মঙ্গলবার | ডিসেম্বর ১০, ২০১৯ | ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

বদ্বীপ

নিম কোটেড ইউরিয়া

কমবে সার আমদানি বাড়বে ফসল উৎপাদন

সাইদ শাহীন

দেশে গত কয়েক বছরে রাসায়নিক সারের ব্যবহার বেড়েছে। এর মধ্যে কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে ইউরিয়া সারের ভূমিকা বেশি বলে প্রতীয়মান। দেশে প্রতি বছর গড়ে ২৪-২৬ লাখ টন ইউরিয়া সার ব্যবহার হচ্ছে। তবে সারটির প্রয়োজন যেমন রয়েছে, তেমনি ক্ষতির দিকও রয়েছে। কেননা ইউরিয়া সার ফসলের জমিতে ক্ষণস্থায়ী এবং গাছের খাদ্য হিসেবে তুলনামূলক কম পরিমাণে ক্রিয়াশীল কার্যকর। বিধায় বাংলাদেশসহ আঞ্চলিক আন্তর্জাতিক অঙ্গনের কৃষিবিজ্ঞানীরা উদ্বিগ্ন। বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ফসলের মাঠ থেকে ইউরিয়া সার অপচয় হয়। যা ভূগর্ভস্থ পানি ভূউপরিস্থ বায়ুমণ্ডলকে দূষিত করে। কীভাবে ইউরিয়া সারের অপচয় রোধ করে গাছের খাদ্য হিসেবে তার দক্ষতা বৃদ্ধি করা যায় তা নিয়ে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন ধরনের গবেষণা হয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভালো ফল পাওয়া গেলেও তা কৃষকবান্ধব নয় বিধায় জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে নিম কোটেড ইউরিয়া অর্থাৎ নিমবীজ থেকে সংগৃহীত তেলের পাতলা আবরণযুক্ত ইউরিয়া সার।

প্রায় ৭০ বছর আগে অ্যামোনিয়াম সালফেট প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষিতে রাসায়নিক সার ব্যবহারের সূচনা হয়। তবে সবুজ বিপ্লবের সূচনালগ্ন থেকে ইউরিয়াসহ অন্যান্য রাসায়নিক সার ব্যবহার বাড়তে শুরু করে। রাসায়নিক সার ফসল উৎপাদনের চালিকাশক্তি হিসেবে এখন বিবেচিত। অবশ্য পরিমাণের দিক দিয়ে ইউরিয়া সারের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে বাংলাদেশে ইউরিয়া সার ব্যবহারের পরিমাণ প্রায় ২৪-২৬ লাখ টন। ১০ লাখ টন দেশে উৎপাদন হলেও বাকি প্রায় ১৫ লাখ টন বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আবার মোট ইউরিয়া সারের প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ শুধু ধানেই ব্যবহার করা হয়।


গাছের জন্য যেসব মৌলিক খাদ্য উপাদান অত্যাবশ্যক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে তার মধ্যে নাইট্রোজেন অন্যতম। গাছের বাড়তি ফলন বৃদ্ধির জন্য নাইট্রোজেন মুখ্য ভূমিকা পালন করে। গাছ সাধারণত মাটি থেকেই নাইট্রোজেনসহ সব মৌলিক খাদ্য উপাদান পেয়ে থাকে। কিন্তু অধিক ফলনসহ ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধির কারণে মাটি ফসলের চাহিদা মোতাবেক পর্যাপ্ত নাইট্রোজেন সরবরাহ করতে পারে না, বিধায় নাইট্রোজেন বাহক ইউরিয়া সারের ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফসলি জমিতে ইউরিয়া সার প্রয়োগের পর পরই মাটির জলকণার সংস্পর্শে এটা দ্রুত গলে যায় এবং অনধিক তিনদিনের মধ্যে অণুজৈব প্রক্রিয়ায় গাছের খাদ্য উপযোগী উপাদানে রূপান্তরিত হয়, যার কিছু অংশ গাছ গ্রহণ করে, কিছু অংশ মাটির নিচে ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশে যায় এবং কিছু অংশ ভূউপরিস্থ বায়ুমণ্ডলে মিশে পরিবেশ দূষণ করে। মাটির প্রকৃৃতি পানির প্রাপ্যতার ওপর ভিত্তি করে প্রক্রিয়ায় ইউরিয়া সারের অপচয় প্রায় ৭০-৭৫ ভাগ হতে পারে।

পক্ষান্তরে নিম তেলে ট্রাইটারপেনস নামক রাসায়নিক পদার্থ থাকায় মাটিতে নিম কোটেড ইউরিয়া থেকে নাইট্রোজেনে রূপান্তরের প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চলে। এতে নাইট্রোজেনের অপচয় কম হয় এবং গাছ বেশিদিন ধরে শিকড়ের মাধ্যমে এই অত্যাবশ্যকীয় মৌলিক খাদ্য উপাদান গ্রহণ করতে পারে। ফলে সাধারণ ইউরিয়া সারের তুলনায় নিম কোটেড ইউরিয়া ১৫-২০ ভাগ কম ব্যবহার করেও সমপরিমাণ ফসল পাওয়া যায়। এমনকি -১০ ভাগ ফলন বৃদ্ধির খবরও এসেছে। প্রতিবেশী বৃহৎ দেশ ভারতে নিম কোটেড ইউরিয়ার ওপর এক দশকের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন ফসলে বিশেষ করে ধান গমের ওপর প্রচুর গবেষণা উন্নয়নের কাজ হয়েছে। সাধারণ ইউরিয়ার তুলনায় নিম কোটেড ইউরিয়া অধিকতর দক্ষ এবং বাড়তি ফলনে সহায়ক। তাছাড়া নাইট্রোজেনের অপচয় কম হওয়ায় পরিবেশবান্ধব এবং পরোক্ষভাবে ফসলে পোকামাকড় দমনেও সহায়ক ভূমিকা পালন করে। বহুবিধ উপকারের কারণে ভারতের কৃষিতে আস্তে আস্তে নিম কোটেড ইউরিয়া সারের ব্যবহার বাড়ছে। ২০১৫ সালে ভারতে কৃষক পর্যায়ে প্রায় ৩৩ লাখ টন নিম কোটেড ইউরিয়া সার ব্যবহার করা হয়েছে। বর্তমান ভারত সরকার সব ইউরিয়া সার কারখানা মালিকদের প্রতি সাধারণ ইউরিয়া সারের পরিবর্তে নিম কোটেড ইউরিয়া সার উৎপাদনের নির্দেশনা জারি করেছে। বাংলাদেশে ধান বা অন্য কোনো ফসলে নিম কোটেড ইউরিয়ার কার্যকারিতার ওপর বিক্ষিপ্তভাবে গবেষণা হলেও আরো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।


বিষয়ে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন (কেজিএফ) নির্বাহী পরিচালক বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান . ওয়ায়েস কবীর বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা এরই মধ্যে নিম কোটেড সার নিয়ে প্রাথমিক পরিকল্পনা করেছি। একটি পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে এটির সম্ভাবনা আরো অধিকতর যাচাই-বাছাই করে সরকারকে সুপারিশ করা হবে। প্রাথমিকভাবে মাঠপর্যায়ে যেসব ফলাফল পাওয়া গেছে সেগুলো আমাদের আশাবাদ হওয়ার মতো তথ্য দিচ্ছে। নিম কোটেড ইউরিয়া সার ব্যবহারে ১৫ শতাংশ দক্ষতা (ইউরিয়া সারের সক্ষমতা) বৃদ্ধি পায়, তাহলে বছরে দেশের কৃষিতে প্রায় দশমিক ৭৫ লাখ টনের বেশি ইউরিয়া সারের ব্যবহার কম হবে। যার বাজারমূল্য সহজেই হিসাব করা যায়। তাছাড়া বাড়তি শতাংশ ধানের ফলন বৃদ্ধি হলে তার সঙ্গে যোগ হবে আরো শত শত কোটি টাকা। তবে ভারতের গবেষণা তথ্যমতে প্রতি টন ইউরিয়ার জন্য নিম তেলের দরকার হয় আধা লিটার। সে হিসাবে ২৫ লাখ টন ইউরিয়া সারকে নিম কোটেড ইউরিয়ায় রূপান্তরিত করতে নিম তেলের প্রয়োজন হবে প্রায় হাজার ২৫০ টন। দেশের উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় বিশেষ করে বরেন্দ্র এলাকায় যথেষ্ট পরিমাণ নিমগাছ আছে। বর্তমানে কিছু নিম তেল স্থানীয়ভাবেও তৈরি হচ্ছে। প্রয়োজনে সেসব এলাকায় আরো নিমের চারা রোপণ করা যাবে।

বাংলাদেশে সম্প্রতি বিএডিসির রাজশাহী অঞ্চলের টেবুনিয়া বীজ উৎপাদন খামারে ধানের ওপর সাধারণ ইউরিয়ার তুলনায় নিম কোটেড ইউরিয়া সারের কার্যকারিতা মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করেছে। গবেষণায় দেখা যায়, প্রথাগত ইউরিয়া সারের তুলনায় শতকার ১৫ ভাগ কম নিম কোটেড ইউরিয়া সার ব্যবহার করেও প্রায় শতাংশ ফলন বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিম কোটেড ইউরিয়া উৎপাদনে প্রাথমিক হিসাবমতে কেজিপ্রতি এক টাকা বাড়তে পারে। কারখানায় বেশি পরিমাণ নিম কোটেড ইউরিয়া সার প্রস্তুত করার জন্য দীর্ঘমেয়াদে দেশের প্রচলিত ইউরিয়া সার কারখানাগুলোর সামান্য পরিবর্তন পরিবর্ধন করার জন্য কিছু বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। আপাতদৃষ্টিতে নিম কোটেড ইউরিয়া ব্যবহারের ফলে কৃষকসমাজ লাভবান হবে, পরিবেশের উন্নয়ন হবে, অকৃষি খাতে ইউরিয়া সার ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করবে। ইউরিয়া সারের আমদানির পরিমাণ কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশ লাভবান হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন