মঙ্গলবার | নভেম্বর ১২, ২০১৯ | ২৮ কার্তিক ১৪২৬

সম্পাদকীয়

তৃতীয় আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গে

শাহ্জাহান সরকার

বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের (কমিন্টার্ন) প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় - মার্চ, ১৯১৯ সালে আর বছর হচ্ছে তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের শততম বর্ষ লেনিনের নেতৃত্বে এটি ঘোষিত হয় মস্কোয়, রাশিয়ান কমিউনিস্ট পার্টির (বলশেভিক) অষ্টম কংগ্রেসের অল্পকাল আগে (১৮-২৩ মার্চ, ১৯১৯) একই বছরের -১০ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় বার্ন (সুইজারল্যান্ড) সম্মেলন দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হিসেবে সুবিধাবাদীরা সম্মেলনের আয়োজন করেন কার্ল কাউটস্কি এডুয়ার্ড বার্নস্টাইন বার্ন সম্মেলনে বলশেভিকবাদ রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবকে নিন্দা করার অপচেষ্টা চালান মধ্যপন্থী কার্ল ইয়ালমার ব্রান্টিং বক্তৃতা করে দেখাতে চেষ্টা করেন যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্বের ফলে সমাজতন্ত্র আসে না বার্ন সম্মেলনে দক্ষিণপন্থী সমাজতন্ত্রীরা সর্বহারা একনায়কত্বের বিরোধিতা করেন এবং বুর্জোয়া গণতন্ত্রের গুণকীর্তন করেন দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের এসব সুবিধাবাদী সমাজতন্ত্রীরা সাধারণ বা চিরস্থায়ী গণতন্ত্রের তত্ত্ব ফেরি করতেন এবং প্রলেতারিয়ান একনায়কত্বকেও সাধারণ বা চিরস্থায়ী অর্থে বর্ণনা করতেন তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের প্রথম কংগ্রেসেই লেনিন ভুল মতবাদকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন

সম্মেলনে লেনিন বুর্জোয়া গণতন্ত্র প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্ব সম্পর্কে থিসিস এবং তার একটা বিবরণী পেশ করেন লেনিন তার থিসিসের শুরুতেই গণতন্ত্র একনায়কত্বের ওপর আলোচনা কেন্দ্রীভূত করেন লেনিন ব্যাখ্যা করে দেখান যে সাধারণভাবে গণতন্ত্র সাধারণভাবে একনায়কত্বের ধারণা যারা পোষণ প্রচার করেন, তারা আস্ত একটা প্রতারণা করেন লেনিনের মতে, সভ্য পুঁজিতান্ত্রিক দেশে সাধারণভাবে গণতন্ত্র নেই; যা আছে সেটা হলো বুর্জোয়া গণতন্ত্র তার একনায়কত্ব অন্যদিকে সাধারণভাবে একনায়কত্বের সমালোচনা করে তিনি বলেন, শোষক শ্রেণীর আধিপত্য নির্যাতনের বিরুদ্ধে সর্বহারা শ্রেণীর যে প্রতিরোধ-সংগ্রাম, প্রকৃতপক্ষে সেটাই হচ্ছে প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্ব-সংক্রান্ত প্রশ্ন এভাবে লেনিন বিশুদ্ধ গণতন্ত্র পরম সমাজতন্ত্রের ধারণাকে খোলামেলা প্রকাশ করেন যদিও লেনিন প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্ব প্রসঙ্গে প্রকৃতপক্ষে শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের শাসনযন্ত্রকে তুলে ধরেন  

লেনিনের মতে, উত্পীড়িত-নির্যাতিত শ্রেণীর পক্ষে নির্যাতনকারী রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্ষমতা দখলের লড়াইটা হচ্ছে সর্বহারা একনায়কত্বের একটা কালপর্ব তাই প্রকৃত মার্ক্সবাদীরা সর্বহারার একনায়কত্ব বলতে তার একটা বিশেষ কালপর্বকে বুঝে থাকেন, অনাদিকালকে নয় তা সত্ত্বেও শ্রেণী-ঊর্ধ্ব সমাজতন্ত্রীরা তাদের মনগড়া সাধারণ একনায়কত্বের নিন্দা করেন এবং সাধারণভাবে গণতন্ত্রের গুণকীর্তন করেন লেনিন গণতন্ত্র একনায়কত্বের প্রশ্নে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক দার্শনিকভাবে গোঁড়ামিপূর্ণ সাধারণীকরণের পেটি বুর্জোয়া বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গিকে নিন্দা করেন

ছদ্ম সমাজতন্ত্রীরা সাধারণভাবে গণতন্ত্রের নামের আড়ালে বুর্জোয়া আধিপত্যের পক্ষপাতিত্ব করেন অথচ বুর্জোয়ারা উন্নত দেশগুলোয় ক্ষমতা জিতে নিয়েছিলগুচ্ছ গুচ্ছ অভ্যুত্থান আর গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এবং একনায়কত্ব দিয়ে বুর্জোয়া শ্রেণী তার প্রতিপক্ষ রাজরাজড়া, সামন্ত শাসক, দাস-মালিকদের পরাজিত করে তারা পুনঃপ্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা করলে বলপূর্বক দমন করে সবকিছুর আলোকে লেনিন মনে করেন, -জাতীয় বৈরী দ্বন্দ্ব যুদ্ধ থেকে জন্ম নিয়েছে বৈপ্লবিক পরিস্থিতি লেনিন মার্ক্সের ফ্রান্সের গৃহযুদ্ধ প্রসঙ্গে এঙ্গেলসের লেখা ভূমিকা থেকে তুলে ধরে দেখান যে সবচেয়ে গণতান্ত্রিক বুর্জোয়া প্রজাতন্ত্রও হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণীকে বুর্জোয়াদের দ্বারা দমনের জন্য, আর মেহনতি জনগণকে গুটি কয়েক পুঁজিপতি কর্তৃক দমনের জন্য বুর্জোয়া রাষ্ট্র হচ্ছে একটা যন্ত্র মাত্র

লেনিন বলেন, এখন যারা সর্বহারা একনায়কত্বের বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্রের পক্ষে ওকালতি করেন, সেই সমাজতন্ত্রীরা বুর্জোয়া বিপ্লবকালে সমাজতন্ত্রের মূল সত্যটাই তুলে ধরেন কিন্তু যখন বিপ্লবকামী প্রলেতারিয়েত মুখিয়ে এসেছে লড়াইয়ের মেজাজে উত্পীড়ন যন্ত্রটাকে বদলে দিতে এবং প্রলেতারীয় একনায়কত্ব কায়েম করতে, তখন সমাজতন্ত্রের প্রতি এসব বিশ্বাসঘাতক দৃঢ়োক্তি করেছেন এই বলে, বুর্জোয়ারা মেহনতি জনগণকে বিশুদ্ধ গণতন্ত্র দেয়ার আশ্বাস দিয়েছে, তারা (বুর্জোয়ারা) প্রতিরোধ ছেড়ে দিয়েছে; মেহনতি জনগণের কাছে বশ্যতা স্বীকারেও তারা প্রস্তুত আছে বলে প্রতারণাভরা দৃঢ়োক্তি করে বলেছেন, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় শ্রমশক্তির ওপর উত্পীড়নের জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রের মতো কোনো বস্তু নেই এবং কখনই ছিল না

লেনিন কমিউন পার্লামেনট্রি প্রতিষ্ঠানের তুলনা করে বলেন, যারা সমাজতন্ত্রী বলে জাহির করে, তারা সবাই প্যারিস কমিউন সম্পর্কে সচেতন ছিল এবং তারা ভীত ছিল কারণে যে শ্রমিকরা কমিউনের প্রতি সোৎসাহে এবং মনে-প্রাণে সহানুভূতিশীল বুর্জোয়া পার্লামেনট্রি ব্যবস্থা মধ্যযুগের সঙ্গে তুলনায় প্যারিস কমিউন হচ্ছে খুবই প্রগতিশীল সেজন্য পার্লামেন্ট মধ্যযুগীয় রীতি-নীতির সঙ্গে প্রলেতারীয় বিপ্লবের যুগে আমূল পরিবর্তন আবশ্যক মার্ক্সের মতে, কমিউন পার্লামেনট্রি প্রতিষ্ঠান ছিল না লেনিন কমিউনকে ব্যাখ্যা করে দেখান, বুর্জোয়া রাষ্ট্রের আমলাতান্ত্রিক, বিধানতান্ত্রিক, পুলিশ আর সামরিক যন্ত্রটার খোলনলচে পাল্টে ফেলে বিধানিক আর নির্বাহী ক্ষমতার বিভাজন না রেখে স্বয়ংপরিচালিত গণশ্রমিক সংগঠন তার জায়গায় স্থাপন করতে চেষ্টা করেছিল কমিউন

বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জমায়েতের স্বাধীনতা-প্রকাশনার স্বাধীনতা’— হচ্ছে বুর্জোয়া শ্রেণীর মিথ্যা প্রতিশ্রুতি শ্রমিক শ্রেণীর জন্য প্রতারণা আর বিশুদ্ধ গণতন্ত্র সমানতা হচ্ছে ভাঁওতা লেনিন দেখান, মার্ক্সবাদীরা আগাগোড়া বলে আসছেন, গণতন্ত্র যতই বেশি বিকশিত হয়, বিশুদ্ধতর হয়, ততই বেশি নগ্ন, তীব্র ক্ষমাহীন হয়ে ওঠে বুর্জোয়া শ্রেণী পরিদৃষ্ট হয় পুঁজিতান্ত্রিক উত্পীড়ন বুর্জোয়া একনায়কত্ব

সমতা-বিশুদ্ধ গণতন্ত্র প্রসঙ্গে লেনিন বলেন, এসবই হচ্ছে ভাঁওতা ফাঁকা বুলি এবং গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে ধনিক শ্রেণীর একনায়কত্ব ছাড়া অন্য কিছু নয় ১৯১৪-১৮ সালের সাম্রাজ্যবাদের মধ্যকার যুদ্ধে (ইংল্যান্ড, ফ্রান্স জারতান্ত্রিক রাশিয়া বনাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইতালি প্রভৃতি দেশ) সবচেয়ে মুক্ত প্রজাতন্ত্রগুলোয়ও বুর্জোয়া গণতন্ত্রের স্বরূপ হলো বুর্জোয়া একনায়কত্ব জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য কার্ল লিবক্লেখট সদস্যা রোজা লুক্সেমবুর্গকে জার্মানি শাসকগোষ্ঠী ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করে বুর্জোয়া একনায়কত্বের চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটায়ওই দুজন বামপন্থী মতাবলম্বী হওয়ায়

লেনিন ধনিক শ্রেণীর রাষ্ট্রের -জাতীয় গণতন্ত্রকে পুরনো সাময়িককালের ঘোষণা করে বলেন, যে শ্রেণীটার রাজনৈতিক আধিপত্য খোয়া যেতে থাকে, সেটার প্রতিরোধ বলপূর্বক দমন করার প্রয়োজন থেকে একনায়কত্বের প্রয়োজন দেখা দেয় সেদিক থেকে একনায়কত্ব হচ্ছে আপেক্ষিক এবং কোনো সাধারণ নিয়ম নয় কারণ সাম্যবাদী সমাজে কোনো প্রকার একনায়কত্ব প্রয়োজন হবে না তবে বুর্জোয়া একনায়কত্বকে ধ্বংস করা এবং মানবজাতির সবচেয়ে নিরাপদ সমাজ সাম্যবাদী সমাজে অবতীর্ণ হওয়ার স্বার্থে প্রলেতারিয়ান একনায়কত্ব একটি জরুরি প্রশ্ন তবে মধ্যযুগের ভূস্বামীদের একনায়কত্ব আর সব সভ্য পুঁজিতান্ত্রিক দেশে বুর্জোয়া একনায়কত্বের সঙ্গে প্রলেতারিয়ান একনায়কত্বের মৌলিক পার্থক্য হলো, জনসমষ্টির বিপুল সংখ্যাগুরু অংশের মেহনতি জনগণের ওপর বলপূর্বক দমন আর নির্যাতন হলো বুর্জোয়া একনায়কত্ব অন্যদিকে জনসমষ্টির নগণ্য সংখ্যালঘু ভূস্বামী এবং পুঁজিপতিদের শোষণ-লুণ্ঠন নির্যাতনের ওপর বলপূর্বক দমন হলো প্রলেতারিয়ান একনায়কত্ব

তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের প্রথম কংগ্রেসের রিপোর্টে লেনিন আরো উল্লেখ করেন, ...দেখা যাচ্ছে, সভ্য দুনিয়ার সর্বত্র বলশেভিকদের নির্বাসন দেয়া হচ্ছে, নির্যাতন করা হচ্ছে, জেলে পোরা হচ্ছে এমনকি বুর্জোয়া প্রজাতন্ত্র সুইজারল্যান্ডে আর আমেরিকায় বলশেভিকদের ওপর হামলা হয়েছে সাধারণ গণতন্ত্র কিংবা বিশুদ্ধ গণতন্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে এটা বাস্তবিকই হাস্যকর যে আপাদমস্তক অস্ত্রসজ্জিত বিভিন্ন উন্নত সভ্য গণতান্ত্রিক দেশ অনগ্রসর দুর্ভিক্ষক্লিষ্ট ছারখার হয়ে যাওয়া রাশিয়া থেকে আসা অল্প কয়েক কুড়ি মানুষের উপস্থিতিতে ভয় পাচ্ছে; ...এই নিদারুণ অসংগতি বস্তুত বুর্জোয়া একনায়কত্বকে প্রতিফলিত করছে

তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের কার্যকাল ছিল ১৯১৯ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত বিশ্বপরিস্থিতি পরিবর্তিত হওয়ায় সমাজতান্ত্রিক কেন্দ্র থেকে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া স্ট্যালিনের পক্ষে সম্ভব না হওয়ায় সব কমিউনিস্ট পার্টির সম্মতি অনুসারে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের নির্বাহী কমিটির সভাপতিমণ্ডলী সংগঠন ভেঙে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন ১৯৪৩ সালে তারপর আর শক্তিশালী কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক গড়ে না ওঠায় বিশ্বব্যাপী কমিউনিস্ট আন্দোলন স্ট্যালিনের মৃত্যুর ফলে (১৯৫৩) দিক্ভ্রান্ত হয়ে পড়ে যদিও ১৯৪৯ সালে মাও সে তুংয়ের নেতৃত্বে চীনে সফল কমিউনিস্ট বিপ্লব এবং ৬৬ সালে সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ফলে চীনের বিপ্লব প্রকৃত বিশ্ববিপ্লবীদের প্রেরণার উেস পরিণত হয়

১৯৫৬ সালে ক্রুশ্চভের নেতৃত্বে সোভিয়েত রাশিয়ায় কমিউনিস্ট পার্টির ২০তম কংগ্রেসে সাম্রাজ্যবাদ সব প্রকার উপনিবেশবাদের তত্ত্বকে উপেক্ষা করে দেশে দেশে শান্তিপূর্ণ বিপ্লবের লাইন রফতানি ফেরি করা শুরু করে এভাবে কমিউনিস্ট কেন্দ্র বিভক্ত হয়ে পড়ে সংগত কারণেই মাও চীনা পার্টির ওপর নতুন কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের দায়িত্ব প্রধানভাবে বর্তালেও চীনা পার্টি তা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয় তা সত্ত্বেও চীনা পার্টিই বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের ভারকেন্দ্রে পরিণত হতে থাকে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়ার পক্ষে এক কেন্দ্র থেকে যেমন বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলন পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল, সমাজতান্ত্রিক চীনও তেমনি অভ্যন্তরীণ বহিরাগত সাম্রাজ্যবাদী শক্তির চাপ মোকবেলায় ব্যস্ত থাকায় সম্ভবত এক কেন্দ্র থেকে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক পুনর্গঠন করা বা গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি

কেউ কেউ বলেন, তৃতীয় আন্তর্জাতিকের পরে মাও নতুন আন্তর্জাতিক গঠনে আগ্রহ দেখাননি কাজেই আন্তর্জাতিকের প্রয়োজন নেই এটা মাওয়ের ওপর একটা অমার্ক্সবাদী দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দেয়ার শামিল এটা অতি মাও প্রীতির আড়ালে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদকে বিরোধিতার কূটকৌশলও বটে এটা প্রকৃত বিপ্লবীদের আন্তর্জাতিককে সুবিধাবাদী ট্রটস্কিপন্থীদের হাতে হাতছাড়া করার শামিল; যে ট্রটস্কিপন্থীরা কমরেড স্ট্যালিনকে আন্তর্জাতিক ভাঙার অজুহাতে একতরফা মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে হিটলারের জার্মানি-নািস বাহিনীর ষড়যন্ত্রের মুখে এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ফ্যাসিবাদবিরোধী ফ্রন্ট গঠনের লক্ষ্যে স্ট্যালিন সব সদস্য সংগঠনের যৌথ সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তৃতীয় আন্তর্জাতিক ভেঙে দিয়েছিলেন এবং বিশ্বের বিপ্লবী পার্টিগুলোকে নিজ নিজ দেশে বিপ্লব অব্যাহত রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন

আশার বিষয়, বিশ্বের মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী বিপ্লবীরা রেভলুশনারি ইন্টারন্যাশনালিস্ট মুভমেন্ট-(রিম) নামে আশির দশকে নতুন আন্তর্জাতিকের ভিত্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন কিন্তু বিশ শতকের শেষের দশকে পেরুর বিপ্লব সংকটে পড়লে এবং একুশ শতকের প্রথম দশকে নেপালের বিপ্লব ভুল পথ গ্রহণ করলে রিমের কার্যক্রম শিথিল বিভেদাত্মক হয়ে পড়ে অন্যদিকে রিমের সংগঠক-সদস্য আমেরিকার বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান বব এভাকিয়ান নিউ সিনথিসিস নামে তার তত্ত্বের পরমত্ব দাবি করলে এবং প্রলেতারিয়ান একনায়কত্বকে বুর্জোয়া বিজ্ঞানে পর্যবসিত করে শ্রেণীসংগ্রামকে শিথিল করলে রিমের (নবগঠিত আন্তর্জাতিকের) নবীন পার্টিগুলোকে বিভ্রান্তির মুখে ঠেলে দিয়ে নয়া কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক আন্দোলনে চরম বিভ্রান্তি ডেকে আনেন এভাবে বিশ্ববিপ্লব সাময়িক ক্ষতির মুখে পড়লেও সবকিছু অতিক্রম করে বিশ্বব্যাপী মাওবাদী কমিউনিস্ট আন্দোলন নতুন আন্তর্জাতিক গড়ার তাগিদ বোধ করছে তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের শততম বর্ষে একে নতুনভাবে রূপদানের প্রত্যয়ে জাগিয়ে তুলতে পারলে বিশ্বব্যাপী কমিউনিস্ট আন্দোলন দুনিয়া বদলের নতুন আশা জাগিয়ে তুলতে পারবে বলে সন্দেহ নেই

 

শাহ্জাহান সরকার: রাজনৈতিক কর্মী গবেষক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন