শনিবার | নভেম্বর ২৩, ২০১৯ | ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

টেরাকোটা-পর্ব ৩

কিংবদন্তির ভাওয়াল রাজবাড়ি

ইমরুল কায়েস খসরু

ইতিহাসের সঙ্গে ভাওয়াল রাজপরিবার ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অনেকে গাজীপুরের নাম শোনার সঙ্গে সঙ্গে সরাসরি ভাওয়াল রাজপরিবারের নাম উচ্চারণ করে বসেন। ভাওয়াল রাজপরিবারের স্মৃতিবিজড়িত জয়দেবপুরের ভাওয়াল রাজবাড়িটি প্রায় ১৫ একর সমতলভূমির ওপর নির্মিত। প্রাসাদটি ঢাকা শহর থেকে উত্তরে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। শেষের পাঁচ কিলোমিটার প্রাসাদগামী শাখা রাস্তা ময়মনসিংহ মির্জাপুর সড়কের ছেদরেখা থেকে পূর্বদিকে প্রসারিত। বর্তমানে এই রাজবাড়ি নব্য সৃষ্ট গাজীপুর জেলার সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। ভাওয়ালের জমিদারদের পারিবারিক আবাসস্থল ছিল জয়দেবপুর। ঢাকা জেলার হিন্দু জমিদারদের মধ্যে তারা ছিলেন নেতৃত্বস্থানীয়। জয়দেবপুরের চারদিক টাঙ্গাইল জেলার পূর্ব মধুপুর গড়ের বিস্তৃত গভীর বনভূমির বিখ্যাত গজারি বন দ্বারা পরিবেষ্টিত। এমনকি পঞ্চাশ বছর আগেও এলাকাটি বন্য জন্তুদের অভয়ারণ্য ছিল। এখানে বাঘ, হাতি, বন্য শূকর, হরিণ ইত্যাদি দল বেঁধে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারত।

সবচেয়ে বড় কথা এই রাজবাড়িটি গাজীপুরের জয়দেবপুর রেল জংশনের একেবারে হাত মেলানো দূরত্বে অবস্থিত। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় ভবন হিসেবে ব্যবহূত এই প্রাসাদটি অত্যন্ত অনিয়মিত অপরিকল্পিত ভূমি নকশায় নির্মিত। ভাওয়াল রাজপ্রাসাদের মূল অক্ষের দৈর্ঘ্য উত্তর-দক্ষিণে ১২০ মিটার। প্রাসাদ চত্বরে প্রবেশের জন্য মূল প্রাসাদ ভবনের প্রায় মিটার পশ্চাতে দক্ষিণ দিকে চার জোড়া গোলায়িত স্তম্ভের ওপর নির্মিত রয়েছে দ্বিতলবিশিষ্ট একটি প্রবেশ দরদালান বা গাড়িবারান্দা। প্রাসাদের গাড়িবারান্দার পশ্চাতে রয়েছে একটি প্রশস্ত বারান্দা। হলঘরের পূর্ব পশ্চিম উভয় দিকে তিনটি করে কক্ষ বিদ্যমান। পরিকল্পনা অনুসারে প্রবেশ হলঘরের ডান দিকে দ্বিতলে ওঠার জন্য রয়েছে কাঠের নির্মিত একটি প্রশস্ত সোপানশ্রেণী। বড়দালান নামে পরিচিত এই সম্মুখ ব্লকটি ইউরোপীয় অতিথিদের জন্য সংরক্ষিত ছিল।

স্থাপত্যটির ইউরোপীয় অতিথিদের জন্য নির্মিত ব্লকের পশ্চাতে রয়েছে ৩০ মিটার বর্গাকৃতির একটি উন্মুক্ত অঙ্গন। অঙ্গনে রয়েছে একটি নাটমণ্ডপ। নাটমণ্ডপের উপরিভাগ লোহা সিমেন্ট-বালি মিশ্রিত মসলা দিয়ে প্রস্তুতকৃত কতকগুলো নলাকৃতির স্তম্ভের ওপর স্থাপিত ঢেউটিনের কুজ্জাকৃতির ছাদে আচ্ছাদিত। অঙ্গনের দক্ষিণ, পূর্ব পশ্চিম দিকে দ্বিতল আবাসিক কক্ষসংবলিত তিনটি ব্লক পরিলক্ষিত হয়। ব্লকসমূহের সম্মুখে অর্ধবৃত্তাকৃতির খিলানসংবলিত টানা বারান্দা বিদ্যমান। অঙ্গনের চতুর্দিকের বারান্দার খিলানসমূহ কতকগুলো করিন্থীয় স্তম্ভের ওপর স্থাপিত।

সর্বোপরি এটি একটি উন্মুক্ত চত্বর, যার দুই প্রান্তে রয়েছে দুটি চৌচালা মন্দির এবং এর পশ্চাতে রয়েছে দ্বিতলবিশিষ্ট একটি সাদাসিধে ইমারত। অধিকন্তু প্রথম অঙ্গনের পশ্চাতে আরো উত্তরে রয়েছে আরেকটি উন্মুক্ত অঙ্গন। অঙ্গনের তিন দিক আবাসিক কক্ষসংবলিত তিনটি দ্বিতলবিশিষ্ট ইমারত দ্বারা পরিবেষ্টিত। ইমারতগুলোর সম্মুখভাগে গোলায়িত যুগল স্তম্ভের ওপর ছাদ নির্মিত রয়েছে। অঙ্গনের অবশিষ্ট উত্তর দিকে রয়েছে একটি পারিবারিক মন্দির। মন্দিরটির সম্মুখস্থ বারান্দা ছয়টি গোলায়িত স্তম্ভ দ্বারা দুটি সমান সারিতে বিভক্ত। প্রতিটি গোলায়িত স্তম্ভের চারদিক আবার কতকগুলো নলাকৃতির তুশকান স্তম্ভ সংযুক্ত করে তদুপরি অর্ধবৃত্তাকৃতির খিলান স্থাপিত হয়েছে। এই ব্লকের পশ্চাতে আরো উত্তর দিকে উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত আরেকটি আবাসিক ইমারত রয়েছে।

ভাওয়াল রাজবাড়ির পশ্চিম দিকের একটি সংকীর্ণ সংযোগপথ দিয়ে এই ব্লকে প্রবেশ করতে হয়। দীর্ঘাকৃতির এই ব্লকের পশ্চিম প্রান্তে এবং মূল ব্লকের ডান কোনায় একটি অভিক্ষিপ্ত ইমারত রয়েছে। ইমারতটি রানী মহল বা প্রাসাদের হেরেম নামে পরিচিত। দ্বিতলবিশিষ্ট রানী মহলের দক্ষিণ প্রান্তে রয়েছে বিশাল ঝুলবারান্দাসহ অর্ধবৃত্তাকৃতির একটি অভিক্ষিপ্ত অবকাঠামো। ঝুলবারান্দাটি কতকগুলো অর্ধবৃত্তাকৃতির খিলানসারির ওপর স্থাপিত। প্রাসাদের এই জটিল অংশটির পশ্চিম দিক একটি অনুচ্চ সীমানাপ্রাচীর এবং একটি ৬০-৮০ মিটার প্রশস্ত পরিখা দ্বারা পরিবেষ্টিত। অবশ্য সমগ্র রাজবাড়িই ওই পরিখা দ্বারা পরিবেষ্টিত সুরক্ষিত। পরিখাটির দক্ষিণ-পশ্চিম পারে রয়েছে একটি ভগ্নদশাগ্রস্ত বাংলো। বলা হয়ে থাকে এই বাংলোটি কুখ্যাত পারিবারিক ডাক্তার আশুতোষ দাস গুপ্তের বাসগৃহ ছিল।

ভাওয়াল রাজবাড়ির বিখ্যাত রানী মহলের ঠিক পশ্চাতে এবং আরো উত্তরে রয়েছে পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা আরেকটি ইমারত, যা পুলিশ সুপারের অফিস হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। ইমারতটি বর্তমানে দ্বিতলবিশিষ্ট হলেও মূলত এটি ছিল একতলাবিশিষ্ট। এর দ্বিতল অংশ পরবর্তীকালে সংযোজিত হয়েছে। রাজবাড়ির বাইরে দক্ষিণ দিকের তৃণভূমির ওপারে দণ্ডায়মান রয়েছে ম্যানেজারের অফিস ভবন। ভবনটি দেওয়ানখানা নামে পরিচিত। এই অফিসের সঙ্গে রয়েছে দুটি আস্তাবল ব্লক। ১৯০৯ সালে এই আস্তাবল দুটিতে একটি রৌপ্য বাঁধানো গাড়ি এবং বিশটি হস্তীসহ চল্লিশটি ঘোড়া ঘোড়ার গাড়ি ছিল। অনিয়মিত অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত ধরনের বিস্ময়কর রাজবাড়ি বাংলাদেশের মধ্যে এটিই সর্ববৃহৎ। এখানে বিভিন্ন আয়তনের ৩৬০টিরও অধিক কক্ষ বিদ্যমান।

ভাওয়ালের প্রথম খ্যাতিমান জমিদার ছিলেন ফজল গাজী। তিনি বাংলার বারভূঁইয়াদের নেতা ঈসা খানের একজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। তার উত্তরাধিকারী বাহাদুর গাজী মোগল সম্রাট আকবরের কাছ থেকে পূর্ববঙ্গের ২২ পরগনা জায়গির হিসেবে লাভ করেন। দৌলত গাজীর সময়কাল পর্যন্ত ভাওয়ালের গাজী পরিবার এই জমিদারি ধরে রেখেছিলেন এবং তারা মূলত তখন পর্যন্ত কালিগঞ্জে বসবাস করছিলেন। ১৬৪৫ খ্রিস্টাব্দে তারা নতুন করে জমিদারি বন্দোবস্ত লাভ করেন। যা হোক দৌলত গাজী নিয়মিত রাজস্ব পরিশোধে ব্যর্থ হলে মোগলরা তার জমিদারি কেড়ে নেয় এবং ওই জমিদারি তার তিনজন হিন্দু কর্মচারী যথা বলরাম, কৃষ্ণরাম চৌধুরী এবং বলসন্না ঘোষের নামে বন্দোবস্ত দেয়। কিংবদন্তি থেকে জানা গেছে, জমিদার বলরাম তার উত্তরাধিকারী শ্রীকৃষ্ণকে রেখে মৃত্যুবরণ করেন। বলরামের ষষ্ঠ অধঃস্তন পুরুষ লক্ষ্মী নারায়ণের সময় ১৭৬৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার দেওয়ানি লাভ করে।

লক্ষ্মী নারায়ণের পুত্র কালী নারায়ণের সময় এই জমিদারির আয়তন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। তিনি ভাওয়ালের বিখ্যাত নীলচাষী মি. ওয়াইজের ভূসম্পত্তির একটি অংশ এবং ফুলবাড়ির জমিদারি কেনেন। পুত্র রাজেন্দ্র নারায়ণ দেব বাহাদুরকে রেখে তিনি ১৮৭৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন। ১৯০১ সালে রাজেন্দ্র নারায়ণও পরলোকগমন করেন। রাজেন্দ্র নারায়ণের তিন পুত্র যথা রণেন্দ্র, রমেন্দ্র রবীন্দ্র নারায়ণ। জ্যেষ্ঠ দুজন বেশিদিন জীবিত ছিলেন না। তারা নিঃসন্তান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে কনিষ্ঠ ভ্রাতা রবীন্দ্র নারায়ণ সমগ্র এস্টেটের মালিক হন। জয়দেবপুর রাজবাড়ির প্রধান অট্টালিকা ১৮৩৮ সালের দিকে জমিদার কালী নারায়ণ কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল বলে অনুমিত হয়।

ভাওয়ালের বিশাল রাজবাড়ীর অবশিষ্টাংশ জুড়ে রয়েছে তদানীন্তন ভারতের দুটি জমিদারির উত্তরাধিকারী হত্যাকাণ্ডের মতো চূড়ান্ত বিয়োগান্তক নাটকের এক চকমপ্রদ ঘটনা। ১৯৩০ সালে ভারতীয় সংবাদপত্রে যে দুটি চঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড ব্যাপক প্রচারণা লাভ করেছিল তাদের একটি ভাওয়াল রাজকুমার হত্যাকাণ্ড মামলা এবং অন্যটি বিহারের পাকুড় রাজকুমার হত্যাকাণ্ড মামলা। প্রথমোক্তটি প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ভাওয়াল রাজকুমারকে বিষ প্রয়োগে হত্যা এবং অলৌকিকভাবে তার জীবন ফিরে পাওয়াজনিত এক অবিশ্বাস্য ঘটনা।

বিষয়টি রূপকথার গল্পকেও হার মানায়। সংক্ষেপে গল্পটি হলো: ১৯০৯ সালের মে মাসে রাজকুমার রমেন্দ্র নারায়ণ রায়কে অসুস্থতার কারণে হাওয়া পরিবর্তনের জন্য তার পত্নী বিভাবতী দেবী তাকে দার্জিলিং নিয়ে যান। পারিবারিক চিকিৎসক ডা. আশুতোশ দাস গুপ্ত, কতিপয় আত্মীয়স্বজন এবং রাজকুমারের কিছু স্টাফ সদস্যও তাদের সঙ্গে ছিলেন। সুস্থতা অর্জনের জন্য বিশ্রামকালে তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার হন। তাকে পারিবারিক চিকিৎসক দ্বারা বিষ প্রয়োগ করা হয়। ফলে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন এবং মে দার্জিলিংয়ের সিভিল সার্জন ডা. কালভার্ট তাকে মৃত ঘোষণা করে মৃত্যুজনিত সনদ প্রদান করেন। ওই দিন রাতেই তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য তাকে শ্মশানঘাটে নেয়া হয়। কিন্তু হঠাৎ করেই একটি কঠিন ঝড়বৃষ্টি এসে সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে ফেললে শ্মশানে আগত লোকজন ঘাট থেকে কিছু দূরে অন্যত্র আশ্রয় নেয়। ঝড়বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর তারা ঘাটে এসে দেখে শবদেহ (মরদেহ) নেই। কিছুদিন পর রাজকুমার জ্ঞান ফিরে নিজেকে একদল নাগা সন্ন্যাসীদের মাঝে দেখতে পান। ওই নাগা সন্ন্যাসীরা সেবাযত্ন করে তাকে বাঁচিয়ে তোলে। এর পর থেকেই রাজকুমার তার স্মরণশক্তি হারিয়ে ফেলেন এবং বারো বছর ভারতের বিভিন্ন স্থান ঘুরে অবশেষে ১৯২১ সালের শেষ দিকে ঢাকায় ফিরে আসেন।

তখন তার পরনে ছিল সন্ন্যাসী বস্ত্র এবং মুখে দীর্ঘ শ্মশ্রু মাথায় দীর্ঘ জট। তিনি ঢাকার বাকল্যান্ড বাঁধে বসবাস শুরু করেন। ক্রমান্বয়ে তাঁর স্মৃতিশক্তি ফিরে আসতে থাকলে তিনি নিজেকে ভাওয়ালের দ্বিতীয় কুমার রমেন্দ্র নারায়ণ রায় বলে ঘোষণা দিয়ে নিজের পরিচিতি ফিরে পাওয়ার জন্য একটি মামলা রুজু করেন। তাঁর পত্নী সঙ্গে সঙ্গে তাকে অস্বীকার করেন। কিন্তু কুমারের বহু আত্মীয়স্বজন, ব্যক্তিগত কর্মচারী প্রজাদের অনেকেই তাকে শনাক্ত করতে সক্ষম হন। ঢাকার অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতে এক দশকেরও অধিক সময় ধরে মামলাটি পরিচালিত হয়। অবশেষে ১৯৩৬ সালের আগস্ট মাসে তিনি তার পরিচিতি ফিরে পান এবং আদালতের ডিক্রি অনুযায়ী তাকে ভাওয়ালের জমিদারির এক-তৃতীয়াংশ প্রত্যর্পণের নির্দেশ দেয়া হয়। আর এই সময়ের স্মৃতি হিসেবে কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে ভাওয়াল রাজবাড়িটি।

 

ইমরুল কায়েস খসরু: উন্নয়নকর্মী

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন