বুধবার | নভেম্বর ২০, ২০১৯ | ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

সম্পাদকীয়

আঞ্চলিক সহযোগিতাই অর্থনৈতিক উন্নয়নের সোপান

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

দক্ষিণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ওআইসি সদস্যভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে আঞ্চলিক সহযোগিতার গুরুত্ব সুযোগ নিয়ে সম্প্রতি ঢাকায় মালয়েশিয়াভিত্তিক ওয়ার্ল্ড ইসলামিক ইকোনমিক ফাউন্ডেশন (ডব্লিউআইইএফ) এবং বাংলাদেশের সাউথ অ্যান্ড সাউথ ইস্ট এশিয়ান কো-অপারেশন (সিয়াকো) ফাউন্ডেশনের যৌথ আয়োজনেআঞ্চলিক সহযোগিতা: অর্থনীতির রূপান্তরশীর্ষক দুই দিনব্যাপী গোলটেবিল বৈঠক গ্লোবাল ডিসকোর্স অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঢাকায় দ্বিতীয়বারের মতো আয়োজিত গোলটেবিলে টেকসই উন্নয়ন, হালাল পর্যটনসহ আঞ্চলিক অবকাঠামো, সরকারি-বেসরকারি নানা সহযোগিতাবিষয়ক দিকনির্দেশের পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়নের সুযোগগুলো সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়। গোলটেবিলের চূড়ান্ত অধিবেশনে সিয়াকো আঞ্চলিক অংশীদারিত্বের প্লাটফর্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যা এসব দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্যে কাজ করবে। উদ্যোগের মাধ্যমে সার্ক সদস্যভুক্ত বাংলাদেশ মালদ্বীপকে আসিয়ান সদস্যভুক্ত তিন দেশ ব্রুনাই, মালয়েশিয়া ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে বেসরকারি খাতে অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য সংযুক্ত করার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

গোলটেবিল বৈঠকে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বলেন, আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে ওআইসির দক্ষিণ দক্ষিণ-পূর্ব ইসলামী দেশগুলো নিজেদের মধ্যে এবং অমুসলিম দেশের সঙ্গে বাণিজ্যের মাধ্যমে সংযুক্ত থাকতে পারে। তাছাড়া মুসলিম দেশে সুকুক ফান্ড বিকাশ হালাল খাবারের বিরাট বাজার রয়েছে। এতে এসব অঞ্চলের অমুসলিম দেশগুলোর জন্যও ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হবে।

সম্মেলনে সিয়াকো অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থনৈতিক সংযোগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ তুলে ধরার পাশাপাশি থেকে উত্তরণের উপায় নিয়েও আলোচনা হয়। গোলটেবিল বৈঠকে জানানো হয়, ২৩ লাখ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ৪২ কোটি ৩০ লাখ জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত সিয়াকো অঞ্চলের সম্মিলিত জিডিপি দশমিক ট্রিলিয়ন ডলার আর বাণিজ্যের পরিমাণ হলো ৭৭ হাজার কোটি ডলার। সিয়াকোর কর্মক্ষম জনশক্তি হচ্ছে ১৯ কোটি ৪০ লাখ আর বার্ষিক জিডিপি দেশভেদে দশমিক থেকে শতাংশ। ইসলামিক অর্থায়ন ২০১৭ সালের লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার থেকে বেড়ে ২০২৩ সাল নাগাদ লাখ ৮০ হাজার কোটি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সম্মেলনে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী ইসলামী অর্থনীতির আকার ক্রমেই বাড়ছে। শরিয়াহভিত্তিক অর্থনীতিকে গুরুত্ব দিলে তা অঞ্চলের মুসলিম দেশগুলোর অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। পর্যায়ক্রমে সিয়াকো অঞ্চলের দেশগুলোর অবকাঠামো নির্মাণ, বিদ্যুৎ খাত, পুঁজিবাজার, ব্যাংকিং, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা, পর্যটন, খাদ্য সংকট মোকাবেলা, ম্যানুফ্যাকচারিং রিলোকেশন, লজিস্টিক, শিক্ষা দক্ষতা উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগের দরজা খুলে যাবে।

সম্মেলনের উপলব্ধিতে উঠে আসে একটি স্বসম্প্রদায়ের আর্থসামাজিক অর্থনীতি বৃদ্ধির উপায় হচ্ছে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, পর্যটন সার্বিক সহযোগিতা। এর মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিগুলো আঞ্চলিকভাবে আরো সংযুক্ত পরিণত হয় এবং ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংকের (আইএসডিবি) মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের অধীনে অনুঘটকের ভূমিকা নিতে পারে। ধরনের আয়োজন অঞ্চলে আরো নিবিড় বাণিজ্য সংহতকরণ, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং আর্থিক সংযোগ স্থাপনে সহায়তা করবে। বেসরকারি খাতগুলো নেতৃত্বের জন্য এবং দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নে অংশ নেবে। অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলোয় বেসরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি সরকারগুলো পারস্পরিক সহায়তা সরবরাহ করতে পারে। বলা বাহুল্য, এবারের ঢাকা সম্মেলন আয়োজনে আইএসডিবি এই প্রথম সরাসরি সহযোগী হিসেবে অংশগ্রহণ করেছে।

ভবিষ্যৎ সুযোগের সম্ভাবনা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবপ্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে নবম ডব্লিউআইইএফ গ্লোবাল ডিসকোর্সের আয়োজন ছিল ঢাকা সম্মেলনের অন্যতম উদ্যোগ। মালয়েশিয়াতেই অনুষ্ঠিত আগের আটটি ডিসকোর্স এরই মধ্যে বিশ্বব্যাপী যথেষ্ট আগ্রহ সৃষ্টি করতে পেরেছে। প্রথমবারের মতো মালয়েশিয়ার বাইরে বাংলাদেশে গ্লোবাল ডিসকোর্সের প্রোগ্রামটি অনুষ্ঠিত হয়। নবম গ্লোবাল ডিসকোর্স মূলত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক পরিবেশগত প্রবণতাগুলো চিহ্নিত করেছে; যা বর্তমান ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জগুলোর সমাধান আনার জন্য একাডেমিকস, উদ্যোক্তা, শিল্প নেতা এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রেক্ষাপট তৈরি করবে এবং সেখানে শক্ত টেকসই অবস্থান নেবে বাংলাদেশ।

ডিসকোর্সের প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা প্রফেসর . গওহর রিজভী পূর্বযুগের চ্যালেঞ্জ শিল্প বিপ্লবের বিভিন্ন দিক এবং সেই সঙ্গে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে একজন মানুষ হিসেবে প্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। আলোচনায় ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে পৌঁছার বিষয়টিও উঠে আসে। আগামীতে ফোরজির সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার জন্য সবার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে সবাইকে আরো ভালোভাবে ম্যাক্রো প্রযুক্তি ব্যবহার করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

সম্মেলনে গোলটেবিল বৈঠক, বি টু বি মিটিং ডিসকোর্সে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয় এবং সহযোগিতার উপায় উপলক্ষ নির্মাণে গবেষণার আহ্বান জানানো হয়। নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে অবকাঠামো উন্নয়ন, মানবসম্পদ উন্নয়নের পাশাপাশি আর্থিক খাতের উন্নয়নে গুরুত্ব দেয়া হয়। এসব সহযোগিতা পর্যটন হালাল খাদ্য শিল্পে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

সম্মেলন শেষে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাত্কালে ডব্লিউআইইএফ সিয়াকো ফাউন্ডেশনের নেতারা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রশংসা করেন। ডব্লিউআইইএফের মহাসচিব ২০২০ সালে কাতারে অনুষ্ঠেয় পরবর্তী ডব্লিউআইইএফ সম্মেলনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানান। সেই সঙ্গে তারা ২০২১ সালে বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশকে ডব্লিউআইইএফ-সিয়াকো শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করার প্রস্তাব দেন।

বস্তুত দক্ষিণ দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অঞ্চলে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সদস্য পাঁচটি দেশের সমন্বয়ে নতুন একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ফোরাম গঠনের প্রস্তাব বাংলাদেশেরই। বছর ২২ এপ্রিল ব্রুনাই সফরের সময় ব্রুনাইয়ের সুলতান হাজি হাসান আল বলকিয়ার সঙ্গে আলোচনাকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রস্তাব দেন। আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব বলেছিলেন, ‘প্রস্তাবিত আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ফোরাম দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কো-অপারেশন (সিয়াকো) অর্গানাইজেশনের সদস্য হবে বাংলাদেশ মালদ্বীপ, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ব্রুনাই।প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে ব্রুনাইয়ের সুলতান আশ্বস্ত করেন, তিনি বিষয়টি বিবেচনায় রাখবেন। প্রধানমন্ত্রী দেশগুলোর ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং লক্ষ্যে একটি অগ্রাধিকার বাণিজ্য ব্যবস্থার সম্ভাব্যতা যাচাই করারও প্রস্তাব করেছিলেন।

প্রসঙ্গত, শুধু এশিয়াতেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল অর্থনীতিতে আঞ্চলিক সহযোগিতা কিংবা বিশ্বায়ন তথা মুক্তবাজার ব্যবস্থাপনাকে কাছাকাছি আনার জন্য যতগুলো গ্রুপ, সংঘ বা সংস্থা গঠিত হয়েছে, তারা এখনো নিজেদের কার্যকর অবস্থায় পায়নি। যদিও এসব বহুদেশীয় অ্যাসোসিয়েশন মুখ্যতজনগণ বেসরকারি খাত’-কে মেলবন্ধনে আনার উদ্দেশ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের লক্ষ্য বা প্রত্যাশায় গঠিত হয়েছে, সেগুলো মূলত সদস্য দেশগুলোরসরকারিভাবনা, আবেগ কূটনৈতিক দাবার চালে সীমিত গণ্ডিবদ্ধ হয়ে পড়েছে। নাফটা, সাফটা, আসিয়ান, সার্ক, বিআইসিএম, বিমসটেক, ডি৮, জি৭, এপেক কোনোটিই এখন পর্যন্ত পরিপূর্ণভাবেবেসরকারিকানেক্টিভিটি তথা আমজনতা অর্থাৎ পিপল টু পিপল যোগাযোগের সেতুবন্ধের হেতুতে পরিণত হতে পারেনি। এটা বলা যায় যে পাক-ভারত শত্রুতার কাছে সার্ক যেমন জিম্মি হয়ে আছে, চীন-ভারতের মতদ্বৈধতার হাতে বিআইসিএম তেমনি বন্দি। নাফটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকোর মধ্যকার দেয়াল তোলার হুমকি প্রশমন করতে পারেনি। মধ্যপ্রাচ্যের অবস্থা তো তথৈবচ। বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে সার্কের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ওপর নির্ভর করে বসে থাকতে পারে না। বরং আঞ্চলিক সহযোগিতা চুক্তি অথবা ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্টের জন্য আসিয়ানের দিকে নজর দিতে পারে। নিজের পায়ে দাঁড়াতে প্রত্যয়ী বাংলাদেশের স্মরণ করা উচিত ১৮০০ শতকে লর্ড পলমারস্টোনের সেই বিখ্যাত উক্তি—‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের কোনো চিরস্থায়ী শত্রু নেই, নেই চিরস্থায়ী বন্ধুও। আমাদের রয়েছে স্থায়ী স্বার্থ।

বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনাই মালদ্বীপ নিয়ে বেসরকারি খাতের দ্বারা (ট্র্যাক .) অর্থনৈতিক জোট সাউথ এশিয়া কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন বা সিয়াকো বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশসহ সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে। আসিয়ানের আঞ্চলিক সহযোগিতা বাণিজ্যিক সাফল্যের আঞ্চলিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ সার্বিক সহযোগিতা বাড়ায় দক্ষিণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ওআইসিভুক্ত পাঁচটি দেশ নিয়ে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট গঠনের প্রস্তাবটি দিন দিন জোরালো হয়ে উঠলেও দেশগুলোর সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, প্রজ্ঞা কূটনৈতিক তত্পরতার তারতম্যে বহু চড়াই-উতরাই পেরোতে হয়েছে বা হচ্ছে।

সিয়াকো জোট গঠনের প্রয়াস দীর্ঘদিনের। ১৯৯২ সালের ১১-১৮ ডিসেম্বর বান্দুং নগরীতে ইন্দোনেশিয়া ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ইন্দো-আইডিবি সেমিনারে দক্ষিণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনাই মালদ্বীপ নিয়ে অর্থনৈতিক জোট সিয়াকো গঠনের প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশের বেসরকারি খাত। প্রস্তাবটির অনুকূলে সেমিনারে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দেশ সমর্থন জানায়। পরের বছর মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত ইসলামিক চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির ১১তম সাধারণ সভায়ও সিয়াকো গঠনের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। একই বছরের ডিসেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ইসলামিক কমন মার্কেট নিয়ে আন্তর্জাতিক সেমিনারেও সিয়াকো অনুমোদন পায়। ১৯৯৪ সালে সিয়াকো গঠনের ব্যাপারে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ব্রুনাই, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া মালদ্বীপের মনোভাব জানতে চেয়ে চিঠি দেয়। আর ১৯৯৬ সালে কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়ার দ্বিপক্ষীয় আলোচনার এজেন্ডা হিসেবে সিয়াকো ঠাঁই পায়। গত বছর ঢাকায় অনুষ্ঠিত ওয়াইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংঘ গঠনের ইচ্ছা স্বীকৃত হয়। সেই সূত্রে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে সিয়াকো ফোরাম উদ্বোধনের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।

সবার জানা যে কানকুন সম্মেলন ব্যর্থ হওয়ার পর বিশ্বে এফটিএ চুক্তির আধিক্য বাড়ে। এতে এশিয়ান দেশগুলোও আঞ্চলিক ব্লক গঠনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ডব্লিউটিএ বা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা এরই মধ্যে দুই শতাধিক এফটিএকে স্বীকৃতি দিয়েছে। পাশাপাশি আরো ১৪০টি এফটিএ কার্যকর রয়েছে। পারস্পরিক বাণিজ্য পদ্ধতির বিকল্প হিসেবে বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল চালিকাশক্তি দেখা হচ্ছে এফটিএ চুক্তিগুলোকে।

ব্রুনাই, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তি হওয়ার ক্ষেত্রে সিয়াকোর ভূমিকা হবে অগ্রগণ্য। দক্ষিণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পাঁচটি দেশের ৪২ কোটি ৩০ লাখ ভোক্তার জন্য সিয়াকো এফটিএর মাধ্যমে উপ-আঞ্চলিক বাজার গঠন সম্ভব হলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দিকেই হাঁটবে। কারণ বাংলাদেশের ১৬ কোটি জনশক্তিকে জনসম্পদে পরিণত করার একটি আকর্ষণীয় পথ পেয়ে যাবে বাংলাদেশ। বিশেষত সিয়াকোর মাধ্যমে দক্ষিণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য, পর্যটন, ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (এফডিআই) জনশক্তি রফতানিতে নতুন গতি আসবে। বাড়বে রেমিট্যান্স।

পূর্ব-এশীয় দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক সম্পর্ক অনেক প্রাচীন। আর সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে মালয়েশিয়ার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়ন করা হলে সিয়াকো গঠনের সার্থকতা প্রতিপন্ন হবে। মধ্যপ্রাচ্যের অলস টাকা ব্যবহার করে মালয়েশিয়া আজ সমৃদ্ধির পথে হাঁটছে। মালয়েশিয়ার সঙ্গে কৃষি চুক্তি করে সার্কভুক্ত দেশ পাকিস্তানও এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে ছুটছে। বাংলাদেশও ব্রুনাই, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া মালদ্বীপের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে। আঞ্চলিক এফটিএ চুক্তিবদ্ধ দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য পণ্য সেবা খাতেথার্ড মার্কেটউপহার দিতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক বাজারে গতিশীলতা এখনো বিকাশের পথে। তাই বিনিয়োগের জন্য এটা একটি আদর্শ গন্তব্য। সিয়াকো আসিয়ানের আওতায় সার্ক অঞ্চলের দেড়শ কোটি ভোক্তার জন্য অর্থনৈতিক সংযোগ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১২ থেকে ১৩ শতাংশ, আসিয়ানে তা ২৩ শতাংশ। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নে তা ৭০ শতাংশ।

বর্তমানে বিশ্বায়ন বাজার অর্থনীতির প্রচণ্ড প্রভাব রোধে অর্থনৈতিক উন্নয়নে আঞ্চলিক ফোরাম সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, পারস্পরিক সহযোগিতা আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ববাণিজ্যে অর্থনৈতিক পরাশক্তিগুলোর প্রভাব মোকাবেলায় এবং দেশীয় অর্থনীতির অস্তিত্ব রক্ষা তার বিকাশে আঞ্চলিক সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই।

এবারের ঢাকা সম্মেলনে সিয়াকো আত্মপ্রকাশ করেছে। এখন শুধু পাঁচ দেশের সরকারের অনুুসমর্থন (ব্লেসিং) দরকার। প্রায় ৮০ বছর আগে ইতিহাসবিদ মার্ক টয়েনবি বলেছিলেন, আগামী শতকে বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে প্রাচ্য। তার ভবিষ্যদ্বাণী আজ সফল হতে যাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের উজ্জ্বল সম্ভাবনার কথা এখন সর্বত্র আলোচিত। মালদ্বীপের অর্থনৈতিক বিকাশ বিশ্বের বৃহৎ বিনিয়োগকারী দেশগুলোর দৃষ্টি কেড়েছে। মালদ্বীপের অর্থনীতিতে প্রভাব বাড়াতে চীনসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। অন্যদিকে তেলসমৃদ্ধ ব্রুনাই, শিল্পে অগ্রসর মালয়েশিয়া দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতির দেশ ইন্দোনেশিয়া যে আগামী দিনে এশিয়ান অর্থনীতির নিয়ন্ত্রকে পরিণত হচ্ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সুতরাং সিয়াকো অঞ্চলে আঞ্চলিক অর্থনীতির বিকাশে এবং অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

 

. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: সাবেক সচিব এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

উপদেষ্টা সিয়াকো ফাউন্ডেশন

সাউথ এশিয়ান ফেডারেশন অব এক্সচেঞ্জের সাবেক চেয়ারম্যান

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন