বৃহস্পতিবার | নভেম্বর ১৪, ২০১৯ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬

টেরাকোটা-পর্ব ৩

দয়ারামপুর রাজবাড়ি

আহসান হাবিব

বাংলার রাজা-জমিদারদের মধ্যে দিঘাপতিয়া রাজবংশ একটি উল্লেখযোগ্য স্থান অধিকার করে আছে। দয়ারাম রায় রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। তার জন্মবৃত্তান্ত আজও রহস্যাবৃত। কারো মতে, দয়ারাম রায় কলম গ্রামের এক তিলি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। রামজীবন যখন পুঠিয়ার রাজা দর্পনারায়ণ ঠাকুরের অধীনে সাধারণ একজন কর্মচারী তখন দয়ারাম তার মাসিক আনা বেতনে চাকরি করতেন। পরে সামান্য লেখাপড়া করে জমা খরচ রাখার মতো যোগ্যতা অর্জন করেন এবং রামজীবন তাকে মাসিক আনার পরিবর্তে টাকা বেতনের মুহুরী নিযুক্ত করেন। পরবর্তী সময়ে পুঠিয়ার রাজা দর্পনারায়ণের স্নেহ, ভালোবাসা সহানুভূতি, নবাব সরকারের ভ্রাতা রঘুনন্দনের প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং বাংলার নবাব দেওয়ান মুর্শিদকুলী খানের নেকনজর সবকিছু মিলিয়ে যখন রামজীবন জমিদারি লাভ করেন তখন তারও ভাগ্য খুলতে থাকে। অনেকের মতে, রামজীবন জলবিহারোপলক্ষে চলনবিলের মধ্য দিয়ে কলম গ্রামে পৌঁছেন। সে সময় দুজন বালক রাজার নৌকার সামনে উপস্থিত হয়। দুটি বালকের একজনের কথাবার্তা বুদ্ধির পরিচয় পেয়ে তিনি তাকে নাটোরে নিয়ে আসেন। বালকটিই দয়ারাম রায়।

দয়ারাম রায় সিংড়া থানার কলম গ্রামের দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। কলমের নরসিংহ রায়ের সন্তান তিনি। অনুমান ১৬৮০ সালে তার জন্ম। প্রথমে রাজা রামজীবনের একজন সাধারণ কর্মচারী এবং প্রতিভাবলে নাটোর রাজের দেওয়ান পর্যন্ত হয়েছিলেন। রামজীবন তাকে অত্যন্ত বিশ্বাস করতেন এবং প্রচুর অর্থ-সম্পদ তার কাছে গচ্ছিত রাখতেন। রাজা সীতারাম রায়ের পতনের পর দয়ারাম নাটোর রাজ্যের একজন পরাক্রমশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। যশোরের রাজা সীতারাম রায় বিদ্রোহী হলে নবাব মুর্শিদকুলী খাঁ নাটোর রাজের দেওয়ান দয়ারাম রায়ের সাহায্যেই তাকে দমন পরাজিত করে নাটোর কারাগারে বন্দি করেন। সীতারাম রায়কে পরাজিত করায় নবাব সরকারের প্রভাব বেড়ে যায় এবং দয়ারাম রায় রাই রাইখাখেতাবে ভূষিত হন। সীতারাম রায়কে পরাজিত করে তিনি তার মূল্যবান সম্পদ লুণ্ঠন করেন, কিন্তু গৃহদেবতা কৃষ্ণজীর মূর্তি ছাড়া সব রামজীবনের হাতে তুলে দেন। দয়ারামের এহেন ব্যবহারে তিনি খুশি হয়ে কৃষ্ণজীর মূর্তি স্থাপনের জন্য দিঘাপতিয়ায় একখণ্ড জমি কয়েকটি পরগনা দান করেন। নিঃসন্তান রামজীবন দেওয়ান দয়ারামের পরামর্শেই রামকান্তকে দত্তক গ্রহণ করেন এবং পুত্র রামকান্ত ভ্রাতুষ্পুত্র দেবী প্রসাদের মধ্যে জমিদারি ভাগ করে দিতে চান। কিন্তু দেবী প্রসাদের একগুঁয়েমি মনোভাবের জন্য সমগ্র জমিদারি রামকান্তের নামে উইল করে দেন। রামকান্তের বিবাহের সময় তিনিই ছিলেন সর্বময় কর্তা। কন্যা পছন্দ, দিন-তারিখ নির্ধারণ, যৌতুক আদায়, আত্মীয়স্বজনদের নিমন্ত্রণ সবকিছুর ভারই অর্পিত ছিল দেওয়ান দয়ারামের ওপর। রামজীবন মৃত্যুকালে দয়ারাম রায়কেই পুত্রের একমাত্র অভিভাবক নিযুক্ত করে যান।

রামকান্ত বালকমাত্র, তাই রাজশাহীর মতো ব্যাপক বিস্তৃত জমিদারি পরিচালনা করা তার পক্ষে অসম্ভব। এজন্য প্রকৃত কর্তৃত্ব ছিল দয়ারাম রায়ের ওপর। তার সুদক্ষ নিপুণ পরিচালনায় জমিদারির মর্যাদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। সরফরাজ খানের সময় ১৩৯ পরগনার স্থলে রাজশাহী জমিদারি পরগনার সংখ্যা দাঁড়ায় ১৬৪-তে। রামকান্ত বয়ঃপ্রাপ্ত হলে স্বাধীনভাবে এবং স্বহস্তে জমিদারি পরিচালনার ইচ্ছা প্রকাশ করলে দয়ারাম রায় অবসর গ্রহণ করেন এবং দিঘাপতিয়ায় রাজবাড়ি নির্মাণ করতে থাকেন। যুবক রামকান্ত বিরাট জমিদারি, প্রচুর সম্পদ, সুন্দরী স্ত্রী, অশেষ মানসম্মান লাভ করে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে ছিলেন। কিন্তু দয়ারাম রায়ের অবসর গ্রহণের পর কিছু অসাধু আমাত্য দ্বারা পরিবেষ্টিত হন এবং বিভিন্ন প্রকার আমোদ-আহলাদে কালাতিপাত করতে থাকেন। পুণ্যবতী স্ত্রী রানী ভবানীর শত উপদেশ সত্ত্বেও যথারীতি রাজকার্য পরিচালনায় মনোনিবেশ করতে পারেননি। ফলে নবাব সরকারের প্রচুর রাজস্ব বাকি থাকে। সময় দয়ারাম রাজকার্যে মনোনিবেশ এবং যথারীতি রাজস্ব প্রদান করতে উপদেশ দেন। নবাব আলিবর্দী খাঁ জমিদারি দেবী প্রসাদকে অর্পণ করলে অবশেষে দয়ারাম রায়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং জগেশঠের সহযোগিতায় পুনরায় তা ফিরে পান। ১৭৪৮ সালে রাজা রামকান্তের মৃত্যু হলে দয়ারাম রায় রানী ভবানীর পাশে থেকে জমিদারি পরিচালনা করেন। তার সুদক্ষ পরিচালনায় রানী বর্গীয় আক্রমণের সমস্যা কিছুই বুঝতে পারেননি। রানী ভবানীর একমাত্র কন্যা তারার বিয়ের সময় তিনিই ছিলেন প্রধান কর্মকর্তা। জামাতা রঘুনাথের মৃত্যুর পর দয়ারামই তাকে দত্তক গ্রহণে সম্পূর্ণ সাহায্য করেন। রানী ভবানী দয়ারাম তারা দুজনের সঙ্গে পরামর্শ করেই বিষয়কার্য পরিচালনা করতেন। রানী ভবানী দয়ারামকে অত্যন্ত বিশ্বাস করতেন এবং অনেক সময় নিজ নামে কার্য পরিচালনার সুযোগ দিতেন। দয়ারাম সে সময় রানীর পরামর্শ ছাড়া ব্রাহ্মণদের ব্রহ্মোত্তর দান করেন। বিষয়ে রানী ভবানীর কোনো আপত্তি ছিল না, কারণ তার বিশ্বাস বৃদ্ধ মন্ত্রী দয়ারাম রায় নাটোর রাজের মঙ্গল ছাড়া কোনো সময়ে অমঙ্গল কামনা করেন না। কিন্তু রাজকুমারী তারা দয়ারামের কাজটিকে সমর্থন করতে পারেননি। তার মতে, রাজকর্মচারী অন্য কোনো কাজ করলেও প্রকৃত মালিকের অনুমতি না নিয়ে ভূসম্পত্তি দান করতে পারেন না। তিনি দান অসিদ্ধ ঘোষণা করেন। দয়ারাম রায় সময়ে রানী ভবানীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সব কথা খুলে বলেন। প্রকাশ্য যে ভবানীর বিবাহের সময় রামজীবনের পরিবর্তে দয়ারাম রায়ই বিবাহের কাগজে সই করেন। দয়ারাম রায় সেই জীর্ণ কাগজটি রানীর সামনে ধরে বলেন যে যদি দয়ারামের স্বাক্ষরে ব্রহ্মোত্তর অসিদ্ধ হয়, তবে বিয়েও সিদ্ধ হয়নি। অবস্থায় বাধ্য হয়ে তারা সুন্দরী মনোভাব ত্যাগ করেন এবং দয়ারামের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। ১৭৬০ সালের দিকে রানী ভবানী একবার রাজ্যচ্যুত হন। সে সময় দয়ারাম রায় কিছুদিনের জন্য জেল খাটেন বটে, কিন্তু রানী ভবানীকে রাজ্য ফিরিয়ে দিয়ে তবেই তিনি ক্ষান্ত হন। নাটোর রাজের গগনস্পর্শী উত্থানে দেওয়ান দয়ারাম রায়ের অবদান অনস্বীকার্য। কখনো তিনি সেনানায়ক রূপে শক্ত হাতে অসি পরিচালনা করেছেন, কখনো বিদ্বান ব্যক্তির মতো কলম হাতে নিয়ে জমিদারির হিসাব রেখেছেন। কখনো ভূষণায়, কখনো ভাতুরিয়ায়, কখনো বড়নগর-মুর্শিদাবাদে ছোটাছুটি করেছেন। রঘুনন্দন নাটোর রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন সত্য, কিন্তু দেওয়ান দয়ারামের সুদক্ষ পরিচালনার জন্য ওই রাজবংশ তত্কালে এত খ্যাতি অর্জন করতে পেরেছিল।

লর্ড ক্লাইভ দেশে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠা করেন সত্য কিন্তু লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস সে শাসনব্যবস্থাকে স্থায়িত্ব দেন। কিশোরী চন্দ্র মিত্র রঘুনন্দনকে নাটোর রাজের ক্লাইভএবং দয়ারামকে ওয়ারেন হেস্টিংসবলে অভিহিত করেছেন। নাটোর রাজের উত্থান শ্রীবৃদ্ধিতে দেওয়ান দয়ারাম রায়ের যে অশেষ অবদান ছিল সে কথা স্বীকার করে মৃত্যুর ২০০ বছর পরও উক্ত রাজবংশের মহারাজা শ্রী যোগীন্দ্রনাথ দৃঢ়কণ্ঠে বলেছেন, ‘রাই রাইয়া দয়ারাম রায় নাটোর রাজবংশের কতখানি আপনজন ছিলেন সে কথা জানিতেন দয়ারাম, জানিতেন তত্কালীন নাটোরাধিপতিগণ এবং জানে বাংলার ইতিহাস। তাঁহার কথা লিখিতে গেলে বহুশত পৃষ্ঠা লিখিলেও তাঁহার অদ্ভুত অপূর্ব গুণরাজি সম্পূর্ণ আলোচনা করা সম্ভব হইবে না

১৭৬০ সালে ৮০ বছর বয়সে তিনি পাঁচ কন্যা, এক পুত্র প্রচুর সম্পদ রেখে ইহলীলা ত্যাগ করেন। দেওয়ান দয়ারাম রায়ই প্রথমে দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি নির্মাণ করেন, যা এখন উত্তরা গণভবন নামে খ্যাত।

দিঘাপতিয়া রাজা প্রমথনাথ রায়ের (১৮৪৯-১৮৮৩) জ্যেষ্ঠ পুত্র প্রমদানাথ রায় ১৮৯৪ সালে দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর তার তিন কনিষ্ঠ ভ্রাতা কুমার বসন্তকুমার রায়, কুমার শরত্কুমার রায় এবং কুমার হেমেন্দ্রকুমার রায়ের জন্য বড়াল নদের তীরে নন্দীকুজা নামক স্থানে দিঘাপতিয়া জুনিয়র রাজ দয়ারামপুর এস্টেটসস্থাপন করেন। তাদের প্রপিতামহের পিতাসহ নাটোরের রানী ভবানীর অসাধারণ দক্ষ দেওয়ান দিঘাপতিয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা দয়ারামের নামানুসারে এলাকার নাম হয় দয়ারামপুর, আর বাড়ির নাম হয় দয়ারামপুর জমিদারবাড়ি মুক্তিযুদ্ধে অসাধারণ অবদান রাখায় পরবর্তী সময়ে ১৯৭৪ সালে শহীদ লে. কর্নেল আব্দুল কাদিরের নামে এই জায়গায় কাদিরাবাদ সেনানিবাস স্থাপিত হয়।

 

আহসান হাবিব: অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন