রবিবার | নভেম্বর ১৭, ২০১৯ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

টেরাকোটা-পর্ব ৩

ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী শশী লজ

মিয়া মুহাম্মদ মারুফ

ঔপনিবেশিক বাংলায় যে কয়েকটি স্থান আঞ্চলিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল তার মধ্যে ময়মনসিংহ অন্যতম অঞ্চলে নির্মিত বিভিন্ন স্থাপনা ওই সময়ে তার সমৃদ্ধির কথা জানান দেয় বিশেষত, ময়মনসিংহ শহরের মধ্যস্থলে ব্রহ্মপুত্র নদের ১৫০ ফুট দক্ষিণে অনিন্দ সুন্দর শশী লজ প্রাসাদটি ঔপনিবেশিক যুগের স্মৃতি ধারণ করে আজও টিকে আছে উনিশ শতকের মাঝামাঝি মুক্তাগাছার মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী স্থানে প্রথমে একটি দ্বিতল ভবন নির্মাণ করেন একটা পর্যায়ে এসে ভূমিকম্পে ওই ভবনটি ধ্বংস হয়ে যায় জনশ্রুতি অনুযায়ী, এই দ্বিতল ভবনে একটি সুড়ঙ্গ পথ ছিল, এই পথ দিয়ে মুক্তাগাছায় যাতায়াত করা যেত, আবার দ্বিতল ভবনের কাঠের সিঁড়ির সঙ্গে প্যারিস থেকে আনা মিউজিক্যাল বক্স ছিল সিঁড়িতে ওঠানামার সময় মিউজিক্যাল বক্স থেকে সুমধুর সংগীত বাজত দ্বিতল পাকা বাড়ি ধ্বংস হওয়ার পর সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী একতলা ভবনটি নির্মাণ করেন প্রায় নয় একর জমির ওপর এই ভবনটি এখনো টিকে আছে কালের সাক্ষী হয়ে

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক শশীলজের মূল ভবনটি সংরক্ষিত, যা ময়মনসিংহ জেলার গঙ্গাদাস গুহ রোডে জেলা পরিষদের উল্টো দিকে অবস্থিত এই সুরম্য ভবনটি জমিদারদের স্থাপত্য শিল্পের সৌন্দর্য ঘোষণা করছে ভবনের প্রধান ফটকটি দোতলা স্থাপত্য এর উপরে একটি বর্গাকার প্যানেল রয়েছে অন্যদিকে ফটকের নিচের মধ্যবর্তী অংশে পাঁচ খাঁজবিশিষ্ট অর্ধগোলাকৃতির নেভ পাওয়া যায় এই নেভের মধ্য দিয়ে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করা যায় নেভের দুই দিকে বর্গাকার ভিতের ওপর তিনটি করে স্তম্ভ রয়েছে স্তম্ভ তিনটির মাঝেরটি বর্গাকার দুদিকের স্তম্ভ গোলাকার অবকাঠামো হিসেবে দৃশ্যমান এর মাঝের বর্গাকার স্তম্ভে খাঁজকাটা খিলানযুক্ত লম্বা কুলুঙ্গি রয়েছে এর বেশির ভাগ স্তম্ভগুলোর ক্যাপিটাল নেভের অর্ধগোলাকার খিলানের শেষ অংশ একই সমান্তরালে অবস্থিত তবে নেভের উপরের বর্গাকার প্যানেলের দুই দিকে দুটি গোলাকার ছোট স্তম্ভ প্যানেলের কার্নিশে গিয়ে ফুলদানি নকশার সঙ্গে মিশে গিয়ে এক অদ্ভুত মায়াবী শৈল্পিকতার পরিচয় দিচ্ছে

পিলার দুটির মাঝখানে দুদিকে বর্গাকার স্তম্ভ সংযুক্ত পাঁচ খাঁজবিশিষ্ট ছোট আরেকটি খিলান রয়েছে খিলানের অভ্যন্তরে নিরাপত্তারক্ষী পাহারায় থাকত ফটকটি মোগল স্থাপত্যরীতিতে তৈরি লালবাগ কেল্লার ফটকের সঙ্গে ফটকের সামঞ্জস্য রয়েছে ফটকের দুদিক থেকে অর্থাৎ পূর্ব-পশ্চিম দিক থেকে ভবনের বাউন্ডারি দেয়াল চারদিকে প্রসারিত হয়েছে দেয়ালের উপরের অংশ নদীর ঢেউয়ের আকৃতিতে তৈরি করা হয়েছে দুটি সারিতে এই ঢেউ নকশা তৈরি করা হয়েছে এবং ঢেউ নকশাগুলো রিবনের মতো বাঁধন দিয়ে মজবুত করা হয়েছে ফটকের পূর্বদিকের দেয়ালের উত্তরাংশে কয়েকটি ছোট ছোট কক্ষ রয়েছে এগুলো প্রহরীদের থাকার কক্ষ ছিল এরপর প্রধান ফটক থেকে লম্বা রাস্তা ভবনের সামনে স্নানরতা ভেনাসের ভাস্কর্য সংযুক্ত ফোয়ারার সামনে গিয়ে পূর্ব পশ্চিমে দুই ভাগ হয়ে ভবনের পেছন পর্যন্ত চলে গেছে

বাগানের মধ্যে স্থাপিত ফোয়ারার চারদিকের সরু ওয়াকওয়ে দিয়ে ভবনের চারদিকে অভ্যন্তরে যাতায়াত করা যায় প্রধান ফটক ভবনের মাঝখানে পূর্ব পশ্চিমে গোলাকার ভিতের মধ্যে ফুলের বাগান ছিল পশ্চিম দিকের বাগান নিশ্চিহ্ন, পূর্ব দিকের গোলাকার ভিতে জ্যামিতিক নকশায় ফুলের বেড করা হয়েছে বাগানের মাঝখানে সিমেন্ট দিয়ে তৈরি গোলাকার বেডটি ফুলের মধ্যাংশ এবং এর চারদিকে আটটি ত্রিভুজ আকৃতির বেড ফুলের নকশা তৈরি করেছে বেডগুলোর ভেতরে নানা ধরনের ফুলের গাছ রয়েছে অন্যদিকে ভবনের সামনে ঢেউ খেলানো ঘেরা অংশের ভেতরে রয়েছে সাদা মার্বেল পাথরের ভাস্কর্য তিন ধাপবিশিষ্ট গোলাকার ভিতের ওপর দণ্ডায়মান বর্গাকার অলংকৃত স্তম্ভের ওপর এই ভাস্কর্যটি স্থাপতি স্নানরত অর্ধনগ্ন একটি ভেনাসের প্রতিকৃতি এখানে ভাস্কর্য হিসেবে স্থাপন করা হয়েছে এখানকার ঢেউ খেলানো ঘেরা অংশের ওপর চারদিকে বিভিন্ন রঙের বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবস্থা ছিল ফোয়ারার পানি বিদ্যুতের আলোর মিশ্রণে রঙিন আলোর বর্ণচ্ছটা এক অপূর্ব সুন্দর আবহের সৃষ্টি করত ঢেউ খেলানো ফোয়ারা ঘেরা চারদিকে পাকা পথ আয়তাকৃতির চত্বরটি ছোট ছোট বর্গাকার স্তম্ভের সাহায্যে নির্মিত এখানে খাঁজের শেষ অংশ অর্থাৎ দেয়ালের উপরিভাগ সাদা মার্বেল পাথরে সজ্জিত স্তম্ভগুলোর উপরে বৈদ্যুতিক স্পট লাইট জ্বালানো হয়

ভেনাসের ভাস্কর্য বসানো ঝরনা চত্বরের পেছনে দক্ষিণ দিকে ভূমি থেকে তিন ফুট উঁচুতে শশীলজের মূল ভবন ভবনটির দৈর্ঘ্য ২২২ ফুট প্রস্থ ১৫৫ ফুট ভবনটির মোট তিনটি অংশ রয়েছে এক. ভবনটির মধ্যাংশ আয়তাকার উত্তর-দক্ষিণে লম্বালম্বিভাবে অবস্থিত দুই. মধ্যাংশের পেছনের বারান্দার সঙ্গে সংযুক্ত পূর্ব পশ্চিম দিকে দুটি বর্গাকার ব্লকে কক্ষ এবং তিন. সম্মুখভাগের বারান্দার পূর্ব পশ্চিম কোণে আয়তাকার কক্ষ অষ্টভুজী বারান্দার পূর্ব পশ্চিম কোণে আয়তাকার কক্ষ অষ্টভুজী বারান্দাসহ কক্ষ রয়েছে এবং মধ্যবর্তী সম্প্রসারিত অংশে পোর্চ রয়েছে সম্পূর্ণ ভবনটি চারদিক থেকে E অর্থাৎ ইংরেজিআকৃতির মনে হয় এখানে ভবনের সামনের মধ্যভাগে পোর্চ বা গাড়িবারান্দা রয়েছে এই পোর্চের বাইরে অংশে ভবনের বারান্দা সংযুক্ত কক্ষ রয়েছে ছাদঢাকা বারান্দাগুলো বর্গাকার, আয়তাকার, অর্ধগোলাকার আটকোনা নকশায় তৈরি তবে পোর্চের উত্তর-পূর্ব পশ্চিম দিক থেকে অংশে প্রবেশ করা যায়

শশীলজের মূল ভবনের সামনে উত্তর, পূর্ব পশ্চিমে তিন ফুট উঁচু আয়তাকার এবং বর্গাকার ভিতের ওপর গোলাকার স্তম্ভসংবলিত পোর্চ রয়েছে উত্তর দিকে তিনটি করে ছয়টি এবং পূর্ব পশ্চিমে তিনটি করে ছয়টি মোট বারোটি স্তম্ভ পোর্চের ছাদকে ধরে রেখেছে পোর্চটি গাড়িবারান্দা হিসেবেও ব্যবহার হতো পোর্চটির উত্তর দিকে অর্থাৎ ভবনের সামনের দিকে পূর্ব-পশ্চিমে তিন ফুট উঁচুতে আয়তাকার ফুলদানিসদৃশ ভিত বিদ্যমান এই ভিতের ওপর দুটি স্তম্ভ রয়েছে ওই স্তম্ভের সংযুক্ত বর্গাকার ভিতের ওপর রয়েছে আরেকটি স্তম্ভ এখানে মোট তিনটি করে ছয়টি স্তম্ভ দৃশ্যমান পাশাপাশি পূর্ব-দক্ষিণ পশ্চিম-দক্ষিণ দিকে একই রকমভাবে তিনটি করে ছয়টি স্তম্ভ দেখা যায় এই সবগুলো স্তম্ভ গিয়ে ছাদের সঙ্গে সংযুক্ত পূর্ব-দক্ষিণ পশ্চিম-দক্ষিণের স্তম্ভগুলোর মাঝখানে ভবনের ভেতরে বারান্দায় ওঠার জন্য সিঁড়ি রয়েছে

শশীলজে মূল পোর্চের ছাদ বর্গাকার সমতল লোহার বিম কড়িকাঠের ওপর ছাদের ভার বহন করা হচ্ছে এখানে পোর্চের ছাদের কার্নিশের সঙ্গে স্তম্ভগুলো সংযুক্ত, কার্নিশের ব্র্যাকেট ফুল নকশায় অলংকৃত পোর্চের ছাদ ভবনের ছাদ থেকে অপেক্ষাকৃত নিচু ভবনের উত্তরে পোর্চের দক্ষিণ দিকে ভবনের অভ্যন্তরে প্রবেশের জন্য প্রধান প্রবেশপথ রয়েছে প্রবেশপথটি সম্মুখ বারান্দার মধ্যবর্তী অংশে অবস্থিত ভবনের দক্ষিণ, পূর্ব পশ্চিমে আরো তিনটি প্রবেশপথ রয়েছে প্রবেশপথগুলো বুরুজ, স্তম্ভ সহযোগে নির্মিত খিলানবেষ্টিত, খিলানগুলো বর্গাকার প্যানেলে আবদ্ধ ভবনের চারদিকের বারান্দা কক্ষসংলগ্ন দরজা রয়েছে দক্ষিণ দিকের বারান্দায় কক্ষসংলগ্ন দুটি দরজা আছে অন্যদিকে ভবনের সামনের চারটি কক্ষের সঙ্গে রয়েছে চারটি দরজা সব মিলিয়ে এখানে ছয়টি দরজা দিয়ে ভবনের অভ্যন্তরে যাতায়াত করা যায় ভবনের প্রতিটি অংশে বারান্দা কক্ষ থেকে যাতায়াত করা যায়, যা এর অনন্য একটা বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত

এখানে ভবনের সামনে মূল প্রবেশপথের খিলান বর্গাকার বুরুজ থেকে উত্থিত হয়েছে এই খিলানের দুই দিকে তিনটি করে গোলাকার পিলার গিয়ে মিশেছে পোর্চের ছাদে অন্যদিকে বারান্দায় প্রবেশপথের দরজাটি কাঠের ফ্রেমে বর্গাকার প্যানেলে সাদা কাচ দিয়ে নির্মিত প্রধান প্রবেশপথের ছাদের ওপর ত্রিভুজ আকৃতির পেডিমেন্ট রয়েছে, যা যুগের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ভবনের চারদিকের বারান্দার খিলানের নিচের পিলারের সংযোগস্থল করিন্থিয়ান অলংকরণে শোভিত এখানকার বেশির ভাগ খিলান খাঁজবিশিষ্ট বর্গাকার প্যানেলে আবদ্ধ একইভাবে দরজা জানালার উপরের তিন খাঁজবিশিষ্ট অর্ধগোলাকার খিলান রয়েছে এখানে খিলানের উপরিভাগে নিচের দিক থেকে ফুলদানি আকৃতির একটি ব্র্যাকেট বা বন্ধনী খিলানগুলোকে দেয়ালের সঙ্গে যুক্ত করেছে বন্ধনীগুলো খিলানের উপরের অংশে দুটি ত্রিভুজ আকৃতির প্যানেল সৃষ্টি করেছে ত্রিভুজের দুদিকে গোলাকার স্তম্ভের ক্যাপিটাল, রয়েছে যার ওপর করা হয়েছে একান্থাস পাতার নকশা পাশাপাশি ত্রিভুজাকৃতির অংশে রয়েছে ফুল লতাপাতার নকশা সব মিলিয়ে শশীলজে মোট চব্বিশটি কক্ষ রয়েছে এখানকার কক্ষগুলোর সামনে পশ্চিম দিকের বারান্দার মাঝখানে একটি প্রবেশপথ রয়েছে অন্যদিকে সামনের বারান্দায় পূর্ব কোণের সম্মুখ ভাগের বর্ধিতাংশে দুটি এবং পশ্চিম কোণে দুটি কক্ষ আছে এই কক্ষগুলোর দরজা ভবনের সম্মুখ দিকে, যার ভূমি নকশা অনেকটাই আয়তাকার আটকোনা আকৃতির

অনন্যসাধারণ স্থাপত্যশৈলীর শশীলজের মধ্যবর্তী অংশের কক্ষগুলোতে কোনো বায়ু চলাচল উপযোগী জানালা নেই তবে এর চারদিকেই রয়েছে প্রশস্ত দরজা অন্যদিকে মধ্যবর্তী তিনটি কক্ষের দরজা দিয়ে প্রতিটি কক্ষেই যাতায়াত করা যায় উত্তর দক্ষিণ দিকের বারান্দার বর্ধিতাংশের কক্ষগুলোতে একটি করে জানালা রয়েছে তবে বারান্দার প্রবেশপথ ব্যতীত প্রতিটি খিলানের মধ্যে জানালা স্থাপিত জানালাগুলো মেঝে থেকে অনতি উচ্চ লোহার রেলিংয়ের ওপর স্থাপন করা হয়েছে এখানকার প্রতিটি কক্ষের খিলানের মধ্যে স্থাপিত দরজার উপরিভাগে সাদা এমবোস করা ফুল লতাপাতা, পাখি ময়ূরের চিত্র রয়েছে ময়ূরগুলোকে পেখম মেলে থাকতে দেখা যায় বাংলাদেশের ঔপনিবেশিক শৈলীর স্থাপত্য হিসেবে শশী লজ গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে বিশেষ করে এর দৃষ্টিনন্দন গঠনশৈলী মনোমুগ্ধকর অলংকরণ যে কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাধ্য

 

মিয়া মুহাম্মদ মারুফ: গবেষক উন্নয়নকর্মী

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন