সোমবার | নভেম্বর ১৮, ২০১৯ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

টেরাকোটা-পর্ব ৩

ঔপনিবেশিক যুগে রাজধানীর স্কুল

আবদুল কাউয়ুম মালেক

মেকুলের মিনিটস অব এডুকেশন প্রকাশ হওয়ার পর থেকে ভারতবর্ষের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নানা জল্পনাকল্পনা শুরু হয় তখন ভারতবর্ষের নানা স্থনের পাশাপাশি বাংলায়ও প্রতিষ্ঠিত হয় অনেকগুলো স্কুল স্থাপনা ভারতবর্ষের নানা স্থানের মতো ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত স্কুলের সাধারণ বৈশিষ্ট্য অনেকটা কাছাকাছি এগুলো বেশ ঠাসাঠাসি অবস্থায় নির্মিত এখানকার মূল বিল্ডিংগুলো প্রাথমিকভাবে কুঠি হিসেবে তৈরি হয়েছিল বলে এগুলোর মধ্যে প্রায় একই রকম বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয় প্রাথমিকভাবে সব স্কুল বিল্ডিংই অভিজাত শ্রেণীর আবাসস্থল বা কুঠি ছিল এই বিল্ডিংগুলোর নিচতলা ব্যবহূত হতো প্রধানত গুদামঘর হিসেবে তবে পরবর্তীকালে বাসস্থান হিসেবে এবং দ্বিতীয় তলা শুধু বসবাসের জন্যই ব্যবহূত হতো মূল দালান দিয়ে মূল অক্ষে প্রবেশের জন্য যে ব্যবস্থা রাখা হয় তার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় হল কক্ষে আলো-বাতাসের চলাচলেরও ব্যবস্থা ছিল

ঔপনিবেশিক যুগে নির্মিত স্কুলের কেন্দ্রীয় হলঘরটি একটা সময়ে ছিল কুঠির সভাকক্ষ এর অন্য রুমগুলো হলঘরের চারদিকে অবস্থিত ভবনগুলো স্কুলের পাঠদান বাদেও বিবিধ কাজে ব্যবহূত হতো ভবনগুলোই বর্তমানে ক্লাসরুম হিসেবে ব্যবহূত তবে কেন্দ্রীয় হলঘরের সঙ্গে অন্য হলগুলোর যোগাযোগের ব্যবস্থা ছিল তবে যোগাযোগ গোপনীয়তা রক্ষার জন্য এক ঘর থেকে অন্য ঘরের ভেতরটা যেন দেখা না যায় সে ব্যবস্থাও ছিল সেকেন্ডারি হলের চতুর্দিকে গৃহকর্মের জন্য গুচ্ছবদ্ধ কক্ষ ছিল

পরবর্তীকালে বিল্ডিংয়ে বিভিন্ন ব্লক তৈরির ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক বিল্ডিংয়ের আকার, অনুপাত বা পরিমাপের কোনো কিছুই অনুসৃত হয়নি এজন্য এসব ইমারত পরবর্তীকালে শুধু অফিস বিল্ডিংয়ের রূপ পরিগ্রহ করে এবং মূল ভবনের সঙ্গে এগুলোর কোনো যোগসূত্র ছিল না

ভূমি নকশা: প্রধান ঔপনিবেশিক বিল্ডিং নির্বাচিত স্থানের মধ্যখানে অবস্থিত ভূমির আকার আকৃতিতে এক ধরনের জটিলতা বিদ্যমান প্রধান ঔপনিবেশিক বিল্ডিংয়ের চারদিকে অনেক খোলা জায়গা আছে বিল্ডিংয়ের সামনের ফাসাদকে বিশিষ্টতা দান করার এবং সৌন্দর্যময়তা বৃদ্ধি করার জন্য ভূমি নকশা প্রণয়নে যত্নবান হওয়ার প্রচেষ্টা লক্ষণীয় এভাবে স্কুলগুলোতে একধরনের নাটকীয়তা মহিমান্বিত রূপের সৃষ্টি হয় বিল্ডিংয়ের পার্শ্ব ফাসাদ বিশেষ করে পেছনের বামদিকের অংশে অলংকরণ অন্যান্য আঙ্গিকের ক্ষেত্রে তেমন গুরুত্বারোপ করা হয়নি

তখনকার নির্মিত বেশির ভাগ স্কুলে প্রবেশের পথ সাধারণত পূর্ব দিক থেকে শুরু হয়ে সরাসরি প্রবেশ বারান্দায় গিয়ে উপনীত হয়েছে প্রধান ইমারতগুলোর বেশির ভাগই দক্ষিণমুখী

ক্ষেত্র বিন্যাস: বিল্ডিংয়ের প্রধান অংশ দুটি জোনে বিভক্ত: প্রথমত, সামনের দিকে খেলার মাঠসহ প্রশাসনিক প্রাথমিক একাডেমিক জোন এবং দ্বিতীয়ত, ল্যাবরেটরি অন্যান্য সুবিধাসহ অতিরিক্ত একাডেমিক জোন প্রধান ইমারতের মধ্যস্থলে নানাবিধ কাজে ব্যবহারের জন্য একটি বড় ধরনের হলঘর এবং এর চারদিকে শ্রেণীবদ্ধ ক্লাসরুম পরবর্তী সংস্কারের সময়ে বায়ু চলাচলের সুবিধার্থে দ্বিতীয় পর্যায়ের অঙ্গনগুলো সংযোজিত হয়েছে সংযোজিত নতুন ব্লকে আলো-বাতাস চলাচলের জন্য শ্রেণীকক্ষগুলোর সামনে দীর্ঘ বারান্দা সন্নিবেশিত করা হয়

বেশির ভাগ স্কুলে আলো-বাতাসের ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়নি এখানকার প্রধান ঔপনিবেশিক বিল্ডিংটি বর্গাকৃতি হওয়ার কারণে এর কেন্দ্রীয় অংশটি স্বাভাবিকভাবেই অন্ধকারাচ্ছন্ন সবকিছু একত্রে ঠাসাঠাসি থাকার কারণে বায়ু চলাচলের সুবিধা এখানে খুবই সীমিত মাথার ওপর দিকে ছাদে কিছু কিছু জায়গায় বাতির ব্যবস্থা থাকলেও বিল্ডিংয়ে আলো বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত

ইমারত আকৃতি: প্রধান ঔপনিবেশিক বিল্ডিংগুলো সাধারণত বর্গাকৃতির দ্বিতল এর অভ্যন্তরভাগ ফাঁকা জায়গাসহ অনেকটা গোছালো পরবর্তীকালে বিল্ডিং থেকে অনেকগুলো উইং তৈরি হয়েছে পরবর্তী সংস্কারের সময়ে অঙ্গনের পার্শ্ববর্তী লম্বা ধরনের আয়তাকার কক্ষ সম্মুখে যে বারান্দা সংযোজনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে তাতে ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের মূল পরিকল্পনার কোনো সাদৃশ্য নেই তাতে বিল্ডিংয়ের সুচারুরূপের প্রকাশ খণ্ডিত হয়েছে এবং এর অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য একাডেমিক উদ্দেশ্যও বিঘ্নিত হয়েছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আচার-অনুষ্ঠানের জন্য নির্মিত বারান্দা অনেকগুলো বলিষ্ঠ স্তম্ভ সংযুক্ত হয়ে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভাবগম্ভীর আকৃতি সৃষ্টি হয়েছে, যা পরবর্তীকালে দর্শনার্থীদের কাছে একটি আকর্ষণীয় স্মারক স্থাপত্য কীর্তি হিসেবে বিবেচিত

নির্মাণ পদ্ধতি বিশ্লেষণ করতে গেলে দেখা যায়, প্রধান ঔপনিবেশিক বিল্ডিংগুলো ভারবাহী ইটের দেয়াল দিয়ে তৈরি এবং এর ছাদ কাঠ বা লোহার বিমের ওপর প্রতিষ্ঠিত দেয়াল ৫০-৫৬ সেন্টিমিটার পুরু, কক্ষের উচ্চতা .৫০ মিটারের বেশি প্রবেশপথে ইটের খিলান এবং .২০-.৫০ মিটার স্প্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ সংযোজিত নতুন ব্লক রড-কংক্রিটের খাম্বায় নির্মিত এবং লিন্টেল সিস্টেমের ছাদ দ্বারা আবৃত

ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল: ঢাকা কলেজসংলগ্ন ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল ১৮৩৫ সালে স্থাপিত পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিল্ডিংয়ের নিচতলায় স্কুলটি মূলতসেমিনার স্কুলহিসেবে শুরু হয় পরবর্তীকালে এর নামকরণ করা হয় ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল এবং তখন এটিকে বর্তমান অবস্থানে স্থানান্তর করা হয় স্কুলটি বর্তমানে ঢাকা , লয়াল স্ট্রিট, সদরঘাটে অবস্থিত স্কুলের আয়তন ৩২,২৯৭ বর্গফুট (.২৪ বিঘা) এবং এর পরিসীমা ৮২০ বর্গফুট নির্মিত স্থান ফাঁকা জায়গাসহ এটি যথাক্রমে ১৬,৬৩২ ১৫,৬২৫ বর্গফুট জায়গাজুড়ে বিস্তৃত

রাজধানী ঢাকার বেশির ভাগ ঔপনিবেশিক আমলে নির্মিত স্কুলের ক্ষেত্রে দেখা যায় একটি প্রায় আয়তাকার ভূমিতে প্রধান ঔপনিবেশিক বিল্ডিংটি অবস্থিত ভূমির দক্ষিণ দক্ষিণ-পূর্ব কোণ কিছুটা বাঁকা বাড়ির সীমানা তিনটি জোনে বিভক্ত: মধ্যবর্তীটি প্রশাসনিক জোন, উত্তরদিকে একাডেমিক জোন এবং দক্ষিণে প্রাইমারি সেকশন চিত্তবিনোদন কেন্দ্র ঔপনিবেশিক বিল্ডিংয়ের চারদিকে ফাঁকা জায়গাসহ একটা বড় অংশে খেলার মাঠ, যা প্রধান প্রবেশপথের পাশে অবস্থিত এতে সম্মুখের ফাসাদের শোভা বর্ধিত হয়েছে

দিক পরিচিতি: ইমারতের প্রবেশপথ পূর্বদিক দিয়ে, যা সরাসরি মূল ঔপনিবেশিক বিল্ডিংয়ে গিয়ে পৌঁছেছে মূল বিল্ডিংটি দক্ষিণমুখী বিল্ডিং ব্লকের পরবর্তী সংস্কারে উত্তর-দক্ষিণে প্রলম্বিত অংশ পূর্বমুখী

ক্ষেত্রবিন্যাস: বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা ঔপনিবেশিক বিল্ডিংয়ের অক্ষকে অনুসরণ করেনি যেমন পূর্বদিকে বাড়ির সম্মুখ ভাগ এজন্য বাড়ির মূলভূমি দুটি জোনে বিভক্ত: . খেলার মাঠসহ প্রশাসনিক প্রাথমিক শ্রেণীর পাঠকক্ষ; . ওপর ক্লাসের শ্রেণীকক্ষ এবং শিক্ষাসহায়ক বিভিন্ন সুবিধা, যেমন ল্যাবরেটরি প্রভৃতির অবস্থানসহ মূল একাডেমিক জোন

রাজধানী ঢাকার বেশির ভাগ ঔপনিবেশিক স্কুলের আলো-বাতাসের ব্যবস্থা তেমন উন্নত নয় মূল বিল্ডিংয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদির জন্য কেন্দ্রে ক্লাসরুম দ্বারা ঘেরা বড় হলরুম অবস্থিত নিচতলা লবির উভয় পাশের কক্ষগুলো অব্যবহূত কারণ প্রধান হলরুমের সঙ্গে এগুলো যুক্ত নয় সেজন্য কক্ষগুলোতে ক্লাসরুমের কাজ চালানোও সম্ভব নয় এবং এগুলো অন্য কক্ষগুলো থেকে আলাদা ছোট আকৃতির জানালার জন্য হলরুমে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রবেশ করে না নিচতলা দ্বিতীয় তলার অবস্থা প্রায় একই রকম হলরুমে আলো-বাতাসের চলাচল কম বিল্ডিং ব্লকের পরবর্তী সংস্কারে একটি ছোট অঙ্গনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা বিভিন্ন জোনে বায়ু চলাচলে সহায়তা করে ক্লাসরুমের সামনে লম্বা বারান্দা থাকার জন্য বায়ু চলাচলের সুবিধা বৃদ্ধি পেয়েছে

ধরনের স্কুলে ইমারত আকৃতিও বেশ বিশেষায়িত এখানকার প্রধান ঔপনিবেশিক বিল্ডিংটি বর্গাকৃতির, দ্বিতল প্রচুর জায়গাসহ সাজানো-গোছানো পরবর্তী সংস্কারে বিল্ডিংয়ে যে ব্লকগুলো নির্মিত হয়েছে, তার সঙ্গে মূল বিল্ডিংয়ের কোনো সম্পর্ক নেই প্রধান বারান্দায় অনেক বড় বড় ক্ল্যাসিক্যাল স্তম্ভ আছে, যা স্মারকের স্বাক্ষর বহন করে তবে এর নির্মাণ পদ্ধতিতে বিশেষ কোনো পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করা যায়নি মূলত প্রধান ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের দেয়ালগুলো অত্যন্ত পুরু ভার বহনে সক্ষম পুরুত্ব ৫০-৬০ সেন্টিমিটার ছাদ নির্মাণের ক্ষেত্রে কাঠ অথবা ইস্পাতের তীর ব্যবহূত হয়েছে কক্ষের গড় উচ্চতা .৫০ মিটারের বেশি .২০-.৫০ মিটার ব্যবধানের ইটের তৈরি খিলান দ্বারা এর জানালাগুলো নির্মিত নতুন ব্লকে রড কংক্রিটের খাম্বা ব্যবহূত হয়েছে শক্ত লিন্টেল বা সর্দলের ওপর ছাদ সন্নিবেশিত

ধরনের স্কুলের উদাহরণ হিসেবে সেন্ট গ্রেগরীজ উচ্চবিদ্যালয়ের কথা বলা যেতে পারে ১৮৮৭ সালের কিছু আগে ইংরেজ যাজক সম্প্রদায় ঢাকায় স্কুল প্রতিষ্ঠা করে তখন মাত্র অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত এর ক্লাস সীমিত ছিল ছাত্রদের আলাদা বোর্ডিংয়ের ব্যবস্থা ছিল প্রথমদিকে ছেলেমেয়েদের জন্য সহশিক্ষার ব্যবস্থা চালু থাকলেও পরবর্তীকালে পার্শ্ববর্তী এক স্থানে মেয়েদের জন্য আলাদা একটা স্কুল নির্মিত হয় অন্যদিকে ১৮৪৮ সালের দিকে নির্মিত পোগোজ স্কুলটিও সাদামাটা স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এটি স্থানিক গুরুত্ব বিবেচনায় ঢাকার আরমানিটোলায় প্রতিষ্ঠিত হয় আর্মেনিয়ার জমিদার পোগোজ স্কুল নির্মাণ করেন শুরুতে স্কুলটি পোগোজের বাসভবন বা কুঠি হিসেবে ব্যবহূত হয়েছিল, যা বর্তমানে স্কুল হিসেবে পরিচিত যা- হোক রাজধানী ঢাকার স্কুলগুলো একাধারে একাডেমিক কমপ্লেক্স স্থাপত্য কীর্তি, যা ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আজও টিকে আছে বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রয়োজনেই এগুলোর সংরক্ষণ পুনর্নবায়ন জরুরি বিশেষ করে মানুষের সাংস্কৃতিক অনুশীলনের মধ্যে সক্রিয় থাকায় স্কুলগুলোর সংরক্ষণে তেমন বিশেষ কোনো উদ্যোগের প্রয়োজন নেই কেবল স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য টিকিয়ে রাখার জন্য সংস্কার নতুন নির্মাণকালে সতর্ক থাকলেই হয়

 

আবদুল কাউয়ুম মালেক: স্কুলশিক্ষক গবেষক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন