয়েছে। আমরা আমাদের উদ্ভাবন দিয়ে আমাদের সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছি। বাংলাদেশে এসে এবার যে ধরনের পরিবেশ দেখতে পেলাম তা ইতিবাচকভাবে সত্যিই বিস্ময়কর। 

যেহেতু আপনারা বেশিরভাগ ক্যান্সারের ওষুধ নিয়ে কাজ করেন, এই বিবেচনায় বাংলাদেশের ক্যান্সার পরিস্থিতি নিয়ে আপনাদের পরিকল্পনা কী? বিশেষ করে ৮টি বিভাগে আলাদা করে সরকারের কিছু পরিকল্পনা রয়েছে। এখানে রোশ কীভাবে সহায়তা করে পারে?
আমরা এক্ষেত্রে সরকারে দিকে তাকিয়ে আছি। যদি সুযোগ হয় সরকারের সাথে কাজ করতে চাই। বিষয়টি নিয়ে আমরা প্রয়োজনী তথ্য সংগ্রহ এবং গবেষণা অব্যহত রেখেছি। আমরা ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়তে চাই। বিশেষ করে স্তন ক্যান্সারের বিষয়ে আমাদের বেশ কিছু পরিকল্পনা রয়েছে।