শনিবার | ডিসেম্বর ০৭, ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

প্রথম পাতা

বেদখল হয়ে যাচ্ছে প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ

জেসমিন মলি

দিনাজপুরের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর অন্যতম ধাপের বাজার ঢিবি। পার্বতীপুর উপজেলার এ পুরাকীর্তির একাংশে গড়ে তোলা হয়েছে সমবায় সমিতির নামে স্থাপনা। অন্যান্য স্থাপনা গড়ে উঠেছে বাকি অংশে। স্থানীয় প্রভাবশালী ও ভূমিদস্যুদের দখলে চলে যাওয়ায় প্রাচীন স্থাপত্যিক ধ্বংসাবশেষ সংবলিত ঢিবিটি আর সংরক্ষণ করা যায়নি।

উত্তরাঞ্চলের আরেক গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থান বিরাট রাজার গড়। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় এ প্রত্নস্থান দখল করেও গড়ে উঠেছে ঘরবাড়ি, দোকানপাট। দখলের ফলে ধ্বংসপ্রাপ্ত ঢিবিগুলো এখন প্রায় অদৃশ্য।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তথ্যও বলছে, স্থানীয় প্রভাবশালী ও ভূমিদস্যুদের দখলের কারণে দেশের অনেকগুলো প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না। যদিও ইতিহাস নির্মাণের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে ধরা হয় এ প্রত্নসম্পদকে। যে সময়ের কোনো লিখিত তথ্য থাকে না, সে সময়কার ইতিহাস নির্মাণে প্রত্নসম্পদের বিকল্প নেই। সারা বিশ্বে তাই এসব প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়।

গত কয়েক বছরের জরিপ ও অনুসন্ধানে প্রত্নসম্পদ অধিদপ্তর সারা দেশে দুই হাজারেরও বেশি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে সংরক্ষিত নিদর্শন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে ৫০৯টি স্থাপনা। বাকি নিদর্শনগুলো সংরক্ষণের আওতায় না আসায় প্রতিনিয়ত নষ্ট হচ্ছে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, অধিদপ্তরে যে-সংখ্যক লোকবল প্রয়োজন, তার তিন ভাগের এক ভাগও নেই। ফলে ইচ্ছা থাকলেও প্রত্নতত্ত্ব রক্ষা করা সম্ভব হয় না। আবার যে বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয়, তা দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা কষ্টকর হয়ে পড়ে।

লোকবলের অভাবে দেখভাল না হওয়ায় সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ভেঙে ফেলার ঘটনাও ঘটছে। এমন একটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হচ্ছে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার বহালতলী মসজিদ। ২০০২ সালে বহালতলী মসজিদটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষণা করে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। এরপর ২০১৮ সালে মাঠকর্মকালে পুরনো মসজিদটির অস্তিত্ব আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। সংরক্ষিত পুরাকীর্তিটি ভেঙে সেখানে নির্মাণ করা হয়েছে একটি আধুনিক স্থাপনা।

সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ভেঙে সেখানে আধুনিক স্থাপনা নির্মাণের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী গোপালগঞ্জ ঢাকা আঞ্চলিক দপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন হলেও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের জনবলের সীমাবদ্ধতার কারণে সেখানে কোনো কাস্টডিয়ান নেই। দেখাশোনা করার মতো কেউ না থাকায় সংরক্ষিত ঘোষণার মাত্র ১৬ বছরের মধ্যেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে পুরনো বহালতলী মসজিদ। একই কারণে অবহেলিত পড়ে আছে অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন পার্শ্ববর্তী চার জেলার পুরাকীর্তিও।

অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়হীনতার কারণেও অনেক প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ করতে পারছে না প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। এমন একটি প্রত্ন স্থাপনা চট্টগ্রামে হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজসংলগ্ন এলাকার মাদ্রাসা পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত একটি দ্বিতল ভবন। স্থানীয়ভাবে পরিচিত পর্তুগিজ ভবন নামে। আর ঐতিহাসিকদের কাছেদারুল আদালত। ২০১৪ সালেই ভবনটি সংরক্ষিত ঘোষণার উদ্যোগ নেয় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। কিন্তু চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) মালিকানা ছাড়তে রাজি না হওয়ায় ভবনটি এখনো সংরক্ষিত ঘোষণা করা সম্ভব হয়নি।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সংরক্ষিত পুরাকীর্তির যে তালিকা তৈরি করেছে, তাতে সবচেয়ে বেশি প্রত্নস্থল আছে রাজশাহী বিভাগে। এ বিভাগে পুরাকীর্তির সংখ্যা ১৫০। এছাড়া এ বিভাগে ছয়টি জাদুঘরও রয়েছে। অন্য বিভাগগুলোর মধ্যে ঢাকায় ১০৬টি প্রত্নস্থল ও দুটি জাদুঘর, খুলনায় ৮৩টি প্রত্নস্থল ও আটটি জাদুঘর, রংপুরে ৫৭টি প্রত্নস্থল ও দুটি জাদুঘর, চট্টগ্রামে ৫৯টি প্রত্নস্থল, বরিশালে ২২টি প্রত্নস্থল ও দুটি জাদুঘর, ময়মনসিংহ বিভাগে ১৯টি প্রত্নস্থল এবং সিলেট বিভাগে ১৫টি প্রত্নস্থল রয়েছে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সরকারিভাবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর খননকাজ সম্পন্ন করে। এর বাইরেও সরকারি অর্থায়নে বেসরকারিভাবে দুটি প্রতিষ্ঠান খননকাজ করছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী খননকালে যেসব প্রত্নবস্তু পাওয়া যাবে, তা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাছে জমা দেয়ার কথা। তবে অভিযোগ আছে, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান গত সাত-আট বছরেও প্রত্নবস্তু জমা দেয়নি। পরে অধিদপ্তর থেকে অর্থায়ন বন্ধ করা হবে জানালে বেশকিছু প্রত্নবস্তুর তালিকা অধিদপ্তরে জমা দেয় তারা। প্রত্নবস্তুর তালিকা প্রদান করলেও প্রত্নবস্তু জমা দেয়নি এখনো।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে শুরু করে প্রাচীন ও মধ্যযুগের নানা ধরনের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রয়েছে বাংলাদেশে। এগুলোর সঠিক সংরক্ষণ ও পরিচর্যার পাশাপাশি দর্শকদের দেখার উপযুক্ত সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও সম্ভাবনাময় হয়ে উঠতে পারে খাতটি। কিন্তু দক্ষ জনবলের অভাব, স্থান অনুযায়ী জনবল নিয়োগের অক্ষমতা, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের ঢাকায় অবস্থান করার প্রবণতার কারণে এ সুযোগ নষ্ট হচ্ছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. একেএম শাহনাওয়াজ বণিক বার্তাকে বলেন, প্রত্নসম্পদ রক্ষায় সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলো বরাবরই বেশ উদাসীন। দীর্ঘদিন ধরে তাদের এ উদাসীনতার কারণে আমরা আমাদের অনেক ঐতিহ্য আজ হারাতে বসেছি। সরকারিভাবে দেশের প্রত্নসম্পদগুলো যেটুকু রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়, তাও যেনতেনভাবে। রক্ষণাবেক্ষণে প্রয়োজনীয় অর্থ যেমন থাকে না, তেমনি পর্যাপ্ত জনবলও নেই। দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। আরেকটা বিষয় আমাদের এখানে ঘটে, তা হলো প্রত্নসম্পদের গবেষণার জন্য তেমন সুযোগ না দেয়া। তাই আমি মনে করি, দেশের প্রত্নসম্পদ রক্ষা করতে হলে সরকারকে এখনই বিষয়টিতে মনোযোগ দিতে হবে। এখানে অনেক সমস্যা আছে। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। সমাধান করতে হবে খুব দ্রুত। কারণ এগুলো রক্ষায় আমরা যত দেরি করব, ততই হারিয়ে যেতে থাকবে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে প্রত্নসম্পদ নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে জরুরিভিত্তিতে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর প্রচারকাজ বৃদ্ধি ও পর্যটক আকর্ষণ উপযোগী করার সুপারিশ করা হয়।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. হান্নান মিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, অধিদপ্তরের বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো ও জনবল সংকট কাটানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। আইনি কাঠামো শক্তিশালী করার বিষয়টি নিয়েও কাজ হচ্ছে। এসব কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে এ অধিদপ্তরের যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন