বুধবার | নভেম্বর ২০, ২০১৯ | ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সম্পাদকীয়

বাড়ছে বায়ুদূষণের মাত্রা

প্রতিরোধে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে

অব্যাহতভাবে অবনতিশীল বায়ুমান বাংলাদেশে অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যার কারণ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। দূষিত বাতাসে প্রতি বছর প্রাণহানি ঘটছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের। সম্প্রতি প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট (এইচইআই) ও দি ইনস্টিটিউট ফর হেলথ ম্যাট্রিক্স অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশনের (আইএইচএমই) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে মৃত্যুর তৃতীয় সর্বোচ্চ কারণ বায়ুদূষণ। উল্লেখ করা দরকার, বাতাসে থাকা মানবদেহের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর উপাদান হলো পিএম২.৫ তথা অতি সূক্ষ্মকণা। এর উচ্চতর উপস্থিতি মানে বায়ুর মান খারাপ এবং তা জীবননাশের অনুঘটক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পিএম২.৫-এর সহনীয় মাত্রা যেখানে ১০ মাইক্রোগ্রাম, বাংলাদেশের প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পিএম২.৫-এর পরিমাণ সেখানে ৬১ মাইক্রোগ্রাম। সেই বিবেচনায় দেশে বায়ুদূষণের ভয়াবহতা এবং সে কারণে মৃত্যুঝুঁকি কতটা প্রকটতর, তা সহজেই অনুমেয়। ঋতুর পালাবদলে দেশে ঘনিয়ে আসছে শীত তথা শুষ্ক মৌসুম। বায়ুদূষণের প্রকোপ বেশি বাড়ে এ মৌসুমে। কর্তৃপক্ষের শিথিলতা অব্যাহত থাকলে বায়ুর মান আরো উদ্বেগজনক মাত্রায় উন্নীত হবে। কাজেই এ সময়ে বাড়তি সক্রিয়তার পাশাপাশি বায়ুর মান উন্নয়নে বছরব্যাপী দূষণ প্রতিরোধী কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। এক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের নজরদারি বাড়ানো এবং কার্যকর দৃশ্যমান উদ্যোগ প্রত্যাশিত।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উঠে আসা তথ্য বলছে, প্রতিবেশী ভারতের বিভিন্ন শহর বিশেষত দিল্লিতে বর্তমানে বায়ুদূষণ সংকটজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। দিল্লির নগর কর্তৃপক্ষ এটিকে জরুরি স্বাস্থ্য সমস্যা ঘোষণা করেছে। সুনির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে। ঢাকার অবস্থাও দিল্লি থেকে খুব একটা ভিন্নতর নয়। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের পুরো জনগোষ্ঠীই বায়ুদূষণের মধ্যে আছে। এর মধ্যেও বেশি ঝুঁকিতে আছে ঢাকার বাসিন্দারা। আন্তর্জাতিক জরিপে বায়ুদূষণের মাত্রার দিক থেকে প্রায় সময় উপরের সারিতে থাকছে ঢাকা। এ চিত্র বদলাতে হবে। এখানে বায়ুদূষণের কারণ অজানা নয়। মোটা দাগে অপরিকল্পিত শিল্প, যানবাহনের কালো ধোঁয়া, ইটভাটা এবং যেখানে-সেখানে নির্মাণকাজের ধুলাই এর কারণ। ঢাকার আশপাশসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যেখানে-সেখানে গড়ে উঠেছে ইটভাটা। এসব ইটভাটা বায়ুদূষণের জন্য বিপুলাংশেই দায়ী। কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই ফসলি জমি ও আবাসিক এলাকায় গড়ে তোলা হচ্ছে এসব ইটভাটা। ইটভাটাগুলোয় বেআইনিভাবে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। ফলে দূষিত হচ্ছে বায়ু। ছাড়পত্রবিহীন এসব ইটভাটা নিয়ন্ত্রণে সরকারের সেই অর্থে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেই। মাঝে পরিবেশবান্ধব ইট তৈরি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, সনাতন পদ্ধতির ইটভাটাগুলোকে জ্বালানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব ইটভাটায় রূপান্তর করা গেলে অনেকাংশে দূষণ কমানো সম্ভব। কাজেই পরিবেশবান্ধব ইটভাটা নির্মাণ উৎসাহিত করতে সরকারি প্রণোদনা ঘোষণা করা যেতে পারে।

এদিকে বায়ুদূষণের কারণগুলোর মধ্যে ইটভাটার পরই রয়েছে ধুলাবালি। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ভবন। কিন্তু এসব স্থাপনা নির্মাণের সময় মানা হচ্ছে না ইমারত নির্মাণ বিধি। ভবন তৈরির সময় সেগুলো কোনো কিছু দিয়ে ঢেকে দেয়া বা পানি ছিটিয়ে কাজ করার নির্দেশনা থাকলেও তা যথাযথ মানা হয় না। এসব তদারকের কার্যকরী ব্যবস্থার অভাবও লক্ষণীয়। ফলে ধুলা উড়ছে বাতাসে। দূষিত হচ্ছে বায়ু। এছাড়া ফুটপাতের উন্নয়ন, সড়ক সংস্কার, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার জন্য খোঁড়াখুঁড়ি সবসময়ই চলছে। এসব উন্নয়ন প্রত্যাশিত হলেও দেখা যায় কোনো কাজই নির্ধারিত সময়ে শেষ হয় না। ফলে বায়ু দূষিত হচ্ছে। ঢাকা শহরসহ অন্যান্য বড় শহরে অনেক সময় দেখা যায়, ড্রেনের ময়লাগুলো রাস্তার পাশে জমিয়ে রাখা হয়। একসময় এগুলো শুকিয়ে ধূলিকণায় পরিণত হয় এবং পরিবেশ দূষিত করে। আবার সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়িগুলো ময়লা বহনের সময় অধিকাংশ সময় না ঢেকেই বহন করে, ফলে বায়ুদূষণ হয়। সর্বোপরি রয়েছে যানবাহন থেকে কালো ধোঁয়া নির্গমন। সব মিলিয়ে বাতাসে উপস্থিতি বাড়ছে জীবনধ্বংসী অতিসূক্ষ্ম বস্তুকণার এবং সেটিই বাড়াচ্ছে মৃত্যুঝুঁকি।

দূষণ রোধে দেশে আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নেই। বায়ুদূষণের কারণ প্রতিরোধ করতে হলে সংশ্লিষ্ট আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। জনগণকে সম্পৃক্ত করে বিশেষজ্ঞদের সুপারিশমালা বাস্তবায়ন করতে পারলে বায়ুদূষণ হ্রাস করা কঠিন নয়। এজন্য অবশ্য ব্যাপক প্রচারণা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। আবার শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না, বায়ুদূষণ রোধে সবুজায়নে অত্যধিক জোর দিতে হবে। মানুষের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডে দেশে বনাঞ্চল ক্রমাগত কমছে। এ অবস্থা দীর্ঘতর হলে বায়ু তথা পরিবেশ দূষণ আরো বাড়বে বৈকি। সুতরাং বৃক্ষরোপণ বৃদ্ধি করে সবুজায়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার বিকল্প নেই।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন