রবিবার | নভেম্বর ১৭, ২০১৯ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

টেরাকোটা-পর্ব ৩

পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ

ড. আয়েশা বেগম

আঠারো শতকের শেষে মোগল শক্তি হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপীয় বণিকদের আগমন সূচিত হয়। ভারতে ইউরোপীয় শাসন বিস্তারে বাংলাদেশ হয়ে ওঠে প্রবেশদ্বার। বাণিজ্যিক যোগসূত্র ধরে রাজনৈতিক এবং শেষ পর্যন্ত সংস্কৃতি ক্ষেত্রেও ইউরোপীয় প্রভাব প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ঔপনিবেশিক শাসন আর্থসামাজিক জীবনে যে কত গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল, তার প্রতিফলন সে সময়ে গড়ে ওঠা দেশের স্থাপত্য শিল্পের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট প্রতীয়মান। ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের উদ্ভব বিকাশ আঠারো উনিশ শতক পার  হয়ে বিশ শতকে প্রবলভাবে প্রতিভাত হয়। মোগল-পরবর্তী স্থাপত্যে ব্রিটিশদের নির্মাণ অবদানের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় ভূস্বামী জমিদার শ্রেণীর অবদানও সমভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলায় ঔপনিবেশিক শাসনামলে গড়ে ওঠা স্থাপত্যে মোগল স্থাপত্য রীতি ইউরোপীয় স্থাপত্য রীতির সংমিশ্রণে এক নবরূপ পরিগ্রহ করে, যা বাংলা স্থাপত্যে অনন্য স্থান দখল করে আছে। বাংলাদেশ ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের গতি-প্রকৃতির প্রেক্ষাপটে এর যে বৈশিষ্ট্য বৈচিত্র্য বিধৃত হয়, তার ওপর আলোকপাত করা হলো।

আঠারো শতকে ইউরোপীয় শিল্প বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার আগ পর্যন্ত শিল্প প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলার অবস্থা যে ইউরোপের চেয়ে অগ্রবর্তী ছিল, কথা প্রমাণ করতে বাংলার উন্নত স্থাপত্য শিল্প বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। তত্কালে বাংলার শিল্প সংস্কৃতির প্রভাব বাংলার বাইরে ছড়িয়ে পড়েছিল। মধ্যযুগীয় স্থাপত্যে সুলতানি আমলে সৃষ্টিধর্মী পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে বাংলা স্থাপত্যের চরম সমৃদ্ধি ঘটে। সুলতানি স্থাপত্যের পটপরিবর্তনে মোগল আমলে উত্তর ভারতকেন্দ্রিক স্থাপত্য প্রভাবে বাংলায় স্থাপত্য রীতিতে ভিন্ন রূপের অবতারণা হয় বটে কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে আবহমান বাংলা স্থাপত্যের ঐতিহ্য সমাদৃত হতে দেখা যায়।

ঔপনিবেশিক আমলে নির্মিত স্থাপত্যে উল্লেখযোগ্য ইমারত গ্রিক স্মৃতিসৌধ (ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), কার্জন হল (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম (রাজশাহী), কারমাইকেল কলেজ (রংপুর) শীতলাই হাউজ, তাড়াশ রাজবাড়ি (পাবনা) ইত্যাদি। ইউরোপীয় নীল ব্যবসাকে কেন্দ্র করে আঠারো শতকের শেষ ভাগে বাংলায় যেসব নীলকুঠি গড়ে ওঠে, সেগুলোর মধ্যে রাজশাহী, যশোর, পাবনা ইত্যাদি স্থানের নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ উল্লেখযোগ্য। ঔপনিবেশিক আমলে বিভিন্ন অঞ্চলের জমিদারদের দ্বারা নির্মিত প্রাসাদ, জমিদার বাড়ি অন্যান্য অট্টালিকার মধ্যে রয়েছে আহসান মঞ্জিল (ঢাকা), বালিয়াটি প্রাসাদ (মানিকগঞ্জ), বলিহার রাজবাড়ি (নওগাঁ), তাঁতিবন্দের রাজবাড়ি (পাবনা), মুরাপাড়া জমিদার বাড়ি (নারায়ণগঞ্জ), শশী লজ রাজবাড়ি, ময়মনসিংহ ইত্যাদি।

স্থাপত্যের দুটি অংশ; একটি কাঠামো, অন্যটি অলংকরণ বা সজ্জা। দুয়ের সমন্বয়ে ইমারতের সামগ্রিক রূপের সৃষ্টি। নদীমাতৃক বাংলাদেশের ইমারতের প্রধান উপাদান ইট; ফলে অলংকরণ প্রধানত মৃৎ ফলকের টেরাকোটা নকশায় কেন্দ্রীভূত ছিল। সুলতানি আমলে বিকশিত টেরাকোটা নকশা সর্বোত্কৃষ্ট অলংকরণ মর্যাদা লাভ করে। মোগল শাসনামলে বাংলায় স্থাপত্যের অলংকরণে সনাতন পোড়ামাটির ফলকের টেরাকোটা নকশার প্রাধান্য হ্রাস পায় এবং গাত্রালংকারে পলেস্তায় প্রলেপিত স্যাকো নকশা স্থান করে নেয়। এতে দেখা যায় ছোট-বড় আয়তাকার বর্গাকার অবতল খোপ, পদ্ম পাপড়ির মারলন নকশা চক্রাকার ফুল। অঞ্চলের অলংকরণ নকশার প্রতি মোগলদের উৎসাহের অভাব পরিলক্ষিত হলেও তাদের কাছে আবহমান বাংলার পর্ণ কুটিরের চালা ছাদের বৈশিষ্ট্য এতই আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে যে বৈশিষ্ট্য তাদের দ্বারা আগ্রা, লাহোর, দিল্লি ফতেপুর সিক্রির অনেক ভবনে সৌন্দর্য সৃষ্টি করে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্রিটিশ শাসনামলে নির্মিত বাংলাদেশের স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যে অলংকরণে পট পরিবর্তিত হয়।

রাজশক্তির প্রকৃতি বদলে গেলে সময়ে নির্মিত প্রশাসনিক ভবন, জমিদারবাড়ি, নীলকুঠি সর্বত্র ইউরোপীয় আধুনিক নির্মাণ উপাদান প্রযুক্তি অঞ্চলের নির্মাণকে প্রলুব্ধ করে, যাতে স্বাভাবিকভাবে আঞ্চলিক স্বাতন্ত্র্যের ওপর বিশ্বজনীন রূপ প্রতিফলিত হয়। ঔপনিবেশিক শাসনকালে বাংলাদেশে নির্মিত ইমারতকে মোট তিন ভাগে ভাগ করা যায়—() শাসকদের প্রয়োজন এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি প্রশাসনিক ভবন, আবাসিক অট্টালিকা, গির্জা ইত্যাদি; () নীল ব্যবসার উদ্দেশ্যে নির্মিত নীলকুঠি () জমিদার শ্রেণী কর্তৃক নির্মিত রাজবাড়ি, জমিদারবাড়ি ইত্যাদি।

যদিও ঔপনিবেশিক আমলে গড়ে ওঠা প্রায় সব প্রধান স্থাপত্য ইমারত কলকাতা তার আশেপাশে নির্মিত কিন্তু বাংলাদেশে বিভিন্ন স্থানে যেসব ঔপনিবেশিক আমলের স্থাপত্য নিদর্শন রয়েছে, সেগুলো আকৃতিতে তুলনামূলকভাবে জাঁকালো বৃহৎ না হলেও এগুলো স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যে যথেষ্ট তাত্পর্য বহন করে। পূর্ববঙ্গের কেন্দ্রীয় নগরী ঢাকা রাজধানী কলকাতা থেকে সব দিক দিয়েই পশ্চাত্পদ ছিল। পূর্ববঙ্গে প্রথম দিকের ঔপনিবেশিক স্থাপত্য রীতির বিদ্যমান নিদর্শন দেখে প্রতীয়মান হয় যে সময়ে শাসকদের নির্মিত স্থাপত্য প্রধানত গির্জা নিদর্শনের মধ্যে সীমিত ছিল। সবচেয়ে পুরনো বলে বিবেচিত হোলি রোজাবিত্ত গির্জাটির শীর্ষে একটি ক্রশ চিহ্ন স্থাপন করা আছে। অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পলকাটা স্তম্ভ সারি, খিলানের বিচিত্র বিন্যাস উল্লেখযোগ্য। নিও ক্ল্যাসিকাল রীতিতে খ্রিস্টান কবরস্থান উয়ারীতে একটি পিরামিডের ন্যায় আকৃতিবিশিষ্ট কলোম্ব সাহেবের সমাধি রয়েছে; এটি ঢাকার একমাত্র ওলন্দাজ স্থাপত্য নিদর্শন। সমাধিটির শীর্ষদেশ সুদৃশ্য অষ্টকোণাকৃতির একটি গম্বুজবিশিষ্ট। বাহাদুর শাহ পার্কের উত্তর দিকে অবস্থিত অ্যাংলিকান গির্জাটি ১৮১৯ সালে নির্মিত এবং ১৮২৪ সালে বিশপ হেবাব এর উদ্বোধন করেন। গির্জায় প্রার্থনা বেদিটি হলঘরের পূর্ব দিকে স্থাপিত এবং অভ্যন্তর ভাগ সামঞ্জস্যপূর্ণ বিভাজনে গির্জা স্থাপত্যের বিশেষত্ব রক্ষা করে ইংল্যান্ডের অন্যান্য গির্জার অনুকরণে নির্মিত। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর গির্জা ভবনরূপে বিবেচিত। ওয়াইজঘাটে অবস্থিত নর্থব্রুক হল (১৮৭২) মোগল স্থাপত্য রীতি ইউরোপীয় রেনেসাঁ রীতির সংমিশ্রণে তৈরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের প্রাঙ্গণে একটি গ্রিক স্মৃতিসৌধ রয়েছে। (১৮০০-৪৩) বর্গাকার নিদর্শনটির অভ্যন্তরে দুটি পলকাটা ডোরিক স্তম্ভ দ্বারা দুটি বে সৃষ্টি করা হয়েছে। গ্রিক ক্ল্যাসিকাল রীতিতে নির্মিত স্মৃতিসৌধের ফাসাদ শীর্ষে রয়েছে ত্রিকোণাকার পেডিমেন্ট।

কার্জন হল ঔপনিবেশিক আমলের একটি উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য নিদর্শন। ভাওয়ালের রাজকুমার নরেন্দ্র নারায়ণ ১৯০৪ সালে লর্ড কার্জনের ঢাকা আগমন উপলক্ষ করে লর্ড কার্জনের নামকে স্মরণীয় করে রাখার উদ্দেশ্যে কার্জন হল নির্মাণ করেন। কার্জন হল ভবনটি দুটি অংশে বিভক্ত, মাঝখানে রয়েছে হলঘর। এতে রয়েছে টানা বারান্দা এবং ফাসাদে সন্নিবেশিত হয়েছে অশ্বখুরাকৃতি বহু খাঁজবিশিষ্ট খিলান। ভবন শীর্ষে ছত্রি এবং ব্রাকেট সংযুক্ত বর্ধিত কার্নিশ এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠেছে। উত্তরমুখী কার্জন হলের সম্মুখভাগে জাঁকালো স্থাপত্য অলংকরণ উপস্থাপিত হয়েছে। সম্প্রসারিত সম্মুখভাগ অর্ধ অষ্টকোণাকৃতির এবং এর দীর্ঘ উচ্চতাবিশিষ্ট সম্মুখের অংশের শীর্ষে সারিবদ্ধ জানালা লক্ষণীয়। এর নিচে অশ্বখুরাকৃতি বিশাল খিলানের মাধ্যমে সৃষ্টি করা হয়েছে তোরণ পথ। বৃহদায়তনের স্থাপত্য ভবনের বিভিন্ন আঙ্গিক বৈশিষ্ট্য অলংকরণ বৈচিত্র্যের মধ্যে সুসামঞ্জস্যপূর্ণ ভারসাম্য সৃষ্টির মাধ্যমে আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছে। দেখা যায় যে মোগল স্থাপত্য রীতির সঙ্গে ব্রিটিশ স্থাপত্য রীতির সংমিশ্রণের যে সূত্রপাত হয়েছিল, তার স্বাভাবিক পরিণতি কার্জন হলে অর্জিত হয়। এছাড়া ঔপনিবেশিক শাসনকালে বাংলাদেশে গড়ে ওঠা উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য ইমারত পুরনো হাইকোর্ট ভবন, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ফজলুল হক হল, রাজশাহী বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম, কারমাইকেল কলেজ ইত্যাদি।

বাংলাদেশে ঔপনিবেশিক শাসনকালে নীল ব্যবসাকে কেন্দ্র করে বেশ কিছুসংখ্যক স্থাপত্য ভবন গড়ে ওঠে এবং নীল চাষ প্রথা বিলোপ হওয়ায় নীলকুঠিগুলোর প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়। আর নীলকুঠিগুলো অনিবার্য ধ্বংসের পথে ধাবিত হয়। পাবনার বিখ্যাত নীলকুঠি পাবনা সদরে পদ্মা নদীর পাড়ে সাধুপাড়ায় অবস্থিত। এটি একটি প্রশস্ত সিঁড়িপথ যুক্ত জাঁকালো দ্বিতল ভবন ছিল। অলংকৃত সুদৃশ্য স্তম্ভ শীর্ষ সংবলিত কোরিনথিয়ান রীতির স্তম্ভ সারি ভবনে প্রত্যক্ষ করা গেছে। এছাড়া খুলনায় মোল্লাহাটি কুঠি, যশোরের রূপদিয়া কুঠিসহ সরদাহ, রাজশাহী, মতিহার, কাজলা ইত্যাদি স্থানে নীলকুঠি বিদ্যমান ছিল।

ঔপনিবেশিক শাসনকালে জমিদারদের দ্বারা নির্মিত প্রাসাদ, অট্টালিকা ইত্যাদির মধ্যে ঢাকায় অবস্থিত আহসান মঞ্জিল (১৮৭২) একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। ১৯৮৮ সালে টর্নেডোয় ক্ষতিগ্রস্ত হলে আলীমউল্লা ভবনটি পুনর্নির্মাণ করেন  এবং ভবন শীর্ষে গম্বুজটি স্থাপন করেন। আহসান মঞ্জিল উত্তোলিত মঞ্চের উপরে নির্মিত একটি অতি জাঁকালো দ্বিতল অট্টালিকা। এতে তিনটি খিলান পথে সৃষ্ট দ্বিতলের প্রবেশপথের সঙ্গে নিচ থেকে উঠে আসা প্রশস্ত সিঁড়িপথ যুক্ত। পলকাটা নিমগ্ন স্তম্ভ, মুল্ডিং করা কার্নিশ। অর্ধবৃত্তাকৃতির খিলানসারিসংবলিত ফাসাদ ইত্যাদি সামগ্রিকভাবে দৃষ্টিনন্দন রূপ লাভ করেছে। আহসান মঞ্জিলের স্থাপত্যে মোগল রীতি ইউরোপীয় রেনেসাঁ রীতির সংমিশ্রণ লক্ষণীয়।

মানিকগঞ্জের বালিয়াটি প্রাসাদ উনিশ শতকের রেনেসাঁ রীতির একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন বলে বিবেচিত হয়। B. C. Allen মন্তব্য করেন, বালিয়াটি প্রাসাদটি ‘...Recalls the georgias country house in England...বিশাল বিস্তৃত বালিয়াটি প্রাসাদের সম্মুখভাগ চারটি প্রধান অংশে বিভক্ত। কেন্দ্রীয় দুটি অংশ ত্রিতলবিশিষ্ট এবং বেষ্টনী প্রাচীরে তিনটি অর্ধবৃত্তাকৃতির প্রবেশপথ রয়েছে। আর তোরণ শীর্ষে সিংহমূর্তি স্থাপন করে শোভা বর্ধন করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত মুরাপাড়া প্রাসাদের (১৮৮৯) সম্মুখভাগে (২০০ ফুট প্রশস্ত) কেন্দ্রীয় প্রবেশপথটি অর্ধবৃত্তাকার খিলানে সৃষ্ট এবং দণ্ডায়মান কোরিনথিয়ান স্তম্ভ সারির মাধ্যমে সন্নিবেশিত। তোরণটির শীর্ষভাগ ত্রিকোণাকৃতির পেডিমেন্ট নকশায় আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছে। পাবনার শীতলাই প্রাসাদের (১৯০০) স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য এবং অলংকরণ শৈলী, যেমন ফাসাদ শীর্ষে ত্রিকোণ পেডিমেন্ট, পলকাটা, নিমগ্ন স্তম্ভ, অর্ধবৃত্তাকার খিলান, স্টাকো পদ্ধতিতে রোজেট নকশাসবই ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের বিকশিত বৈশিষ্ট্য বলে পরিগণিত। শীতলাই ভবনের ফাসাদের কেন্দ্র ক্রমে উঁচু হয়ে সব শেষে পাখির নকশা ধারণ করে আছে। ছাদে বেষ্টনী প্যারাপেটে গোল ছিদ্র ছোট ছোট বুরুজ স্থাপন করা আছে। ভবনের উত্তর-পশ্চিম কোণে মোগল স্থাপত্য প্রভাবে সৃষ্ট একটি মাত্র গম্বুজ রয়েছে এবং ছোট কলস শীর্ষ বুরুজরূপে ব্যবহারে এর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে। বিশাল গম্বুজের একেকটি শিরে একটি করে সাপের নকশা বিধৃত হয়েছে।

তাড়াশ রাজবাড়িটি রায় বাহাদুর বনমালী রায় উনিশ শতকের শেষ পাদে নির্মাণ করেন। প্রাসাদটির প্রবেশপথ জোড়া ডোরিক স্তম্ভসংবলিত অর্ধবৃত্তাকার বিশাল এবং সুউচ্চ খিলানের মাধ্যমে সৃষ্ট। চারটি কোরিনথিয়ান স্তম্ভ ভিতে এবং দেয়াল স্টাকো পদ্ধতিতে আকর্ষণীয় ফুলেল নকশায় অলংকৃত; এছাড়া বাংলাদেশে আরো অনেক জমিদারবাড়ি রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ময়মনসিংহের রাজবাড়ি, শশী লজ, গৌরীপুর প্রাসাদ, ধনবাড়ি নওয়াবের প্রাসাদ, পুটিয়া প্রাসাদ, দীঘা পাতিয়া মহারাজার প্রাসাদ (উত্তরা গণভবন), নওগাঁর দুবলহাটি বলিহার রাজবাড়ি, দিনাজপুর রাজবাড়ি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এসব প্রাসাদ রাজবাড়ির স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য অলংকরণ শৈলী পর্যবেক্ষণে পরিলক্ষিত হয় যে ইউরোপীয় স্থাপত্যের প্রভাবে মোগল রীতির সমন্বয়ে সময়ে এসব জমিদারের জামদারবাড়ির স্থাপত্য গড়ে ওঠে। বস্তুত ইউরোপীয় স্থাপত্যে আধুনিকতার আগে গ্রিক স্থাপত্যের পুনর্জাগরণের মধ্য দিয়ে এবং ঔপনিবেশিক শাসনের পথ ধরে রেনেসাঁ রীতি এদেশে অধিকতর সচল বেগবান হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক আর্থসামাজিক ক্ষমতা ইউরোপীয়দের হাতে থাকায় বাংলাদেশের স্থাপত্য ক্ষেত্রে তাদের প্রভাব স্বাভাবিকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। উপরন্তু, দেশের বিত্তবান অভিজাত শ্রেণী, যারা আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছিল, তারা ছিল পাশ্চাত্যের অনুকরণে নিবেদিতপ্রাণ।

ঔপনিবেশিক শাসনকালে গড়ে ওঠা তাদের স্থাপত্যের প্রভাবে বাংলাদেশের স্থাপত্য ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রগতি সূচিত হয়েছে সত্য কিন্তু প্রক্রিয়ায় হাজার বছরে গড়ে ওঠা সমৃদ্ধ অলংকরণ বৈশিষ্ট্য ঔপনিবেশিক স্থাপত্যে উল্লেখযোগ্যভাবে অঙ্গীভূত হয়ে উঠতে পারেনি। ইটের কাঠামোর ওপর পোড়ামাটির ফলক দ্বারা শোভিত করার প্রথা বহু প্রাচীন। বিভিন্ন উৎস থেকে আহরিত উপকরণ ব্যবহারে মধ্যযুগে সুলতানি যুগের অলংকরণ শুধু সমৃদ্ধই হয়নি, বরং সুষ্ঠু সমন্বয় ভারসাম্য সৃষ্টির মাধ্যমে রসোত্তীর্ণ শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছতে সমর্থ হয়েছে। সে সময়ে সব ইমারতের বহির্গাত্র ছিল টেরাকোটা নকশায় সজ্জিত। টেরাকোটা অলংকরণ সেই প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে ব্যাপকভাবে সুলতানি, মোগল এমনকি মোগল আমলের শেষের দিকে মন্দির স্থাপত্যে পর্যন্ত অবিচ্ছিন্নভাবে ব্যবহূত হয়েছে। বিত্তের দৈন্য থাকলেও চিত্তের ঐশ্বর্যে বাংলার টেরাকোটা ছিল মোহময়। টেরাকোটা অলংকরণ ঔপনিবেশিক আমলে প্রথমবারের মতো বর্জন করা হয়। অধিকন্তু, বাংলার আঞ্চলিক শিল্প মোটিফ যে তাদের মনকে আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হয়েছে, সে সম্পর্কে প্রাসঙ্গিকতা থাকায় প্রত্নতত্ত্ববিদ স্যার আলেকজান্ডার কানিংহামের একটি মন্তব্য এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। কানিংহাম তার জরিপ রিপোর্টে সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের সমাধি গাত্রে উত্কীর্ণ অলংকরণ সম্পর্কে যে মন্তব্য করেন, এক্ষেত্রে তা প্রণিধানযোগ্য। আলোচ্য অলংকরণ নকশা ছিল আদিনা মসজিদ, একলাখী সমাধি ইত্যাদি গৌড় পাণ্ডুয়ার স্থাপত্য ইমারতে ইট পাথরের উত্কীর্ণ ঝুলন্ত সিকায় রক্ষিত পাত্র’ (মতান্তরে প্রদীপদান) প্রভৃতিতে। কানিংহাম মন্তব্য করেন, ‘The sacrophogus itself is richly carved but the design has then some fault that is common to all bengali ornaments in a monotonous repetition of the same petty form.তারা মনে করেন, (সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ) উত্কীর্ণ অতি উত্কৃষ্ট অলংকরণ ঝুলন্ত সিকায় রক্ষিত পাত্রনগণ্য একঘেয়ে নকশার পুনরাবৃত্তি, যা বাংলার অলংকরণে সর্বত্র পরিলক্ষিত হয়। থেকে সহজেই অনুধাবন করা যায় যে বাংলা অঞ্চলের কোনো অলংকরণের শিল্পমাধুর্য ইউরোপীয় নির্মাতাদের মনকে আকৃষ্ট করতে পারেনি।

ঔপনিবেশিক শাসনামলে তাদের দ্বারা কোনো মসজিদ অথবা মন্দির নির্মিত হয়নি। সময়ে স্থাপত্য অলংকরণ ধর্মীয় চেতনার বন্ধন মুক্ত হয় এবং এতে এক সর্বজনীন অলংকরণ শৈলী প্রকাশ পায়। যদিও ঔপনিবেশিক স্থাপত্য অলংকরণ ইউরোপীয় নির্মাতাদের দ্বারা গড়ে ওঠে, এর ধারাবাহিকতা দেশীয় জমিদারশ্রেণী  কর্তৃক অনুসৃত হয়ে চলে। বাংলাদেশে ঔপনিবেশিক শাসনকালে নির্মিত প্রশাসনিক ভবন, জমিদারবাড়ি নীলকুঠি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে যাওয়ায় প্রায় ক্ষেত্রেই এর মূল্যায়ন কষ্টসাধ্য। এসব নিদর্শন ধ্বংসের প্রধান কারণ এসব ইমারতের ঐহিক বৈশিষ্ট্য। স্থাপত্য ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, সনাতন স্থাপত্য উপাদান, উপকরণ পদ্ধতি থেকে উদ্ভূত সমস্যা সমাধানের জন্য প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য রীতির সূত্রপাত হয়। সিমেন্ট, কংক্রিট, স্টিল, কাচ ইত্যাদি ব্যবহারে পূর্বের সনাতন নির্মাণ পদ্ধতি অচল বলে পরিগণিত হয়। এভাবে উনিশ শতকে আধুনিক প্রযুক্তির হাত ধরে ইউরোপীয় রেনেসাঁ রীতি বাংলায় অনুপ্রবেশ করে এবং অচিরে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এখানে ব্রিটিশ স্থাপত্যের মূলধারার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য নিদর্শন প্রকাশ পায়, যাতে বৃত্ত, বর্গ, ত্রিভুজ ইত্যাদি গঠনরূপ বহিরাবরণে অভ্যন্তরে ব্যবহূত হয়েছে। ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের দ্বিমুখী ভূমিকা লক্ষণীয়, যদিও তাদের স্থাপত্য প্রভাবে অঞ্চলের স্থাপত্যের স্বাতন্ত্র্য ক্ষুণ্ন হয়। কিন্তু বিশ্ব স্থাপত্যের সঙ্গে অঞ্চলের স্থাপত্যের সংযোগের দ্বার উন্মোচন করে। রাজশক্তির প্রকৃতি বদলে গেলে সময়ে নির্মিত প্রশাসনিক ভবন, জমিদারবাড়ি, নীলকুঠিসর্বত্র ইউরোপীয় আধুনিক নির্মাণ উপাদান প্রযুক্তি অঞ্চলের নির্মাণকে বদলে দেয়; যাতে স্বাভাবিকভাবে আঞ্চলিক স্বাতন্ত্র্যের ওপর বিশ্বজনীন রূপ প্রতিফলিত হয়।

বাংলাদেশে ঔপনিবেশিক স্থাপত্য অলংকরণের বৈশিষ্ট্য হিসেবে প্রকাশ পায় অর্ধবৃত্তাকৃতির খিলানবিশিষ্ট বিশাল প্রবেশপথ, পত্রগুচ্ছে সজ্জিত স্তম্ভ শীর্ষ (ক্যাপিটাল)-সংবলিত কোরিনথিয়ান ডোরিক ধ্রুপদী স্তম্ভ, ত্রিকোণ পেডিমেন্ট, স্তম্ভগুলো সাধারণত স্তম্ভ ভিত, স্তম্ভ দণ্ড স্তম্ভ শীর্ষ তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে থাকে; কলস ভিতসংবলিত সুডৌল স্তম্ভ, খিলান শীর্ষে, স্তম্ভ খিলানে জ্যামিতিক ফুলেল নকশা, কারুকার্যমণ্ডিত লৌহ গ্রিল, জোড় স্তম্ভের ব্যবহার, বারান্দা খোলা করিডোর, মোজাইক গ্লেজ টাইলের ব্যবহার, জানালায় রঙিন কাচের ব্যবহার, বিভিন্ন ধরনের খিলান দেয়ালে চিনিটিকরির কাজ, পদ্ম পাপড়ির মারলন নকশা, নকশাকৃত ব্রাকেট, গম্বুজ, বুরুজ, সংলগ্ন স্তম্ভ ইত্যাদি। স্টাকো পদ্ধতিতে নারী মূর্তি, ভেনাস (মাতা মেরির কোলে শিশু যিশু), ম্যাডোনা, ঘোড়া, সিহং, বাঘ, হাতি, ময়ূর, টিয়া, সাপসহ অন্যান্য জীবজন্তু, চক্র, ফুলেল নকশা, মুকুট, বিভিন্ন ফুল, লতাপাতা-গাছগাছড়া ইত্যাদি সূক্ষ্মভাবে উত্কীর্ণ করা বিভিন্ন আকর্শনীয় নকশা দেখতে পাওয়া যায়। তাছাড়া বন্ধ জানালা, বন্ধ দরজা বন্ধ খিলানের নকশাও এসময়ে পরিলক্ষিত হয়। উপরন্তু, ভবন প্রবেশপথের আচ্ছাদন হিসেবে দোচালা চৌচালার ব্যবহারও দেখা যায়। মোল্ডিং নকশায় ফুল, কলি, পাতা, সর্পিল লতা, তরঙ্গায়িত রেখা বিভিন্ন গাছগাছড়ার উত্কীর্ণ নকশার প্রচলন লক্ষনীয়। উল্লেখ্য, পলেস্তরার নকশায় দেশের পাথরের কাঠ খোদাই নকশার প্রভাব লক্ষ করা যায়। বাস্তব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে এসব স্থাপত্য ইমারতে ঔপনিবেশিক আমলে যে স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য বিধৃত হতে দেখা যায়, তা যুগবাহী বিবর্তিত নির্মাণ অলংকরণ শৈলীর সামগ্রিক রূপ।

 

. আয়েশা বেগম: অনারারি প্রফেসর, ইসলামের ইতিহাস সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন