বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ১৪, ২০১৯ | ৩০ কার্তিক ১৪২৬

টেরাকোটা-পর্ব ৩

শঙ্খনিধি হাউজের স্মৃতিচিহ্ন

ইমতিয়াজ আরমান

বাংলার ঔপনিবেশিক শাসনের প্রাথমিক থেকে মধ্যভাগে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আর্থিক ক্ষেত্রে নানা ধরনের রদবদল লক্ষ করা গেছে। উত্থান-পতনের ডামাডোলে প্রত্যক্ষ করা যায় নানা ধাঁচের স্থাপত্যিক উৎকর্ষ। উনিশ শতকের মধ্যভাগে ঢাকার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উত্থান ঘটেছিল। তাদের ভাগ্যের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অনেক পথ খুলে যেতে দেখা যায় সময়ে। তখনকার পুরান ঢাকার নবাবপুর এলাকায় বসতি স্থাপনকারী রকম একটি পরিবারের নাম শাহ বণিক পরিবার। শাহ বণিক শব্দের অর্থ হলো মসলা বিভিন্ন ঔষধি দ্রব্যসামগ্রী ক্রয় বিক্রয়কারী একশ্রেণীর ব্যবসায়ী। পরিবার সম্পর্কে একটি কিংবদন্তি চালু আছে যে পরিবারের একজন সদস্য এক রাতে শঙ্খ বা ঝিনুকের খোলস স্বপ্ন দেখে। এরপর এই শঙ্খ তাদের পরিবারে ব্যবসার ক্ষেত্রে সমৃদ্ধি এনে দেয়। বিশ শতকের গোড়ার দিকে লালমোহন শাহ বণিক, ভজহরি শাহ বণিক গৌর নিতাই শাহ বণিক ভ্রাতৃত্রয়ের নেতৃত্বে এই পরিবারের ব্যবসায় অনেক উৎকর্ষ সাধিত হয়। তখন থেকে পরিবার শঙ্খনিধি’ (শঙ্খের বাহক) উপাধি গ্রহণ করে এবং শঙ্খকে তারা তাদের বাণিজ্যিক উৎকর্ষের তাবিজ মনে করে একে ব্যবসার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ঢাকার ঔপনিবেশিক স্থাপত্য লাভ করেছিল অন্য রকম মাত্রা।

সময়কাল হিসাব করতে গেলে দেখা যায়, ১৯২০-২৬ সালের মধ্যে অনেকগুলো শঙ্খনিধি ইমারত প্রতিষ্ঠিত হয়। শঙ্খনিধি পরিবারের ব্যবসায়ের অসাধারণ সাফল্যের এক পর্যায়ে ভ্রাতৃত্রয় ঢাকার অভ্যন্তরে এবং পাশে অনেক স্থাবর সম্পত্তির মালিক হন। তারা স্থানীয় নীতিনির্ধারণ অনেক জনহিতকর কর্মকাণ্ডে নিজেদের নিয়োজিত করেন। শঙ্খনিধি গ্রুপের অনেকগুলো স্থাপনা পুরান ঢাকার টিপু সুলতান রোডের উত্তর দিক থেকে শুরু করে নবাবপুর রোডের কোণ থেকে র্যাংকিন স্ট্রিট পর্যন্ত বিস্তৃত। এগুলোর মধ্যে চারটি ইমারতকে নিবন্ধের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। বিল্ডিংগুলো হলো . শঙ্খনিধি লজ . নাটমন্দির . ভজহরি লজ . রাধাবিনোদ মন্দির।

এই স্থাপনাগুলো এমন এক সময়ে নির্মিত, যখন ভারতীয় স্থাপত্য গথিক-ইন্ডিয়ান ইন্দো-সারাসিন রীতির আয়ত্তাধীন, যা ক্ল্যাসিক্যাল রীতির অনুসরণে নির্মিত এবং এর সঙ্গে দেশীয় রীতির ব্যবহারও পরিলক্ষিত হয়। তখনকার দিনে ঢাকা ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত শহর। সেই হিসেবে শঙ্খনিধি হাউজে গড়ে ওঠা বিল্ডিংয়ে উপর্যুক্ত রীতিগুলোকে অস্বীকার করা যায়নি, যা ইমারতগুলোতে বিধৃত। ইমারতগুলো সাধারণভাবে ঐতিহ্যবাহী অঙ্গনকেন্দ্রিক, নির্মাণে ক্ল্যাসিক্যাল রীতির অনুসরণে সুষম, যা বৈশিষ্ট্য পদ্ধতিতে পরিদৃশ্যমান। এই বংশের তত্ত্বাবধানে নির্মিত ভবনের মধ্যে প্রথমেই বলতে হয় শঙ্খনিধি লজের কথা।

বিশেষত, ১৯২১ সালে তিন ভাইয়ের বড় ভাই লালমোহন শাহ বণিক এই বহু অঙ্গনবিশিষ্ট দ্বিতল ভবনটি নির্মাণ করেন। এতে চমত্কারভাবে অলংকৃত উঁচু রাস্তাসহ ঐতিহ্যগত অঙ্গন ব্যবস্থা অনুসৃত হয়েছে। এর সম্মুখের ফাসাদ গ্রেকো-ইন্ডিয়ান প্রভাবের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এর কেন্দ্রীয় বে-টি দ্বিগুণ উচ্চতাবিশিষ্ট করিন্থীয় কলামের সাহায্যে ষড়ভুজাকৃতি বিশিষ্ট করে নির্মিত হয়েছে। ফলে এতে জাঁকজমক আভিজাত্যের চিহ্ন ফুটে উঠেছে। উভয় তলায় পার্শ্ববর্তী বেগুলোতে তিনটি করে প্রবেশপথ এবং অন্তর্বর্তী পলেস্তরাকার্যে ফুল-লতাপাতার এমন সমাবেশ ঘটানো হয়েছে যে যার ফলে সমগ্র ইমারতে বারুক-রকোকো নাটকীয়তার সৃষ্টি হয়েছে।

অন্যদিকে শঙ্খনিধি লজের পূর্বদিকে নাটমন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন তিন ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট নিতাই শাহ বণিক। তিনি ভবনটি নির্মাণ করার পর থেকে তার অবকাশ আপ্যায়ন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহূত হয়। পাঁচ ফুট উঁচু বেদির ওপর এই বদ্ধকায় অবকাঠামোটি নির্মিত। একটি মূল হলঘরে অগ্রবর্তী বারান্দাসহ এটি অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে সাজানো। এর সামগ্রিক বিনির্মাণে যে রীতি প্রয়োগ করা হয় তা গথিক-ইন্ডিয়ান রীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর বহু খাঁজবিশিষ্ট খিলান, গুচ্ছস্তম্ভ এবং স্তম্ভগুলোর পাদদেশে কলস নকশা, উঁচু বেদি প্রভৃতি প্রাক-ইউরোপীয় রীতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। দরজা-জানালার উপরের কারুকাজে পত্রগুচ্ছের ব্যবহার এই অবকাঠামোকে একটা গতিময়তা দান করেছে এবং দুটি কৌণিক অষ্টকোণাকৃতির গম্বুজ ব্যবহারে গথিক রীতির ভারতীয় অনুকরণ বলে মনে হয়।

বর্তমানে গ্র্যাজুয়েট স্কুল নামে বিখ্যাত ভজহরি লজটি নির্মাণ করা হয়েছিল ১৯২৫ সালের দিকে। ইমারতটি নির্মিত হয়েছিল বিশেষ উদ্দেশ্য সামনে রেখে। এটি দ্বিতলবিশিষ্ট এবং কেন্দ্রীয়ভাবে পাশাপাশি তিনটি কক্ষ এবং চারদিকে বারান্দাসংবলিত একটি সাজানো-গোছানো ইমারত। সম্ভবত এটি বসবাসের জন্য তৈরি। তবে মাঝে মাঝে এখানে বাংলা নাটক মঞ্চস্থ হতো বলে তথ্য পাওয়া যায়। স্টাইলের দিক দিয়ে এটি গ্রেকো-ইন্ডিয়ান এবং গথিক-ইন্ডিয়ান রীতির অন্তর্ভুক্ত। বপ্রগুলো সূক্ষ্মভাবে অলংকৃত এবং এটি আনুভূমিকভাবে আকাশ রেখা বরাবর উত্থিত, যা এক ধরনের ছন্দময়তা তৈরি করেছে। কেন্দ্রীয় বে-এর অর্ধবৃত্তাকৃতির ব্যালকনির পাশে অর্ধগম্বুজ মোগল স্থাপত্যের সঙ্গে হিন্দু রীতির প্রভাবের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। ওপরতলার স্তম্ভ নির্মাণের ক্ষেত্রেও ভারতের প্রাক-মুসলিম আমলের হিন্দু মন্দিরের রীতি অনুসৃত হয়েছে।

শঙ্খনিধি হাউজ গ্রুপের সবগুলো ইমারতের মধ্যে রাধা বিনোদ মন্দির নির্মাণের ক্ষেত্রে সর্বাধিক ভারতীয় পাশ্চাত্য রীতির সফল মিশ্রণ ঘটেছে। একটি কেন্দ্রীয় অঙ্গনকে ঘিরে মন্দিরের মূল অংশটি উত্তর দিকের শেষ প্রান্তে অবস্থিত। রাস্তামুখী উন্নত ইমারতের কেন্দ্রীয় বে-এর তৃতীয় পর্যায় ছাড়া সবকিছুই ভারতীয় স্থাপত্য অধ্যায় থেকে নীত। এর প্রবেশ স্তম্ভে উত্তর ভারতীয় মন্দির স্তম্ভ রীতি এবং ব্যালকনির ওপর বহু খাঁজবিশিষ্ট খিলান মোগল মঞ্চ নির্মাণ রীতির অনুকরণ। এর উপরিভাগে হিন্দু ব্র্যাকেট রীতির সমাহার লক্ষ করা যায়। বপ্রে চৌচালা ছত্রির ব্যবহার ঢাকার স্থাপত্যে গথিক রীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ। নিচুতলার প্রবেশপথে খিলানের ব্যবহারও গথিক রীতির পরিচায়ক। অন্যদিকে ওপরতলার পার্শ্ব বে প্রবেশপথে ইউরোপীয় প্রভাব পরিদৃষ্ট হয়।

এগুলোর মধ্যে বিভিন্ন ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গির সংমিশ্রণ ঘটেছে। ওপরতলার মেঝের গ্যালারির রেলিংয়ে স্টিলের স্তম্ভের ব্যবহারে রোমান রীতির প্রভাব সুস্পষ্ট। ধরনের স্তম্ভের ওপর ছাদ নির্মাণের রীতি রাজস্থানের প্রাসাদ নির্মাণের ক্ষেত্রেও দেখা যায়। এটা উল্লেখ্য যে অলংকরণের নিমিত্তে এবং পরিবারের মর্যাদা প্রকাশের প্রয়োজনে শঙ্খ মোটিফ ইমারতের ফাসাদে বিশেষভাবে ব্যবহূত হয়েছে। ইন্দো-সারাসেনিক গথিক-ইন্ডিয়ান রীতির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় রীতিকে পতনের হাত থেকে রক্ষা করা, তাকে যতদূর সম্ভব ধরে রাখা এবং প্রজা হিসেবে নতুন রাজকীয় আদর্শের অনুসরণ করা। নতুন বিদেশী নির্মাণ পদ্ধতি ভারতীয় ঐতিহ্যগত নির্মাণ পদ্ধতি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এসব নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একগুচ্ছ দক্ষ কারিগরের সম্মিলিত অবদান পরিলক্ষিত হয়।

যদিও রাধা বিনোদ মন্দিরটি বিনির্মাণে নির্মাতা পরিকল্পনাকারীর কার্যক্রম নির্ধারিত, তবুও কিছুসংখ্যক ভারতীয় কারিগরের নকশা প্রণয়ন এবং কিছুসংখ্যক অথবা সামগ্রিক অলংকরণের ক্ষেত্রে তাদের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। তবে ভারতীয় স্থাপত্য ঐতিহ্যের প্রবহমানতা রক্ষার ক্ষেত্রে দায়িত্ব তেমন কোনো কার্যকর ভূমিকা পালন করেনি। ফলে নতুন এই রীতি মৌলিকত্বের ক্ষেত্রে অনেক প্রশ্নের উদ্রেক করে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ইংল্যান্ডে উইলিয়াম মরিসের সমকালীন শিল্পকলার আন্দোলনের উদাহরণ টেনে আনা যায়, যার মোদ্দা কথা অনুকরণ নয় অনুসরণ। আমাদের স্থাপত্যের পরিচয় পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন এখন অনেক বেশি প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এটি কখনো পূর্ণ সফলতা পাবে না, যদি না এর অনুকরণকে আমরা অতিক্রম করতে পারি, এমনকি বিষয়টি আরো কঠিন হতে পারে, যদি অতীতকে আমরা নতুন চোখে না দেখি বা নতুনভাবে বোঝার চেষ্টা না করি। আধুনিকতার আন্দোলন আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যের স্থায়ী মূল্য বুঝতে সহায়তা করে এবং একে অবজ্ঞার চোখে দেখতে নিরুৎসাহিত করে। একসময় আমাদের সমাজ আমাদের পুরনো ঐতিহ্যের মিশ্রণ প্রক্রিয়ায় আনুকূল্য প্রদর্শন করে। এই বিষয়টি দেখার জন্য যে কেউ যখন তখন ঘুরে আসতে পারেন ঐতিহ্যবাহী শঙ্খনিধি হাউজ কমপ্লেক্স থেকে।

 

ইমতিয়াজ আরমান: গবেষক উন্নয়নকর্মী

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন