বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ২১, ২০১৯ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

শেষ পাতা

অস্থিরতায় প্রবাসী শ্রমবাজার

আউটপাস নিয়ে নয় মাসেই ফিরেছেন ৩৬ হাজার বাংলাদেশী

মনজুরুল ইসলাম

জনশক্তি রফতানির শীর্ষ গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশেই খারাপ সময় পার করছেন বাংলাদেশী শ্রমিকরা। ব্যাপক মাত্রায় সৌদীকরণের ফলে আকামা (কাজের অনুমতিপত্র) নবায়ন করতে না পেরে সৌদি আরবে প্রতিনিয়ত অবৈধ হয়ে পড়ছেন প্রবাসীরা। অবৈধ হয়ে পড়াদের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এমনকি কাতারেও। এ অবস্থায় চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে। কেউ কেউ অবৈধভাবে অবস্থান করতে গিয়ে ধরা পড়ছেন। কারাভোগ শেষে দূতাবাসের মাধ্যমে আউটপাস নিয়ে দেশে ফিরতে হচ্ছে তাদের।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় প্রতিদিনই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আউটপাস নিয়ে ফিরছেন প্রবাসী শ্রমিকরা। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই ফিরেছেন ৩৫ হাজার ৮০৯ শ্রমিক।

মূলত যাদের পাসপোর্ট নেই, অবৈধ কিংবা বিভিন্ন সমস্যায় পড়ে যারা একেবারে নিজ দেশে চলে যেতে ইচ্ছুক অথবা দেশে গিয়ে নতুন ভিসায় আবার বিদেশে আসতে চান, তাদের জন্যই আউটপাস দেয় দূতাবাস। এছাড়া যেসব কর্মী দূতাবাসের সেফ হাউজে হেফাজতে থাকেন এবং যাদের মামলা শেষ, তাদেরও আউটপাস দিয়ে দেশে পাঠিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করে দূতাবাস। আউটপাস নিয়ে ফেরা প্রত্যেক ব্যক্তিকেই প্রথমে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে জবানবন্দি দিতে হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে তাদের পাঠানো হয় বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কে। সেখানে তথ্য সংগ্রহের পর তাদের বিমানবন্দর ত্যাগের অনুমতি দেয়া হয়।

বিমানবন্দর প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের তথ্য অনুযায়ী, আউটপাস নিয়ে গত জানুয়ারিতে দেশে ফেরেন ৪ হাজার ২৫ জন। এছাড়া ফেব্রুয়ারিতে ৩ হাজার ৩৭২ জন, মার্চে ৩ হাজার ৮৭৫, এপ্রিলে ৩ হাজার ৪৬, মে মাসে ৩ হাজার ৪৭৫, জুনে ১ হাজার ৭৭৮, জুলাইয়ে ৩ হাজার ৮৮০, আগস্টে ৩ হাজার ৬৩৩ ও সেপ্টেম্বরে রেকর্ডসংখ্যক ৮ হাজার ৭২৫ জন প্রবাসী বাংলাদেশী আউটপাস নিয়ে দেশে ফিরেছেন।

আউটপাস নিয়ে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক ফেরত এসেছেন সৌদি আরব থেকে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে এ সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ৩০। এছাড়া ওমান থেকে ৪ হাজার ৮৯৬, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ৪ হাজার ৫৬৭, কাতার থেকে ১ হাজার ৮৬৮ ও বাহরাইন থেকে ৮৫৯ জন শ্রমিক আউটপাস নিয়ে ফিরে এসেছেন।

এত বেশি মাত্রায় শ্রমিক ফেরত আসা প্রসঙ্গে সৌদির বাংলাদেশ দূতাবাস বলছে, সৌদি আরবে অবস্থানকারী বাংলাদেশী শ্রমিকদের আকামায় যে পেশা ও নিয়োগদাতার নাম উল্লেখ করা আছে, সেখানে কাজ না করে অন্য স্থানে বা অন্য কোনো পেশায় কাজ করছেন এমন প্রবাসী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে সৌদি সরকার। এর অংশ হিসেবে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে তাদের।

জানা গেছে, গত পাঁচ বছরে ৯৪ হাজার ১২৮ জন প্রবাসী বাংলাদেশীকে আউটপাস দিয়ে দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল, জেদ্দা। এর মধ্যে চলতি বছর (৩০ অক্টোবর পর্যন্ত) আউটপাস ইস্যু হয়েছে ১৮ হাজার ২২০ জনের। এ সংখ্যা ২০১৮ সালে ছিল ২৬ হাজার ৭৭১, ২০১৭ সালে ছিল ১২ হাজার ৪৯৬, ২০১৬ সালে ছিল ১৪ হাজার ৫৯৩ ও ২০১৫ সালে ছিল ২২ হাজার ৪৮।

জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের শ্রমকল্যাণ উইংয়ের কাউন্সিলর আমিনুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, গত বছর সৌদি আরব সরকার ১২টি পেশায় প্রবাসীদের কাজ করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এসব ক্ষেত্রে কেবল সৌদি আরবের নাগরিকরা কাজ করতে পারবে। এতে দীর্ঘ সময় ধরে যেসব বাংলাদেশী সৌদি আরবে ছিলেন, তাদের কাজের ক্ষেত্র সীমিত হয়ে গেছে, যার পরিপ্রেক্ষিতে অনেকেই দেশে ফিরে যাচ্ছেন। অন্যদিকে যাদের আকামার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, পাসপোর্ট নেই অথবা অন্যান্য কারণে অবৈধ হয়ে পড়েছেন, তাদের দূতাবাসের সহায়তায় আউটপাস দিয়ে দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দূতাবাসের আউটপাস নিয়ে ফিরে আসাদের বড় অংশই প্রবাসজীবন ছেড়েছেন নিজ পেশায় টিকতে না পেরে। সৌদি আরবের ক্ষেত্রে মূলত চাকরিতে ব্যাপক মাত্রায় সৌদীকরণের ফলে দেশটিতে প্রবাসীদের কাজের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে পড়েছে। যার কারণে বৈধভাবে বা অবৈধ হয়ে পড়ে ফিরে আসতে হচ্ছে তাদের।

একই অবস্থা মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোতেও। নিয়োগকর্তার নির্যাতন, আকামা জটিলতা, বেতন-ভাতা না পাওয়ার সমস্যাসহ নানাভাবে নির্যাতিতরা টিকতে না পেরে অবশেষে দূতাবাস থেকে আউটপাস নিয়ে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। বিমানবন্দরে প্রায় প্রতিদিনই সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, বাহরাইন, জর্ডান, লেবানন, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আউটপাস নিয়ে শ্রমিকরা ফেরত আসছেন। ফিরে আসা শ্রমিকদের অনেকেই নির্যাতনের বিচার ও ক্ষতিপূরণ চেয়ে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোতে লিখিত অভিযোগ করছেন।

অভিবাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, রিক্রুটিং এজেন্সির ভিসা কেনাবেচার কারণে এমনিতেই অভিবাসন ব্যয় অনেক গুণ বেশি। অন্যদিকে অত্যধিক খরচে বিদেশে যাওয়ার পর কম মজুরিতে নিয়োগ, নিচু পদে কাজ করা, এমনকি চাকরিচ্যুত হতে হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত টিকতে না পেরে অনেকেই দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন।

প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) পরিচালক ড. সিআর আবরার এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, বলা হচ্ছে সৌদি আরব সৌদীকরণ করছে, যার কারণে প্রবাসী বাংলাদেশীরা চাকরি হারাচ্ছেন। বৈধ কাগজ থাকার পরও অনেক সময় পাঠিয়ে দেয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। সরকারকে কিন্তু অবশ্যই দেখতে হবে, আসলেই ঠিক প্রক্রিয়া মেনে শ্রমিকদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে কিনা। সরকারি পর্যায়ে শ্রমিকদের সুরক্ষাবলয়ে নিতে চাপ দিতে হবে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন