সোমবার | নভেম্বর ১৮, ২০১৯ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

টেরাকোটা-পর্ব ৩

ঢাকার নবাব পরিবারের জনকল্যাণমুখী নির্মাণশিল্প

মুতাসিম বিল্লাহ

ঢাকার নবাব ছিল ব্রিটিশ বাংলার সবচেয়ে বড় মুসলিম জমিদার পরিবার। সিপাহী বিপ্লবের সময় ব্রিটিশদের প্রতি বিশ্বস্ততার জন্য ব্রিটিশরা পরিবারকে নবাব উপাধিতে ভূষিত করে। ব্রিটিশরাজ দ্বারা ভূষিত ঢাকার প্রথম নবাব ছিলেন খাজা আলিমুল্লাহ। মৌলভি খাজা হাফিজুল্লাহ কাশ্মীরি পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা। বাংলার জনকল্যাণমুখী স্থাপত্য বিনির্মাণ তার রক্ষণাবেক্ষণে দেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে শিক্ষা সংস্কৃতির অগ্রগতিতে, স্বাস্থ্য সুরক্ষায়, জীবন মান উন্নয়নে নবাব পরিবারের অবদানকে যুগ যুগ ধরে ইতিহাস স্মরণ রাখবে। তাদের জনকল্যাণমুখী স্থাপত্যের মধ্যে রয়েছে মসজিদ, মাদ্রাসা, সমাধি, মন্দির, এতিমখানা, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল, ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল।

স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানা: ১৯০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এতিমখানা। নবাব সলিমুল্লাহর একজন প্রিম্যাচিউর কন্যাসন্তান মারা যায়। নবাব তার স্ত্রী আসমাতুন্নেসা এতে অনেক মর্মাহত হন। কুর্মিটোলায় ভাড়া করা বাসায় প্রথম তিনি কার্যক্রম শুরু করেন। আহসান মঞ্জিলের কাছেই এর নাম দেন ইসলামিয়া এতিমখানা। ম্যানেজিং কমিটি ছিল এর দেখাশোনার জন্য। ১৯১২ সালে নবাবরা এর পরিচালনা খরচের জন্য ২০০ রুপি করে দিতেন। এতিমদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় তিনি এর স্থান পরিবর্তন করে লালবাগে নিয়ে আসেন।

১৯১৩ সালে লর্ড কারমাইকেল এতিমখানা পরিদর্শন করে উদ্বুদ্ধ হন। তিনি ১০০০ রুপি দান করেন। টাকা দিয়ে পরবর্তী সময়ে খাস জমি (আজিমপুর গোর--শহীদ মসজিদের কাছে) লিজ নিয়ে এতিমদের জন্য স্থায়ী ভবন নির্মাণ করেন। দুই বছর সময় লাগে বিল্ডিং তৈরি করতে। এর পুরো খরচ বহন করেন নবাবরা। স্যার সলিমুল্লাহর মৃত্যুর পর তার ছেলে ভাড়া বাসা থেকে এই এতিমখানা আজিমপুরে নিয়ে আসেন। এর নাম পরিবর্তন করে রাখেন স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানা।

চৌধুরী ফরিদউদ্দিন সিদ্দিকীর প্রাণান্তকর প্রচেষ্টায় এটি তত্কালীন পূর্ব বাংলা তো বটেই, ভারত উপমহাদেশে অন্যতম শ্রেষ্ঠ এতিমখানা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এতিমদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ১৯১৩ সালে স্যার আহসানউল্লাহ নামে একটি ভবন তৈরি করা হয়, যার খরচ হয় ২২,৮৫৩ টাকা। এর মধ্যে ১০ হাজার টাকা দান করেন নবাব হাবিবুল্লাহ। এরপর এতিমখানায় মেয়েদের আলাদা ওয়ার্ড তৈরি করা হয়, যেখানে খাজা সালাউদ্দিন ১০ হাজার টাকা দেন। খরচ হয় ২৩ হাজার ১৭৫ টাকা। বাকি টাকা সরকার বহন করে। এর নামকরণ করা হয় আসমাতুন্নেসা ওয়ার্ড। তিনি হলেন নবাব হাবিবুল্লাহর মা। সময় এতিমদের সহায়তায় একটি কাপড়ের ফ্যাক্টরিও চালু করা হয়। এতিমখানায় ইসলামী শিক্ষা ছিল বাধ্যতামূলক। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি এখানে এতিমদের টেইলারি, হস্তজাত বস্ত্র শিল্প তৈরি, কাঠমিস্ত্রী, কামার, বই বাঁধাই, বাগানের কাজ শেখানো হতো। এতিমখানায় অল্প পরিমাণ কৃষি ভূমি ছিল, যেখানে এতিমরা কাজ করত। খেলার মাঠ ছিল। তত্কালীন পত্রিকা জাগরণ’-এর মাধ্যমে বিষয়গুলো জানা যায়।

মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকার মাধ্যমে জানা যায়, সময় ৫০ জনের মতো এতিম ছিল। জায়গার সংকুলান না হওয়ায় অনেকের ব্যবস্থাও করা যায়নি। পরে আরো একটি ওয়ার্ড বাড়ানো হয়। এতে ১৪০ জন এতিমের থাকার ব্যবস্থা হয়। যার মধ্যে সাতজন ছিল মেয়ে। মেয়েদের জন্য আলাদা মহিলা সুপারভাইজার ছিল। এতিমদের মধ্যে যাদের মেধা ভালো তাদের টেকনিক্যাল জেনারেল স্কুলে পাঠানো হতো। এতিম সন্তানদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নজর দিতে ফিজিক্যাল মাস্টারও ছিল। আজিমপুর গোর--শহীদ মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া ছিল বাধ্যতামূলক।

বাকল্যান্ড বাঁধ: বাকল্যান্ড বাঁধ নির্মাণে নবাব আবদুল গনি ৩৫ হাজার রুপি দিয়েছিলেন। তত্কালীন ম্যাজিস্ট্রেট কালেক্টর মিস্টার ক্লে তার ডায়েরিতে বিষয়ে লিখেছেন, The natives are very parsimonious about welfare activities. They are close fisted and give very little in charity. But Khwaja Abdul Ghani is an exception; he has rather set a noble example in charity for building the buckland bund. বাকল্যান্ডে এই বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়ায় নগরবাসীদের পক্ষ থেকে নবাব আবদুল গনি, খাজা আহসানউল্লাহ, জিএম র্যালি, সিএন পোগোজ, গোবিন্দ চন্দ্র দত্তরা বিদায়ী সংবর্ধনা দেন।

নর্থব্রুক হল: ঢাকার আর্থসামাজিক ইতিহাসে হল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে। এটি প্রাথমিকভাবে নির্মাণ করা হয় টাউল হল হিসেবে। আধুনিক, শিক্ষিত, রুচিশীল অভিজাতদের জন্য উনিশ শতকে হলকে আইডিয়াল কমিউনিটি হল হিসেবে চিন্তা করা হতো। এটি বিনির্মাণে নবাব আবদুল গনির গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে। নর্থব্রুক ঢাকায় আসার মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখতে নর্থব্রুক হল লাইব্রেরি করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বিষয়ে নবাব আবদুল গনির আহ্বানে আহসান মঞ্জিলে ১৮৯৪ সালে একটি সভার আহ্বান করা হয়। এখানে উপস্থিত দাতাদের মধ্য থেকে সিদ্ধান্ত আসে ৮০০০ রুপি দিয়ে এই হল নির্মাণ করা হবে। নবাব আবদুল গনি এবং তার পুত্র খাজা আহসানউল্লাহ প্রত্যেকে এক হাজার করে দুই হাজার টাকা প্রদান করেন। টাকায় হল নির্মাণ না হলে নবাব আবার ধনীদের একটা সভা ডাকেন। বাকি কাজ সমাধান করার জন্য আবার ফান্ড গঠন করা হয়। সর্বশেষ এই হল নির্মাণে ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়। ১৮৭৯ সালে এর নির্মাণকাজ শেষ হয়। উদ্বোধন হয় ১৮৮০ সালের ২৪ মে। ১৮৮২ সালের ফেব্রুয়ারি নর্থব্রুক হলের সঙ্গে লাইব্রেরি নির্মাণ করা হয়। লাইব্রেরি নির্মাণে খাজা আবদুল গনি রাজা রাজেন্দ্রর (ভাওয়াল) অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই লাইব্রেরিতে খাজা আবদুল গনি গুরুত্বপূর্ণ সাতশ ভলিউম অনেক মূল্যবান বই দান করেছেন। নবাব আহসানউল্লাহও অনেক বই দান করেন। তাদের বই আলাদা আলমারিতে রাখা আছে। এখন পর্যন্ত সেই আলমারিগুলোতে নবাবদের নাম পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে ঢাকার পৌরসভার কর্তৃপক্ষকে এই লাইব্রেরি পরিচালনায় আহ্বান জানায় এর সেবাগ্রহীতারা। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৮৮৫ সালের ১৯ জানুয়ারি পৌরসভার কমিশনাররা একটা সভা ডাকেন। এখানে এর নিয়ম-নীতি আয়-ব্যয়ের খাতের দায়িত্ব বুঝে নেয়া হয়। এর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ১৮৮৬ সালের দিকেই বিল্ডিংয়ের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে, এমনকি এর ছাদ থেকে পানি পড়া শুরু হয়।

অবস্থায়ও নবাব আহসানউল্লাহ এগিয়ে আসেন। তিনি ১৩৫০ রুপি ব্যয় করে দেয়াল নির্মাণ করে এর যথাযথ সংরক্ষণ নিরাপত্তা বিধান করেন।

হাসপাতাল নির্মাণ: নবাবরা ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল, মেডিকেল সেন্টার নির্মাণ করেন। তা এমন এক সময়ে, যখন কিনা দেশের কোথাও আধুনিক যন্ত্রপাতি ছিল না, সাধারণ মানুষ হাতুড়ে ডাক্তারদের শরণাপন্ন হতো।

এমন সময়ে নবাবরা খাজনা আদায়ে নিয়োজিত তাদের কাছারিঘরগুলোকে চ্যারিটেবল ডিসপেনসারিসহিসেবে ব্যবহার করতেন। সাধারণ মানুষকে তারা আধুনিক চিকিৎসাসেবা দেয়ার চেষ্টা করতেন।

মিটফোর্ড হাসপাতাল: ব্রিটিশ বাংলায় হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। প্রাচীনকাল থেকে গুটিবসন্ত, কলেরায় দেশের হাজার হাজার মানুষ মারা যেত। চিকিৎসার অভাবে এসব রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটত। যা ধীরে ধীরে মহামারিতে রূপ নিত। অঞ্চলে টিটেনাস, নিউমোনিয়া, হাইড্রোফোবিয়া, টিউবারকিউলোসিস, ডিপথেরিয়া টাইফয়েডে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। কারণে ইংরেজরা ১৮০৩ সালে ঢাকায় একটি আঞ্চলিক হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। তবে হাসপাতাল ছিল উচ্চবিত্তদের, সবাই সুযোগ পেত না। অবস্থা বিবেচনায় লর্ড মিটফোর্ড সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত টাকায় চ্যারিটেবল ডিসপেনসারিস হিসেবে হাসপাতাল চালু করেন। পরবর্তী সময়ে ১৮৫৮ সালে হাসপাতাল বর্ধিতকরণ আধুনিকায়ন তথা উন্নতির উদ্যোগ গ্রহণে নবাব পরিবারের অবদান প্রণিধানযোগ্য। নবাব আবদুল গনি থেকে নবাব হাবিবুল্লাহ পর্যন্ত সবাই হাসপাতালের উন্নয়নে বিপুল অর্থকড়ি দান করেছেন। প্রত্যেক বছর নবাব ওয়াকফ স্টেটের ফান্ড থেকে হাসপাতালে টাকা বরাদ্দ দেয়া হতো। ঢাকা প্রকাশ’-এর মাধ্যমে তাদের ব্যয় করা অর্থের পরিমাণ জানা যায়। মিটফোর্ড হাসপাতালে প্রথমবার ৫০০ টাকা দান করেছিলেন, পরে ১৮৭৫ সালে নারীদের জন্য ওয়ার্ড নির্মাণে নবাব আবদুল গনি ২৫ হাজার ২৪৫ টাকা দেন। এর নামকরণ করা হয় আসমাতুন্নেসার নামে। অধিকাংশ টাকা দেয়া হয় নবাব আহসানউল্লাহর সময়ে। উনিশ শতকে আহসানউল্লাহ ২০ হাজার টাকা দান করেন জনগণের কল্যাণমূলক কাজে। এর মধ্যে মিটফোর্ড হাসপাতালকে ৫১৫০ টাকা, নায়ারণগঞ্জ হাসপাতাল, ঢাকা শহরের বিভিন্ন হাসপাতালকে এই টাকা দান করেন। হাসপাতালে পানি বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেন। ১৯০৩ সালে নবাব সলিমুল্লাহ হাজার টাকা দিয়েছিলেন মহিলা ওয়ার্ডে ফার্নিচার কেনার জন্য। এছাড়া তিনি আরো হাজার টাকা দান করেন বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি কিনে দেয়ার জন্য। একই বছর তিনি নবাব ওয়াকফ থেকে বার্ষিক ৪০০ টাকা পরে ১৯০৫ সালে তা ৮০০ টাকা বর্ধিত করে হাসপাতালকে দিতেন। এছাড়া হাসপাতালে বেওয়ারিশ লাশ দাফন-কাফনের জন্য প্রয়োজনীয় টাকা সবসময় দিতেন।

১৯০৭ সাল পর্যন্ত নবাব ওয়াকফ স্টেট থেকে হাসপাতালে প্রায় দেড় লাখ টাকা দেয়া হয়। ঢাকা পৌরসভার চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় খাজা মোহাম্মদ আসগর অফথালমোলজি ওয়ার্ড চালু করেন মিটফোর্ডে।

ঢাকা প্রকাশ থেকে জানা যায়, ১৮৬৩ সালে ঢাকার অধিবাসীরা মেডিকেল স্কুলের দাবি জানান। ১৮৭৩ সালে লেফটেন্যান্ট গভর্নরকে ঢাকা গণসভারনামে ঢাকাবাসী স্কুল করার জন্য আবার দাবি জানায়। অবশেষে মিটফোর্ড হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত করে ১৫ জুন ১৮৮৫ সালে মেডিকেল স্কুল চালু করা হয়, ৩৮৪ জন শিক্ষার্থী প্রথম বছর ভর্তি হয়। ১৮৭৫-৮৫ সময়ের মধ্যে ১৩৬ জন এলএমএফ ডাক্তার পাস করে স্কুল থেকে।

 

সমাজের বিত্তবানদের সহায়তায় এটি আরো প্রসারিত হয়। ২২ সেপ্টেম্বর ১৮৮৯ সালে নতুন বিল্ডিংয়ে যাত্রা শুরু করে স্কুল। ১৯৬২ সালে স্কুল মেডিকেল কলেজে রূপান্তরিত হয় স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ নামে। ১৯৭২ সালে এটি পূর্ণ মেডিকেল কলেজে রূপান্তরিত হয়। বর্তমানে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতাল কার্যক্রমের দিক থেকে একে অন্যের পরিপূরক।

লেডি ডাফরিন হাসপাতাল: পর্দানশীল নারীদের কথা চিন্তা করে নবাব আহসানউল্লাহ ঢাকায় একটি মহিলা হাসপাতাল করার ঘোষণা দেন লেডি ডাফরিন হাসপাতাল নামে। লর্ড ডাফরিনের স্ত্রী লেডি ডাফরিন ইন্ডিয়ার নারীদের মেডিকেল শিক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তিনি ১৮৮৫ সালে ইন্ডিয়ায় নারী মেডিকেল কলেজ করেন। সেখানেও সলিমুল্লাহ অনেক টাকা দান করেছিলেন।

গভর্নর জেনারেল লর্ড ডাফরিনের ঢাকা সফরকালে নবাব সলিমুল্লাহ স্থানীয় গণ্যমান্য মানুষের উপস্থিতিতে ঘোষণা করেন হাসপাতাল নির্মাণের। তিনি বলেন, হাসপাতাল নির্মাণে অন্যরা যে টাকা দেবে সে পরিমাণ টাকা তিনি একাই দেবেন। হাসপাতাল নির্মাণে নবাব আহসানউল্লাহ ৫০ হাজার টাকা দান করেছিলেন। ঢাকার নালগোলা এলাকায় টাকা দিয়ে একটি বিল্ডিং তৈরি করা হয়, সেখানে হাসপাতাল চালু করা হয়। হাসপাতালে বহির্বিভাগ চিকিৎসাসেবাও ছিল। ২৭০৪ নারী এখানে চিকিৎসা নিতে পারতেন। এছাড়া হাসপাতাল পরিচালনার জন্য নবাব প্রতি বছর হাজার টাকা করে দিতেন বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে জানা সম্ভব হয়েছে। তবে এটা আলাদা স্বায়ত্তশাসিত কোনো হাসপাতাল ছিল না। ১৯৪০ সালের দিকে হাসপাতালকে মিটফোর্ড হাসপাতালের সঙ্গে জুড়ে দেয়া হয়।

পটুয়াখালী বেগম হাসপাতাল: নবাব আহসানউল্লাহর তৃতীয় স্ত্রী ১৯০০ সালে মারা যায়। তার স্ত্রীর স্মরণে তিনি পটুয়াখালীতে একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। এর নামকরণ করেন পটুয়াখালী বেগম হাসপাতাল। তার স্ত্রীর নাম ছিল কামরুন্নেসা বিবি। সে ঘরে নবাবের তিন সন্তান ছিল পরীবানু, মেহের বানু, আক্তার বানু। হাসপাতাল নির্মাণে তিনি হাজার টাকা পটুয়াখালী সাবডিভিশন অফিসে পাঠান এবং হাসপাতাল নির্মাণের সব খরচের দায়িত্ব নেন। ১৯০৩ ১৯০৪ সালে তিনি আরো হাজার টাকা দিয়েছেন।

জামুর্কী চ্যারিটেবল ডিসপেনসারিস: টাঙ্গাইলে নবাব এস্টেটের বিশাল বড় কাছারি ছিল (রেভিনিউ অফিস) অফিসের আশপাশে নবাবরা একটি মসজিদ, একটি স্কুল একটি চ্যারিটেবল ডিসপেনসারি প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া যেত। একে বিল্ডিং করে পূর্ণ হাসপাতালে রূপান্তরের ওয়াদা করেন নবাব সলিমুল্লাহ। সেই সঙ্গে মসজিদও। নবাবদের জনকল্যাণমুখী কাজের বাস্তব উদাহরণ এটা। এই জামুর্কী এলাকার বিখ্যাত হাইস্কুল নবাব আবদুল গনির নামে।

আহসানউল্লাহ জুবিলী মেমোরিয়াল হাসপাতাল কামরুন্নেসা স্কুল: নওয়াবজাদি আক্তার বানু ঢাকার টিকাটুলী এরিয়ায় তার বাবার স্মরণে দ্য স্যার আহসানউল্লাহ জুবিলী মেমোরিয়াল হাসপাতালপ্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এর জন্য ১০ বিঘা জমি দান করেন। এছাড়া প্রয়োজনীয় সব খরচ বহনের দায়িত্ব নেন। হাসপাতাল নির্মাণের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সমাজের সুবিধাবঞ্চিত, অবহেলিত গরিব নারী পুরুষের জন্য চিকিৎসাসেবা দেয়া। বিশেষ করে যে নারীরা পর্দা করে তাদের চিকিৎসাসেবার পরিবেশ দিতে। নানা কারণে ১৯৪০ সালে হাসপাতালটি বন্ধ হয়ে যায়। তখন এর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নবাবজাদির মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত কামরুন্নেসা গার্লস স্কুলকে দান করা হয়। হাসপাতালে রোগীদের জন্য ছয়টি স্থায়ী কিছু অস্থায়ী বেডের ব্যবস্থা ছিল। আলাদা স্টেরিলাইজেশন কক্ষ, লেবার কক্ষ ছিল। অন্য পাশে বহির্বিভাগ রোগীদের জন্য দুটি ওয়েটিং রুম ছিল। নারী ডাক্তারদের আলাদা চেম্বার, পুরুষের জন্য আলাদা চেম্বার, একটি সার্জিক্যাল রুম, স্টোর রুম, নারীদের ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষার রুম ছিল। আবাসিক মেডিকেল অফিসার, নার্স, কম্পাউন্ডার, বেয়ারাদের ফ্রিতে কোয়ার্টারে থাকার ব্যবস্থা ছিল। কামরুন্নেসা স্কুল প্রতিষ্ঠায় আক্তার বানু লাখ টাকা দিয়েছেন হাসপাতালের স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তিসহ। ১৯৪৮ সালে স্কুলকে সরকার নিয়ে নেয়। ঢাকায় এটিই প্রথম সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়।

ঢাকায় চ্যারিটেবল ডিসপেনসারিস ফার্মেসি: তত্কালীন সময়ে বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্রপাতি মেডিকেল ওষুধ ইউরোপের দেশগুলোতে তৈরি হলেও দেশের মানুষ তা পাওয়া থেকে বঞ্চিত ছিল। নবাব আবদুল গনি ঢাকায় একটি ফার্মেসি প্রতিষ্ঠা করলেন অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য। দেশ-বিদেশ থেকে ভালো মানের ওষুধ আনলেন এবং মানুষ যেন তা সহজেই পেতে পারে সে ব্যবস্থা করলেন। ফার্মেসি প্রতিষ্ঠায় হয়তো তার সেবার পাশাপাশি ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য ছিল, তার ওষুধের দোকানে তখন ঢাকার বিখ্যাত চিকিৎসক ডা. কালিস চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় যুক্ত ছিলেন। তিনি ফার্মেসি ভিজিট করতেন। ওষুধের গুণাগুণ বিচার ক্রেতাদের সঠিক ওষুধ সরবরাহ করতেন। শুরুতে ফার্মেসির নাম ছিল কে. সি. বন্দ্যোপাধ্যয় অ্যান্ড কোং ডক্টর অ্যান্ড ড্রাগিস্ট। পরে এর নাম পরিবর্তন করে ইংল্যান্ডের রানীর নামে ভিক্টোরিয়া মেডিকেল হলরাখলেন। এটি ছিল বাবুবাজারে। ১৮৯০ সালের দিকে নবাব আহসানউল্লাহ আরেকটি বড় ফার্মেসি করেন শাহীন মেডিকেল হলনামে। নবাব আহসানউল্লাহর কবি নাম ছিল শাহীন। এখান থেকে দেশ-বিদেশে ওষুধ যেত, আবার এখানে আসত। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে মেডিকেল হল ধ্বংস হয়ে যায়। অন্যত্র ফার্মেসি স্থানান্তর হয়। নবাব সলিমুল্লাহ পরে এটি বিক্রি করে দেন। নবাব সলিমুল্লাহর ঢাকা শহরে হোমিওপ্যাথিক ফার্মেসিও ছিল। নবাব হাবিবুল্লাহর সময় এটি বিক্রি করে দেয়া হয়। তারা দেশে আধুনিক মেডিকেল সরঞ্জামাদি ওষুধ নিয়ে আসেন। এছাড়া নবাবরা কুমিল্লা হাসপাতালের নারী ওয়ার্ড নির্মাণে হাজার, নারায়ণগঞ্জ হাসপাতাল নির্মাণে হাজার, বরিশাল শহরে চ্যারিটেবল ডিসপেনসারি বাবদ হাজার টাকা দান করেন।

খাজা আলিমুল্লাহ থেকে নবাবদের আল্লাহর নামে দেয়া ওয়াকফ ট্রাস্ট, যা নবাব আবদুল গনির সময়ে এসে এর সমুদয় সম্পত্তি বেড়ে লাখ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। যার কারণে তাদের ধরনের কাজ করা সহজ হয়।

আবদুল গনি ফ্রি হাইস্কুল: গরিব ছাত্রদের বিনা বেতনে অধ্যয়নের সুযোগ দিতেই তিনি ১৮৬৩ সালে এই স্কুল চালু করেন। নবাব স্টেট থেকে প্রতি মাসে ২০০ টাকা দেয়া হতো

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূল উদ্যোক্তা নবাব সলিমুল্লাহ বঙ্গভঙ্গ রদের আঘাতে সেই যে শোকাহত হন, সেই শোক-দুঃখে তিনি রাজনীতি থেকেই ১৯১২ সালে অবসর নিলেন। এরপর তিনি আরো তিন বছর বেঁচে ছিলেন। তার স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয় তিনি দেখে যেতে পারেননি, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে কোনো অসুবিধা যাতে না হয়, সেজন্য তিনি তার জমিদারি থেকে একশ বিঘারও অধিক জমি দান করে যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল স্বপ্নদ্রষ্টা নবাব সলিমুল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা দেখে যেতে পারেননি। ১৯১৫ সালে তিনি অল্প বয়সে ভগ্নহূদয়ে ইন্তিকাল করেন। তার মৃত্যুর পর তার দুই কৃতী সহযোগী ধানবাড়ীর জমিদার সৈয়দ নবাব আলী চৌধুরী এবং উদীয়মান জননেতা একে ফজলুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটানা চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। অতঃপর প্রধানত সৈয়দ নবাব আলী চৌধুরীর অব্যাহত চেষ্টায় ১৯১৯ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিল উত্থাপিত হয় এবং তা ১৯২০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন হিসেবে অনুমোদিত হয়। ১৯২০ সালের ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভাইস চ্যান্সেলর ফিলিপ জে হার্টস তার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল: এর শুরুটা ছিল একটি সার্ভে স্কুল হিসেবে। ১৮৭৬ সালে ব্রিটিশ ভারতের বাংলা প্রদেশের সরকার পুরান ঢাকার নালগোলায় প্রতিষ্ঠা করে ঢাকা সার্ভে স্কুল মূলত বাংলা অঞ্চলে ভূমি জরিপকারী তৈরি করাই ছিল স্কুলের মূল লক্ষ্য। সে সময় দুই বছরের কোর্সে ভর্তি হতো ছাত্ররা। বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই ১৯০৫ সালে ঢাকার তত্কালীন খাজা আহসানউল্লাহ স্কুলের প্রতি আগ্রহী হন। মুসলমানদের শিক্ষা-দীক্ষার অগ্রগতির জন্য তিনি স্কুলে লাখ ১২ হাজার টাকা দান করেন। তার মহৎ অনুদানে এটি পরবর্তী সময়ে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষালয় হিসেবে প্রসার লাভ করে। এরপর ১৯০৮ সালে বিদ্যালয় তার নামানুসারে আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলহিসেবে নামকরণ করা হয়। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পর আহসানউল্লাহ স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে পরিণত হয় আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হিসেবে। ১৯৫৬ সালে পুরনো পাঠ্যসূচি পাল্টে নতুন পাঠ্যসূচি চালু হয় কলেজে। উচ্চতর শিক্ষা গবেষণার লক্ষ্যে পাকিস্তান সরকার ১৯৬২ সালে আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করে। ১৯৬২ সালের জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আলাদা হয়ে পথচলা শুরু হয় ইস্ট পাকিস্তান ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির (ইপুয়েট) দিনটিকেই বুয়েটের জন্মদিন হিসেবে পালন করা হয় প্রতি বছর। সার্ভে স্কুল থেকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হতে পাড়ি দিতে হয় ৮৬ বছর। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর ইপুয়েটের ইস্ট পাকিস্তান বদলে হয় বাংলাদেশ, ইপুয়েট পরিণত হয় বুয়েটে।

নবাব হাবিবুল্লাহ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ: উত্তরা মডেল টাউনের প্রাণকেন্দ্রে মনোরম পরিবেশে অবস্থিত। এটি একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। উত্তরার একমাত্র প্রাচীন এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান রেখে আসছে ১৯৬৩ সাল থেকে। নবাব সলিমুল্লাহর ছেলে হাবিবুল্লাহ এই প্রতিষ্ঠানের জন্য জমি দান করায় স্কুলটি তার নামেই প্রতিষ্ঠিত।

মসজিদ মাদ্রাসা নির্মাণ সংস্কার: নবাব আলিমুল্লাহর সময় থেকে নবাববাড়ীর উত্তর পার্শে কেন্দ্রীয় মসজিদ ছিল। বর্তমান সময়েও এর খরচ মেটানো হয় ওয়াকফ ট্রাস্ট থেকে। এর উত্তর-পশ্চিমের কর্নারে জাব্বু খানম মসজিদের ব্যয়ও নির্বাহ করা হয় ওয়াকফ থেকে। দিলকুশায় শাহজালাল দাখিনি মসজিদ, পরীবাগ মসজিদের খরচ বর্তমান সময়েও ব্যয় হয় ওয়াকফ থেকে।

হোসেনি দালানের সংস্কার: ১৮৪৩-এর পর হোসেনি দালানের মুতাওয়াল্লি মারা যাওয়ায় যখন ব্রিটিশ সরকারের কাছে নতুন মুতাওয়াল্লি নিয়োগ হোসেনি দালানের খরচের জন্য আবেদন করা হলো তখন ব্রিটিশ সরকার এর বরাদ্দ দেয়াও বন্ধ করল, নতুন কোনো মুতাওয়াল্লিও নিয়োগ দেয়নি। অবস্থায় মহররম যখন কাছাকাছি চলে এল তখন শিয়া সম্প্রদায়ের মানসিক অবস্থা উপলব্ধি করে এগিয়ে এলেন খাজা আলিমুল্লাহ। যদিও তিনি ছিলেন সুন্নি। তিনি শিয়া ধর্মাবলম্বীদের মহররমের সব আয়োজনের ব্যবস্থা এর অর্থ নিজের পকেট থেকে দিলেন। অবশেষে ব্রিটিশ সরকার তাকেই মুতাওয়াল্লি হিসেবে নিযুক্ত করল। এর পর থেকে হোসেনি দালানের সব দায়দায়িত্ব নবাবরাই পালন করতেন। হোসেনি দালানের রক্ষণাবেক্ষণে প্রতি বছর ১২৮৩ টাকা আনা নবাব স্টেট থেকে বরাদ্দ ছিল। এছাড়া বিভিন্ন উপলক্ষে সহায়তা তো থাকতই। পরবর্তী সময়ে খাজা নবাব আবদুল গনির সুপারিশে ব্রিটিশ সরকার খাজা আবদুর রহিম মীর মোহাম্মদকে হোসেনি দালানের সুপারভাইজার নিয়োগ করে। এটাও জানা গেছে যে হোসেনি দালান সংরক্ষণে আবদুল গনি এককালীন ২০ হাজার টাকা দান করেন। এরপর ১৮৯৭ সালের ১২ জুন যখন ভূমিকম্পে হোসেনি দালান ক্ষতিগ্রস্ত হয় সে সময় নবাব আহসানউল্লাহ এর সংস্কারে লাখেরও বেশি টাকা দান করেন। তাদের কাজে কলকাতার শিয়া সম্প্রদায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে একদল প্রতিনিধি প্রেরণ করে। হোসেনি দালানের পশ্চিম পাশে নবাবরা বাগান তৈরি করেন। এছাড়া নবাব সলিমুল্লাহ নবাবদের পুরনো গ্যাসপ্লান্ট দান করেন আহসান মঞ্জিল এরিয়া থেকে। এর কিছু পরে ১৯০২ সালে হোসেনি দালানের আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করেন এমনকি কলকাতা থেকে ৪০টি ল্যাম্প নিয়ে আসেন।

কদমরসুলের সংস্কার: ১৫০৮ সালে ঈশা খার সেনাপ্রধান মাসুম খান রাসুলের কদমের ছাপ আছে এমন একটি পাথর সংগ্রহ করেন একজন আরব বণিকের কাছ থেকে। অনেক বেশি দাম দিয়ে। তিনি এটি সংরক্ষণ করার জন্য একটি বিল্ডিং নির্মাণ করেন। সুবাদার ইসলাম খান, শাহজাহানের ছেলে যখন ঢাকায় ছিলেন তারাও কদমরসুলের প্রতি সম্মান শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন। শাহ সুজা এর জন্য ৮০ বিঘা জমি দিয়েছিলেন। যখন থেকে নবাবরা হোসেনি দালানের দেখভাল করেন, তখন থেকে কদমরসুল দেখভাল করার দায়িত্বও বর্তায় নবাবদের ঘাড়ে। তায়েস জানান, নবাব আহসানউল্লাহ কদমরসুলসংস্কারে অনেক অর্থকড়ি ব্যয় করেন। নবাবদের দানের তালিকা থেকে জানা যায়, এর সংস্কারে হাজার টাকা ব্যয় করেন।

শাহ আলী দরগা সংস্কার: নবাব পরিবার থেকে ২৫০০ টাকা ব্যয় করা হয় এর সংস্কারে। এছাড়া এখানে যাওয়ার জন্য রাস্তা নির্মাণে ১০ হাজার টাকা দান করেন। এই দরগা সংস্কারের জন্য পরে আরো ৩০০ টাকা দিয়েছিলেন।

সাত মসজিদ: সুলতানি আমলে নির্মিত সাত মসজিদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুধাবন করে নবাব আহসানউল্লাহ উনিশ শতকের শেষ দশকে এর সংস্কার করেন। পুনরায় মসজিদের কার্যক্রম চালু হয়। তিনি মুয়াজ্জিন কাম ইমাম নিয়োগ করেন। এর বেতন দেয়ার জন্য ১২ পাখি জমি ম্যানেজ করেন। এর মধ্য দিয়ে মসজিদটি আবার সচল হয়। নবাবদের দানের তালিকা থেকে জানা যায়, মসজিদ সংস্কারে ১৬৯৯ টাকা ব্যয় করেন নবাবরা।

মালিক পীর ইয়ামিনির দরগা সংস্কার: বিংশ শতাব্দী থেকে সাধকের সমাধিসৌধের কোনো আলামত পাওয়া যেত না। শুধু স্থানীয়রা তার ওখানে গিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন। শুধু দুটি বটগাছের মাঝখানে অল্পকিছু আলামত ছিল। ১৮৮৪ সালে প্রথম রেল কর্তৃপক্ষ জায়গাটি শনাক্ত করে। এরপর এক নবমুসলিম আসামের মনিপুরি রয়েল ফ্যামিলি থেকে এখানে আসেন এবং এই সমাধির রক্ষণাবেক্ষণ শুরু করেন। তার নাম ফকির রাজা। অবস্থায় এগিয়ে আসেন আহসানউল্লাহ। তার সহযোগিতায় সমাধির পাশে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়। এখানে খাজা আহসানউল্লাহ মসজিদ নির্মাণে এককালীন ১১০০ টাকা পীরের সমাধি মেরামতে ২৪৪ টাকা ব্যয় করেন। ১৯০৯ সালে খাজা সলিমুল্লাহ তার নিজের খরচের টাকায় বিশাল সমাধি নির্মাণ করেন।

লালবাগ শাহি মসজিদ সংস্কার: ১৮৭০ সালে নবাব আবদুল গনি মসজিদের সংস্কারে বিপুল টাকা ব্যয়ে এর ছাদ নির্মাণ করেন। দুবারে এখানে হাজার ৮৩০ টাকা দেন সংস্কারের জন্য।

খাজা আম্বর মসজিদ সংস্কার: কারওয়ান বাজারে অবস্থিত মসজিদ শায়েস্তা খানের আমলে তার অধীন খাজা আম্বর নামে এক ব্যক্তি নির্মাণ করেন। মসজিদের নিচেই তার সমাধি আছে। এর অনেক সম্পত্তি থাকলেও এর রক্ষণাবেক্ষণে টাকার অভাবে মসজিদটি জীর্ণশীর্ণ ছিল। নবাব আহসানউল্লাহ প্রচুর পরিমাণ টাকা ব্যয় করেছেন ওয়াকফ স্টেট থেকে। এর বর্ধিত অংশ থাকলেও পুরনো স্থাপনা এখনো আছে।

শাহজালাল দখিনি মসজিদ: মসজিদের সব খরচ নবাব স্টেট থেকে ব্যয় করা হয়। শাহ নেয়ামতুল্লাহ বুতশিকিনের সমাধির সংস্কারের খরচও দেয়া হয় নবাব ওয়াকফ স্টেট থেকে। হজরত শাহ মাসুদ পীর জঙ্গির দরগা নতুন করে আহসানউল্লাহ নির্মাণ করে দেন।

রামকৃষ্ণ মিশনে ভবন দান: সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে নবাবজাদি আক্তারবানু হিন্দু-মুসলিম পার্থক্য করতেন না। তার বাবার নামে রামকৃষ্ণ মিশনে একটা বিল্ডিং করে দেন প্রচুর টাকা খরচ করে, যা কিনা আজও আছে। তিনি আরো একটি বিল্ডিং করেন লক্ষ্মীবাজারে মিয়া সাহেবের ময়দানে, যা এখনো আছে।

বেগুনবাড়ী মসজিদ: সাভারের সাদুল্লাপুর মৌজায় একটি বাগানবাড়ী করেছিলেন নবাবরা। বছরের বিভিন্ন সময়ে পরিবার, সেন্ট্রি, অন্যদের নিয়ে অবকাশ যাপন, শিকার, মাছ ধরতে সেখানে যেতেন তারা। সেখানে তারা একটা চমত্কার মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। মসজিদটি এখনো বর্তমান।

খাজা হাফিজুল্লাহ মসজিদ মাদারীপুর: মসজিদটি মাদারীপুর শহরের মসজিদ। মসজিদটি অনেক আগের ছিল, যা সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দেয়। ১৮৮৪ সালে তত্কালীন ম্যাজিস্ট্রেট অব দ্য সাবডিভিশন মৌলভি মোহাম্মদ আজহার একটি সভা ডাকেন। এতে সংস্কারের ব্যয় নির্বাহে স্থানীয় সবার কাছ থেকে ৬০০ টাকা ওঠানো সম্ভব হয়। কিন্তু খাজা আহসানউল্লাহ মসজিদে সাড়ে হাজার টাকা দান করেন। ফলে পুরনো মসজিদটি সম্পূর্ণ ভেঙে বড় করে নতুনভাবে তৈরি করা হয়। পরে এর অভ্যন্তরীণ ডেকোরেশনের জন্য নবাব আরো হাজার টাকা দান করেন। মসজিদ কমিটি খুশি হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে নবাবের মারা যাওয়া সন্তান খাজা হাফিজুল্লাহর নামে মসজিদের নামকরণ করেন।

নেত্রকোনা আহসানউল্লাহ মসজিদ: এটিও নেত্রকোনা শহরের একটি মসজিদ ছিল, যেটির সংস্কার প্রয়োজন হলে তত্কালীন ম্যাজিস্ট্রেট অব দ্য সাবডিভিশন মৌলভি মোহাম্মদ আজহার সবার কাছ থেকে অর্থসহায়তা চান। ৮০৮ টাকা উত্তোলন সম্ভব হয়। টাকা দিয়ে সম্পূর্ণ সংস্কার করা সম্ভব হয় না, কাজ থেমে যায়। ১৯০২ সালে নবাব সলিমুল্লাহ ৩৩৩০ টাকা মসজিদে দান করেন। মসজিদ কমিটি খুশি হয়ে তার বাবার নামে মসজিদের নামকরণ করেন।

এছাড়া নবাবরা ঢাকা মাদ্রাসা, মাদারীপুর মাদ্রাসা, নেত্রকোনায় মাদ্রাসা, মসজিদ, বিক্রমপুরে দীঘিরপার সালিমিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন।

 

মুতাসিম বিল্লাহ: প্রত্নতত্ত্ব গবেষক সিনিয়র লেকচারার, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ (ইউডা)

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন