শুক্রবার | ডিসেম্বর ০৬, ২০১৯ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

টেরাকোটা (শেষ পর্ব)

বাংলার কুঁড়েঘর থেকে বাংলো

ড. আবু সাঈদ এম আহমেদ

স্থাপত্যরীতি হিসেবে বাংলো বিশ্বব্যাপী পরিচিত। বিশেষ করে, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে বাংলো মূলত আবাসিক ভবন হিসেবে প্রচলিত। যদিও স্বাচ্ছন্দ্য অভিজাত্য স্থান হিসেবে খ্যাত, তবে দর্শনীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবেও বাংলোর সুনাম রয়েছে। বাংলোকে ব্রিটিশদের আবিষ্কার হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, ইংরেজি ছাড়াও অন্যান্য ভাষায় বাংলো শব্দটির ব্যবহার লক্ষণীয়। বাংলো সাধারণত একতলাবিশিষ্ট ভবন এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এটিকে অবকাশযাপনের স্থান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এর বহির্ভাগ উন্মুক্ত লম্বা বারান্দাযুক্ত, সেখানে বসে দীর্ঘ অবসর কাটানো যায়। ক্রমশ অবকাশযাপনের কেন্দ্র হয়ে ওঠা বাংলোর বিশাল জনপ্রিয়তার অন্যতম প্রধান কারণ।

উনিশ শতকের মধ্যভাগের ব্রিটেনে ধরনের অবকাশযাপন প্রথার খোঁজ মেলে। যেখানে মূল কর্মকাণ্ডই ছিল সূর্যস্নান আর ছুটির দিনগুলোতে সময় কাটানো। বার্চিংটনের রিসোর্ট বা বাংলোগুলো তাই সমুদ্রসৈকতের তটঘেঁষেই গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে অস্ট্রেলিয়ান আমেরিকানরা বাংলো নির্মাণ ব্যবহার করতে থাকে। যা কিনা বাংলোর বৈশ্বিক বিস্তারের বিষয়টিকে নিশ্চিত করে।

তবে বাংলোর মূল উদ্ভব আরো প্রাচীনে নিহিত। আর সে সময় এটি কোনো রিসোর্ট বা অবকাশযাপন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহূত হতো না, বরং এটি ছিল গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আবহাওয়া মোকাবেলার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলার বিচক্ষণ স্থাপত্য কৌশল, অঞ্চলটি একসময় ব্রিটেনের উপনিবেশ ছিল।

বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ বদ্বীপ ভূমি। বৈশিষ্ট্যগতভাবে এটি সমতল জলাভূমি হওয়ার কারণে কৃষিকাজের জন্য সুবিধাজনক। এখানের স্থানীয় জনগণ, যারা কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত তারা নিজেদের থাকার যে বাড়িগুলো তৈরি করত, সেগুলো হয় তাদের চাষাবাদকৃত ভূমির মধ্যে কিংবা মাঠের কাছাকাছি হতো। আকারে ছোট বাড়িগুলো হতো অস্থায়ী, সাময়িকভাবে কিছুদিন থাকার জন্য। কেননা পরবর্তী সময়ে তারা জায়গা থেকে বসতি গুটিয়ে অন্যত্র গিয়ে বসবাস করত।

বিভিন্ন অভিধানেও উল্লেখ করা হয়েছে যেবাংলোশব্দটি মূলতবাংলাথেকেই এসেছে এবং এর উত্পত্তিস্থল বাংলাতেই।বেঙ্গল হাটমানেবাংলা কুঁড়েঘর নির্মাণে সহজ অস্থায়ী ঘরগুলোয় গ্রামের লোকেরা নিজেদের বসবাসের পাশাপাশি গবাদিপশু রাখার স্থান হিসেবেও ব্যবহার করত। বদ্বীপ অঞ্চলে নদীর ভাঙন আর বন্যার বিষয়টি নিয়মিত। সেক্ষেত্রে অঞ্চলের অধিবাসীরা বাংলো ধরনের ঘর তৈরি করত, ফলে এটি সহজে স্থানান্তরযোগ্য হতো। ষোল শতকের মধ্যভাগে যখন প্রথম ইউরোপীয় বণিকরা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে অঞ্চলে পাড়ি জমাতে থাকে তখন তারা মূলত উপকূল ঘিরেই তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখে এবং সেখানে তারা নিজেদের কারখানা স্থাপন করে। এরপর তারা ক্রমশ বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে শুরু করে এবং বিভিন্ন কাজে বিশেষ করে রাত্রিযাপনের প্রয়োজন মেটাতে সহকারীদের দিয়ে বাংলা ঘর নির্মাণ করতে শুরু করে। তাছাড়া সহজ নির্মাণ পদ্ধতি আর হাতের কাছে পাওয়া স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করার কারণে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে এটি নির্মাণ করা সম্ভব হতো।

বাংলোর বিশেষ বৈশিষ্ট্যগত নির্মাণরীতির কারণে এটি তীব্র সূর্যরশ্মি, উষ্ণ তাপমাত্রা, মৌসুমি ভারি বর্ষণ সহনশীল এবং অঞ্চলের আবহাওয়া উপযোগী। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এটি নির্মাণ করা হতো বাঁশের পাশাপাশি সহজাত নমনীয় উপাদান ব্যবহার করে। এতে ছাদের ঢালের সংখ্যায় ভিন্নতা জুড়ে দেয়া সহজ হতো, যা পরিচিত দোচালা, চৌচালা আটচালা নামে। গ্রামীণ কুঁড়েঘরগুলো মূলত সামনে খোলা বারান্দাযুক্ত আয়াতক্ষেত্র কক্ষবিশিষ্ট। দেয়ালগুলো ছোট ছোট ছিদ্রযুক্ত বাঁশের বেড়া দিয়ে তৈরি। এতে করে গরমের দিনে সহজে বাতাস চলাচল করতে পারে। ঘরের চালাগুলো বাঁকানো, যেগুলো চৌচালা কিংবা দোচালার বৈশিষ্ট্যযুক্ত। বদ্বীবভূমির ভবন তৈরির মৌলিক উপকরণের মধ্যে বাঁশ অন্যতম। তাছাড়া বাঁশ অনেক বেশি নমনীয় উপকরণ। এটিকে বাঁকানোর পর কোনো দড়ির সাহায্যে এটিকে বেঁধে নিলে তখন এটি একটি শক্ত কাঠামোতে পরিণত হয়। বাংলার গ্রামীণ বাসিন্দারা নিজেদের ঘর তৈরিতে বাঁশের ব্যবহারের মাধ্যমে ওই সহজলভ্য নমনীয় উপকরণটির সুবিধাটাই নিয়েছে। তাছাড়া উপরে ঢালু চালা তৈরির অন্য কারণটি হচ্ছে বৃষ্টি হলে ওই পানি যাতে আটকে না থাকে, বরং যথাসম্ভব দ্রুততার সঙ্গে নেমে যেতে পারে সে ব্যবস্থা করা। বাংলোর চালাগুলো সাধারণত ঘরের আকারের চেয়ে কিছুটা বড় করে তৈরি করা হয়। বারান্দা ঘরের অন্যান্য কক্ষের সঙ্গে সংযুক্ত। বিশেষ করে গরমের দিনে গৃহস্থালির অধিকাংশ কাজগুলোই খোলা বারান্দাতে বসেই সারা হতো।

ব্রিটিশদের আগেই বাংলা ঘরের স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য অঞ্চলের অন্য শাসকদের দৃষ্টি আর্কষণ করে। অঞ্চলের হিন্দু কিংবা মুসলিম শাসকদের ধর্মীয় মন্দির কিংবা মসজিদসহ বিভিন্ন স্থাপত্যেও বক্রাকৃতির চালা ছাদের ব্যবহার দেখা যায়। ইসলামিক যুগের সূচনা আমলে মুসলমান নির্মাতারা স্থাপত্য নির্মাণে বাংলার বিভিন্ন স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করতে শুরু করে। সে সময়ে বাংলা ঘরের বিভিন্ন স্থাপত্য নকশা তারা ব্যবহার করে। এভাবে এখানকার কিছু স্থাপত্য নকশা আর উপকরণ সে সময়ের স্থায়ী স্থাপত্যের অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। যদিও বৈশিষ্ট্যগতভাবে বাংলা ঘর একটি অস্থায়ী স্থাপত্য। তাছাড়া আয়াতক্ষেত্রাকার একটি কক্ষের ওপর গম্বুজের ব্যবহার সম্ভব নয়। তাই নতুন স্থাপত্য নকশা ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে। সেক্ষেত্রে তাদের আয়াতক্ষেত্রাকার কক্ষের উপরে ছাউনি দেয়ার কৌশল হিসেবে চৌচালার ব্যবহার করতে হয়। এটি তারা বেছে নেয় বাংলা ঘরের স্থাপত্য নকশা থেকে।

মোগল সম্রাট শাহজাহান প্রায় ১৬ বছর বাংলাতে কাটিয়েছিলেন। এরপর বাংলা ঘরের চালা ছাদের নকশাকে তিনি তার সাম্রাজ্যের অনেক স্থাপত্যে ব্যবহার করতে শুরু করেন। মোগল আমলের বিভিন্ন স্থাপত্যে বিষয়টির নিদর্শন আজও মেলে।

রাজনৈতিক কারণে বেশ কয়েক বছর সম্রাট শাহজাহান বাংলাতে অবস্থান করতে হলে সে সময়গুলোতে বেশকিছু বাংলা স্থাপত্যশৈলী দিয়ে তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন যেমন বাঁকানো ছাউনি আর চৌচালা গম্বুজ। পরবর্তী সময়ে দিল্লিসহ ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মোগল স্থাপত্যে তিনি বাংলার নকশাগুলো সংযুক্ত করেন। মোগল ফোর্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ যেমন খাসমহলের ছাদ, দেওয়ানি খাসমহল কিংবা অডিয়েন্স হল এমনকি মোগল ফোর্টের প্যাভিলিয়নে চৌচালা গম্বুজের ব্যবহার লক্ষণীয়।

ঔপনিবেশিক আমলের শুরুতে ব্রিটিশ নির্মাতারা ইংল্যান্ডের স্থাপত্যরীতি অনুসরণ করলেও ক্রমশ তারা শংকর স্থাপত্যধারার প্রচলন করে, যা কিনা ব্রিটিশ ইসলামিক স্থাপত্য নকশার মিশ্রণ। সময়ে ব্রিটিশ নির্মাতারা বেশকিছু ইসলামিক স্থাপত্য নকশা উপকরণ গ্রহণ করে যেমন কিয়স্ক। আর মোগল কিয়স্কগুলোতে চৌচালা গম্বুজাকৃতির ছাউনি ব্যবহূত হতো।

উনিশ শতকের শেষ দিকে ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশের বিষয়টি বাংলা কুঁড়েঘর ধরনের স্থাপত্যরীতি অধিগ্রহণের মাধ্যমে চিত্রিত হয়। কিন্তু কীভাবে স্থাপত্যরীতিটিকে অধিগ্রহণ করা হয়?

অস্থায়ীভাবে স্বল্প সময়ের মধ্যে নির্মাণ সম্ভব বলে অন্যান্য ইউরোপিয়ানের মতো ব্রিটিশরাও বাংলা কুঁড়েঘরের স্থাপত্য নকশা দিয়ে প্রভাবিত হয়। বিশেষ করে তাদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সময়কালে অস্থায়ী ঘর নির্মাণের বিষয়টি তাদের জন্য সহজতর ছিল।

ঔপনিবেশিক আমলের শুরুর দিকে ব্রিটিশরা তাদের কারখানা কিংবা তথাকথিত ব্যারাকের মধ্যেই বসবাস করত। কেননা নিরাপত্তাজনিত কিছু বিধিনিষেধ ছিল যে তারা তাদের নির্দিষ্ট জায়গার বাইরে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে থাকতে পারবে না। অন্যদিকে বাণিজ্যিক পরিসর বৃদ্ধি আর অঞ্চলের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে তাদের জন্য ক্রমশ বাংলার অভ্যন্তরীণ ভূখণ্ডে প্রবেশ করাটা জরুরি হয়ে পড়ে। এজন্য তাদের পক্ষ থেকে অস্থায়ী বাসস্থান তৈরির বিষয়টিতে জোর দেয়া হয়। কেননা তারা তো দীর্ঘদিনের জন্য সেগুলোতে অবস্থান করবে না। অস্থায়ী ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা থেকেই তারা বাংলা ঘর তৈরি করতে শুরু করে। তাছাড়া বাংলা ঘর স্বয়ং একটি অস্থায়ী বাসস্থান।

অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ব্রিটিশরা এটা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় যে বাংলা কুঁড়েঘরগুলো মূলত বিভিন্ন বৈচিত্র্যে ভরা, বিশেষ করে ভারতে তাদের নতুন উপনিবেশ স্থাপনের জন্য তারা এটিকে নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী তৈরি করে নিতে পারবে।

ব্রিটিশরাজ তার প্রশাসনের চাহিদা মোতাবেক তাই এক ঘরবিশিষ্ট বাংলা ঘরের পরিসর বাড়িয়ে স্থায়ীভাবে কয়েকটি কক্ষবিশিষ্ট ভবনে রূপ দেয়া হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি হলো সার্ভিস রুম বাসার সাহায্যকারীদের জন্য কক্ষ নির্মাণ। পরবর্তী সময়ে আভিজাত্যপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য তারা নিজেদের সুবিধা যোগ করে। তবে উত্তরোত্তর আভিজাত্যের চাহিদা পূরণের অর্থটা এসেছে ঔপনিবেশিক সম্পদের মাধ্যমে। আভিজাত্যের উৎকর্ষ পূরণের জন্য আর ঘরের ভেতর কৃত্রিম বাতাস সঞ্চালনের জন্য সিলিংয়ের সঙ্গে তারা পাঙ্খা অথবা হাতে টানা পাখা সংযুক্ত করে। কখনো কখনো বাংলোতে বড় পরিসরের প্লাটফর্ম জুড়ে দেয়া হতো, সেখানে বাড়ির কাজের লোকেরা নিচে মেঝেতে বসে কাজ করত বা বিশ্রাম নিত। এর মাধ্যমে সামাজিক পার্থক্যকরণের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবেই ফুটে ওঠে। বাংলোর উন্নতি সাধন বিশেষ করে ব্রিটিশ শর্তাবলি পূরণপূর্বক পূর্ণাঙ্গ বাসস্থান হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে দুটো ঘটনা বড় ধরনের প্রভাব ফেলে, যা ঘটে উনিশ শতকের মাঝামাঝি। ১৮৫৪ সালে একটি অন্তর্নিহিত ব্রিটিশ প্রশাসনিক এবং সাধারণ স্থাপনা নির্মাণের উদ্দেশ্যে গণপূর্ত বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৮৫৮ সালে ভারতের শাসনভার সরাসরি ব্রিটিশ রাজশক্তির হাতে স্থানান্তরিত হয়। ঘটনাটি সরকারি প্রশাসনিক ভবন তৈরির পাশাপাশি ভারতে ব্রিটিশদের বসবাসের জন্য আবাসিক ভবন তৈরিকে প্ররোচিত করে। সে সময়ে অনেক বাঁকানো ঢালু ছাদের বদলে প্রশাসনিক মিলিটারি মডেলের বহুকক্ষ সমন্বিত একতলা ভবন তৈরি করা হয়, এর মাধ্যমে বাংলোর মূল বৈশিষ্ট্য অপসারিত হয়। অন্যদিকে, বসবাসের জন্য ব্যক্তিগত ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বাঁকা ঢালু ছাদের প্রচলন অপরিবর্তিত রেখে ব্রিটিশ বাংলোগুলোতে বিভিন্ন বৈচিত্র্য যোগ করা হয়।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত চট্টগ্রাম শহরে ঔপনিবেশিক আমলের অফিসারদের বসবাসের জন্য বাংলোগুলো তৈরি করা হয়েছিল পাহাড়ের ওপর। বাংলাগুলো অসামরিক আবাসনের উদাহরণ। এর মধ্যে কোনো কোনো বাংলো দোতলা। যেগুলোতে হস্তশিল্প আর অলংকরণের নিখুঁত বিজ্ঞানকে তুলে ধরা হয়েছে; যেমন রঙিন কাচের জানলা, নকশা করা গ্রিল কাঠের জাফরির কাজযা কিনা অস্ট্রিয়া মিলিটারি মডেলের স্থাপত্যরীতি থেকে বের হয়ে আসার বিষয়টিকে স্পষ্টভাবে চিত্রিত করে।

বাংলোর নকশা মূলত বাংলার দেশজ স্থাপত্যের ওপর ভিত্তি করে গঠিত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলো ব্রিটিশদের আবিষ্কার, কেননা ব্রিটিশদের আগমের আগে আমাদের এখানে কখনো এত বড় পরিসরে বাংলো নির্মিত হয়নি। তাছাড়া বাংলার স্থাপত্য নকশার সঙ্গে তারা নির্দিষ্ট কিছু ব্রিটিশ শৈলীর সমন্বয় ঘটিয়েছে, যেমন কাঠের মেঝে সম্ভবত বাংলাতে এর প্রচলন ছিল না, এরপর জানালায় ঝাঁপের (শাটার) ব্যবহার, কখনো জানালায় রঙিন কাচের ব্যবহার, ভেনিসীয় খড়খড়ি, ঝুলছাদ ইত্যাদি মূলত ব্রিটিশদের হাত ধরেই এসেছে।

ইউরোপে বাংলোর প্রচলনের পর এর নকশাতে বেশকিছু পরিবর্তন সাধিত হয়। বিশেষ করে উনিশ শতকে বাংলো তৈরিতে নব্য ধ্রুপদী ধারার বেশকিছু স্থাপত্য নকশার পাশাপাশি গৃহ সরঞ্জামাদি ব্যবহারের সুবিধা যুক্ত করা হয়। বাংলোর সবচেয়ে চমত্কার বিষয়টি হচ্ছে এর উচ্চতার বিন্যাস। ঘরের মাঝামাঝি অংশ বারান্দা থেকে তুলনামূলক বেশি উচ্চতাবিশিষ্ট। ধরনের নকশা প্রাকৃতিকভাবে সূর্যের আলো প্রবেশের পাশাপাশি গরমের দিনগুলোতে বাতাস চলাচলের সুবিধাসম্পন্ন। ভারতের প্রায় সর্বত্র বাংলোর ধরনের বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। যা কিনা ইউরোপের বসবাসরত ব্রিটিশদের আদর্শ বাসস্থানের প্রতীক হয়ে ওঠে।

বাংলোতে ইউরোপিয়ান শৈলী যোগ কেবল এর পরিধি, কাঠামো নান্দনিক মূল সূত্রাবলিকে পরিবর্তন করেনি, বরং নতুনভাবে আরো অনেক বৈশিষ্ট্য যোগ করেছে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে কিছু প্রোটেস্ট্যান্ট গির্জা বাংলো আদলে নকশা করা হয়। বাংলাদেশের সিলেট এবং উত্তর-পশ্চিমে ধরনের স্থাপত্যের সন্ধান মেলে। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে চট্টগ্রামে নির্মিত হাসপাতাল আর বাড়িগুলো বাংলো আদলে নির্মিত।

বাংলোর সঙ্গে সে সময়ের কটেজ বা খামারবাড়িগুলোর নকশাগত অনেক মিল পাওয়া যায়। যেমন উন্মুক্ত মাঠের মাঝে একটা ভবন গড়ে তোলা, যেখানে আপনাকে সাহায্যের জন্য অনেক ব্যক্তি হাজির থাকবে, আর এর মাধ্যমে আপনার ভূস্বামীর পদমর্যাদা রক্ষিত হবে। কারণগুলো বাংলোর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে।

বিষয়টি সম্ভবত অনেকটাই হাস্যকর যে বিংশ শতাব্দীতে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলো অনেকটাই ইউরোপীয় পরিচয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। ব্রিটিশদের অনুকরণে অঞ্চলের ধনী পরিবারগুলো যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরদের পরিবারও শহর থেকে দূরে নিজেদের জন্য অভিজাত বাংলো তৈরি করেছিল। এখানে বসে বিশ্বকবি তার সবচেয়ে স্মরণীয় লেখাগুলো লিখেছিলেন। তবে মূল পরিবর্তনটা আসে যখন ভারতের স্থানীয় মধ্যবিত্ত ধনী পরিবারগুলো শহরের অভ্যন্তরে নিজেদের বসবাসের জন্য ইউরোপীয় আদলে বাংলোর ছোট সংস্করণ তৈরি করতে শুরু করে। সিলেট শহরে ধরনের কিছু নমুনার হদিস মেলে। প্রথম দিকের মতো গ্রামীণ সবুজে ভরা অবসরযাপন কেন্দ্র নয়, বরং বাংলোগুলো ছিল ডুয়েল ইউনিটের।

ব্রিটিশরা যখন ভারতবর্ষে অধিক হারে আসতে শুরু করে তখন মূলত মধ্যবিত্ত শ্রেণীনির্ভর একটি উন্নয়ন কাঠামো জরুরি হয়ে ওঠে। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ কিন্তু ইউরোপে হয়নি। মধ্যবিত্ত শ্রেণীটি ছিল মূলত ইউরোপীয় শিক্ষায় শিক্ষিত। ব্রিটিশরা তাদের দিয়ে নিজেদের উদ্দেশ্যসাধন তথা নিজেদের প্রশাসনিক সহযোগিতা করার জন্য তৈরি করেছিল। ইউরোপীয় ধারার শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া এবং ইউরোপীয়দের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে শ্রেণীটি মূলত জীবনাচারে ইউরোপিয়ানদের অনুসরণ করতে শুরু করে। তারা চেষ্টা করে ইউরোপীয়দের মতো হতে। তাই সহজাতভাবেই তারা ব্রিটিশদের অনুকরণ করত। আর কারণেই অঞ্চলের স্থানীয় অভিজাত পরিবারগুলো ভবন নির্মাণে বাংলোর ইউরোপীয় নকশাকে অনুসরণ করতে শুরু করে।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের ভারতবর্ষ ত্যাগের সময় তাদের ব্যবহূত প্রাসাদসম বাংলোগুলো পড়ে থাকে আর তা খুব শিগগিরই সরকারি কর্মকতাদের দ্বারা অধিকৃত হয়। তাই আজও প্রশাসনের সঙ্গে বাংলোর সংযোগ বিদ্যমান রয়েছে। তাছাড়া বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে বাংলো এখনো চমকপ্রদ অবসর আর অবকাশযাপনের প্রতীক।

(ইংরেজি থেকে ভাষান্তর শ্রুতিলিখন: রুহিনা ফেরদৌস)

 

. আবু সাঈদ এম আহমেদ: ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক চেয়ারম্যান

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন