রবিবার | নভেম্বর ১৭, ২০১৯ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

টেরাকোটা-পর্ব ৩

ঔপনিবেশিক খুলনার পুরাকীর্তি

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

১৭৪০ খ্রিস্টাব্দে বাংলা, বিহার, ওড়িশার দেওয়ান নাজিম নিযুক্ত হন আলীবর্দী খাঁ। ১৭৪২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্যবসা শুরু করে দেশে। সময়ে মারাঠা, বর্গী আক্রমণের শিকার হয়েছিল খুলনা অঞ্চল। শাসনক্ষমতা নবাবের হাতে থাকলেও কার্যত কোম্পানি ক্রমশ হয়ে উঠতে থাকে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। লর্ড ক্লাইভ দ্বিতীয় গভর্নর হওয়া পর্যন্ত ব্রিটিশ শাসনে স্থানীয় কর্মচারীদের আকার ছোট থাকলেও ভেরেলস্টও কার্টিয়ারের (১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দ) সময় কর্মচারীরা দুর্নীতিবাজ বেপরোয়া হয়ে ওঠে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সঙ্গে কর্মচারীদের দুর্নীতি দুয়ের ফলে ১৭৬৯-৭০ খ্রিস্টাব্দে (১১৭৬ বঙ্গাব্দে) বাংলায় ঘটে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। মন্বন্তরে খুলনা অঞ্চলের বহু লোক মৃত্যুবরণ করে। হেস্টিংসের সময়ে প্রত্যেক জেলায় একটি করে দেওয়ানি ফৌজদারি আদালত স্থাপিত হয়। ওই সময় রাজস্ব আদয়ের কালেক্টর দেওয়ানি বিচারের কাজ চালাতেন। নায়েব নাজিমের অধীনে ফৌজদারি বিচারের ভার ন্যস্ত হয় দেশের ম্যাজিস্ট্রেট বিচারকের ওপর। খুলনা অঞ্চলের প্রথম আদালত স্থাপিত হয় ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে যশোরের মুড়লীতে। আদালত স্থাপনের পর ম্যাজিস্ট্রেসি পুলিশি ক্ষমতা চলে গিয়ে তা ন্যস্ত হয় জজের হাতে। যশোর আদালতের জজের হাতে ন্যস্ত ছিল যশোর, খুলনা ফরিদপুর এলাকার ফৌজদারি ক্ষমতা।

১৭৬৬ সালে পশুর নদীতে ফলমাউথ নামে একটা জাহাজ ডুবে গিয়েছিল। এর সূত্র ধরে নীল চাষের সময়ে ১৭৮১ সালে খুলনা হয় পিচ্চি এক থানা, নতুন নয়াবাদ থানা গোটা বাংলায় নীল চাষের যে করুণ ইতিহাস তা খুলনা অঞ্চলের মানুষের জন্য বয়ে আনে সীমাহীন ট্র্যাজেডি। নয়াবাদ থানা স্থাপনের পরও নীলকর বনাম প্রজা দাঙ্গা নিরসন না হওয়াতে সরকার ১৮৪২ খ্রিস্টাব্দে নয়াবাদ থানাকে মহকুমায় উন্নীত করে আর রেণীর তালিমপুর শিবনাথ ঘোষের শ্রীরামপুরের মধ্যবর্তী কিসমত খুলনা নামক স্থানে মহকুমা সদর স্থাপন করেন। উল্লেখ্য, খুলনা বাংলাদেশের প্রথম মহকুমা। পরবর্তীকালে মহকুমা অফিস বর্তমান জেলা প্রশাসকের বাংলোতে স্থানান্তরিত হয়। ওই সময়ে খুলনা মহকুমার অংশ ছিল বর্তমান খুলনা, সাতক্ষীরা কচুয়া ব্যতীত সমগ্র বাগেরহাট জেলা।

খুলনার নীল বিদ্রোহের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন রহিমুল্লাহ। নীলকর মোড়েল (যার নামে বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ উপজেলা) তার অনুগত বাহিনীর অত্যাচারের বিরুদ্ধে রহিমুল্লাহ বারুইখালী গ্রামবাসী রুখে দাঁড়ায়। পরে নীলকরদের লাঠিয়াল বাহিনীর কাছে রহিমুল্লাহ বেশ কয়েকজন নিহত হন। কিন্তু প্রহসনের বিচারে নীলকর বাহিনী খালাস পায় বেকসুর। কায়েমি স্বার্থবাদী হিন্দু জমিদার নীলকরদের বিরুদ্ধে প্রজাদের সংগঠিত করেন মীর নিসার আলী ওরফে তিতুমীর। তিতুমীরের প্রধান কার্যালয় ভারতের চব্বিশ পরগনায় হলেও খুলনার ইতিহাসে তিনি অবিসংবাদিত নেতা। অল্পদিনেই খুলনা অঞ্চলে তার সমর্থক বৃদ্ধি পায় আশাতীত। মোল্লাহাটের নীলকুঠির ম্যানেজার ডেভিস লাঠিয়াল বন্দুক বাহিনী নিয়ে মিলিত হয় জমিদার কালিপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে।

অতঃপর তারা সম্মিলিতভাবে আক্রমণ করে তিতুমীর বাহিনীকে। কিন্তু তারা পরাস্ত হয়। যুদ্ধ জয়ের পর বৃদ্ধি পায় তিতুমীরের জনপ্রিয়তা। খুলনা, সাতক্ষীরার জমিদাররা গোবরডাঙ্গা নদীয়ার কালেক্টরের কাছে যৌথ আক্রমণের প্রস্তাব করে। তিতুমীর সাধারণ প্রজাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে অক্টোবরে চব্বিশ পরগনা জেলায় নারকেলবাড়িয়াতে একটি বাঁশের কেল্লা স্থাপন করেন। গভর্নর জেনারেল উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের (১৮২৮-৩৫ খ্রিস্টাব্দ) নির্দেশে মেজর স্কটহাড়িং বারাসাতের যুগ্ম ম্যাজিস্ট্রেট আলেকজান্ডার একযোগে তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা আক্রমণ করেন ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দের ১৯ নভেম্বর। যুদ্ধে তিতুমীর পরাজিত নিহত হন। খুলনা জেলায় ফারায়েজি আন্দোলন ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন ফরিদপুরের হাজী শরিয়ত উল্লাহ (১৭৮১-১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ) তার পুত্র মহসীন উদ্দিন ওরফে দুদু মিয়া (১৮১৯-১৮৬২ খ্রিস্টাব্দ) ফারায়েজি আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল অত্যাচারী জমিদার, নীলকরদের হাত থেকে মুসলমানদের রক্ষা করা অধঃপতিত কুসংস্কারাচ্ছন্ন মুসলমানদের প্রচলিত নয়, প্রকৃত ইসলামের পথে আনা। সৈয়দ আহমদ বেরেলভি (১৭৮৬-১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে) তরিকায়ে মুহম্মাদিয়া জেহাদ আন্দোলন শুরু করেন। খুলনায় যে প্রচারকেন্দ্র ছিল সেখানে এলাকাবাসী জেহাদের জন্য নিয়মিত অর্থ জোগান দিত। ব্রিটিশ শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে সিপাহি বিপ্লব ইতিহাসের এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে খুলনা, যশোর চব্বিশ পরগনা একীভূত জেলা ছিল। সিপাহি বিপ্লবের জন্য কলকাতা থেকে বরিশাল পর্যন্ত যে জাহাজ চলাচল করত, তাতে সংগ্রহের বড় একটা অংশ আসত খুলনা অঞ্চল থেকে। ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর রানী ভিক্টোরিয়া (১৮৭৫-১৯০১ খ্রিস্টাব্দ) এক রাজকীয় ঘোষণার দ্বারা ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটিয়ে ব্রিটিশ সরকারের প্রত্যক্ষ শাসন প্রতিষ্ঠিত করলে খুলনাও ব্রিটিশ সরকারের শাসনাধীন হয়। ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দের জুন তারিখ যশোর চব্বিশ পরগনার পশার কেটে নিয়ে সুন্দরবনের জন্য পৃথক পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে খুলনাকে যেন জড়োয়া গহনা পরিয়ে দিলেন ব্রিটিশ বাহাদুর। ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দের ১৯ ২৬ এপ্রিল The Calcutta Gazette- প্রকাশিত দুটি প্রজ্ঞাপন উল্লিখিত তারিখে মুদ্রিত হলেও তাতে প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ১৫ ২৫ এপ্রিল।

১৮৮৪ সালের ১২ ডিসেম্বর পৌরসভা ঘোষণা হয় খুলনার কেন্দ্রীয় শহরে। ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ডিসেম্বর মিউনিসিপ্যালিটি দ্বিতীয় সভায় ভাইস চেয়ারম্যান বাবু কৈলাশচন্দ্র কাঞ্জিলালের বাড়ি সত্যচরণ হাউস’- মিউনিসিপ্যালিটির অফিস স্থাপন করা হয়। স্থানটির অস্তিত্ব বর্তমানে নির্ণয় করা যায়নি, তবে কারো কারো মতে ভবনটি বর্তমান পৌর ভবনের কাছে ছিল। খুলনার প্রথম প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন মি. শের। প্রথম জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন ডব্লিউ এন ক্লে। আর দ্বিতীয় মহকুমা হাকিম হয়ে আসেন সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪) বর্তমানে খুলনার যে স্থানটিতে জেলা প্রশাসকের বাসভবন সেখানেই ছিল তার সরকারি বাসভবন। স্থানে বসেই তিনি লিখেছিলেন দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫)

খুলনার এসব মনোহর মান-মর্যাদার কারণেই ১৯৪৭-এর ১৪ আগস্ট ভারত বিভাগের দিনে খুলনাকে নিয়ে রীতিমতো কাড়াকাড়ি, টানাটানি পড়ে যায় দুই পারে। তিনদিন খুলনা ভারতের খাতায়। ১৭ আগস্ট পাকিস্তানের। পঞ্চাশের দশকেই খুলনা হয় দেশের সেরা নদীবন্দর, দ্বিতীয় সমুদ্রবন্দর, তৃতীয় শিল্পনগরী। রূপসী সুন্দরবনের বদৌলতে দেশসেরা নিউজপ্রিন্ট মিল, জগেসরা জুট মিল, দিলদরিয়া দাদা দেশলাই কারখানা, টাটকা টেক্সটাইলস মিল, সেরা শিপইয়ার্ড এসবের পশারে জমজমাট আনন্দ তখন ভৈরবের বাতাসে, স্রোতে। সুন্দরবনের সৌন্দর্যে, শিবসার সুরালোকে সে সময় বিমোহিত ছিল সবাই। বিভাগীয় শহরের মর্যাদা লাভ করে খুলনা ১৯৬১ সালে।

খুলনা জেলার অবস্থান বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে। মফস্বল থেকে মুসলমানদের সমস্যা চিহ্নিত করে তা সরকারের গোচরে আনার উদ্দেশ্যে ১৯১২-১৩ খ্রিস্টাব্দে জন্ম খুলনা জেলা মোহামেডান অ্যাসোসিয়েশন’-এর। সংগঠন প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী উল্লেখ্যযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন শামসুর রহমান। মহাত্মা গান্ধী খুলনায় আসেন ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে। দলমত নির্বিশেষে খুলনার মানুষ তাকে বিপুল আয়োজনে পার্কে সংবর্ধনা জানান। পরে তার সম্মানে পার্কটির নামকরণ করা হয় গান্ধী পার্ক’, যা বর্তমানে হাদিস পার্কনামে পরিচিত। ঐতিহাসিক পার্কে মহাত্মা গান্ধীর পরে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন, সরোজিনী নাইডু প্রমুখ বক্তৃতা করেছেন।

উপরোক্ত ইতিহাস প্রেক্ষাপটে ঔপনিবেশিক খুলনায় পুরাকীর্তির সন্ধান যা মেলে তাতে দেখা যায় মন্দির, মসজিদ, জমিদারবাড়ি, প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের বাড়ি, দক্ষিণডিহি রবীন্দ্রনাথের শ্বশুরবাড়ি, নীলকরের আস্তানা ছিল ঔপনিবেশিক খুলনার পুরাকীর্তির সিংহভাগ। মধ্যযুগে খুলনায় ছিল মোগল প্রশাসন মুসলিম পরিব্রাজক, অধ্যাত্ম পীর প্রচারকদের কর্মকাণ্ড সংশ্লিষ্ট প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। নদীবিধৌত খুলনা অঞ্চলে প্রচুর প্রাচীন মসজিদ, খানকা, দরগার দেখা মেলে। মাটির কাজ কারুকার্যে তা ছিল সমৃদ্ধ। ঔপনিবেশিক খুলনায় সেসবের ধারাবাহিকতা যেমন দেখা যায়, আবার ব্রিটিশ শাসনামলে ইউরোপীয় নির্মাণশৈলীর সাক্ষাৎ শুরু হয়। এসব নিদর্শনের তালিকা অনুসন্ধান কতিপয়ের বিবরণ রচনায় সাহায্য নেয়া হয়েছে সতীশ চন্দ্র মিত্রের (১৮৭২-১৯৩১) ‘যশোর খুলনার ইতিহাস’, এএফএম আবদুল জলীলের (১৯১৬-১৯৭৮) ‘সুন্দরবনের ইতিহাস’, অধ্যাপক বজলুল করিমের ব্রজলাল কলেজের ইতিহাসএবং অতি সম্প্রতি (নভেম্বর ২০১৭) প্রকাশিত . মিজানুর রহমানের খুলনার পুরাকীর্তিথেকে।

মহেশ্বরপাশা জোড়বাংলা মন্দির

দৌলতপুর উপজেলায় মহেশ্বরপাশা গ্রামে অপূর্ব কারুমণ্ডিত একটি জোড়বাংলা মন্দির আছে। এটি মহেশ্বরপাশা জোড়বাংলা মন্দির নামে খ্যাত। মহেশ্বরপাশার মল্লিকপাড়ায় মন্দিরের অবস্থান। মানিকতলা বাস স্টপেজ থেকে . কিলোমিটার পশ্চিমে। মন্দিরের উত্তর অংশে অবস্থিত জিয়া কলেজ। নির্মাতার পরিচয় নির্মাণ তারিখসংবলিত একটি ভাঙা ইষ্টক ফলক পাওয়া যায় মন্দিরের পূর্ব দেয়ালের বহিরাংশে। তা থেকে জানা যায়, ‘নবাব আলীবর্দী খানের আমলে ১৭৪৯ সালে মল্লিক বংশীয় গোপীনাথ গোস্বামী নামক এক খ্যাতনামা সাধক মন্দিরটি তৈরি করেন।

মল্লিক বংশ মহেশ্বরপাশার আদি বাসিন্দা। মল্লিক বংশের পূর্বপুরুষ ঈশান বন্দ্যোপাধ্যায়ের বসবাস ছিল বাঁকুড়া জেলায়। তার ছেলে নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায় বাঁকুড়া থেকে মহেশ্বরপাশায় এসে বসতি গাড়েন। তিনি সরকার বাহাদুরের কাছ থেকে মল্লিকউপাধি পান। নারায়ণের দুই পুত্র রামকৃষ্ণ প্রাণকৃষ্ণ। প্রাণকৃষ্ণের পৌত্র গোপীনাথের হাতেই নির্মিত হয় মহেশ্বরপাশা জোড়বাংলা মন্দির। গোপীনাথ জোড়বাংলা মন্দির নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করার পর এর নান্দনিক সুষমা বিবেচনায় রেখে খ্যাত নির্মাতা সন্ধান করতে থাকেন। অবশেষে কাজের দায়িত্ব ন্যস্ত করেন লতা গ্রামের রাজপদবিধারী নমঃশূদ্র রাজমিস্ত্রীদের ওপর। মন্দির নির্মাণের সময় নিজ অর্থ ছাড়াও তিনি অন্যদের সাহায্য পেয়েছিলেন। গোপীনাথ চাঁচড়ার রাজা মনোহর রায়ের প্রপৌত্র রাজা নীলকণ্ঠ রায়ের সমসাময়িক ছিলেন। সেই সময়ে এই জোড়বাংলা নির্মিত হয়। গোবিন্দ বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার জন্য রাজা গোপীনাথ থেকে ১০০/- দেবত্র দেন।মন্দির নির্মাণের সময় এর পোড়ামাটির কাজে ধর্মীয় বিষয়াবলি ফুটিয়ে তোলার সঙ্গে সঙ্গে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সমকালীন বাংলার চালচিত্র। মহেশ্বরপাশা জোড়বাংলা মন্দির নির্মাণের সময় এর তারিখখচিত যে ইষ্টকলিপি তা নির্মাণ সনের সাক্ষ্য হয়ে বহু বছর টিকে ছিল। বর্তমানেও এর কিয়দংশ টিকে আছে। একটি চৌকো ফ্রেমের মধ্যে আবদ্ধ নান্দনিক লিপিফলকের যেটুকু টিকে আছে তা অর্ধাংশ। টিকে থাকা লিপি থেকে যে পাঠ উদ্ধার করা যায় তা হলো প্রশস্তি। শ্রী গোপীনাথোনামাক্ষিতিসুর সুতকে বৃষ্ণিরাশৌ দিনেশে শ্রীহরী।জোড়বাংলা মন্দির নির্মাণের পর এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দেশ-বিদেশে। পূজা-পার্বণ ছাড়াও বহু পর্যটক আসতেন।

কালীমন্দির স্মৃতিমন্দির

বসুদেব স্মৃতিমন্দিরের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে ভৈরব-তীরবর্তী অংশে কয়েকটি প্রত্ন নিদর্শন পাওয়া যায়, যদিও এগুলোর স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য তেমন গুরুত্ব বহন করে না। অংশে অবস্থিত গিরিশচন্দ্র সেন মহাশ্মশান। নির্মাণ ফলকের তথ্য অনুযায়ী এটির নির্মাণ সন ১২৫২ বঙ্গাব্দ সংস্কার সন ১৩৯২ বঙ্গাব্দ। এখানে নদীর পাড়ে উত্তর অংশে একটি কালীমন্দির একটি স্মৃতিমন্দির আছে। এগুলোর অবস্থান সেনহাটী বাজারসংলগ্ন স্থানে। স্থানীয়দের মতে, কালীমন্দিরটি যে স্থানে নির্মিত সেখানে প্রাচীন একটি মন্দির ছিল। বর্তমান মন্দিরটি ২র্৫-র্৬র্  গুণন ১র্২-র্৯র্  পরিমাপের। এর ছাদ সমতল। দরজা-জানালাহীন মন্দিরটির দক্ষিণ দেয়ালে তিনটি প্রবেশপথ আছে। পথ আলাদা করেছে দুটো চারকোনার থাম। গায়ে সিমেন্ট-বালির প্রলেপ।

নির্মাণকাজে ব্যবহূত ইট আধুনিক কালের ইটের বৈশিষ্ট্য বহন করছে। মন্দির লাগোয়া চারকোনার পিলারসদৃশ একটি ছোট স্মৃতিমন্দির আছে। মন্দিরটির দক্ষিণ-পশ্চিম উত্তর অংশে স্বল্প গভীরবিশিষ্ট খাঁজকাটা ফলক সংস্থাপনের জায়গাবিশিষ্ট স্থাপনা চতুষ্কোণ একটি বেদির ওপর নির্মিত। বেদিটি ফুট ইঞ্চি বর্গাকার। বেদির ওপরকার স্মৃতিফলকটি ফুট ইঞ্চি বর্গাকারে নির্মিত। বর্তমানে যে অবস্থায় এটি পাওয়া যায় তাতে ভূমি থেকে বেদির উচ্চতা ফুট। এর উপরি অংশ নির্মিত পিরামিডের আদলে। উত্তর অংশের লিপিফলক থেকে যে তথ্য উদ্ধার করা যায় তাতে জানা যায়, জনৈক কৈলাশচন্দ্র সেন মুন্সীর স্মরণে এটি নির্মাণ করেন তার পুত্রগণ। ফলকে উল্লিখিত হয়েছে কৈলাশচন্দ্র সেন মুন্সী। জন্ম শকাব্দ ১৭৬৭-২৮ মাঘ সোমবার, মৃত্যু শকাব্দ ১৮৪৪- ভাদ্র বৃহস্পতিবার। সেনহাটীর ভদ্র সম্প্রদায়ের পবিত্র শ্মশানক্ষেত্র স্মরণাতীত কাল হইতে স্থাপিত। ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে রাজশক্তি শবদাহ নিষেধাজ্ঞা প্রচার করিবার সেই চিরন্তন অধিকার সংহরণ কল্পে চেষ্টিত হইলে সমগ্র গ্রামবাসী ক্ষুব্ধ চকিত হইয়া উঠিয়াছিলেন।

রাসমণি মন্দির

পাইকগাছা উপজেলা সদরের ১১ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে কাটীপাড়া বাজারের ওপর পূর্ব পাশে আটকোনার ভিত নিয়ে একটি পুরনো স্থাপনা টিকে আছে। এটি রানী রাসমণি মতান্তরে রাসমন্দির নামে পরিচিত। মন্দিরের উপরি অংশ বিনষ্ট হয়েছে বহু আগে। ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিনষ্ট মন্দিরের উপরি অংশের স্তূপীকৃত রাশ জমা ছিল ভিতের ওপর। এখানে ছিল ক্ষুদ্রাকৃতির ভাঙা ইটের টুকরো চুনমিশ্রিত ইটের গুঁড়োর আস্তরণ। ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে কাটীপাড়া বাজার কমিটি স্তূপ পরিষ্কার করে আটকোনার ভিতটি দৃশ্যমান অবস্থায় এনেছে এবং উত্তর অংশ বরাবর নির্মাণ করেছে কয়েক ধাপের সিঁড়ি। স্থানীয়দের কাছ থেকে যে তথ্য পাওয়া যায় তাতে মন্দির নির্মাণবিষয়ক দুটো মতামত পাওয়া যায়। একটি মতে জানা যায়, মন্দিরের নাম রাসমণি মন্দির, নির্মাতা রানী রাসমণি (১৭৯৩১৯.০২.১৮৬১ খ্রিস্টাব্দ) কৈবর্ত কৃষিজীবী দরিদ্র হরেকৃষ্ণ দাসের ঘরে রাসমণির জন্ম ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে। বৈবাহিক সূত্রে পরবর্তীকালে রাসমণি বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক হন। অসাধারণ রূপবতী হওয়ার কারণে কলকাতার বিশিষ্ট ধনী ব্যবসায়ী প্রীতিরাম মাড় পুত্র রামচন্দ্রের সঙ্গে রাসমণির বিয়ে দিয়ে পুত্রবধূ করে ঘরে তোলেন ১৮০৪ খ্রিস্টাব্দে। তীক্ষ বুদ্ধির অধিকারিণী রাসমণি বিয়ের পর স্বামীর কাছে শিক্ষালাভ করে স্বশিক্ষায় সুশিক্ষিত হন। ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে রামচন্দ্রের মৃত্যুর পর স্বামীর সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের ভার তার ওপর পড়ে। নিজের বুদ্ধির বলে তিনি সম্পত্তি আরো বাড়াতে সক্ষম হন। সিপাহী বিদ্রোহের সময় কোম্পানির কাগজের কেনা-বেচায় নদীবিধৌত সুন্দরবনাঞ্চলের খুলনা জেলায় সংখ্যার বিচারে প্রত্ননিদর্শন কম। কিন্তু যা আছে তা ব্যতিক্রমিতার জন্য বিশিষ্টতার দাবিদার। অঞ্চলে প্রাপ্ত কয়েকটি উত্কৃষ্ট প্রত্ননিদর্শন আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্যের বাঁকবদলে প্রতিনিধিত্ব স্থানীয় প্রত্নসম্পদের খাতায় সহজে নাম লেখাতে পারে।

গাওঘরা জামে মসজিদ

গাওঘরা জামে মসজিদ বটিয়াঘাটা উপজেলায় একমাত্র প্রত্ননিদর্শন। অপরিকল্পিত প্রসার সংস্কারের কারণে নিদর্শনটিও হারিয়েছে প্রত্ন ঐতিহ্য। তবু টিকে থাকা গম্বুজ বুরুজে যে শৈল্পিক নিদর্শন তা অবশ্যই এক উজ্জ্বল প্রত্নস্মারক। ধামালিয়া জামে মসজিদ ধোপাখোলা জামে মসজিদ দুটো ভেঙে সেখানে নতুন মসজিদ নির্মিত হলেও আদি অবয়বের আলোকচিত্র ভূমি নকশা করা সম্ভব হয়েছে, যা হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের টিকে থাকা আলোকদ্যুতি।

বেদ মন্দির

পাইকগাছা উপজেলা সদরের ১৩ কিলোমিটার উত্তরে কপিলমুনি বাজারে আট কোনাকার একটি মন্দির আছে। মন্দিরটি পরিচিত বেদ মন্দির নামে। মন্দিরটির পূর্ব পাশে খুলনা-পাইকগাছা প্রধান সড়ক, উত্তর দক্ষিণে বিপণিবিতান, পশ্চিমে রায়সাহেব বিনোদ বিহারী সাধু খাঁর বসতভিটা। মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা পুরুষ রায়সাহেব বিনোদ বিহারী সাধু খাঁ। তিনি আধুনিক কপিলমুনির স্বপ্নদ্রষ্টা রূপকার। এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে মহত্প্রাণ মানুষের জন্ম ১২৯৬ বঙ্গাব্দের ১৬ বৈশাখ, পিতা যাদবচন্দ্র সাধু মাতা সহচরী দেবীর চার পুত্রের তৃতীয় বিনোদ বিহারী। পিতামহ কুন্তলাল সাধু খাঁর আমল থেকেই পরিবার বনেদি ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ছিল। বিনোদ বিহারী রাড়ুলী এমই স্কুলে পড়ার সময় আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসেন। প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর সন্তান হওয়া সত্ত্বেও তিনি কাজকে নিয়েছিলেন আন্তরিকতায়। রবি বৃহস্পতিবার হাটবারে দোকানের বাইরে খোলা টিনের ড্রামে কেরোসিন নিয়ে খুচরো বিক্রির দায়িত্ব পিতা তাকে দেন। তিনি কাজ করতেন আন্তরিকতার সঙ্গে। ১৩১৪ বঙ্গাব্দে পিতার মৃত্যুর পর যখন তার কাঁধে পৈতৃক ব্যবসার দায় দায়িত্ব চাপে তখন বয়স ১৮ বছর। স্বশিক্ষিত এই মানুষটি নানা পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যবসার বিস্তর উন্নতি ঘটান। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্রের পরামর্শে তিনি কপিলমুনিতে প্রতিষ্ঠা করেন কপিলেশ্বরী অয়েল মিল মৃতপ্রায় কপিলমুনি বাজারের প্রাণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাজারসংলগ্ন ৩১ বিঘা জমি কিনে সংস্কার করে বাজারটি ছেড়ে দেন ১১ সদস্যবিশিষ্ট পরিচালনা পর্ষদের হাতে।

এখানে ১৩৩৯ বঙ্গাব্দের ২৮ ফাল্গুন দোল পূর্ণিমার তিথিতে শুরু হয় বাজারের কার্যক্রম। তার নামানুসারে বাজারের নাম হয় বিনোদলাল বাজার। বাজারের ব্যবসায়ীরা যাতে ব্যাংক সুবিধা পেতে পারে সে কারণে প্রতিষ্ঠা করেন উৎকর্ষ সমিতি সিদ্ধেশ্বরী ব্যাংক যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতির জন্য তিনি নাছিরপুর খালের ওপর কাঠের সেতু করে দেন। তিনি উদ্যোগী হয়ে গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন দাতব্য চিকিৎসালয়। এটি তার পিতার নামে রাখা হয় যাদবচন্দ্র দাতব্য চিকিৎসালয় ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল এর দ্বারোদঘাটন করেন তত্কালীন খুলনার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জে ভাস স্কয়ার আইসিএস। একই সময়ে এর পাশে পিতামহের নামে প্রতিষ্ঠা করেন ২০ শয্যাবিশিষ্ট ভরতচন্দ্র ইনডোর হাসপাতাল। তত্কালীন জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান রায় যতীন্দ্রনাথ ঘোষ বাহাদুর বাংলা ১৩৩৬ সালের ১৪ চৈত্র এর দ্বারোদ্ঘাটন করেন। ধর্মীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিনোদ বিহারী ছিলেন উদার। তার উদ্যোগে কপোতাক্ষ পাড়ের মুনিকপিলের কালীমন্দির পুনর্নির্মিত হয়। আগের কালীমন্দিরটি নদীভাঙনে ধ্বংস হলে তিনি এর পার্শ্ববর্তী স্থানে নতুন মন্দির নাট্যশালা নির্মাণ করে তাতে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। বিনোদ বিহারী নিজ বাড়িতে সম্মুখ অংশে আট কোনাকার এক গম্বুজবিশিষ্ট অপূর্ব শিল্পসুষমামণ্ডিত একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করে এর চার দেয়ালে চার খণ্ড বেদ সংরক্ষণ করেছেন। মন্দিরটি বেদমন্দির নামে পরিচিত। মন্দিরের এক কোণে সংস্থাপন করা আছে রায়সাহেব বিনোদ বিহারী সাধুর শ্বেতপাথরের মর্মর মূর্তি। কপিলমুনি বাজারের বেদ মন্দিরটি উদ্বোধন করা হয় ১৩৩৮ বঙ্গাব্দের কার্তিক। উদ্বোধন করেন তত্কালীন হিন্দু মিশনের সভাপতি শ্রীমত্স্বামী সত্যানন্দজী মহারাজ।

দধিবামন দেবের মন্দির

সরকারি ব্রজলাল কলেজ’, দৌলতপুরের ক্যাম্পাসে দধিবামন দেবের মন্দির অবস্থিত। ব্রজলাল শাস্ত্রীর উদ্যোগে কলেজটি ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় হিন্দু একাডেমিনামে। প্রতিষ্ঠা পর্বে এখানে কলেজ চতুষ্পাঠী নামে দুটো শাখা ছিল, চতুষ্পাঠীর প্রধান পুরোহিত থাকতেন সমগ্র প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক। একাডেমির মন্দিরে প্রতিষ্ঠা পর্বের প্রথম দিকে ব্রজলাল চক্রবর্তী নিজে পূজা করতেন। ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে মন্দিরের জন্য শুরু হয় পাকা ভবন নির্মাণের কাজ।

নদীয়ার বাবু শশীভূষণ মুখার্জী এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। নাটোরের তদানীন্তন মহারাজা জগদীন্দ্রনাথ রায় মন্দির ভবন নির্মাণের জন্য হাজার টাকা দান করেন। মহারাজের মাতামহা রাণী ব্রজসুন্দরী দেবীর স্মৃতির উদ্দেশে পবিত্র মন্দির উৎসর্গীকৃত। এটিই ছিল তদানীন্তন হিন্দু একাডেমিচৌহদ্দি মধ্যস্থ প্রথম পাকা ভবন। এর মধ্যে রৌপ্য নির্মিত পদ্মফুলের ওপর স্থাপন করা হয় দধিবামন নামক শালগ্রাম শিলাটিকে। তাকে পরানো হয় সোনার পৈতা। প্রথমে কলেজের নামে কেনা দুই একর জমির কিছু অংশ দধিবামন দেবতার নামে উৎসর্গ করা হয়। দৌলতপুর হিন্দু একাডেমিতেধর্মীয় শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হতো। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে ফেব্রুয়ারি একাডেমির একটি সাধারণ প্রার্থনা কক্ষে স্থাপন করা হয় নারায়ণ শিলা। পরে সে স্থানে প্রতিস্থাপন করা হয় শালগ্রাম শিলা। যা পূজিত হতে থাকেন দধিবামন দেবনামে।

দধিবামনের শালগ্রাম শিলা ছাড়াও এখানে আরো দুটো বিগ্রহ আছে। একটি বিশালাকৃতি শিবলিঙ্গ। গৈরীপট্টসহ শিবলিঙ্গটি ১৯৭৬ সালে কলেজ সংলগ্ন ভৈরব নদ থেকে উদ্ধার করা হয়। প্রথমে এর অস্তিত্ব জানতে পারে জেলেরা, পরে কলেজ মন্দিরে এনে এটি সংস্থাপন করা হয়।

বিশালাকৃতির বিগ্রহটি ৪১ ইঞ্চি গুণন ৩২. ফুট মাপের। বাংলাদেশের বহু স্থানে শিবলিঙ্গ আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলো বৈদিকলিঙ্গ, জ্যোতিলিঙ্গ, ঊর্ধ্বভলিঙ্গ, প্রাকৃতলিঙ্গ, ধড়লিঙ্গ, সহস্রার লিঙ্গ প্রভৃতি নামে পরিচিত। আকৃতি পরিমাপের ওপর ভিত্তি করে এগুলোকে চললিঙ্গ (আকারে ক্ষুদ্র সহজে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত করা যায়) অচললিঙ্গ (ভারী, সহজে বহনযোগ্য নয় এক স্থানে সংস্থাপন করা হয়) দুই ভাগে ভাগ করা যায়। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত উদ্ধারকৃত অচললিঙ্গের উত্কৃষ্ট নিদর্শন দৌলতপুর বিএল কলেজের শিবলিঙ্গটি। দধিবামন দেবের মন্দিরে আরো একটি বিগ্রহের অধিষ্ঠান আছে।

বামন বিষ্ণু

খুলনা অঞ্চলে পাইকগাছার কপিলমুনি পোদ্দার পাড়ার সন্তোষ দত্তের পুকুর খননকালে লাল বেলেপাথরে ক্ষুদ্রাকৃতির একটি বামন বিষ্ণু পাওয়া গেছে। মূর্তিটি বর্তমানে গৃহদেবতা হিসেবে পূজিত হয়ে আসছেন। লাল বেলেপাথরের ওপর খোদাইকৃত মূর্তিটির চার হাতের দুখানি ভূমি স্পর্শ করেছে, অন্য দুই হাতের অস্তিত্ব বোঝা যায় তবে ভাঙা হওয়ায় হাতে কী ছিল তা বর্তমানে বোঝার উপায় নেই। এর মাথায় অলংকার শোভিত মুকুট দৃশ্যমান, মুকুটের দুপাশে খাঁজকাটা আলংকারিক ভাঁজ গলায় অলংকারের সঙ্গে সাদৃশ্য রেখে মিশেছে। বেলেপাথরের উপরি অংশ ঈষৎ উত্তল। বর্তমানে পোদ্দারবাড়িতে পারিবারিক দেবতা হিসেবে বামন বিষ্ণু পূজিত হচ্ছেন।

দক্ষিণডিহি রায়বাড়ি

খুলনা জেলার ফুলতলা উপজেলার দক্ষিণডিহি গ্রামে দ্বিতল একটি বাড়ি ক্ষত শরীরে দাঁড়িয়ে আছে। এটি দক্ষিণডিহি রায়বাড়ি। বাংলা সাহিত্যের খ্যাত প্রতিভা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) বাড়ির জামাতা। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন মা-বাবার অষ্টম পুত্র চতুর্দশ সন্তান। রবীন্দ্রনাথ বিয়ের পিঁড়িতে বসেন ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর (১২৯০ বঙ্গাব্দের ২৪ অগ্রহায়ণ) ওই সময়ে তিনি ২২ বছর মাসের যুবক। রবীন্দ্রনাথের জন্য পাত্রী সন্ধানক্ষেত্র যশোর এলাকা নির্বাচন করা হয়। মুসৌরি থেকে কবি ফেরার আগেই ঠাকুরবাড়ির হিসাবের খাতায় রবীন্দ্রবাবুর বিবাহের হিসাবলেখা পাওয়া যায়। সহজে অনুমেয় দেবেন্দ্রনাথ বিয়ের জন্য চাপ দিয়েছিলেন পুত্রকে। পাত্রী খোঁজার এলাকা হিসেবে যশোরকে নির্বাচন করার পেছনে ছিল একাধিক কারণ। ঠাকুরবাড়ির অন্তঃপুরে সে সময়ে যাদের কর্তৃত্ব খ্যাতি তাদের অধিকাংশেরই পিত্রালয় যশোর অঞ্চলে। ধর্মীয় একটি বিষয়ও জড়িত ছিল যশোর অঞ্চলে পাত্রী খোঁজার। পিরালী ব্রাহ্ম হওয়ার কারণে ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে সামাজিক মেলবন্ধনের ক্ষেত্রেও তদানীন্তন সময়ের অভিজাত সনাতন বংশীয়রা বেশ খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে চলতেন। সে ক্ষেত্রে যশোর অঞ্চল বিশেষ করে খুলনা শহরের অদূরে ফকিরহাটে ছিল পিরালী ব্রাহ্মদের আদিনিবাস কেন্দ্রস্থল। সর্বোপরি যশোরের মেয়েদের রূপের গুণের খ্যাতি সে সময়ে কলকাতায় ব্যাপক প্রচলিত ছিল।

কবির শ্যালক নগেন্দ্রনাথ রায়চৌধুরী বাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু করেন ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে। ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে শুরু হয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে চলে বাড়ির নির্মাণকাজ। দক্ষিণডিহি রায়বাড়ির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলে কবির শাশুড়ি দাক্ষায়ণী দেবী বাড়িতে অনিয়মিত অবস্থান করতেন বলে ধারণা করা যায়। রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় কন্যা রেণুকার (২৩.০১.১৮৯১-১৪.০৯.১৯০৩ খ্রি.) মাত্র ১২ বছর মাস বয়সে যক্ষ্মা রোগে যে অকালমৃত্যু হয় তার খবর কবি টেলিগ্রাম করে শাশুড়িকে জানান ফুলতলার দক্ষিণডিহির ঠিকানায়।

জমিজমার কাগজপত্রে যে তথ্য মেলে তাতে সিএস খতিয়ানে ৯১০ নম্বর দাগের এই জমিটি বাস্তুভিটাসহ মোট .৪১ একর। মালিক নগেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী, পিতা বেণীমাধব রায় চৌধুরী। এসএ রেকর্ডে এসে ৭৫৮ খতিয়ানের অংশের জমিজমা নগেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরীর পুত্র বীরেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী ধীরেন্দ্রনাথ রায় চৌধুরীর নামে .০৮ একর জমি রেকর্ড হয়েছে।

ধামালিয়া জমিদারবাড়ি

ডুমুরিয়া উপজেলার ১৭ কিলোমিটার উত্তরে ধামালিয়া ইউনিয়নের ধামালিয়া গ্রামে একটি পুরনো বাড়ির ধ্বংসাবশেষ জরাজীর্ণ অবস্থায় টিকে আছে। এটি ধামালিয়া জমিদারবাড়ি নামে পরিচিত। বাড়ির জমিদার খ্যাত পুরুষদের পদবি সরদার। সে হিসেবে স্থানীয় কেউ কেউ বাড়িটি পরিচিত করান ধামালিয়া সরদারবাড়ি নামে। বাড়ির প্রথম পুরুষ হিসেবে যার নাম পাওয়া যায় তিনি বাবর আলী সরদার। লোকপরম্পরা, পারিবারিক সূত্র, মামলা-মোকাদ্দমার কাগজপত্রে যে তথ্য পাওয়া যায় তাতে সমাজসেবাসহ এলাকার উন্নয়নমূলক কাজে বাবর আলী সরদারের চতুর্থ অধস্তন পুরুষ ভিকন আলী তার পুত্র আহাদ আলী সরদারের আছে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। সুন্দরবনসংলগ্ন অঞ্চলে সরদার পরিবারের ছিল কাঠের ব্যবসা। কলকাতার সঙ্গে সরাসরি ব্যবসায়িক যোগাযোগ রক্ষার জন্যে তাদেরই উদ্যোগে উন্নয়ন ঘটানো হয় নৌপথের। হরি নদী দিয়ে বরুনা বাজার পর্যন্ত সে সময়ে কলকাতা থেকে যে নৌকা ছোট জাহাজ আসত তা আহাদ আলী সরদারের উদ্যোগেরই ফসল। কাঠের ব্যবসা ছাড়াও পরিবারের ছিল ঠিকাদারি ব্যবসা, ইটের ভাটা, রাখি মালের ব্যবসা ইত্যাদি। এছাড়া তাদের আয়ের একটা বিরাট অংশ আসত কলকাতার নারকেলডাঙ্গার মুদি ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত। মিকশিমিল বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাপর্বের উদ্যোগী পুরুষদের অন্যতম ছিলেন আহাদ আলী সরদার।

মুন্সি ভিকন আলী সরদারের সময় পরিকল্পিতভাবে ধামালিয়া জমিদারবাড়ির গোড়াপত্তনের সূচনা হয় (নির্মাণ সন অজ্ঞাত) তা পূর্ণতা পায় তার পুত্রের আমলে। মুন্সি ভিকন আলী সরদারের তিন পুত্র মুন্সি মোখলেছ আলী সরদার, আহাদ আলী সরদার মেহের আলী সরদার। তিন পুত্রের মধ্যে মুন্সি মোখলেছ আলী সরদার আহাদ আলী সরদারের মধ্যে ধামালিয়া জমিদারি ভাগ হয়ে যায় এবং কলকাতার মুন্সি বাজারের সম্পত্তি মেহের আলী সরদারের অধীনস্থ হয়।আহাদ আলী সরদার এলাকা এলাকার বাইরে খ্যাত, সম্মানীয় ব্যক্তি থাকলেও তার মৃত্যুর পর পরিবারে ভাঙন ধরে।

প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের বাড়ি

পাইকগাছা উপজেলা সদরের কিলোমিটার উত্তরে রাড়ুলি ইউনিয়নের বিশাল এলাকা জুড়ে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের (১৮৬১-১৯৪৪) বাড়ি টিকে আছে ক্ষত শরীরে। বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের বাড়ির যে অংশ সংরক্ষিত পুরাকীর্তির আওতায় নিয়েছে তার পরিমাণ .৪৭ একর। পাইকগাছার রাড়ুলি রায়বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘ ইতিহাস। রায় পরিবার বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে বংশানুক্রমিক জমিদার ছিলেন। এই পরিবারের ব্যক্তিরা নানা সময়ে সরকারের, কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থেকেছেন। প্রফুল্লচন্দ্রের পূর্বপুরুষ শিবচন্দ্র ছিলেন ঢাকার নায়েব দেওয়ান মহম্মদ রেজা খাঁর মুন্সি। তিনি যশোরে আসেন ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে। ওই সময় যশোরে ইংরেজ রাজত্বের প্রশাসনিক কাজ শুরু হয়। তার মৃত্যুর পর এই চাকরি পান ওই বংশেরই মানিকচন্দ্র। সম্পর্কসূত্রে মানিকচন্দ্র ছিলেন শিবচন্দ্রের ভ্রাতুষ্পুত্র। মানিকচন্দ্রের তৃতীয় অধস্তন পুরুষ আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র। মানিকচন্দ্র যশোরের কালেক্টর ভবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে ৩৫ বছর সুনামের সঙ্গে চাকরি করেছিলেন। তার পুত্র আনন্দলাল (প্রফুল্লচন্দ্রের পিতামহ) সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন ১৮ বছর বয়সে। ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আনন্দলালের চাকরি জীবনের পুরো সময় অতিবাহিত হয়েছে যশোর হুগলিতে। নানা পদে অধিষ্ঠিত থেকে নানাজনের সঙ্গে মিশে ব্যক্তি বিদ্যা-বুদ্ধিতে পারঙ্গমতা অর্জন করেছিলেন। আনন্দলাল রাড়ুলি কাটিপাড়া এর আশপাশের বহু জমিজমা খরিদ করেন। যশোর, খুলনায়ও তার সম্পত্তি ছিল। আনন্দ লাল যশোহরে থাকিবার সময় উহার সন্নিকটে কিছু তালুক তর্জন করেন এবং তথাকার প্রজাবাসীর জলকষ্ট নিবারণের জন্য ধোপাখোলায় একটি সুন্দর পুষ্করিণী খনন করিয়া দেন। আনন্দলালের সময়েই রাড়ুলির সুন্দর অট্টালিকা সমন্বিত বৃহৎ আবাসবাটী নির্মিত হয়

ডুমুরিয়া বাগদাদবাড়ি

ডুমুরিয়া উপজেলার পয়োগ্রাম-কসবাতে প্রাচীন একটি বাড়ির সীমানাপ্রাচীর টিকে আছে। বাড়িটি পরিচিত বাগদাদবাড়ি নামে। বাড়ির বর্তমান বাসিন্দাদের দাবি, তাদের পূর্বপুরুষ বাগদাদ থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এখানে আসে এবং এলাকায় স্থায়ী হয়। অধস্তন পুরুষরা পরবর্তীকালে বাড়ির বিভিন্ন অংশ ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করলেও বংশপরম্পরায় অতীত ঐতিহ্যের একটি সীমানাপ্রাচীর তারা সংরক্ষণ করে আসছেন। ৪৩ ফুট ইঞ্চি লম্বা ফুট ইঞ্চি পুরু প্রাচীরের ইটের আকৃতি পাতলা। গাঁথুনির কাজে ব্যবহূত হয়েছে চুন-সুরকি। ইটের আকৃতি বিশ্লেষণ করে এর নির্মাণসন আনুমানিক সতেরো শতকের শেষভাগ থেকে আঠারো শতকের প্রথম ভাগ বলা যায়।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, খুলনা বিভাগের নয়টি পুরাকীর্তি দীর্ঘদিন ধরেই অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে ছিল। ইতিহাস ঐতিহ্যসমৃদ্ধ এসব পুরাকীর্তি সংরক্ষণে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পুরাকীর্তি সংস্কার সংরক্ষণে বিশেষ কর্মসূচির আওতায় খুলনার ফুলতলা উপজেলার দক্ষিণডিহিতে অবস্থিত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের শ্বশুরবাড়ি অর্থাৎ রবীন্দ্র কমপ্লেক্স পাইকগাছায় স্যার পিসি রায়ের বাড়ি, নীলকুঠি, যশোরের অভয়নগরের ১১ শিবমন্দির এবং চাঁচড়া শিবমন্দির, কেশবপুরের মীর্জানগর হাম্মামখানা ভরত ভায়না ডিবি, মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়ি সংস্কার, নড়াইলের নীহাররঞ্জন গুপ্তের বাড়ি সংস্কার করা হবে।

সূত্র: মিজানুর রহমান: খুলনার পুরাকীর্তি, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, নভেম্বর ২০১৭, পৃ. ২৩২

 

. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: সরকারের সাবেক সচিব

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন