সোমবার | নভেম্বর ১৮, ২০১৯ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

টেরাকোটা-পর্ব ৩

লোকস্থাপত্য, কুঁড়েঘর ও ব্রিটিশের বাংলো

শামীম আমিনুর রহমান

সভ্যতার আদিতেই মানুষ প্রাকৃতিক গুহা থেকে সমতলে এসে বসবাস শুরু করে। পাহাড়ের পাদদেশে কিংবা সমতলে সে সহজলভ্য উপাদান যেমন গাছের ডাল, পাতা, মাটি, পাথর, কাঠ নানাবিধ এসব উপাদান দিয়ে তৈরি করে নেয় তার আশ্রয়। এটি তৈরিতে তার ওই স্থানে প্রাপ্ত উপাদান ভূমির প্রাকৃতিক স্বরূপ, আবহাওয়ার সঙ্গে টিকে থাকতে সেই ঘরখানিকে দেয় প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ রূপ বা কাঠামোর বিশেষ ধরন। আমাদের এই দেশসহ বিশ্বের সর্বত্রই এমনটি ঘটেছে। মরুভূমির তপ্ত ভূমিতে মোটা মাটির পাথরের দেয়ালে থাকত ছোট ছোট জানালা প্রচণ্ড গরম তপ্ত হাওয়া থেকে বাঁচতে। সে ঘরের রূপ আমাদের দেশের সাধারণ ঘরের মতো নয়। আফ্রিকায় গাছের ডাল ভূমিতে গোল করে পুঁতে তার অগ্রভাগ শক্ত দড়ি দিয়ে বেঁধে গোল তাঁবুর মতো আকৃতি দেয়া হয়। সেই কাঠামো ঘিরে দেয়া হয় কাদামাটি দিয়ে। ধরনের গৃহ, যা আজও আফ্রিকান উপজাতিদের মধ্যে প্রচলন রয়েছে। এসবই প্রকৃতপক্ষে লোকস্থাপত্য, যা হাজার হাজার বছর ধরে নির্মিত হয়ে আসছে। লোকস্থাপত্যের পূর্বশর্তই হচ্ছে সহজলভ্য উপাদান, ব্যবহারের উপযোগিতা এবং স্থানীয় কীর্তি-কৌশল তাদের শৈলীর ছাপ। স্থাপত্যরীতিতে প্রধানত তিনটি বিষয় যেমন জলবায়ু, স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য উপাদান এবং রাজনৈতিক, সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রভাব ইত্যাদির ফলে গড়ে ওঠে প্রতিটি অঞ্চল বা দেশে তাদের নিজস্ব লোকজ স্থাপত্যশৈলী। আর আমাদের রয়েছে সেই চিরায়ত নিজস্ব লোকজ স্থাপত্যের উজ্জ্বল উদাহরণ শাশ্বত বাংলার হাজার বছরে গড়ে ওঠা বাংলা কুঁড়েঘর। স্থানীয় আবহাওয়া উপযোগী সহজলভ্য উপাদানে তৈরি এই বাংলার কুঁড়েঘর সারা ভারতবর্ষের জন্য উদিত হয়েছিল গৃহের এক অনুপম অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। গ্রীষ্মমণ্ডলে অবস্থিত বাংলাদেশের আবহাওয়া খুবই আর্দ্র এবং প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে বিশেষ করে বর্ষা ঋতুতে বাসোপযোগী ঘরবাড়ি এমনভাবে তৈরি করতে হয়, যাতে ছাদের পানি সহজে গড়িয়ে পড়তে পারে। কারণে ছাদ ঢালু করা হয়। আবহমান বাংলার কুটিরের বর্ণনা দিয়েছেন রমেশ চন্দ্র মজুমদার, ‘বাংলাদেশের বেশীর ভাগ বাঁশের খুঁটি খড়ের চাল দিয়া ঘর তৈয়ারী হইত। দো-চালা চার-চালা সাধারণত ঘরের এই দুই শ্রেণী। দেখা যায় কাঠের ইটের বাড়ীর ছাদ ইহার অনুকরণেই নির্মিত হইত। অর্থাৎ সরল রেখার পরিবর্তে ঘরের চালের ন্যায় কতকটা বাঁকানো হইত। দুইটি বাঁশ অল্পদূরে পুতিয়া তাহার মাথা নোয়াইয়া বাঁধিয়া দিলে যে আকৃতি ধারণ করে, ইটের পাথরের স্তম্ভের উপর গঠিত খিলানগুলিও তাহার অনুকরণ করিত।বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বাস করে এবং তারা সহজলভ্য সাধারণ উপকরণ মাটি বাঁশ দিয়ে ঘরবাড়ি তৈরি করে। বাঁশের তৈরি কুঁড়েঘরে বাঁশের চাচ দিয়ে তৈরি করে দেয়াল বা মাটি দিয়েও দেয়াল নির্মিত হয়। ছাদ তৈরি হয় খড় বা ছন দিয়ে। এসব গৃহের ছাদ সাধারণ দোচালা বা চারচালা হয়। চালাঘরের মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে চালের বক্রাকার কার্নিশ। চালের সংখ্যা অনুযায়ী দোচালা, চারচালা এমনকি আটচালা হয়েও থাকে। চালাঘর বা বাংলা কুটিরের বর্ণনা প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে অহরহ পাওয়া যায়। দীনেশ চন্দ্র সেনের ভেলুয়া সুন্দরীর কাহিনীতে পাওয়া যায় বাংলা গৃহের নানা বর্ণনা।

বড় বড় ঘর তার আট-চালা চৌ-চালা।অন্য একটি বর্ণনায়

নাটমন্দির জোড় বাঙ্গলা

দোরে হাতী বাহিরে ঘোড়া।

বাংলার লোকজ স্থাপত্যশৈলীর ব্যাপক সফলভাবে স্থায়ী ইমারত নির্মাণে ব্যবহূত বা প্রয়োগ হয়েছিল মুসলিম শাসনামলে। লেখক অমিয় কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তার বাংলা মন্দিরের স্থাপত্য ভাস্কর্য গ্রন্থে লিখেছেন, ‘মধ্যযুগে মুসলমান স্থাপতিরা যখন তাঁদের খিলান গম্বুজ তৈরির বিদেশী দক্ষতা অভিজ্ঞতা নিয়ে আবির্ভূত হলেন তখন বঙ্গদেশের মন্দির নির্মাণ রীতির এক যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটে গেলো।মুসলিমদের আগমনের পর বিশেষ করে বাংলায় মসজিদ মন্দির নির্মাণে বাংলাদেশের চিরন্তন লোকজ স্থাপত্য অর্থাৎ কুঁড়েঘরের হেলানো ছাদ বা চালা ছাদের বাঁকানো কার্নিশের ব্যবহার এবং ইটের দেয়াল আবৃত করতে বাংলার বিখ্যাত টেরাকোটা টাইলের ব্যবহার শুরু হয়। বিশেষ করে ইটের তৈরি মন্দির স্থাপত্যে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। মুসলিম শাসনে প্রাক-মুসলিম যুগে যে ভারতীয় ক্ল্যাসিক্যাল রীতিতে স্থাপত্যচর্চার প্রচলন ছিল, তা হ্রাস পেয়ে এক নতুন অনবদ্য বাংলার নিজস্ব স্থাপত্যশৈলীর আবির্ভাব ঘটে। ডেভিড ম্যাককাচ্চন তার গ্রন্থ বাংলার মন্দিরের পোড়ামাটির অলংকরণ, পশ্চিম বাংলার লোকশিল্পে উল্লেখ করেন, ‘মুসলমানদের আগমনে ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের কর্তৃত্ব নষ্ট করে দেশজ ভাবধারাকে মুক্ত করেছিল। সুলতানী আমলেই প্রথম বাঙালী নামে একটি স্বতন্ত্র জাতির সৃষ্টি হয়। নিজস্ব ভাষা সাহিত্যে স্থাপত্যের অধিকারী একটি জাতি। কাজেই নিয়ে কোন তর্ক নেই যে মন্দির মসজিদের পোড়ামাটি শিল্প এবং সেই সঙ্গে তাদের স্থাপত্য-রীতি একান্তভাবেই জাতীয় চরিত্র বিশিষ্ট।এক্ষেত্রে আমি মনে করি, প্রকৃতপক্ষে মুসলিম শাসনামলে বাঙালিদের সাহিত্য শিল্প সুলতান কর্তৃক সমাদৃত হয়।

তারা বাঙালির সাহিত্য শিল্পের সব ক্ষেত্রকে সমাদৃত প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

তাদের আগে বাঙালি জাতি তাদের স্বকীয়তা বা শিল্প সাহিত্যকর্ম গুপ্ত পাল ঐতিহ্যের প্রভাব সর্বভারতীয় সংস্কৃতির চাপে স্বীকৃতি বা প্রসারলাভ করতে পারেনি। ফলে প্রাক-মুসলিম বাংলায় বাঙালি স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে সংগঠিত বা জাতিসত্তাকে প্রতিষ্ঠিত বা সঙ্গায়িত করা সম্ভব হয়নি। মুসলিম শাসনে বাংলার নিজস্ব লোকস্থাপত্য রীতির বিবর্তন দেখা যায় শ্রীচৈতন্য দেবের আগমনে। ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে বাংলার সর্বত্র অসংখ্য ইটের তৈরি টেরাকোটা মন্দির নির্মিত হয়। বাংলার সর্বজনীন লোকস্থাপত্য কুঁড়েঘরের যে বিশাল প্রভাব পড়েছিল সর্বত্র, তা গুরুসদয় দত্তের গ্রন্থের (পশ্চিম বঙ্গের লোকশিল্প কলকাতা, ১৯৭৬) লেখায় পাওয়া যায়।

মুসলিম যুগে জন্ম নিয়েছিল এক দেশজ ভাস্কর্য’— বাংলাদেশের নিজস্ব উপকরণ পোড়া এবং কাঁচা মাটির তৈরী বাংলার দেশজ শিল্পীদের হাতে মুক্ত স্বাধীন আবেগে যার মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে এক স্বাতন্ত্র্য জাতীয় চিন্তাধারা, বাংলাদেশের জীবন বোধ, বাংলাদেশের প্রকৃতি চিন্তা, বাঙালীর বিশ্বভাবনা।আমরা প্রভাব দেখতে পাই এখনো নানা মন্দিরে টিকে থাকা কয়েকটি মসজিদ বা মাজারে। খুলনার বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ মাজার, চাঁপাইনবাবগঞ্জের দরসবাড়ি মসজিদ, রাজশাহীর ছোট সোনামসজিদ, রাজশাহীর পুঠিয়ায় একবাংলা ছোট আহ্নিক মন্দির, পাবনার জোড়বাংলা গোপীনাথ মন্দির, রাজশাহীর পুঠিয়ায় চারচালা গোপালের মন্দিরএগুলো সব বাংলার নিজস্ব স্থাপত্যশৈলী, যার মূল সুর গ্রামীণ বাংলার কুঁড়েঘর থেকেই প্রভাবিত।

মোগলপূর্ব সুলতানি আমল ছাড়াও মোগল আমল বাংলা ছাড়াও ভারতের অন্য অঞ্চলেও এই বাংলা রীতির প্রভাব দেখা যায়। মোগল স্থাপত্যের ইতিহাসে বাংলার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যপূর্ণ চালা স্থাপত্যের প্রভাব দেখা যায় সুদূর আগ্রা, দিল্লি লাহোরে। আগ্রার দুর্গে বাংলা মহলটি বাংলার দোচালা চারচালার সংমিশ্রণে নির্মাণ করা হয়েছে। সাতমসজিদে বক্রাকার কার্নিশ চালাঘরের মতো নিদর্শন রয়েছে। দেওয়ানি আমের বিখ্যাত সিংহাসন বাংলার কুঁড়েঘরের আদলেই ছাদটি নির্মিত হয়েছে। মোগল-পরবর্তী যুগে অর্থাৎ দেশ তথা ভারতীয় মহাদেশে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য স্থাপনের পরও বাংলার কুঁড়েঘর বা বাংলা ঘর এক বিশাল প্রভাব বিস্তার করেছিল। ভারতের নানা অঞ্চলে ব্রিটিশ সিভিলিয়ানরা দেশ শাসনের প্রয়োজনে বসবাস করতে লাগলেন। দেশে তাদের বসতবাড়ির জন্য দেশের আবহাওয়া উপযোগী এমন একটি মডেল খুঁজছিলেন, যা হতে পারে তাদের একটি আদর্শ উদাহরণ। এসব ব্রিটিশ কর্মকর্তা তাদের বসতবাড়ি নির্মাণ করলেন বাংলা কুঁড়েঘর থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে। তাদের সেই বসতবাড়ির নাম দেয়া হয় বাংলা, বাংলো অথবা বাঙ্গালো। ঐতিহ্যবাহী বাংলা কুঁড়েঘর স্থানীয় আবহাওয়ার বিবেচনাটি সমন্বয় করে উত্তরণ ঘটল নতুন এক বসতবাড়ি, যার নাম বাংলো। ব্রিটিশদের ভারতীয় নানা অঞ্চলে বসবাসের উপযোগী এমন একটি গৃহ, যা হয়ে উঠল সর্বতো আদর্শ সমাধান। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো খড়ের বা ছনের ঢালু ছাদ, প্রশস্ত বারান্দা, মাটির তৈরি উঁচু ভিত্তি এবং এক এককযুক্ত গৃহ। প্রধান গৃহের আশপাশে তৈরি হতো ছোট ছোট ঘর বা প্রধান গৃহের সেবাদানের জন্যই তৈরি হতো। রান্নাঘর, গোয়ালঘর কিংবা বাবুর্চিখানা ইত্যাদি নানা প্রয়োজনে তা নির্মিত হতো।

এই বাংলোর রূপটি নানা বৈরী আবহাওয়ায় এতটাই কার্যকরী ছিল যে ব্রিটিশরাজ ভারত মহাদেশ ছাড়াও অন্যত্র বিশেষ করে আফ্রিকায় সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ করলে সেখানেও এই বাংলা বা বাংলো নির্মাণ করেছিল। আজও ভারতের নানা অংশে এবং অন্য দেশে বাংলা বা বাংলো নামটি সুপরিচিত, যা এই বাংলারই নিজস্ব ঐতিহ্যে প্রথিত। আজও বাংলাদেশের গ্রামের জনসাধারণ বাংলা ঘর তৈরি করে চেলেছে। তার উপাদান মাটি, বাঁশ, ছনের পরিবর্তে আজ হয়তো ইট, কাঠ টিনের চালার ব্যবহার হলেও এখনো তাতে বাংলার সেই আদি রূপটি খুঁজে পাওয়া যায়।

. নীহাররঞ্জন রায়ের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে লেখাটি শেষ করছি।

সাম্প্রতিক বাংলাদেশের পল্লীগ্রামে আজও বাঁশ বা কাঠের খুঁটির উপর চতুষ্কোণ নকশার ভিত্তিতে মাটির দেয়াল বা বাঁশের চাচরির বেড়ায় ঘেরা যে ধরনের ধনুকাকৃতি দো-চালা, চৌ-চালা, আট-চালা ঘর দেখতে পাওয়া যায় তাহাই বাংলা রীতি নামে খ্যাত এবং তাহাই পরবর্তীকালে মধ্যযুগীয় ভারতীয় স্থাপত্যে বাংলার দান বলিয়া গৃহীত স্বীকৃত হইয়াছিল।

 

শামীম আমিনুর রহমান: বাংলাদেশ সরকারের গৃহায়ণ গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন