মঙ্গলবার | নভেম্বর ১২, ২০১৯ | ২৮ কার্তিক ১৪২৬

সম্পাদকীয়

দ্য ভাইস চ্যান্সেলর

টি. ডি. ভার্ক

আমার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হাই-রেঞ্জ ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর হওয়া আমি শুনেছি বর্তমান ভাইস চ্যান্সেলর আপ্পাইয়া দিক্ষিঞ্চার মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে আরো বিস্তৃতভাবে জানার জন্য আমার বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হই, এই পদের প্রত্যাশীরা এরই মধ্যে লাইনে দাঁড়িয়ে গেছেন এবং তাদের প্রাথমিক প্রচেষ্টাও শেষ হয়ে এসেছে আমি ব্যথিত হই, তবে কি আমি বড্ড দেরি করে ফেলেছি আমি বেশ বুঝতে পারছি প্রতিদ্বন্দ্বিতা খুব তীব্র হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আমার কাছে অঙ্কুশের মতো, কেবল টানছেই অবস্থাটা গ্রামের ধর্মান্ধ ক্ষ্যাপাটের মতো, জনতার প্রচণ্ড ভিড়ে গুড ফ্রাইডের প্রার্থনাসভায় ক্রুশবিদ্ধ যিশুর মূর্তিতে চুমু খেতে না পেরে ধুতির খুট গুঁজতে গুঁজতে চেঁচিয়ে ওঠেদেখি কোন শালা আমার চুম্বন ঠেকায়!

(শিক্ষার বাজারে আমার নামডাক আছে বিভাগীয় প্রধান হিসেবে, সিনেট সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে, টুকটাক লেখক হিসেবে; প্রথম ধাক্কায় পিএইচডি অর্জনের মাধ্যমে আমার অবস্থান যথেষ্ট দৃঢ় সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষামন্ত্রী আমার ছাত্র)

অনেক বছর পর ভাইস চ্যান্সেলরের পদটা মাথায় রেখে কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়াই শিক্ষামন্ত্রীর বাড়িতে এক সকালে তার সঙ্গে দেখা করতে গেলাম আমার আকস্মিক আগমনে তার কী প্রতিক্রিয়া, পরীক্ষা করতে চাইলাম ঘটনাটি ১৫ বছর আগেকার ছাত্রআন্দোলনের মুখে কর্তৃপক্ষকে সন্তুষ্ট করতে আমি ক্লাস চালিয়ে যাচ্ছি শিক্ষামন্ত্রী তখন নেতা

নেতাকে দলবল নিয়ে ক্লাসের দিকে তেড়ে আসতে দেখে গোটা ক্লাস স্তব্ধ হয়ে গেল তাদের একটি দল লাফিয়ে পোডিয়ামের ওপর উঠল নেতা আমার ঘাড়ে চেপে ধরল এবং আমাকে ধাক্কা মেরে আমার ক্লাসের ছাত্রীদের সামনে মেঝেতে ফেলে দিল আমি যখন পড়ে যাই, আমার ধুতি মাঝ বরাবর ছিঁড়ে যায় মেয়েরা কাঁপতে থাকে আমার সহকর্মী শিক্ষকরা আমাদের ক্লাসরুমের দিকে ছুটে আসার আগেই আমি নিজেকে টেনে তুলতে সক্ষম হই

প্রশ্নের জবাবে মেয়েরা বলল, ওরা প্রফেসর স্যারকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছে

আমি বললাম, আমার কিছু হয়নি

টিচার্স কাউন্সিল বৈঠকে নেতাকে বহিষ্কার করার প্রস্তাব উঠলে আমি বলি, আমার কিছু হয়নি আমি বললাম, এমনকি ওরা যদি আমাকে ধাক্কা মেরে নিচে ফেলেও থাকে এবং আমি যদি অস্বীকার করি তাহলে আমার কথাই শিরোধার্য হবে

প্রতিষ্ঠান প্রধান বললেন, তুমি এমনকি যিশু খ্রিস্টকেও ছাড়িয়ে গেছ আমি জানি, আমার ঘাড় ধাক্কা পতনের ফসল আমি ঘরে তুলতে পারব

মন্ত্রী সাহেবের ভৃত্য আমাকে ঘরে ঢুকতে বাধা দিচ্ছিল আমি তার তোয়াক্কা না করে পেছন দিকে রান্নাঘরের দরজা দিয়ে ডাইনিং রুমে ঢুকে পড়লাম ঢোকার সময় তার তিন বছর বয়সী কন্যাকে জোর করে কোলে তুলে নিই

নাশতা খাওয়ায় ব্যস্ত মন্ত্রী একটু দেরিতে হলেও আমাকে চিনে কফি দেয়ার নির্দেশ দিল তার সুন্দরী স্ত্রী পাশে মন্ত্রীর মেয়ে হাতে কলম নিয়ে আমার শার্টের ওপর আঁকাআঁকি শুরু করল

আমি মন্ত্রীকে রাজি করাতে পারলাম, প্রার্থী যতই থাকুক, শিক্ষামন্ত্রীর নিজের শিক্ষকই ভাইস চ্যান্সেলর হবেন

আমি সব বাধা ডিঙিয়ে ১২ জন প্রার্থীকে কুপোকাত করে মুখ্যমন্ত্রী গভর্নরের আশীর্বাদ নিয়ে হাই-রেঞ্জ ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর হয়ে গেলাম যদিও পদে যেতে লাখ লাখ টাকা খরচ হওয়ার কথা আমি হলফ করে বলতে পারি, এক টাকাও ঘুষ দিইনি শিক্ষামন্ত্রী শুধু বলেছে, স্যার, আমি আপনার কাছে ঋণী

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংগঠন কর্মচারী ইউনিয়ন তাদের সুপারিশ ছাড়া আমার এত বড় পদে চাকরি হওয়ায় ভীষণ অসন্তুষ্ট আমার সঙ্গে পরাস্ত প্রার্থীরা রটালেন, আমি রাজ্যের সব কয়টা গুরুত্বপূর্ণ মানুষকে টাকা দিয়ে কিনে নিয়েছি, তারা নিশ্চিত করেছেন আমার পদ

প্রতিকূলতা তো থাকবেই আমি জানি, হাই-রেঞ্জ ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে ইতিহাসে আমার নাম খোদাই করা হয়ে গেছে খোদাই আরো গভীর করার জন্য আমি পড়াশোনার ওপর জোর দিতে চাইলাম আমার কথা ছাত্র, নেতা শিক্ষামন্ত্রীর ধর্মপুত্ররা গ্রহণ করল না দরকষাকষি করতে তারা যখন আমার চেম্বারের চেয়ারগুলো দখল করে নিল, আমার মুখে তখন মেঘের ছায়া আমার কীর্তিমান ছাত্র শিক্ষামন্ত্রী নিজেও তার রঙ বদলাতে শুরু করে আমাদের দুজনের কথোপকথনের মধুর স্মৃতি দ্রুত মিলিয়ে গেল তার ইঙ্গিত ছিল, আমি যেন মেধাবী মন্ত্রী হিসেবে তার প্রশংসা করি; আমি তা- করেছি

আমার স্বার্থ দেখার জন্য আমি আপনাকে ভাইস চ্যান্সেলর বানিয়েছি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আপনার সাধ্যমতো সহযোগিতা করবেন আপনি তাহলে আমার স্বার্থের কথা ভুলে গেলেন কেমন করে?

আমি মন্ত্রীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলাম

এখন প্রতিদিনই মন্ত্রীর কাছ থেকে আমাকে নির্দেশ নিতে হয় আমার নিত্যদিনের রুটিন কী হবে মন্ত্রীই ঠিক করে দেয় অপদস্থ হয়ে ছাত্রনেতাদের কাছ থেকে প্রথম শিক্ষা নিলাম মন্ত্রীর বন্ধুর বিরোধী কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিলে তাদের অপরাধ বোঝার চেষ্টা করছিলাম আমার দ্বিধা আঁচ করে মন্ত্রী ফোনেই আমার ওপর থুতু নিক্ষেপ করল উধুপি হোটেলের কাউন্টারে রাখা মূর্তির মতো আমার মাথা ঘুরতে শুরু করল

মন্ত্রী বলল, আমি যা বলব তার যৌক্তিকতা বের করার জন্যই তো আপনাকে নিয়োগ দিয়েছি

মন্ত্রীর সঙ্গে সুসম্পর্ক পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ নিয়ে বেশ কয়েকজনের পরীক্ষার ফলাফল পাল্টে দিই আমার কাছে পেশ করা সার্টিফিকেটের মধ্যে আধডজন জাল শনাক্ত করি এবং একজন কেরানিকে বরখাস্ত করি অমনি মন্ত্রীর ফোন, এখন সামলান কাল থেকে ওরা আন্দোলনে নামছে বাঁচতে হলে ইউনিয়নের নেতাদের ডেকে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বলুন পরদিন যেসব নোংরা স্লোগান দিয়ে আমাকে ইউনিভার্সিটিতে স্বাগত জানানো হয়, তার মধ্যে রয়েছে, গৃহপালিত ভৃত্য, নোংরা জন্তু-জানোয়ার ইত্যাদি (শিক্ষক হওয়ায় হয়তো অতিরিক্ত নোংরা কথাগুলো এড়িয়ে গেলাম)

আমি মাটি কামড়ে পড়ে রইলাম, এত অপমান এমনকি মহাত্মা গান্ধীকেও সহ্য করতে হয়নি

মন্ত্রীর নির্দেশ পেয়ে বিকালেই কেরানির বরখাস্তের আদেশ বাতিল করে দিই আমার বক্তৃতার ভাষায় নতুন মাত্রা যোগ হয়বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বলি, উন্নত শিক্ষার ইতিহাসে এটাই স্বর্ণযুগ শিক্ষামন্ত্রীর নেতৃত্বে সেই যুগের অভ্যুদয় ঘটেছে গণমাধ্যমে আমিও বিবর্ধিত হলাম, আমাকেও বলা হলো শিক্ষা সংস্কৃতির স্থপতি পত্রিকায় তা ছাপা হলো

হঠাৎ শিক্ষা বিপ্লবের ডাক উঠল তবে তা উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট ১০টি কলেজ প্রতিষ্ঠার অনুমতি দিলে দরকষাকষি করে আমি তা বাড়িয়ে ১৫টি করি কিন্তু এত কমসংখ্যক কলেজে কি আর বিপ্লব হয় নাকি? মন্ত্রী ৩৫টির ঘোষণা দিল! সিন্ডিকেট রাজি হলো না

মন্ত্রীকে বললাম, সিন্ডিকেটে বিরোধী দলের রাজনীতির প্রভাব আছে সে বলল, আপনিও তাদের বিরুদ্ধে রাজনীতি শুরু করুন

সিন্ডিকেটে পরের বৈঠকে বলা হয়, অলিতে-গলিতে-ঘুপচিতে ইউনিভার্সিটি সৃষ্টি করলে শিক্ষা একটি প্রহসনে পরিণত হবে

এর মধ্যে আমার বিরুদ্ধে মন্ত্রীর কাছে অভিযোগ জমা হতে লাগল মন্ত্রী আমাকে সব নথি দলিল-দস্তাবেজ নিয়ে হাজির হতে বলল

আমি হাজির হয়ে সকাল থেকে অপেক্ষা করে চলেছি, আমার ডাক পড়ছে না অন্যান্য দর্শনার্থীর কেউ আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললেন, দালাল কেউ বললেন, বিশ্বাসঘাতক কেউ বললেন, একজন ভিসিকে এভাবে দাঁড় করিয়ে রাখা ঠিক হচ্ছে না

আমাকে এখানেই থামলে হবে না হাই-রেঞ্জ ইউনিভার্সিটিতে ভিসি হিসেবে আরেক টার্ম থাকতে হবে

দুপুর-বিকাল-সন্ধ্যা গড়িয়ে যায় মন্ত্রীর দর্শনার্থীরা যাতে ভিসির এই করুণ দশা না দেখেন, সেজন্য কালো চশমায় চোখ ঢেকে রাখি 

রাত ১টার পর যখন তার অফিস প্রায় জনশূন্য, মন্ত্রী আমাকে ডাকল, মন্ত্রী এই বুঝি ডাকলএই করে করে সারা দিন কিছুই খাওয়া হয়নি অভুক্ত অবস্থায় এক নাগাড়ে বসে থাকার কারণে পাকস্থলী ফেঁপে উঠেছে

আমি মন্ত্রীকে আর তুমি বলার সাহস পেলাম না

মন্ত্রীর রুমে ঢোকার সময় কালো চশমা নাক পিছলে মেঝেতে পড়ে যায় আমি চশমা তুলে নিই

মন্ত্রী বললেন, আপনি যে এমন অযোগ্য অপদার্থ আমার জানাই ছিল না, যেখানে সরকার ৩৫টি কলেজের অনুমোদন দিতে প্রস্তুত, আপনার সিন্ডিকেট তা খারিজ করে দেবে?

মন্ত্রী সিন্ডিকেট বাতিল করে দিলেন এবং ভাইস চ্যান্সেলরকে জড় বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ বললেন

রাত আরো একটু বাড়ল মন্ত্রী বললেন, কাজটা আমি করতে চাইনি কিন্তু আপনার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ, আপনাকেও সরিয়ে দিতে হচ্ছে, স্যার

স্যার শব্দটি শিক কাবাবের মাংসে শিক ঢোকানোর মতো আমার হূিপণ্ডে বিঁধে গেল

(লেখকের দ্য ভাইস চ্যান্সেলর গল্পটি সংক্ষেপে অনুসৃত)

 

অনুসৃতি: আন্দালিব রাশদী

 

টি. ডি. ভার্ক: মালয়ালম ভাষার ঔপন্যাসিক গল্পকার

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন