বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ২১, ২০১৯ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

প্রথম পাতা

ব্যবসার পরিবেশে দুর্বলতা সত্ত্বেও বিনিয়োগ থেকে ঈর্ষণীয় আয় বহুজাতিক কোম্পানির

মেহেদী হাসান রাহাত

দেশে ব্যবসা শুরু করতে সময় লাগে সাড়ে ১৯ দিন। বিদ্যুৎ পেতেও গড়ে ১২৫ দিন অপেক্ষা করতে হয়। আইনকানুনের জটিলতায় সম্পত্তি নিবন্ধন থেকে শুরু করে ব্যবসায়িক বিরোধ নিষ্পত্তিতে লম্বা সময় চলে যায়। এসব কারণে ব্যবসার পরিবেশ সূচকে বাংলাদেশ এখনো নিচের সারিতে। তা সত্ত্বেও বিনিয়োগ থেকে ঈর্ষণীয় আয় করছে বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনাকারী বহুজাতিক বড় কোম্পানিগুলো।

প্রতিষ্ঠানের আর্থিক পারফরম্যান্স পরিমাপের অন্যতম মাপকাঠি রিটার্ন অন ইকুইটি (আরওই) বা শেয়ারহোল্ডারদের বিনিয়োগের বিপরীতে আয়। এর মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠান তার শেয়ারহোল্ডারদের অর্থ কতটা দক্ষতার সঙ্গে বিনিয়োগ করে সর্বোচ্চ রিটার্ন নিশ্চিত করতে পারছে, সেটি বোঝা যায়। দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আরওই বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রিটার্ন অন ইকুইটির হার বিবেচনায় উপরের দিকে থাকা বেশির ভাগ কোম্পানিই বহুজাতিক।

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ৩১৯টি কোম্পানির রিটার্ন অন ইকুইটির তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, শীর্ষ ২০ কোম্পানির মধ্যে সাতটিই বহুজাতিক। এগুলো হচ্ছে ম্যারিকো বাংলাদেশ, রেকিট বেনকিজার বাংলাদেশ, গ্রামীণফোন, জিএসকে বাংলাদেশ, সিঙ্গার বাংলাদেশ, লিন্ডে বাংলাদেশ ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ।

১৬১ দশমিক ২৬ শতাংশ রিটার্ন অন ইকুইটি নিয়ে সবার উপরে আছে এফএমসিজি খাতের বহুজাতিক কোম্পানি ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেড। ভারতের মুম্বাইভিত্তিক বহুজাতিক কোম্পানিটির বিশ্বের ২৫টি দেশে কার্যক্রম রয়েছে। গ্রুপটির টার্নওভারের ২২ শতাংশই আসে ভারতের বাইরে থেকে। ভারতের বাইরে থেকে আসা টার্নওভারের ৪৬ শতাংশই আবার বাংলাদেশে। ম্যারিকো ইন্টারন্যাশনালের আর্থিক প্রতিবেদন অনুসারে কোম্পানিটির বৈশ্বিক রিটার্ন অন ইকুইটি ৩৪ শতাংশ।

১৫২ দশমিক ৪৭ শতাংশ রিটার্ন অন ইকুইটি নিয়ে ম্যারিকো বাংলাদেশের পরই আছে আরেক বহুজাতিক কোম্পানি রেকিট বেনকিজার বাংলাদেশ লিমিটেড। কোম্পানিটির রিটার্ন অন ইকুইটির বৈশ্বিক গড় যেখানে ১৪ শতাংশ।

১০৬ দশমিক ৩২ শতাংশ রিটার্ন অন ইকুইটির ভিত্তিতে তৃতীয় স্থানে রয়েছে টেলিকম খাতের বহুজাতিক জায়ান্ট গ্রামীণফোন লিমিটেড। গ্রামীণফোনের মূল প্রতিষ্ঠান টেলিনরের নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান মিয়ানমারে ব্যবসা রয়েছে। বছরের ৩০ জুন শেষে টেলিনরের সমন্বিত রিটার্ন অন ইকুইটি ছিল ২৫ দশমিক ৯৯ শতাংশ। সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন অনুসারে ২০১৮ সালে ফিনল্যান্ডের ডিএনএর আরওই ছিল ১৬ দশমিক শতাংশ থাইল্যান্ডের ডিট্যাকের আরওই ছিল ঋণাত্মক ২০ শতাংশ। থাইল্যান্ডে কোম্পানিটি গত বছর পরিচালন লোকসানে ছিল। বিশ্বের অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে গ্রামীণফোনের গ্রাহকও অনেক বেশি।

আরওই তালিকায় চতুর্থ স্থানে রয়েছে ওষুধ খাতের বহুজাতিক কোম্পানি গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইন (জিএসকে) বাংলাদেশ লিমিটেড। কোম্পানিটির রিটার্ন অন ইকুইটি ৬১ দশমিক ৩২ শতাংশ।

বহুজাতিক কোম্পানি ম্যারিকো বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের পরিচালক এবং জিএসকে বাংলাদেশের পর্ষদ চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন মাসুদ খান। দেশে ব্যবসায় প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগের বিপরীতে ঈর্ষণীয় আয়ের কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ব্যবসায় প্রতিবন্ধকতার সমস্যাটি স্থানীয় বহুজাতিক সবার জন্যই প্রযোজ্য। কিন্তু স্থানীয় বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ব্যবসার ধরন, পরিচালন পদ্ধতিসহ অনেক কিছুতেই পার্থক্য রয়েছে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো অনেক কিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে একটি টেকসই লাভজনক ব্যবসায়িক মডেল দাঁড় করিয়েছে। তারা ব্র্যান্ডিংকে অনেক গুরুত্ব দেয়। নিয়োগ দেয় সবচেয়ে মেধাবী, দক্ষ যোগ্য কর্মীকে। স্থানীয় কোম্পানিগুলোর মতো অপ্রয়োজনীয় বিনিয়োগ তারা করে না। নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো কর্মীদের দক্ষতা বাড়ায়, যাতে এসব কর্মী প্রতিষ্ঠানে তার সক্ষমতার পুরোটা দিতে পারেন। তাছাড়া বহুজাতিক কর্মীদের উচ্চহারে পারফরম্যান্সভিত্তিক ইনসেনটিভও দেয় বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। ফলে কর্মীরা প্রতিষ্ঠানের প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন এবং এতে কর্মপরিবেশও অনেক ভালো থাকে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ব্যবসার প্রতিটি প্রক্রিয়া পূর্বনির্ধারিত লিখিত আকারে থাকে। এতে কোনো কর্মী বদল হলেও প্রক্রিয়ার পরিবর্তন হয় না। সর্বোপরি কঠোরভাবে করপোরেট সুশাসন পরিপালন করে তারা। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো চলতি মূলধন দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করায় ব্যাংকঋণও খুব বেশি প্রয়োজন হয় না তাদের। এছাড়া তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে অনেক পণ্য নিয়ে আসার কারণে খরচ কম হয়। এসব কারণেই মূলত স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঈর্ষণীয় পারফরম্যান্স করে।

প্রকৌশল খাতের বহুজাতিক কোম্পানি সিঙ্গার বাংলাদেশ লিমিটেডের রিটার্ন অন ইকুইটির হার ৪০ শতাংশ। সিঙ্গার বাংলাদেশের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স ডিরেক্টর মানবসম্পদ প্রধান মোহাম্মদ সানাউল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ১১৪ বছর ধরে আমরা এখানে ব্যবসা করছি। কীভাবে চলতি মূলধনকে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়ে সর্বোচ্চ রিটার্ন নিশ্চিত করা যায়, সেটাই আমাদের লক্ষ্য। আমরা মনে করি, কোম্পানির আয় তার শেয়ারহোল্ডারদের জন্য। এজন্য আমরা শেয়ারহোল্ডারদের সবসময় সর্বোচ্চ লভ্যাংশ দেয়ার চেষ্টা করি।

ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্যাস উৎপাদনকারী বহুজাতিক কোম্পানি লিন্ডে বাংলাদেশ লিমিটেডের রিটার্ন অন ইকুইটির হার ২৫ শতাংশ। লিন্ডে গ্রুপের রিটার্ন অন ইকুইটির হার যেখানে দশমিক ৬৭ শতাংশ।

তামাক খাতের বহুজাতিক জায়ান্ট ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ লিমিটেডের (বিএটিবিসি) রিটার্ন অন ইকুইটির হার ২৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এর মূল প্রতিষ্ঠান ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর (বিএটি) রিটার্ন অন ইকুইটি শতাংশ।

ব্যবসায় পরিবেশের প্রতিবন্ধকতার মধ্যেই বাংলাদেশে বিনিয়োগ থেকে ঈর্ষণীয় আয় পাচ্ছে এসব বহুজাতিক কোম্পানি। বিশ্বব্যাংকের ডুয়িং বিজনেস ২০২০ প্রতিবেদনের ইজ অব ডুয়িং বিজনেস সূচকে ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৮তম। আগের বছর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৭৬তম। অর্থাৎ বাংলাদেশের ব্যবসার পরিবেশ এখনো অনেক দুর্বল।

এর মধ্যেও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ভালো করার কারণ সম্পর্কে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) সভাপতি বিএটিবিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শেহজাদ মুনিম বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় হচ্ছে। হতদরিদ্র অবস্থা থেকে মানুষ বেরিয়ে আসছে। দেশের মানুষ যা আয় করে, তার বড় একটা অংশ খরচ করে। এটা বাংলাদেশের বাজারের একটা ভালো দিক। সুতরাং এখানে ভালো পণ্য সেবা নিয়ে যে ব্যবসা করতে আসবে, তার জন্য রিটার্ন অর্জন করা সম্ভব। ঝুঁকি যেখানে বেশি থাকবে, সেখান থেকে রিটার্ন আসাই উচিত। বাংলাদেশের বাজারে বিনিয়োগ করলে ২০ শতাংশ রিটার্ন আসাটাই স্বাভাবিক।

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন