শনিবার | ডিসেম্বর ১৪, ২০১৯ | ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

বদ্বীপ

৮২ কোটি পুষ্টিহীনের বিশ্বে ৯৯ হাজার কোটি ডলারের খাদ্য অপচয়

আল আমিন হুসাইন

মধ্য উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে ফসল সংগ্রহ থেকে শুরু করে সরবরাহ চেইন ভোক্তা পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি খাদ্য অপচয় হয়। বিশেষ করে ধনী দেশগুলো বছরে ২২ কোটি ২০ লাখ টনের মতো খাবার নষ্ট করে। যেখানে আফ্রিকার সাবসাহারা অঞ্চলের দেশগুলো ২২ কোটি ৩০ লাখ টন খাদ্য উৎপাদন করে

কৃষিপ্রযুক্তিতে উন্নয়নের ফলে খাদ্য উৎপাদন বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে বাড়লেও পুষ্টিহীনতার সমস্যা থেকে মুক্তি মিলছে না। জাতিসংঘের হিসাবে, ২০০৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা কমলেও এখন সেটি ধীরগতিতে হলেও অব্যাহতভাবে বাড়তে শুরু করেছে। ২০১৮ সালে বিশ্বব্যাপী পুষ্টিহীন মানুষের সংখ্যা ৮২ কোটি ছিল। যেখানে চার বছর আগে সংখ্যা ছিল ৭৮ কোটি ৫০ লাখ।

এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী খাদ্য অপচয় সরবরাহ চেইনে নষ্ট হওয়ার প্রবণতাও নিয়ন্ত্রণহীন। জাতিসংঘের খাদ্য কৃষি সংস্থার (এফএও) হিসাবে, বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর ১৩০ কোটি টন খাদ্যপণ্য নষ্ট বা অপচয় হয়। আর সংস্থাটির স্টেট অব ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচারের (এসওএফএ) প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বব্যাপী ভোক্তাদের কাছে পৌঁছার আগেই নষ্ট হয় ১৪ শতাংশ খাদ্যপণ্য। মানুষের খাওয়ার উপযোগী পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার ফেলে দেয়া বা অন্য কাজে ব্যবহার করাকেই এফএওর সংজ্ঞায় খাদ্য অপচয় বলা হয়। আর উৎপাদন থেকে ভোগ পর্যন্ত নানা ধাপে খাদ্য নষ্ট হয়। এফএওর হিসাবে, প্রতি বছর ৯৯ হাজার কোটি ডলার মূল্যমানের খাদ্য অপচয় করা হয়।

জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) নির্বাহী পরিচালক ইনগার অ্যান্ডারসেন বলেন, খাদ্যপণ্যের বাইরে অন্য কোনো খাতে বছরে এত পরিমাণে অপচয় হয় না।

গত ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত এফএওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী মোট খাদ্যপণ্যের এক-তৃতীয়াংশই নষ্ট হচ্ছে। এর মধ্যে উত্তর আমেরিকা ইউরোপে খাদ্যের অপচয় ১৫ শতাংশের বেশি। আর মধ্য দক্ষিণ এশিয়ায় নষ্ট হচ্ছে প্রায় ২০ শতাংশের বেশি খাদ্য। অবস্থায় খাদ্যের অপচয় রোধ করে উৎপাদন খরচ খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে জোর দিচ্ছে বিভিন্ন দেশের সরকার আন্তর্জাতিক সংগঠন।

এসব পরিত্যক্ত খাবার থেকে সৃষ্ট গ্রিনহাউজ গ্যাস জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষজ্ঞরা। ইনগার অ্যান্ডারসেনের তথ্য অনুযায়ী, বার্ষিক কার্বন নির্গমনের শতাংশ আসছে নষ্ট হওয়া খাদ্যপণ্য থেকে। সে কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অন্যতম হাতিয়ার হতে পারে খাদ্যপণ্য অপচয় কমিয়ে আনা।

জাতিসংঘের কর্মকর্তা জানান, খাদ্য অপচয় জীববৈচিত্র্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিষয়টির ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, খাদ্য অপচয়ের কারণে এক ফসল চাষ কৃষি সম্প্রসারণ ঘটছে দ্রুত। তাতে বন নিধনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। কৃষির উপজাত এবং মত্স্য খামারের বর্জ্য জলজ বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করছে। পরিত্যক্ত খাদ্য ফেলা হচ্ছে ভাগাড়ে, এতে খাদ্যশৃঙ্খল ব্যাহত হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়্যার স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক গুলনিহাল ওজবে বলেন, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি খাদ্যপণ্য অপচয় করে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির অধিকাংশ বর্জ্য ফেলার স্থান বা ভাগাড় অপচয় করা খাদ্যপণ্যে ভরে থাকে। তিনি মনে করেন, দেশটিতে নতুন নতুন ভাগাড় তৈরি মানে আরো জমি পরিষ্কার করা, বন উজাড় করা। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা কঠিন হয়ে পড়বে।

খাদ্য অপচয়ের এমন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি রোধে পারিবারিক অভ্যাসে পরিবর্তন আনার কথা বলছে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থা প্রতিষ্ঠান। ওজবের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের মানুষ মনে করে খাদ্য সরবরাহ অপরিসীম। কারণে মানুষ খাবার ব্যবহারে সচেতন হওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না। দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অপচয় বাড়ে।

এফএও তাদের প্রতিবেদনে বলছে, মধ্য উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে ফসল সংগ্রহ থেকে শুরু করে সরবরাহ চেইন ভোক্তা পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি খাদ্য অপচয় হয়। বিশেষ করে ধনী দেশগুলো বছরে ২২ কোটি ২০ লাখ টনের মতো খাবার নষ্ট করে। যেখানে আফ্রিকার সাবসাহারা অঞ্চলের দেশগুলো ২২ কোটি ৩০ লাখ টন খাদ্য উৎপাদন করে।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফুড এক্সপার্ট এমিলি ব্রড লেইব মনে করেন, খাদ্য অপচয় রোধ করতে হলে খাদ্যাভ্যাস বিষয়ে শিক্ষাদান এগুলো বাস্তবায়নে মানুষকে উৎসাহিত করতে হবে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খাদ্য অপচয় রোধ খাদ্যের পুনর্ব্যবহারের বিষয়ে শিক্ষা দেয়া যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন