রবিবার | ডিসেম্বর ০৮, ২০১৯ | ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

শেষ পাতা

সিসার উপস্থিতি

হলুদ রফতানি বন্ধের নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের

জেসমিন মলি

বাংলাদেশ থেকে হলুদ রফতানি সীমিতকরণ বা বন্ধে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। হলুদের গুঁড়োয় মাত্রাতিরিক্ত সিসা বা লেড ক্রোমেটের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ায় পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে এরই মধ্যে -সংক্রান্ত একটি নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে।

জানা গেছে, হলুদের রঙ উজ্জ্বল করতে কাঁচা হলুদ শুকানোর আগেই কৃষক ব্যবসায়ীরা এতে অতিরিক্ত মাত্রায় সিসা ব্যবহার করছেন বলে তথ্য পায় সরকার। বিষয়টি প্রমাণ হওয়ার পর জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পণ্য রফতানি বন্ধের উদ্যোগ নেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান স্বাক্ষরিত -সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা ১৫ অক্টোবর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব . মো. জাফর উদ্দিনের কাছে পাঠানো হয়।

বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বলছে, যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দেশ থেকে হলুদের রফতানি সীমিত বা বন্ধ করা যেতে পারে। কিংবা শুধু সরকার থেকে সনদ পাওয়া সাপেক্ষে কোনো লট রফতানির জন্য নির্ধারণ করা যেতে পারে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে হলুদ প্রসেসিংয়ের আগে লেড বা সিসা ব্যবহারজনিত কারণে ভয়ানক স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং সমস্যা উত্তরণে করণীয় শীর্ষক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্প্রতি সায়েন্স জার্নাল আইএফএল সায়েন্স, অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক এবিসি নিউজ এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওয়াশিংটন পোস্টে বাংলাদেশের হলুদে ক্ষতিকারক সিসার উপস্থিতি নিয়ে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ করা হয়। বাংলাদেশের কিছু মসলা প্রক্রিয়াজাতকারী বা ব্যবসায়ী হলুদের রঙ উজ্জ্বল করতে শিল্পে ব্যবহূত ক্ষতিকারক সিসা ব্যবহার করছে। হলুদে লেড ক্রোমেট পিগমেন্টের ব্যবহারে ব্যাপক স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া অধিক মাত্রায় সিসার উপস্থিতির ফলে বাংলাদেশের মসলা রফতানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার ফলাফল পরে এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ জার্নালে প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, দেশের কৃষক ব্যবসায়ীরা হলুদের ধূসর রঙ গাঢ় করতে শুকানোর আগেই অতিরিক্ত মাত্রায় সিসা ব্যবহার করছে। প্রক্রিয়ায় লেড ক্রোমেট ব্যবহার করা হয়, যা একটি শক্তিশালী নিউরোটক্সিন। শিল্পে অনুন্নত দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের মানুষের শরীরে সিসার পরিমাণ সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি। লেড ক্রোমেট বা সিসা ব্যবহারে করলে হলুদের উপরের ছাল উঠে যায়। এতে হলুদের রঙ আরো আকর্ষণীয় হয়।

জানা গেছে, ২০১১ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত মাত্রাতিরিক্ত সিসার উপস্থিতির কারণে বাংলাদেশ ভারতের ১৩টি ব্র্যান্ডের রফতানি করা হলুদ ফেরত পাঠিয়েছে আমদানিকারক দেশগুলো।

বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন সময় ইউরোপ-আমেরিকায় রফতানি হওয়া হলুদের গুঁড়ো পরীক্ষা করে তাতে মাত্রাতিরিক্ত সিসার উপস্থিতি পাওয়ার পর দেশগুলো ওইসব চালান ফেরত পাঠায়। এবার যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক বাংলাদেশে হলুদ উৎপাদনকারী নয়টি অঞ্চল থেকে ৫২৪টি নমুনা সংগ্রহ করে এতে বিভিন্ন রাসায়নিকের উপস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখেছেন। তাদের গবেষণার ফলাফলে বলা হয়, নমুনাগুলোয় সিসার মাত্রা বিধিবদ্ধ মাত্রার তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। প্রতি গ্রাম হলুদে গড়ে ৬৯০ মাইক্রোগ্রাম সিসার অস্তিত্ব পাওয়া যায়।

তিনি বলেন, গবেষণার ফলাফল পাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে চিঠি পাঠিয়ে রফতানি বন্ধ বা সীমিত করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সে বিষয়ে মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে। এছাড়া হলুদে ক্ষতিকারক সিসার মিশ্রণ বন্ধে খাদ্য অধিদপ্তর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরো তত্পর হওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এছাড়া বিএসটিআই বা অন্যান্য সংস্থার সমন্বয়ে হলুদ উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত কারখানা থেকে নমুনা সংগ্রহের পর পরীক্ষা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণের পরামর্শ দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।

তথ্যমতে, বাংলাদেশে হলুদে প্রথম সিসার ব্যবহার হয় আশির দশকে। বন্যায় হলুদ স্যাঁতসেঁতে হয়ে রঙ নষ্ট হলে এটি প্রথমবারের মতো ব্যবহার করা হয়।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি হলুদ আমদানি করে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি বছরে সাড়ে কোটি ডলার মূল্যের হলুদ আমদানি করে। বিশ্বের মোট চাহিদার ৮০ শতাংশ হলুদ উৎপাদন হয় ভারতে। বৈশ্বিক হলুদ উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। বাংলাদেশ বৈশ্বিক চাহিদার শতাংশ হলুদ সরবরাহ করে। এর পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে।

প্রতিবেদনে সিসার প্রভাবে শিশু গর্ভবতী নারীর ক্ষতির বিষয়েও উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের মানুষের রক্তে সিসার সহনশীল মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে মাইক্রোগ্রাম। মুন্সীগঞ্জ জেলার একটি গ্রামে গবেষণায় দেখা যায়, ২০-৪০ মাস বয়সী শিশুদের ৭৮ শতাংশেরই রক্তে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় সিসা রয়েছে। গর্ভবতী মহিলাদের ৩০ শতাংশের রক্তে সিসার পরিমাণ বেশি।

মার্কিন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন জানিয়েছে, শিশুদের রক্তে যেকোনো মাত্রায় লেডের উপস্থিতিই অনিরাপদ। সিসা প্রাপ্তবয়স্কদের হূদরোগ মস্তিষ্কের ব্যাধির ঝুঁকি বাড়ায় এবং শিশুর মেধাবিকাশকে ব্যাহত করে। হলুদ পুরনো হলে সিসার প্রভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরো বেড়ে যায়।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন