বুধবার | নভেম্বর ২০, ২০১৯ | ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

শেষ পাতা

জাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সংহতি সমাবেশ

বন্ধের ঘোষণা প্রত্যাখ্যান উপাচার্যের অপসারণ দাবি

বণিক বার্তা প্রতিনিধি জাবি

আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার পর গত মঙ্গলবার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের যে ঘোষণা সিন্ডিকেট সভা থেকে দেয়া হয়েছে, তা প্রত্যাখ্যান করেছেন উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। উপাচার্য অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। গতকাল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল সংহতি সমাবেশ থেকে ঘোষণা দেন তারা।

সংহতি সমাবেশে অংশ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারের নিয়োগকৃত ভিসি সরকারি ছাত্রসংগঠনের মাধ্যমে দুর্নীতি প্রকাশিত হয়েছে। এতদিন ধরে আন্দোলন চলে, অথচ সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি; তদন্ত কমিটি গঠন করেনি। আমাদের দাবি থাকবে আজকের মধ্যেই সমস্যা সমাধানে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে।

তিনি আরো বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এখন আর একাডেমিক গঠনতন্ত্র মেনে চলা হয় না। উপাচার্য নিয়োগ প্রক্রিয়া এখন সম্পূর্ণ সরকারের নিয়ন্ত্রণে। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, ছাত্রলীগ, সরকারি দলের রিপোর্টের ভিত্তিতে উপাচার্য নিয়োগ হয়ে থাকে। ভিসি নিয়োগ প্রাক্রিয়ায় সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বাঁচানো যাবে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান আন্দোলনের জন্য উপাচার্যকে দায়ী করে আনু মুহাম্মদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে হলে যাদের দ্বারা শিক্ষার্থী নির্যাতন চলে, তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ভিসি টিকে থাকতে চাচ্ছেন। ভিসির বিরুদ্ধে যে অপরিকল্পনা, অস্বচ্ছতা দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা না নিয়ে তিনি নিজেই আন্দোলনকে ভিসি পরিবর্তনের আন্দোলনে পরিণত করেছেন। উপাচার্যকে অপসারণের পাশাপাশি দুর্নীতির তদন্তসাপেক্ষে জড়িতদের যথাযথ বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।

এর আগে বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কলা ভবনসংলগ্ন মুরাদ চত্বর থেকে আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একটি বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। বিক্ষোভ মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রীতিলতা হলের অবরুদ্ধ থাকা নারী শিক্ষার্থীদের বের করে আনে। পরে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে মিছিলটি পুরনো রেজিস্ট্রার ভবনের সামনে গিয়ে মিলিত হয়। পরবর্তী সময়ে রেজিস্ট্রার ভবনের সামনে শতাধিক শিক্ষক পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে সংহতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সময় উপাচার্যপন্থী বলে পরিচিত অনেক শিক্ষককেও আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করতে দেখা যায়।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর ব্যানারে আয়োজিত সংহতি সমাবেশ থেকে শিক্ষকরা বলেন, উপাচার্য তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করতে ভয় পান। তিনি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কোনো দাবির প্রতি কর্ণপাত করেননি। অবশেষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা যখন তাকে অপসারণের দাবিতে তার বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়েছেন, তখন ছাত্রলীগকে ব্যবহার করে তিনি আন্দোলনকারীদের মারধর করেছেন। অবস্থার পর অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে থাকতে পারেন না। তিনি শিক্ষক হিসেবে পাঠদান করারও নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন।

সংহতি সমাবেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর তপন কুমার সাহা বলেন, চার বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের দায়িত্ব পালন করেছি, কখনো বিশেষ ছাত্রসংগঠনকে নামানোর প্রয়োজন হয়নি! এখন কেন হলো?

তিনি বলেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা লাঞ্ছিত হওয়ার পর উপাচার্য এটিকে গণঅভ্যুত্থান বলেছেন। এটি আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষকদের জন্য দুর্ভাগ্য। জাহাঙ্গীরনগরকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমার-আপনার সবার। অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের বিরুদ্ধে শুধু তদন্ত নয়, বরং তাকে রাষ্ট্রীয় আইনে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।

সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি আশিকুর রহমান বলেন, গতকাল শিক্ষার্থীরা যাতে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে না পারে, সেজন্য হল তালা মেরে বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। আমরা আচরণের তীব্র নিন্দা জানাই। জাহাঙ্গীরনগরের ইতিহাস অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার ইতিহাস। অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে স্বপদে থাকতে পারবেন না।

সংহতি সমাবেশে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক তানজীম উদ্দিন খান, অধ্যাপক রায়হান রাইন, অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস, অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানা, অধ্যাপক কামরুল আহসান, অধ্যাপক আনোয়ারুল্লাহ ভুঁইয়া, অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক, অধ্যাপক খবির উদ্দিন, অধ্যাপক কবিরুল বাশার, অধ্যাপক শরমিন্দ নীলোর্মি, প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফারুক ওয়াসিফ, ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক অনিক রায়, ছাত্রফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন প্রিন্সসহ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা।

হল ত্যাগের নির্দেশ: এদিকে আন্দোলন দমাতে শিক্ষার্থীদের গতকাল বেলা সাড়ে ৩টার মধ্যে হল ছাড়ার বিষয়ে কঠোর নির্দেশ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এই সময়ের মধ্যে হল না ছাড়লে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দেয়া হয়। গতকাল বেলা ২টার দিকে হল প্রভোস্ট কমিটির বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি অধ্যাপক বশির আহমেদ তথ্য জানান। প্রভোস্ট কমিটির ওই বৈঠকে হল হলসংলগ্ন সব খাবারের দোকান পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন হলের প্রভোস্ট আবাসিক শিক্ষার্থীদের রুমে রুমে গিয়ে হল ছাড়ার জন্য হুমকি দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। প্রীতিলতা হলের প্রভোস্টের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের বাড়ি ফোন দিয়ে অভিভাবকদের মাধ্যমে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ দিয়ে হলে হলে তল্লাশি হবে, এমন ঘোষণায় অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে আতঙ্ক দেখা গেছে। প্রশাসনের হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করে এখনো হলে অবস্থান করছেন অনেক শিক্ষার্থী। বেশ কয়েকটি হল ঘুরে শিক্ষার্থীদের দেখা গেছে। আন্দোলনকারীরা হল ত্যাগ না করার বিষয়ে অনড় রয়েছেন।

মিছিল সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে বিজ্ঞপ্তি: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সব ধরনের সভা-সমাবেশ, মিছিল কিংবা কোনো অফিস বা আবাসিক এলাকায় শিক্ষার্থীদের অবস্থানে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। গতকাল রাত ৮টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ অফিসের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক সালাম সাকলাইন স্বাক্ষরিত এক অফিস বিজ্ঞপ্তিতে তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাইরে এবং ভেতরে অবস্থানরত কোনো শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে সভা-সমাবেশ, মিছিল করতে পারবেন না। এছাড়া কোনো অফিস বা আবাসিক এলাকায় অবস্থান করতে পারবেন না।

এদিকে সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলনকারীরা উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান করছেন। উপাচার্যের নিরাপত্তায় তার বাসভবনের সামনে শতাধিক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলায় তারা প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা রেজাউল হক।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন