বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ১৪, ২০১৯ | ৩০ কার্তিক ১৪২৬

টেরাকোটা-পর্ব ৩

শিতলাই প্রাসাদ তাড়াশ

ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম

পাবনার তাড়াশ রাজবাড়ি, যা প্রচলিতভাবে তাড়াশ ভবন নামে পরিচিত, বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি ঐতিহাসিক স্থাপত্য নিদর্শন ভবনটি তৈরি করা হয়েছিল আঠারো শতকের কোনো এক সময় ব্রিটিশ শাসনামলে তাড়াশ রাজবাড়ী বা তাড়াশ ভবনটি নির্মাণ করেন তাড়াশ এস্টেটের তত্কালীন জমিদার রায় বাহাদুর বনমালী রায় সতেরো শতকে জনৈক বাসুদেব তালুকদার ছিলেন এই জমিদারির গোড়াপত্তনকারী পরবর্তীকালে ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে দত্তক পিতা বনওয়ারীলাল রায়ের মৃত্যুর পর বনমালী রায় তার পিতার বিষয়-সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন তিনি অসাধারণ প্রতিভাসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন তার সুব্যবস্থাপনায় জমিদারির আয় অনেক বৃদ্ধি পায় সমাজ উন্নয়নের লক্ষ্যে জমিদার রায়বাহাদুর বনমালী রায় পাবনায় বেশকিছু সংগঠনমূলক কাজের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন তিনি নানা রকমের প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন, যার মধ্যে রয়েছে বনওয়ারী নগর সিবিপি উচ্চবিদ্যালয়পাবনা এডওয়ার্ড কলেজবনমালী ইনস্টিটিউট, টমসন হল, ইলিয়ট শিল্প বিদ্যালয়, হাসপাতাল, টাউন হল, পাবনা ইলিয়ট বনমালী টেকনিক্যাল স্কুল ইত্যাদি জনহিতকর কাজের জন্য তিনি দুর্ভিক্ষ ভাণ্ডার, জগন্নাথ দেবের মন্দির সংস্কারসহ আরো অনেক কাজের জন্য অর্থ দান করে গেছেন

তদানীন্তন ব্রিটিশ সরকার বনমালী রায়ের নামের প্রশংসা করে ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দেঅভিষেকঅনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাকেরায়বাহাদুরউপাধিতে ভূষিত করেন এর পাশাপাশি তিনি আরো অনেক পুরস্কার খেতাব পেয়েছেন দেশহিতকর কাজে তিনি বহু অর্থ জমি দান করে গেছেন বনমালী রায়কে বৃহত্তর পাবনা জেলার শ্রেষ্ঠ জমিদার বলা হয়

তার নির্মিত তাড়াশ ভবন স্থাপত্যের দিক দিয়ে ইউরোপীয় রেনেসাঁ রীতির সঙ্গে অনেক মিল পাওয়া যায় প্রাথমিকভাবে সামনে দাঁড়িয়ে দেখতে গেলে পাবনার তাড়াশ ভবন অত্যন্ত আকর্ষণীয় দৃষ্টিনন্দন ঔপনিবেশিক যুগে নির্মিত দোতলা ইমারতটি পাবনা শহরের মধ্যে প্রধান সড়কের পশ্চিম পাশে অবস্থিত একটি অর্ধবৃত্তাকৃতির খিলানযুক্ত তোরণপথ দিয়ে (প্রবেশপথ) পূর্বমুখী এই প্রাসাদ চত্বরে প্রবেশ করতে হয় দেশে ধরনের প্রবেশ তোরণ দুর্লভ তোরণটি প্রাচীন গ্রিকের তিনটি ক্ল্যাসিক্যাল স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম ডরিক অর্ডারে নির্মিত তোরণটি মোট আটটি থামের ওপর দাঁড়িয়ে আর মাঝে অর্ধবৃত্তাকার খিলানপথ তোরণ সে সময়ে অর্থ প্রতিপত্তির তীব্র বহিঃপ্রকাশ ছিল এই তোরণের কারণেই জায়গাটি স্থানীয়ভাবে রায়বাহাদুর গেট নামে বেশি পরিচিত তাড়াশ ভবনের রায়বাহাদুর গেট থেকে মূল ভবনের দিকে পা বাড়াতেই পুরনো স্থাপত্য যেন ফিসফিস করে বলে ওঠে পুরনো রাজা-বাদশাহদের ইতিহাসের অজানা কথা আয়তাকৃতির মূল ভবনটির আয়তন প্রায় ৩০ মিটার গুণন ১৮ মিটার ইমারতটির সম্মুখে একটি অভিক্ষিপ্ত দোতলা গাড়িবারান্দা বিদ্যমান গাড়িবারান্দার উপরিস্থিত ছাদ সুবিশাল চারটি করিন্থীয় স্তম্ভের ওপর স্থাপিত ইমারতটির উভয় শেষ প্রান্তে করিন্থীয় শীর্ষসংবলিত আয়তাকৃতির পিলাস্টারসহ আরো দুটি অভিক্ষিপ্ত অংশ রয়েছে প্রাসাদটির অলংকরণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে অর্ধবৃত্তাকৃতির খিলান এছাড়া আরো ব্যবহূত হয়েছে বিভিন্ন রকমের ব্যান্ড নকশা তাড়াশ ভবনের দরজা-জানালাগুলো দামি আর মজবুত কাঠের তৈরি এবং দরজা জানালার উপরে অর্ধবৃত্তাকার অংশে রঙিন কাচের খোপ পার্টিশন দেয়া প্রধান তিনটি ঘরের দেয়ালে, মেঝে থেকে প্রায় সাড়ে তিন ফুট উচ্চতা পর্যন্ত হালকা নকশার কাঠের প্যানেল লাগান দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাব সংস্কারহীন থাকায় তাড়াশ ভবনের ছাদের বিভিন্ন স্থান, সিঁড়িপথ বিশেষ করে দোতলার বারান্দার কার্নিশ বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অবশ্য এর দেয়ালের গাঁথুনি এখনো যথেষ্ট মজবুত কাজেই সংস্কার করলে ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন ইমারতটিকে আরো দীর্ঘকাল ব্যবহার করা সম্ভব হবে বলা চলে উনিশ শতকের শেষের দিকে নির্মিত এই প্রাসাদটি এখনো সুরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে বিভিন্ন ধরনের রূপান্তর পরিবর্তনের পরেও ভবনটি এখনো টিকে আছে অনেকটা অবিকৃত অবস্থাতেই ভবনটিতে জমিদাররা স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন না কেননা বনওয়ারী লাল তার পরবর্তী চার পুরুষের মূল বসবাস ছিল পাবনা জেলার ফরিদপুরের বনওয়ারী রাজবাড়িতে তার দুই পুত্র (দত্তক) ক্ষিতিশভূষণ রাধিকাভূষণ ১৯৫০ সালের জমিদারি প্রথা বিলোপ পর্যন্ত তাড়াশের জমিদারি পরিচালনা করেছেন তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সময়কালে পুরো জমিদার পরিবার ভবনে আশ্রয় নিয়েছিলেন বলে জানা যায়

শিতলাই প্রাসাদ

পাবনা জেলার স্থাপত্যিক নিদর্শন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা শিতলাই প্রাসাদের কথা উল্লেখ করতে হয় শহরের বাইরে পূর্বদিকে রাঘবপুর এলাকায় এবং একসময়ে বহমান পদ্মা নদীর উত্তর তীরে (এখন পদ্মা নদী এখান থেকে অনেক দূরে সরে গেছে) এই প্রাসাদটি অবস্থিত এটি একটি দ্বিতল সুবিশাল অট্টালিকা, যা এখনো সুরক্ষিত অবস্থায় বিদ্যমান উনিশ শতকের প্রথমদিকে শিতলাইয়ের জমিদার যোগেন্দ্রনাথ মিত্র এটি নির্মাণ করেছিলেন যোগেন্দ্রনাথ মৈত্রের ১৫ একর জায়গায় সুউচ্চ প্রাচীর দিয়ে ঘিরেশিতলাই হাউসনামে এই বিশাল প্রাসাদটি নির্মাণ করেন আধুনিক দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদটি দোতলা হলেও বিশাল অট্টালিকা পর্যায়ে পড়ে এতে রয়েছে ৩০টি কক্ষ প্রাসাদটি ইন্দো-ইউরোপিয়ান বা ঔপনিবেশিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত প্রাসাদের পাশেই বিশাল দীঘি, দীঘির চার পাড়ে শান বাঁধানো ঘাট ছাদের ভার বহনের জন্য টানা বারান্দার সম্মুখে স্থাপিত রয়েছে অনেকগুলো স্তম্ভ করিন্থীয় শীর্ষসংবলিত লোহার নির্মিত এসব পিলারও বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ইমারতের মেঝে ধবধবে সাদা প্রস্তরে আচ্ছাদিত অন্যদিকে প্রাসাদের উত্তর গৃহমুখের কেন্দ্রস্থলের অভিক্ষিপ্ত গাড়িবারান্দাটি বর্তমানে ধ্বংসপ্রাপ্ত এই গৃহমুখের উত্তর-পশ্চিম কোনার ওপর রয়েছে একটি অক্টাগোনাল শীর্ষদেশ প্রাসাদের দক্ষিণ গৃহমুখের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে অভিক্ষিপ্ত আরেকটি বারান্দা এই বারান্দার বৈশিষ্ট্য বাংলার অন্য সব ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ অন্যদিকে বারান্দাটির সম্মুখে নিচতলায় একটি অর্ধবৃত্তাকৃতির খিলানসারি দৃশ্যমান এর দোতলা বরাবর দৃষ্টি দিলে ধ্রুপদী করিন্থীয় রীতির স্তম্ভের সারি চোখে পড়ে তবে এখান থকে বাইরের দিকে অভিক্ষিপ্ত বারান্দার উপরের যে ছাদ তার উপরের উত্থিত দেয়াল তথা পাঁচিল ত্রিকোণাকৃতির বৈশিষ্ট্যযুক্ত

শিতলাই প্রাসাদের আদি বাসিন্দারা এসেছিলেন শরত্নগর থেকে ইতিহাস থেকে জানা যায়, শরত্নগরের জমিদাররা নাটোরের রানী ভবানীর কাছ থেকে ওই অঞ্চলে জমিদারি লাভ করেছিলেন শরত্নগর এস্টেটের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন চাঁদি প্রাসাদ মৈত্রেয় রাজশাহীর খ্যাতিমান লোকনাথ মৈত্রেয় এই বংশেরই একজন ছিলেন লেখাপড়ার উদ্দেশ্যে লোকনাথ মৈত্রেয় তার পৈতৃক আবাসস্থল ছেড়ে প্রথমে নাটোর এবং পরে রামপুর-বোয়ালিয়ায় (রাজশাহী) গমন করেন পরবর্তীকালে উত্তরাধিকার ভিত্তিতে যোগেন্দ্রনাথ মৈত্রেয় এস্টেটের মালিক হয়েছিলেন যোগেন্দ্রনাথ মৈত্রেয় শ্রীরামপুরের জমিদার কিশোরীলাল গোস্বামীর কন্যা সরলা দেবীকে বিয়ে করেছিলেন কথিত আছে সরলা দেবী শরত্নগরে যেতে অস্বীকৃতি জানালে তিনি শিতলাইয়ের পৈতৃক আবাসভূমি ছেড়ে পাবনা শহরে এসেছিলেন সেখানে তারা শিতলাই হাউজ নির্মাণ করেন বাসস্থান হিসেবে স্বদেশী ভাবধারায় দীক্ষিত যোগেন্দ্রনাথ তার সন্তানদের অত্যন্ত সাধারণভাবে মানুষ করেছিলেন জমিদারি ঠাটবাটের কোনো বাড়াবাড়ি ছিল না মৈত্রেয় পরিবারেরশিতলাই হাউজ’- যোগেন্দ্রনাথ ছিলেন সংস্কৃতিমনস্ক নিজে একাধিক বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারতেন বাড়িতে বসত শাস্ত্রীয় সংগীতের আসর বিখ্যাত গায়ক-বাদকরা আসতেন যোগেন্দ্রনাথ রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন স্বদেশী আন্দোলনের সঙ্গে ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তাই শিতলাই হাউজে একসময় বিপ্লবীদের আনাগোনা চলত নিয়মিত যোগেন্দ্রনাথ নিজে চরকা কেটে গামছা, ধুতি ইত্যাদিও তৈরি করতেন গান্ধীজি পাবনায় এলে শিতলাই হাউজের আতিথ্য গ্রহণ করেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুও যোগেন্দ্রনাথের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং পাবনার শিতলাই হাউজে যান বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাধিকবার পাবনায় গিয়েছিলেন তাদের পরিবারের শিলাইদহ এস্টেট ছিল শিতলাই এস্টেটের পদ্মাপারের বাড়ির বিপরীত পাড়ে তার ছিন্ন পত্রাবলির অনেকগুলো রচিত হয় শিতলাই হাউজের বজরায় বসে

১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে পাবনায় উত্তরবঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের প্রথম দিনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ সম্মেলনের বিদগ্ধ সাহিত্যিক, সংস্কৃতিমান ব্যক্তিরা শিতলাইয়ের জমিদার যোগেন্দ্রনাথ মৈত্রেয়র বাসভবন শিতলাই হাউজের আতিথেয়তা গ্রহণ করেছিলেন শুধু তাই নয়, কলকাতার হপসিং কোম্পানির ফটোগ্রাফারকে দিয়ে তারা ফটোসেশন করিয়েছিলেন ১৯৫০ সালের পূর্ববঙ্গ জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ আইন অনুযায়ী শিতলাই জমিদারির বিলুপ্তি ঘটে তবে শিতলাই প্রাসাদটি বর্তমানে বাংলাদেশের একটি ড্রাগ প্রস্তুত ল্যাবরেটরির অধিকারে রয়েছে এই স্থাপত্যটি এখন শুধু স্থানীয়ভাবেই নয়, বাংলাদেশের ঔপনিবেশিক স্থাপত্য হিসেবে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ

 

. মো. আনোয়ারুল ইসলাম: অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর পাবনা বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন