শুক্রবার | ডিসেম্বর ১৩, ২০১৯ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

শেয়ারবাজার

অতিমূল্যায়িত ও অবমূল্যায়িত শেয়ার চিনবেন যেভাবে

পুঁজিবাজারে জনপ্রিয় একটি প্রবাদ আছে, ‘দর হলো আপনি যা পরিশোধ করে থাকেন আর মূল্য বা ভ্যালু হলো আপনি যা পান। স্মার্ট বিনিয়োগের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো, অবমূল্যায়িত বা আন্ডারভ্যালুড শেয়ার খুঁজে বের করা ও অতিমূল্যায়িত বা ওভারভ্যালুড শেয়ার এড়িয়ে চলা। যদিও ভ্যালুর ধারণায়ও রয়েছে নানা রকমফের। একেকজনের কাছে ভ্যালুর ধারণা একেক রকম।

ভ্যালুয়েশনে ভিন্নতার উদাহরণ হিসেবে ফ্লিপকার্টকে বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। বড় ধরনের লোকসান করার পরও, বিক্রির সময় কোম্পানিটির ভ্যালুয়েশন করা হয় ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার, যা কিনা অবিশ্বাস্য বলে মনে করেন অনেকে। ফ্লিপকার্টের এ অবিশ্বাস্য ভ্যালুয়েশনকে আপনি কীভাবে বিচার করবেন? এ ধরনের বিষয়ে বিচার করা খুবই কঠিন। ফ্লিপকার্টের মতো ব্যতিক্রমী কোম্পানির বিষয় বিবেচনায় না নেয়াই ভালো। কিন্তু স্বাভাবিক বাজার পরিস্থিতিতে আপনি কীভাবে একটি কোম্পানির ভ্যালুয়েশন করবেন? পাঁচটি উপায় কাজে লাগিয়ে আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন একটি শেয়ার ওভারভ্যালুড নাকি আন্ডারভ্যালুড।

 

মূল্য-আয় অনুপাত (পিই রেশিও) বা আর্নিংস ইল্ড

শেয়ার ভ্যালুয়েশনের সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতিগুলোর একটি মূল্য-আয় অনুপাত বা পিই রেশিও। ধরা যাক, একটি শেয়ারের পিই রেশিও ১০ এবং অন্য একটি শেয়ারের পিই রেশিও ২৫। যে শেয়ারটির পিই রেশিও ২৫ সেটি কি ওভারভ্যালুড? অথবা যেটির পিই রেশিও ১০, সেটি কি আন্ডারভ্যালুড? অবশ্যই তা নয়।

পিই রেশিওকে সবসময় দেখতে হবে একটি কোম্পানির প্রবৃদ্ধি, মার্জিন ও ব্র্যান্ড ভ্যালুর ওপর ভিত্তি করে। ভারতের অটোমোবাইল কোম্পানি মারুতি সুজুকি মাসের পর মাস উচ্চপ্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারার কারণেই এর পিই রেশিও অন্যদের তুলনায় বেশি। একই উদাহরণ দেয়া যায় ভারতের তথ্যপ্রযুিক্ত খাতের কোম্পানি টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেসের ক্ষেত্রেও। শক্তিশালী ব্র্যান্ড ভ্যালুর কারণে ইউনিলিভার বা ব্রিটানিয়ার মতো কোম্পানির পিই রেশিও সবসময় বেশি থাকে। তার পরও সূচকের পরিপ্রেক্ষিতে চিন্তা করলে অবশ্যই নিম্ন পিই রেশিওকে আমরা আন্ডারভ্যালুয়েশন এবং উচ্চ পিই রেশিওকে ওভারভ্যালুয়েশন হিসেবে বিবেচনা করতে পারি।

আর্নিংস ইল্ডের ভিত্তিতেও একটি শেয়ারের ভ্যালুয়েশন করা যেতে পারে। আর্নিংস ইল্ড হলো নিট মুনাফার সাপেক্ষে একটি শেয়ারের আয়। আর্নিংস ইল্ডকে ইল্ডস অন ডেটের সঙ্গে তুলনা করে একটি শেয়ারের ভ্যালুয়েশন করা যায়। যদি একটি শেয়ারের ইল্ড অন ডেটের তুলনায় আর্নিংস ইল্ড বেশি হয়, তাহলে ধরা নেয়া যায় শেয়ারটি আন্ডারভ্যালুড।

 

প্রাইস টু বুক ভ্যালু রেশিও

প্রাইস টু বুক ভ্যালু রেশিও বা পিবিভি রেশিও মূলত কিছু নির্দিষ্ট খাতের শেয়ার ভ্যালুয়েশনের জন্য বেশি প্রযোজ্য। একটি শেয়ারের দর এবং এর বুক ভ্যালুর (নিট মূল্য) রেশিও এখানে হিসাব করা হয়। ব্যাংক ও আর্থিক খাতের জন্য এ রেশিও সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য। এসব খাতে মার্জিনগুলো সাধারণত  স্থিতিশীল, যার কারণে পিবিভি রেশিও এখানে ভ্যালুয়েশনের জন্য কার্যকরী। একটি শেয়ারের পিবিভি রেশিও কম হলে একে আন্ডারভ্যালুড শেয়ার হিসেবে ধরা হয়।

 

ইভি/ ইবিআইটিডিএ রেশিও

ধরা যাক, যদি একটি কোম্পানি এখন পর্যন্ত কোনো মুনাফা করেনি। এ ধরনের কোম্পানির শেয়ারের ভ্যালুয়েশন আপনি কীভাবে করবেন? জ্বালানি, টেলিকম বা ইন্টারনেট কোম্পানিগুলোকে এক্ষেত্রে বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। এ ধরনের কোম্পানিগুলোর সাধারণত মুনাফা করতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়। এসব কোম্পানির শেয়ার ভ্যালুয়েশনের উপায় হলো ইভি/ ইবিআইটিডিএ রেশিও। ইভি বা ইকোনমিক ভ্যালু হলো, এক্সটার্নাল ডেট বাদ দিয়ে একটি কোম্পানির বাজারমূল্য। অর্থা একটি কোম্পানি অধিগ্রহণে যে মূল্য পরিশোধ করা হয় তা-ই কোম্পানিটির ইকোনমিক ভ্যালু। অন্যদিকে ইবিআইটিডিএ বা আর্নিংস বিফোর ইন্টারেস্ট, ট্যাক্সেস, ডেপ্রিসিয়েশন অ্যান্ড অ্যামরটাইজেশন হলো একটি কোম্পানির মুনাফা, যার সঙ্গে কোম্পানির ক্যাপিটাল স্ট্রাকচারের কোনো সম্পর্ক নেই। ইভি/ইবিআইটিডিএ রেশিও কম হলে একটি শেয়ারকে তুলনামূলক আন্ডারভ্যালুড শেয়ার হিসেবে ধরে নেয়া হয়। কোম্পানি অধিগ্রহণ বা একীভূতকরণের ক্ষেত্রে এ ধরনের ভ্যালুয়েশন সবচেয়ে বেশি কার্যকর।

 

ডিভিডেন্ড ইল্ড

আন্ডারভ্যালুয়েশন বুঝতে আমরা কি ডিভিডেন্ড ইল্ডকে কাজে লাগাতে পারি? অবশ্যই কিছুমাত্রায় কাজে লাগানো যায়। ডিভিডেন্ড ইল্ড হলো একটি কোম্পানির শেয়ারপ্রতি লভ্যাংশ ও শেয়ারদরের অনুপাত। যদি একটি কোম্পানির শেয়ারদর ১০০ টাকা হয় এবং কোম্পানিটি লভ্যাংশ হিসাবে শেয়ারহোল্ডারকে শেয়ারপ্রতি ৫ টাকা প্রদান করে তাহলে ডিভিডেন্ড ইল্ড হলো ৫ শতাংশ। ডিভিডেন্ড ইল্ড যত বেশি হবে একটি শেয়ারের ভ্যালুয়েশন তত কম হবে। যদিও সাধারণ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এটি খুব একটা ঠিক কাজ করে না। প্রবৃদ্ধির খুব বেশি সম্ভাবনা না থাকা সত্ত্বেও উচ্চ লভ্যাংশ প্রদানকারী কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে ইতিবাচকভাবে দেখা হয়। তবে সামগ্রিক সূচকের পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করলে ডিভিডেন্ড ইল্ড ভ্যালুয়েশনের জন্য কার্যকরী। মার্কেট সবসময় চায় প্রবৃদ্ধি, সুতরাং উচ্চ ডিভিডেন্ড ইল্ডকে খুব বেশি ইতিবাচক হিসেবে দেখা যায় না।

 

শেয়ারের মার্জিন অব সেফটি

ওয়ারেন বাফেটতত্ত্ব থেকে মূলত এ ধারণার সৃষ্টি। শেয়ার ভ্যালুয়েশনের ক্ষেত্রে এ ধারণাটিকে সম্প্রতি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। একটি শেয়ারের মার্জিন অব সেফটি হলো, শেয়ারটির অন্তর্নিহিত প্রকৃত ভ্যালু (যা কিনা একজন অ্যানালিস্ট নির্ণয় করেন) এবং এর প্রকৃত বাজারদরের মধ্যকার পার্থক্য।

শেয়ারের প্রকৃত ভ্যালুর তুলনায় শেয়ারদর কম হলে মার্জিন অব সেফটি উচ্চ হিসেবে ধরা হয়। মার্জিন অব সেফটি যত বেশি, একটি শেয়ার তত বেশি আন্ডারভ্যালুড। অন্যদিকে মার্জিন অব সেফটি যত কম, শেয়ারটি তত বেশি ওভারভ্যালুড।

 

আইআইএফএল অবলম্বনে

মেহেদী হাসান সবুজ

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন