মঙ্গলবার | নভেম্বর ১২, ২০১৯ | ২৮ কার্তিক ১৪২৬

সম্পাদকীয়

স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজনের তুলনায় এখনো অপ্রতুল

অবকাঠামো সুবিধা ও চিকিৎসা পেশাজীবী বাড়াতে হবে

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের মৌলিক চাহিদা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী এক হাজার মানুষের জন্য নিবন্ধিত চিকিৎসক থাকার কথা একজন, আর আমাদের প্রতি হাজার ৮৭১ জনের বিপরীতে আছেন একজন একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্স থাকার নিয়ম থাকলেও আছে প্রতি দুজন চিকিৎসকের বিপরীতে একজন হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা রোগীর অনুপাতেও পিছিয়ে আমরা বৈশ্বিক প্রায় সব মানদণ্ডে পিছিয়ে আমাদের স্বাস্থ্য খাত আর্থিক বাধা সবচেয়ে বড় আমাদের স্বাস্থ্যসেবার জন্য যদিও আমরা জানি, মাথাপিছু ২৭ ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে স্বাস্থ্য খাতে, তবুও ৬৪ শতাংশ টাকা আসে মানুষের পকেট থেকে আমাদের দেশকে সংক্রামক ব্যাধি পিছিয়ে দিচ্ছে এবং অসংক্রামক ব্যাধিগুলো খুব দ্রুত চলে আসছে সন্দেহ নেই, আমাদের দেশের সরকার সবার জন্য স্বাস্থ্য বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে দেখছে সরকার এরই মধ্যে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবার রোডম্যাপ করে ফেলেছে সরকারের একটি রোডম্যাপ থাকলেও এনজিও, প্রশাসনিক গবেষণা উপদেষ্টা সংস্থার সহযোগিতা প্রয়োজন কানাডার মডেলের মতো নার্সরা চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকলে ভালো হতো দেশে নার্সিং শিক্ষা সমাপ্ত করেও নার্স কেবল যন্ত্রচালিতের মতো কাজ করেন স্বল্পসংখ্যক নার্সের পক্ষে অধিক মানুষের সেবা দেয়া সম্ভব নয়

ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ বা বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসেবা হলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক নির্ধারিত সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার অঙ্গীকার পরিকল্পনা সংজ্ঞায় বলা আছে, এটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিশ্বের প্রতিটি মানুষ তার প্রয়োজনীয় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা বহনযোগ্য যৌক্তিক খরচে পেতে পারবে এজন্য বাংলাদেশসহ বিশ্বের বেশির ভাগ দেশই বর্তমানে ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজের আওতায় যার যার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে অবকাঠামো জনশক্তির মধ্যে ভারসাম্যহীনতা একটা বড় সমস্যা উপজেলায় ১৫০ শয্যার হাসপাতাল করা হলেও জনশক্তি ৫০ শয্যার রয়ে গেছে অর্থাৎ অবকাঠামো বাড়ানো হলেও জনশক্তি বাড়ানো হয়নি এতে আমরা দেখাতে পারছি হাসপাতাল হয়েছে কিন্তু সেখানে সেবা পাওয়া যাচ্ছে না আবার এমনও দেখা যাচ্ছে, হয়তো কোনো হাসপাতালে অনেক বিশেষজ্ঞ আছেন কিন্তু নার্স নেই সাপোর্ট ফোর্স নেই এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম দুর্বলতা আমাদের শহরগুলোয় স্বাস্থ্য অবকাঠামো তুলনামূলকভাবে অনুপস্থিত আমাদের রেফারেল সিস্টেম কাজ করছে না

স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে অতি মুনাফাভিত্তিক বাণিজ্যিকীকরণ হচ্ছে এর কারণে মানের প্রশ্নও বড় হয়ে উঠছে সুস্থ সেবা দেয়ার মাধ্যমে যৌক্তিক মুনাফা অর্জনের যে বাণিজ্যিকীকরণ, সেটি ভালো কিন্তু অতি মুনাফার লক্ষ্যে বাণিজ্য চালানো বন্ধ করা দরকার অতি মুনাফার বাণিজ্যিকীকরণে সঠিক সময় ধরে রোগীকে দেখা হচ্ছে না অপ্রয়োজনীয় ওষুধ টেস্ট দিয়ে বাহুল্য খরচের দিকে জনগণকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে এখান থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে হবে আমাদের ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিতে দুর্বলতা রয়েছে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের স্বাস্থ্য বাজেট বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেই বর্তমান বাজেটের সর্বোচ্চ ব্যবহার কাম্য এর যথাযথ ব্যবহারের পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া আমাদের বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখতে হবে

স্বাস্থ্য অবকাঠামো তুলনামূলক ভালো হওয়া সত্ত্বেও দেশের সব মানুষের জন্য এখনো মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে পারেনি সরকার বেসরকারি হাসপাতালের উচ্চ চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে চিকিৎসাসেবা নিতে পারছে না সাধারণ মানুষ অন্যদিকে জটিল দীর্ঘমেয়াদি রোগের বিনা মূল্যে চিকিৎসাপ্রাপ্তিতে নানামুখী সংকট রয়েছে সরকারি হাসপাতালে কারণে মোট জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ স্বাস্থ্য সুরক্ষার বাইরে রয়েছে অবস্থায় দরিদ্র থেকে বিত্তবান সব শ্রেণী-পেশার মানুষের জন্য ন্যূনতম মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্থাৎ ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ নিশ্চিত করতে হবে স্বাস্থ্যসেবার মূল জায়গা সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা একে সচল রাখতে হবে

স্বাস্থ্য খাতে আমাদের অগ্রগতি আছে কিন্তু আত্মতৃপ্তির সুযোগ নেই ভবিষ্যতের করণীয় ঠিক করার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ সবার কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে হলে প্রত্যেক নাগরিকের জীবনমানের উন্নয়নও জরুরি যেখানে ২২ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে, সেখানে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো অলীক কল্পনাই বটে সরকারি পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার জন্য যে জনবল অবকাঠামো আছে, সেটি প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যয় এত বেশি যে সাধারণ মানুষের পক্ষে তা বহন করা সম্ভব নয় ফলে সরকারি হাসপাতালগুলোয় রোগীদের অতিরিক্ত ভিড় লক্ষ করা যায় অবস্থায় অবকাঠামোগত সুবিধার পাশাপাশি চিকিৎসক নার্সের সংখ্যাও বাড়াতে হবে গেল শতকের শেষ দিকে ২০০০ সালের মধ্যে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা স্লোগানটি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল এরপর সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায়ও স্বাস্থ্য খাতের প্রতি জোর দেয়া হয়েছে বর্তমান টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিশ্চিত এবং সব বয়সের সবার কল্যাণে কাজ করার যে প্রত্যয় রয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে হলে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন