মঙ্গলবার | নভেম্বর ১২, ২০১৯ | ২৮ কার্তিক ১৪২৬

প্রথম পাতা

স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজনের তুলনায় এখনো অপ্রতুল

সুমন আফসার

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য নিবন্ধিত চিকিৎসক থাকার কথা একজন। অথচ বাংলাদেশে প্রতি হাজার ৮৭১ জন মানুষের বিপরীতে চিকিৎসক রয়েছেন একজন। প্রশ্ন আছে চিকিৎসকের মান নিয়েও। এছাড়া প্রতি একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্স থাকার নিয়ম রয়েছে। বাংলাদেশে প্রতি দুজন চিকিৎসকের বিপরীতে নার্স আছেন একজন। সংকট আছে রোগী অনুপাতে হাসপাতালে শয্যা সংখ্যারও। বৈশ্বিক মানদণ্ডে পিছিয়ে থাকলেও দ্রুত বড় হচ্ছে দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাত।

ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা খাতের আকার ছিল ৩২০ কোটি ডলারের। ওই সময় থেকে খাতে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। ২০১৭ সাল পর্যন্ত খাতটিতে বার্ষিক যৌগিক প্রবৃদ্ধির হার (সিএজিআর) দশমিক ১৩ শতাংশ। প্রবৃদ্ধির ধারা বিবেচনায় নিয়ে আগামী ২০২৩ সাল নাগাদ শুধু স্বাস্থ্যসেবা খাতের আকার ৯০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে।

ওষুধ শিল্প মেডিকেল ট্যুরিজমকে বাইরে রেখেই হিসাব প্রাক্কলন করা হয়েছে। গবেষণার তথ্য বলছে, ৬০ শতাংশের বেশি পরিবার চিকিৎসাসেবা নিচ্ছে বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে। এতে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় ছয় গুণ বেশি ব্যয় হলেও বেসরকারি খাতে স্বাস্থ্যসেবা ক্রমেই বড় হচ্ছে।

কম্প্রিহেনসিভ প্রাইভেট সেক্টর অ্যাসেসমেন্ট (সিপিএসএ) শীর্ষক ইউএসএআইডির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মূলত নব্বইয়ের দশকের পর থেকে দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়তে শুরু করে। চিকিৎসাসেবা, হাসপাতাল, চিকিৎসক, বিশেষায়িত হাসপাতাল ক্লিনিক, নার্সিং হোম, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, প্যাথলজি ল্যাবরেটরি, ওয়েলনেস সেন্টার সেবাদায়ীদের জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্রএসব ক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগ হয়েছে।

সর্বশেষ হেলথ বুলেটিনের তথ্যমতে, ২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে সরকারি হাসপাতালগুলোর শয্যাসংখ্যা বেড়েছে মাত্র ২৫ শতাংশ। অথচ বেসরকারি খাতে একই সময় শয্যা বেড়েছে চার গুণ। ২০১১ সালে সরকারি হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা ছিল ৩৯ হাজার, যা ২০১৭ সাল নাগাদ দাঁড়ায় ৪৯ হাজারে। আর বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় ২০১১ সালে শয্যা সংখ্যা ছিল ৪২ হাজার। ২০১৭ সালে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৮ হাজারে। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য হাসপাতালে শয্যা রয়েছে দশমিক ৫৬টি। যদিও এটির বৈশ্বিক গড় ২৭।

শুধু অবকাঠামোগত সুবিধাই নয়, চিকিৎসা পেশাজীবীরও চরম সংকট রয়েছে বাংলাদেশে। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (এসডিজি) মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য চিকিৎসক, নার্স ধাত্রীর অনুপাত ধরা হয়েছে ৪৪ দশমিক ৫। তবে বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজারে এসব পেশাজীবীর অনুপাত এখনো মাত্র দশমিক ৪। নার্সের সংখ্যা বিবেচনায় নিলে এটি আরো উদ্বেগজনক। বাংলাদেশে প্রতি দুজন নিবন্ধিত চিকিৎসকের বিপরীতে নার্স রয়েছেন একজন। অথচ ডব্লিউএইচওর সুপারিশ অনুযায়ী একজন নিবন্ধিত চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন প্রশিক্ষিত নার্স থাকার কথা।

তথ্য অনুযায়ী, লাখ ৪৫ হাজার ৫৩৩ জন প্রয়োজনের তুলনায় বর্তমানে বাংলাদেশে নিবন্ধিত চিকিৎসক রয়েছেন ৮৫ হাজার ৫৩৩ জন। ২০০৭ সালের তুলনায় সংখ্যা তিন গুণ বেশি। একই সময়ে নার্সের সংখ্যা বেড়েছে আড়াই গুণ। বর্তমানে দেশে নার্স রয়েছেন ৫৪ হাজার ৪৪৯ জন। যদিও ডব্লিউএইচওর মানদণ্ড অনুযায়ী, নার্স প্রয়োজন লাখ ৩৪ হাজার ৫৬৯ জন। চিকিৎসাসেবা-সংশ্লিষ্ট শিক্ষার মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিয়েই ধরনের উদ্বেগ বেশি।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির সুযোগ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। খাতের সবগুলো সূচকেই এগিয়েছি আমরা। বিশেষ করে সেবাপ্রাপ্তির বিষয়টিতে গত এক দশকে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। তবে সেবার মান হয়তো সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এক্ষেত্রেও অগ্রগতি অর্জনের জন্য সব ধরনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

জনবল চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটে চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার এমন চিত্র দেখা গেছে দেশের উত্তরাঞ্চলের অন্যতম জেলা দিনাজপুরের সরকারি হাসপাতালগুলোয়। দিনাজপুর জেনারেল হাসপাতাল ১২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই এমন অবস্থা রয়েছে। জেলার ৫০ শয্যার হাকিমপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক থাকার কথা ১৩ জন। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র চারজন।

জানা গেছে, দিনাজপুর জেনারেল হাসপাতাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয় বর্তমানে দেড় শতাধিক চিকিৎসকের প্রয়োজন। অথচ এর বিপরীতে চিকিৎসক কর্মরত রয়েছেন ৬৫ জনের মতো। ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট দিনাজপুর জেনারেল হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ৫৮ জন চিকিৎসকের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২৫ জন। চারজনের স্থলে অ্যানেস্থেসিস্ট রয়েছেন একজন।

চিকিৎসক সংকটের কারণে সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে উল্লেখ করে দিনাজপুরের সিভিল সার্জন আব্দুল কুদ্দুছ বলেন, ১২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪০ জন চিকিৎসক রয়েছেন। যদিও শতাধিক চিকিৎসক প্রয়োজন এসব চিকিৎসা সেবাকেন্দ্রে। কোনো কোনো হাসপাতাল পরিচালনা করতে হচ্ছে মাত্র দুজন চিকিৎসক দিয়ে। সংকটের বিষয়ে এরই মধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করছি, দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে।

রোগীপ্রতি শয্যার হার প্রকাশ করা হয় বেড অকুপেন্সি রেশিওর মাধ্যমে। সর্বশেষ হেলথ বুলেটিনের তথ্যমতে, সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোর বেড অকুপেন্সির গড় হার ১৫৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ। তবে হাসপাতালভেদে হারে কম-বেশি আছে। হাজার ৩১৩ শয্যার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হার ১৯০ দশমিক , ৫০০ শয্যার খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৬২ দশমিক , এক হাজার শয্যার বরিশালের শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৫৯ দশমিক , ৫০০ শয্যার কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৫৬ দশমিক , সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৫৬ দশমিক এবং ৬০০ শয্যার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৫১ শতাংশ। এছাড়া হাজার ২০০ শয্যাবিশিষ্ট রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বেড অকুপেন্সির হার ১৪৫ দশমিক , ৮৫০ শয্যার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৩২ দশমিক , ৫০০ শয্যার ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১১৪ দশমিক , ৫০০ শয্যার দিনাজপুরের এম আবদুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১১২ দশমিক এবং ২১৪ শয্যার গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বেড অকুপেন্সির হার ১০৫ দশমিক শতাংশ।

 

প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন বণিক বার্তার দিনাজপুর হিলি প্রতিনিধি

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন