বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ২১, ২০১৯ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

শেষ পাতা

সমবায় কর্মকাণ্ডে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে গুরুত্বারোপ প্রধানমন্ত্রীর

নিজস্ব প্রতিবেদক

সমবায়ের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে যুগোপযোগী সমবায় ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার জন্য আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে গতকাল ৪৮তম জাতীয় সমবায় দিবস উদযাপন ও জাতীয় সমবায় পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলে সমবায়ের মাধ্যমেই আমাদের দেশের উন্নয়ন করতে পারব।

সমবায়ীদের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমবায়ের কাজে যারা দক্ষ তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং সত্ভাবে তারা যেন কাজ করে, সে বিষয়ে আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। ইনশাআল্লাহ, তবেই জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলতে সক্ষম হব।

তার সরকারউন্নত জাতের গাভী পালনের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত মহিলাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর মাধ্যমে নারীদের সুদবিহীন, জামানতবিহীন দীর্ঘমেয়াদি ১ লাখ ২০ হাজার টাকা করে ঋণ দেয়া হচ্ছে।

সমবায় ভবন নির্মাণ ও সমবায় অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয় থেকে উপজেলা পর্যন্ত সব কার্যালয়কে আইসিটি নেটওয়ার্কের আওতায় এনে অনলাইনে কেনাবেচার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম। মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি খোন্দকার মোশাররফ হোসেন, প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য্য, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিব কামাল উদ্দিন তালুকদার, বাংলাদেশের জাতীয় সমবায় ইউনিয়নের সভাপতি শেখ নাদির হোসেন লিপু অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। স্বাগত বক্তব্য রাখেন সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধক ও মহাপরিচালক আমিনুল ইসলাম। মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সিনিয়র সচিব, সচিবসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আমন্ত্রিত অতিথি ও সারা দেশ থেকে আসা সমবায়ীরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে সমবায় অধিদপ্তরের কর্মকাণ্ড নিয়ে একটি ভিডিওচিত্র পরিবেশিত হয়। চলতি বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য হচ্ছেবঙ্গবন্ধুর দর্শন, সমবায়ে উন্নয়ন। অনুষ্ঠানে ২০১৮ সালের জাতীয় সমবায় পুরস্কার বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী।

আলোচনা পর্বের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী সমবায়ীদের জন্য অনলাইনে পণ্য কেনাবেচা ও বাজারজাতের উদ্বোধন করেন এবং অনুষ্ঠানস্থলে সমবায়ীদের স্থাপিত বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন।

সমবায় অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশের কৃষি, মত্স্য চাষ, পশু পালন, দুগ্ধ উৎপাদন, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা, আবাসন, পুঁজি গঠন ও নারীর ক্ষমতায়নে সমবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ১ লাখ ৭৪ হাজার সমবায় সমিতি রয়েছে। এর সদস্য সংখ্যা ১ কোটি ৯ লাখ। এসব সমবায় সমিতির মোট কার্যকরী মূলধনের পরিমাণ ১৩ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। সমবায়ের মাধ্যমে সৃষ্ট কর্মসংস্থানের সংখ্যা প্রায় নয় লাখ।

দেশের বিদ্যমান সমবায় আইনকে যুগোপযোগীকরণ ও সমবায় ব্যাংককে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমাদের সমবায় আইনটিকে আরো যুগোপযোগী করতে হবে এবং সমবায় ব্যাংক যেটা রয়েছে, সেটা একসময় মুখ থুবড়ে পড়েছিল। কাজেই এ ব্যাংক আইনটাও সময়োপযোগী করে এটাকে একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার ব্যবস্থা নিতে হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়ভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি) কর্তৃক পাঁচটি উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামের দরিদ্র ও বিত্তহীন জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করে প্রশিক্ষণ, উপকরণ সরবরাহ ও ঋণ সহায়তা প্রদান করে স্বাবলম্বী করে তোলা হচ্ছে। ক্ষুদ্র কৃষকদের উন্নয়নে ক্ষুদ্র কৃষক উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তিনটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বর্তমানে ১৭৪টি উপজেলায় বিস্তৃত হয়েছে। সেই সঙ্গে পল্লী অবকাঠামো সুবিধা ও দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নে পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশনের (পিডিবিএফ) মাধ্যমে সরকার ১০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। ফলে গ্রামে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গ্রামের রাস্তায় সৌরবিদ্যুৎ সুবিধা প্রদান করা হয়েছে।

তিনি বলেন, যেখানে বিদ্যুতের গ্রিড লাইন নেই, সেখানে সোলার প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং দেশের শতকরা ৯৩ জন মানুষ এখন বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া নৌপথ, সড়কপথ এবং রেলপথ চালু ও উন্নত করা এবং বিদ্যুতের ব্যবস্থা করার ফলে গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ছে। মানুষের জীবনমান উন্নত হচ্ছে।

তার সরকার বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড), কুমিল্লার গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রায়োগিক গবেষণা পরিচালনার জন্য দুটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।ভিক্ষুক জাতির কোনো ইজ্জত থাকে না জাতির পিতার বক্তৃতার এ উদ্ধৃতি উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা আমাদের স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন, লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে সে স্বাধীনতা আমরা অর্জন করেছি। কাজেই এ দেশের মানুষ আর কোনোদিন কারো কাছে হাত পেতে চলবে না, মাথা উঁচু করে চলবে এবং নিজের পায়ে দাঁড়াবে। সে লক্ষ্যেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ার কৌশল ছিল সমবায়। জাতির পিতা এ দেশে কৃষি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা, শিল্প উদ্যোগ, কৃষিঋণসহ সব ক্ষেত্রে সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে কাজ করেন। জাতির পিতাই সংবিধানের ১৩ নং অনুচ্ছেদে মালিকানার দ্বিতীয় খাত হিসেবে সমবায়কে স্থান দিয়ে যান। তিনি (বঙ্গবন্ধু) নিরন্ন মানুষের মুখে খাদ্য তুলে দিতে গঠন করেছিলেন কৃষি সমবায় সমিতি, পুষ্টির চাহিদা পূরণে গঠন করেছিলেন মত্স্যজীবী সমবায় সমিতি, দরিদ্র তাঁতিদের নিয়ে তাঁতি সমবায় সমিতি, শিল্প সম্প্রসারণে শিল্প সমবায় সমিতি এবং দেশের অন্যতম সমবায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মিল্ক ভিটা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা প্রতিটি গ্রামে নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছি। আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় সমবায়ের মাধ্যমে ২ লাখ ৯৮ হাজার ২৪৯টি পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। ১০৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ঋণ সহায়তা প্রদান করে তাদের স্বাবলম্বী করা হচ্ছে।আমার বাড়ি, আমার খামার প্রকল্পের আওতায় ৮৭ হাজার ২২৩টি গ্রামে ১ লাখ ৫ হাজার ৭২৩টি গ্রাম উন্নয়ন সমিতি গঠিত হয়েছে, যার উপকারভোগী পরিবার ৪৭ লাখের বেশি। একই সঙ্গে গ্রামভিত্তিক সমবায় সমিতি গঠন করে সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন কর্মসূচি (সিভিডিপি) প্রকল্পের মাধ্যমে সমবায়ভুক্ত সদস্যদের লাগসই প্রশিক্ষণও প্রদান করা হচ্ছে।

দুগ্ধ খাতের উন্নয়নে সরকারের সমবায়ভিত্তিক বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সমবায়ভিত্তিক দুগ্ধ উৎপাদন নিশ্চিতকরণ প্রকল্প ও দুগ্ধ সমবায়ের কার্যক্রম বিস্তৃতকরণের মাধ্যমে বৃহত্তর ফরিদপুর, বরিশাল ও খুলনা জেলার দারিদ্র্য হ্রাসকরণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এছাড়া, মিল্ক ভিটার মাধ্যমে গোখাদ্য উৎপাদনের জন্য লাহিড়ী মোহনপুর দুগ্ধ কারখানায় গোখাদ্য উৎপাদন কারখানা স্থাপন ও দুগ্ধ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য মহিষের কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে।

দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ৯০ শতাংশ নিজস্ব অর্থায়নেই বর্তমানে বাস্তবায়িত হচ্ছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের বাজেট সাত গুণ বৃদ্ধি করেছি। এরই মধ্যে আমরা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে গ্র্যাজুয়েশন লাভ করেছি। এ উত্তোরণকে ধরে রেখে আমাদের আরো সামনে এগিয়ে যেতে হবে। জাতির পিতার নির্দেশনা অনুযায়ী এ এগিয়ে যাওয়ার পথে তার নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা সমবায়কে গুরুত্ব দেব। যাতে একসঙ্গে অধিকসংখ্যক মানুষ উপকার ভোগ করতে পারে।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন