মঙ্গলবার | নভেম্বর ১২, ২০১৯ | ২৮ কার্তিক ১৪২৬

প্রথম পাতা

স্থপতির ভুয়া স্বাক্ষরে অনুমোদন পাচ্ছে ভবনের নকশা

জেসমিন মলি

যেকোনো ভবনের নির্মাণকাজ করতে হয় কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি তথা স্থপতি নির্মাণ বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে। নির্মাণ বিধিমালায় এমন বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা মানছেন না ভবনের মালিকরা। ব্যয় কমাতে স্থপতির স্বাক্ষর জাল করে ভবনের নকশা অনুমোদন করিয়ে নিচ্ছেন অনেকেই। আর কাজে তাদের সহায়তা করছেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কিছু অসাধু কর্মচারী।

একজন স্থপতির নাম, স্বাক্ষর সনদ জালিয়াতি করে ভবনের নকশার আবেদন করার অভিযোগে গত বৃহস্পতিবার এক ব্যক্তিকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে রাজউক। আটক ওই ব্যক্তি নিজেকে স্থপতি মইদুল ইসলাম হিসেবে দাবি করেছিলেন। তবে তার প্রকৃত নাম-পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ব্যাপারে রাজউকের পক্ষ থেকে উত্তরা (পূর্ব) থানায় একটি মামলাও করা হয়েছে।

বর্তমানে রাজউকে নকশা অনুমোদনের কাজটি অনলাইনে করা হয়। প্রক্রিয়া চালুর পর থেকে রাজউকে কোনো নকশা অনুমোদনের জন্য আবেদন জমা পড়লে আবেদনকারী স্থপতিকে এসএমএস করে তা জানিয়ে দেয়া হয়। গত মাসের শুরুতে একটি নকশা জমা পড়ার এসএমএস পান স্থপতি মইদুল ইসলাম। এসএমএস পাওয়ার পর তিনি রাজউকে অভিযোগ করেন, ওই নকশা তিনি করেননি। এরপর তদন্তে নেমে রাজউক প্রমাণ পায়, অভিযুক্ত ব্যক্তি স্থপতি মইদুল ইসলামের নাম, স্বাক্ষর ফোন নম্বর জালিয়াতি করে নকশার জন্য আবেদন করেছিলেন।

স্থপতি মইদুল ইসলামের স্বাক্ষর জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়লেও অনেক জালিয়াতিই অধরা থেকে যাচ্ছে। জালিয়াতি করে নকশা অনুমোদনের এসব ঘটনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে যাদের নাম-পদবি ব্যবহার করা হচ্ছে, তারা তা জানেনই না। আবার কোনো কোনো স্থপতি ভবনের নকশা তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না থেকেও টাকার বিনিময়ে নিজেদের নাম ব্যবহারের অনুমতি দেন, এমন অভিযোগও আছে।

স্থপতি নির্মাণ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভবনের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয় চারটি পর্যায়েপ্রস্তাবনা, অনুমোদন, সে অনুযায়ী চুক্তি নির্মাণকাজে পর্যবেক্ষক নিয়োগ। নির্মাণকাজের মোট ব্যয়ের নির্দিষ্ট একটি অংশ দেয়া হয় পর্যবেক্ষককে। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষক বাবদ অর্থ ব্যয়ে আগ্রহী নন নির্মাতারা। কারণেই স্থপতিদের এড়িয়ে চলেন তারা। আবার ভবনের নকশা অনুমোদন করতে সরকারের বেশ কয়েকটি সংস্থার অনুমোদন নিতে হয়। সেই সব সংস্থার মধ্যেও সমন্বয় নেই। এছাড়া এসব স্থানে কর্মরতদের বদলিও করা হয় বেশ দ্রুত। ফলে ভবনের নকশা অনুমোদনে ভোগান্তি এড়াতে রাজউকের একশ্রেণীর কর্মকর্তাদের সহায়তা নিয়ে নকশা অনুমোদনের কাজ করিয়ে নেয়া হয়।

স্থপতিদের সংগঠন ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশের (আইএবি)- সাবেক সভাপতি স্থপতি আবু সাঈদ এম আহমেদ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, প্রতি বছর রাজউক থেকে চার হাজারের মতো ভবনের নকশা অনুমোদন পায়। দেখা গেছে, এর প্রায় তিন হাজার নকশা অনুমোদন নেয়া হচ্ছে স্থপতির স্বাক্ষর জাল করে। ভবনের নকশায় যে স্থপতির স্বাক্ষর থাকছে, তিনি সে সম্পর্কে ঘুণাক্ষরেও কিছু জানতে পারেন না। যদিও এতে আমাদের নির্মাণ খাতটি ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়ছে। ধরনের অপকর্ম অতিদ্রুত বন্ধ করতে রাজউককেই উদ্যোগী হতে হবে।

নকশা জালিয়াতির বিষয়টি নিয়ে স্থপতিদের সংগঠন আইএবি থেকে থানায় জিডি করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, জিডির কপি সংযুক্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আমরা রাজউকে আবেদন করেছিলাম। তবে তারা তেমন কোনো ব্যবস্থাই নিচ্ছে না। এর পেছনে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য কাজ করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

স্থপতিরা বলছেন, আইএবির স্বীকৃত স্থপতি রয়েছেন সাড়ে তিন হাজার। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা কঠিন কোনো কাজ নয়। আগে প্ল্যান পাস হলে তা রাজউকের ওয়েবসাইটে দিয়ে দেয়া হতো, যা দেখে বিভিন্ন দুর্বলতা চিহ্নিত করে রাজউককে জানাতেন স্থপতিরা। পরে ওয়েবসাইটে প্ল্যান আপলোড করাটাও বন্ধ হয়ে যায়।

অভিযোগ রয়েছে, যথাযথ প্রক্রিয়ায় ছাড়পত্র নেয়ার ক্ষেত্রে ইমারত মালিক নির্মাতাদের নিরুৎসাহিত করেন রাজউকের একশ্রেণীর কর্মকর্তা। অনেক ক্ষেত্রে ইমারত মালিক নির্মাতারাও জানেন না, এসব ছাড়পত্র ভুয়া। অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে তারা এসব নকশা অনুমোদন করিয়ে দেন। অনেক আবাসন প্রতিষ্ঠান আবার অনুমোদনের অতিরিক্ত উচ্চতার ভবন তৈরি করে। এসব ক্ষেত্রে রাজউক দায়সারা গোছের নোটিস পাঠিয়েই তাদের দায়িত্ব শেষ করে। অনেক সময় ভবন মালিকরা অতিরিক্ত অংশ ভাঙার নোটিস পেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন। অনুমোদন ছাড়া নির্মিত অংশ ভেঙে ফেলাসহ জরিমানা আদায়ের ক্ষমতা আছে রাজউকের। যদিও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ হিসেবে তারা তা প্রয়োগ করছে না।

স্থপতির স্বাক্ষর জালিয়াতিসহ নকশা অনুমোদনে নানা অনিয়মের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে রাজউক চেয়ারম্যান . সুলতান আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের কাছে কোনো ভবনের নকশা অনুমোদনের জন্য জমা পড়লে পেশাজীবী সংগঠনের সদস্যদের যে তালিকা আছে, সেটির সঙ্গে স্থপতির নাম মিলিয়ে দেখা হয়। অনেক সময় স্থপতিদের অগোচরেই তাদের নাম রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার করে ভবনের নকশা অনুমোদন হয়ে থাকতে পারে। কাজে আমাদের কর্মীদের সংশ্লিষ্টতা যদি প্রমাণ হয়, তাহলে তাদের ছাড়ব না।

তিনি জানান, তারা (রাউউক) শিগগিরই ভবন নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে বসবেন। তাদের কাছে রক্ষিত বিভিন্ন ডাটাবেজ আপডেট করার উদ্যোগ নেবেন। ভবনের নকশা অনুমোদন করতে দুর্নীতি বন্ধ করবেন।

ভবন নির্মাণে বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। নকশা জালিয়াতিসহ নানা অনিয়মের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ইমারত। নিয়মকানুন না মেনে গড়ে ওঠা রাজধানীর কতটি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ, তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান সরকারের কোনো সংস্থার কাছেই নেই। তবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় অঞ্চলভিত্তিক সমীক্ষা করে প্রায় ৭০ হাজার ভবন ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানিয়েছে। বিশেষজ্ঞ তত্ত্বাবধান ছাড়াই গড়ে ওঠা এসব ভবন ঝুঁকির মুখে ফেলছে মানুষের জীবন।

সাভারের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর ভবন নির্মাণে অনিয়মের বিষয়টি আবারো সামনে চলে আসে। ভবন নির্মাণ বিধিমালা অনুসরণ না করেই গড়ে উঠেছিল ভবনটি। যে পুকুরের ওপর ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল, সেটি ভরাট করা হয় বালি কাদামাটি দিয়ে। এছাড়া বিশেষজ্ঞ পরামর্শও নেয়া হয়নি এটি নির্মাণে।

রানা প্লাজার মতো আরো অনেক ভবনই জলাশয়ের ওপর গড়ে উঠেছে। ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, একসময় রাজধানীর ৬৫ শতাংশ এলাকাই ছিল বিভিন্ন ধরনের জলাশয়। বালি আবর্জনা ফেলে তা ভরাট করায় এসব এলাকার মাটির গঠন অত্যন্ত দুর্বল। নির্মাণ বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ নিয়ম মেনেই এসব জায়গায় ভবন নির্মাণ করা উচিত। তা না হলে নির্মিত ভবন যেকোনো সময় ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন