রবিবার | নভেম্বর ১৭, ২০১৯ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

টেরাকোটা-পর্ব ৩

বিপন্নপ্রায় স্থাপত্যের জীবন্ত জীবাশ্ম

সৌমেন হাজরা

বইমাত্রই যেমন সাহিত্যকর্ম নয়, স্থাপনামাত্রই তেমন স্থাপত্য নয়। একটি বই তখনই সাহিত্যকর্ম হয়ে ওঠে যখন তা পাঠকের কাছে বিমূর্ত হয় তারই নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন হিসেবে। কালজয়ী সাহিত্য পাঠকের মননে যে চেতনার স্ফুরণ ঘটায়, তা বহুমাত্রিক। সাহিত্যের পুনর্পাঠ পৌনঃপুনিকভাবে নবতর মাত্রার বিস্তৃতি ঘটায়। স্থান-কালের বাধা অতিক্রম করে তা হয়ে ওঠে সর্বজনীন, কালোত্তীর্ণ। স্থাপত্যও তেমনি দৈর্ঘ্য-প্রস্থ আর উচ্চতায় সীমাবদ্ধ একটি ত্রিমাত্রিক ক্ষেত্র বা অবয়ব শুধু নয়। চতুর্থ মাত্রায় সেই পরিসর এবং নির্দিষ্ট প্রসঙ্গ কাঠামোতে সেই অবয়ব যখন অনুধাবনকারীর কাছেশুধু নান্দনিকতায় নয়, সামগ্রিকভাবে তার উপলব্ধিতেপ্রেরণাদায়ক সুখানুভূতির দ্যোতনা ঘটাতে সক্ষম হয়, তখনই তা হয়ে ওঠে স্থাপত্য। স্থাপত্য প্রায়োগিক শিল্প। মানুষ পাঁচটি মাত্র ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে অনুধাবন করে জাগতিক সবকিছু, যা মস্তিষ্কে তার অতীতলব্ধ অভিজ্ঞতার আলোকে বিশ্লেষিত হয়ে যে চিত্র তার মানসপটে তৈরি করে, সেটাই ওই বিষয়ে তার উপলব্ধি। শিল্পকর্ম তখনই শিল্পোত্তীর্ণ হয় যখন তা রসাস্বাদনকারীর কাছে বিনির্মিত হয় অনুপ্রেরণা হিসেবে।

বিশিষ্ট স্থপতি প্রত্নস্থাপত্য সংরক্ষণবিশারদ অধ্যাপক আবু সাঈদ স্থাপত্য সম্পর্কে তার উপলব্ধির কথা প্রসঙ্গে ঢাকা শহরের দুটি স্থাপনার কথা উল্লেখ করেন, যে দুটি স্থানে তিনি যতবার গিয়েছেন প্রতিবার যেন সেই পরিসর, এর আঙ্গিক স্থানিক অবয়ব তার কাছে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় ধরা পড়েছে। এর একটি হলো স্থপতি কানের অনন্য সৃষ্টি জাতীয় সংসদ ভবন আর অন্যটি শাঁখারীবাজারের পুরনো বাড়িগুলো। আন্দ্রেই তারকাভস্কি বলেছিলেন, একটি বই হাজারো পাঠকের কাছে হয়ে ওঠে হাজারো বই। শুধু কি তাই, একই বইয়ের পুনর্পাঠ যেন নতুন এক আবিষ্কার, নবতর অনুধাবন। স্থাপত্যকর্মের মর্ম উপলব্ধিও তেমনই, স্বতন্ত্রের কাছে তা অনন্য। আবার যেহেতু প্রত্যেক স্বতন্ত্রের সত্তা ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়, পরিণত হয়, হয় অভিজ্ঞ, প্রতিবার ওই শিল্পরূপ পুনর্নির্মিত হয় তার উপলব্ধিতে, নতুন রূপে। মহান স্থপতি লুই আই কানের অনবদ্য স্থাপত্য আমাদের মহান জাতীয় সংসদ ভবন। শুধু অবয়ব, বহিরাবরণ, গঠন উপাদান বা বিন্যাসে নয়, স্থানের পরম্পরা কিংবা পরিসরের ব্যাপ্তি এবং ব্যঞ্জনা তা ব্যবহারকারীর উপলব্ধির ক্ষেত্রে সতত পরিবর্তনশীল দ্যোতনার সৃষ্টি করে। প্রতিটি স্থান সামগ্রিকভাবে অন্যান্য স্থানের সঙ্গে নিবিড় বুননে গাঁথা। স্থান স্থানের মধ্যে, অবয়ব অবয়বের মধ্যে এমনভাবে গ্রথিত, যা এক নিরবচ্ছিন্ন ঐকতানের সৃষ্টি করে।

অন্যদিকে শাঁখারীবাজারের পুরনো বাড়িগুলোকে স্থাপত্যের জীবন্ত জীবাশ্মের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। ঢাকা শহরের জন্মলগ্ন থেকে এর ক্রমবিবর্তনের সঙ্গে জড়িত এই বাড়িগুলোর অস্তিত্ব। মূলত ক্ষুদ্র এক বাণিজ্য নগরী হিসেবে গোড়াপত্তন ঘটে ঢাকার। একদিকে ধোলাইখাল আর অন্যদিকে বুড়িগঙ্গা নদী, এরই মধ্যে সীমাবদ্ধ ভূখণ্ডে হস্ত কুটির শিল্পী আর বণিকদের দ্বারা গড়ে ওঠা বাজার ক্রমান্বয়ে বৃহৎ জনপদে পরিণত হয়। বিশেষায়িত হস্ত কুটির শিল্পনির্ভর বণিক সম্প্রদায় এমন এক বিশেষ আবাসন একক উদ্ভাবন করে যেখানে হস্তশিল্পজাত পণ্যের উৎপাদন বা বিপণন এবং শিল্পী পরিবারের আবাসন একই বাড়িতে সংঘটিত হতো, যাকে বলা হয় শপ হাউজ গৃহনির্ভর বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার এক অনন্য প্রতিভাস এই শপ হাউজগুলো। ঢাকার বিস্তৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই বিশেষ হাউজ-টাইপ। শপ হাউজমূলত নাগরিক ভার্নাকুলার হাউজফর্ম, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সেই শহরগুলোতে দেখা যায় যেগুলো অতীতের কোনো না কোনো সময়ে ঔপনিবেশিক শাসনাধীন বা বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত ছিল। যেমন চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ভারতবর্ষের শহরগুলোতে। যা বিন্যাসের দিক দিয়ে স্থানীয় ঐতিহ্য ধারণ করে কিন্তু বাহ্যিক অবয়বে ঔপনিবেশিক ধারায় প্রভাবিত। বাণিজ্যিক ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে বসবাসের জন্য নির্মিত মিশ্র ব্যবহার-সংবলিত এই বাড়িগুলো ঐতিহাসিকভাবে অঞ্চলের অধিকাংশ নগরকেন্দ্রের মৌলিক গাঠনিক একক। এই বাড়িগুলো রৈখিকভাবে বিন্যস্ত, সংক্ষিপ্ত সম্মুখসম্পন্ন বিশেষ ধরনের বার্গেই (Burgage) প্লটে বিকশিত হতো, যার দৈর্ঘ্য প্রশস্ততার কয়েক গুণ। এক্ষেত্রে একই দেয়াল ভাগাভাগি করে গায়ে গা লাগানো ভবনগুলো উঠান এবং টেরাসের সঙ্গে নিবিড়ভাবে বিন্যস্ত থাকত। সম্মুখ অলংকরণ প্রাচ্য পাশ্চাত্য উভয় ঐতিহ্যে অনুপ্রাণিত। শপ হাউজ’-এর সুনির্দিষ্ট কোনো বাংলা প্রতিশব্দ পাওয়া যায় না। দোকানঘরবলতে মূলত বড় দোকান, গুদাম বা আড়তের বিক্রয়কেন্দ্রকে বোঝানো হয়। কুঠি-বাড়িশব্দটিও শপ হাউজের সমার্থক নয়। এক্ষেত্রে shopঅর্থ দোকান, যার অন্য এক সমার্থক শব্দ আপণএবং houseঅর্থ বাড়ি বা আলয়’, দুয়ের সন্ধিতে আপণ+আলয়=আপণালয়, যেমন শিল্পালয়, বিদ্যালয়, চিকিৎসালয়, লোকালয় ইত্যাদি। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষত প্রাচ্য পাশ্চাত্যের মেলবন্ধনে বিকশিত এক বিশেষ পরিমণ্ডলে গড়ে ওঠা পুরনো ঔপনিবেশিক শহরগুলোতে এর বিস্তার দেখা যায়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, নাটোর, বগুড়া, যশোর, খুলনা, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, দিনাজপুর, রংপুর প্রভৃতি শহরে ঔপনিবেশিক আপণালয়ের সন্ধান মেলে। এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হাউজ-টাইপ ঢাকার ঐতিহাসিক বিস্তৃতি এবং বিন্যাসে এক অনন্য ভূমিকা রেখেছে।

ঢাকার ইতিহাস চারশ বছরেরও প্রাচীন। ইতিহাসবেত্তাদের মতে, সপ্তম শতাব্দীতে বৌদ্ধ আমলে কামরূপ রাজ্যে ঢাকার অস্তিত্বের সন্ধান মেলে। নবম-দশম শতাব্দীতে ঢাকা সেন আমলের একটি প্রতিরক্ষা ঘাঁটি ছিল, যার রাজধানী ছিল বিক্রমপুর। চতুর্দশ শতাব্দীতে, যখন সোনারগাঁও ঈশা খাঁর রাজধানী তখন ঢাকা এর বর্তমান অবস্থানে একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। ব্রাডলে ব্রিটের (১৯১৪) লেখায় জানা যায়, মেঘনা-ধলেশ্বরী-শীতলক্ষ্যার সঙ্গমস্থলে বায়ান্ন বাজার তেপ্পান্ন গলি যে কিংবদন্তি জনশ্রুতি সেখানে ঢাকার উল্লেখ না থাকলেও সোনারগাঁও, বাঙ্গাল্লা বিক্রমপুরের উল্লেখযোগ্য বিবরণ ছিল। প্রাক-মোগল আমলের বাংলাবাজারই হয়তো বাঙ্গাল্লা। তবে ঢাকার বিস্তৃতি গুরুত্ব বৃদ্ধি পেতে শুরু করে মোগল সুবেদার ইসলাম খান ১৬০৮ সালে যখন রাজমহল থেকে তার রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তর করেন এবং মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামানুসারে ঢাকার নামকরণ করেন জাহাঙ্গীরনগর। পুরান ঢাকার নগরবিন্যাস মূলত দেশীয় (indigenous) প্যাটার্নে গড়ে উঠেছিল। হিন্দু হস্ত কুটির শিল্পী এবং বণিকদের অন্তর্মুখী আপণালয়, সরু অন্তরঙ্গ অলিগলি এবং এদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা বসতি যা তলাবা মহল্লানামে পরিচিত, এসবই ছিল নগর বিন্যাসের উপাদান। উঠান-গলি-মহল্লা-মোড়-চক-বাজার এই ক্রমে বিশেষ নগরশৈলী রচিত হয়। নগর গবেষক অধ্যাপক নিলুফার এই বিন্যাসকে স্থপতিবিহীন নগর স্থাপত্যবলে আখ্যায়িত করেছেন।

মহল্লার নামকরণ সাধারণত বসতি স্থাপনকারী পেশাজীবীদের পেশার নামানুসারে হতো। মির্জা নাথান রচিত বাহরিস্তান--গায়েবিএবং রেনেল (১৭৭৮) চিত্রিত মানচিত্রে প্রাক-মোগল আমলের ঢাকাতে বাণিজ্য কেন্দ্র যেমন লক্ষ্মীবাজার, বাংলাবাজার, হস্তশিল্পীদের বসতি যেমন শাঁখারীবাজার (শাঁখারী), তাঁতীবাজার (তাঁতি) এবং ব্যবসায়ীদের বসতি যেমন পাটুয়াটুলি (পাট সিল্ক বস্ত্র চিত্রকর), সুতার নগর (দারুশিল্পী), কামারনগর (কামার), গোয়ালনগর (গোয়ালা) প্রভৃতি স্থানের উল্লেখ পাওয়া যায়। মোগল আমলে অন্যান্য পেশাজীবী ঢাকায় এসে বসতি স্থাপন করে এবং নতুন নতুন মহল্লার বিস্তার ঘটে। বাণিয়ানগর (বণিক, মূলত স্বর্ণ রৌপ্য ব্যবসায়ী), কুমারটুলি (কুমার), যোগীনগর (বয়ন শিল্পী), জালুয়ানগর (জেলে), কাগজীটোলা (কাগজ প্রস্তুতকারী), চুড়িহাট্টা (চুড়ি প্রস্তুতকারী), সাঁচিবন্দর (সাঁচি পান ব্যবসায়ী), কসাইটুলি (কসাই), কায়েতটুলি (কায়স্থ), মোগলটুলি (মোগল) প্রভৃতি এমন সব মহল্লার উদাহরণ।

ঢাকার ইতিহাস একদিকে যেমন রাজনৈতিক উত্থান-পতনের ইতিহাস, অন্যদিকে তেমনি বাণিজ্যিক উত্থান-পতনের ইতিহাসও বটে। ১৭০০-১৭৬৫ সময়কালে ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্য তুঙ্গে ওঠে। যদিও ১৭০৭ সালে আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মোগল রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত হয়, তন্মধ্যে পর্তুগিজ, আর্মেনিয়ান, ফরাসি ইংরেজ ব্যবসায়ীদের আগমন ঘটে এবং ঢাকা এতদঞ্চলের প্রধান এক রফতানি কেন্দ্রে পরিণত হয়। পাশ্চাত্য পরিব্রাজক এবং পণ্ডিতরা তত্কালীন ঢাকাকে ভারতবর্ষের শহরের রানী হিসেবে আখ্যায়িত করেন। সময়ে ঢাকা হস্তশিল্পী, দেশী ইউরোপীয় বণিক এবং রাজকর্মচারীদের এক ঘনবসতিপূর্ণ নগরে রূপান্তরিত হয়। অপেক্ষাকৃত ক্ষণস্থায়ী উপকরণের পরিবর্তে ইট চুন-সুরকির বাড়ি নির্মিত হয়। অধিকাংশ ভবনেই গৃহস্থালি পেশাভিত্তিক কাজ যৌথভাবে সম্পন্ন হতো। অর্থাৎ সেগুলো ছিল শপ হাউজবা আপণালয়। ১৭৬৪ সালে ঢাকা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনাধীন হয় এবং ১৮৫৮ সাল পর্যন্ত তা বহাল থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত না তা ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের আওতায় আসে। কোম্পানি আমলে অতিরিক্ত রফতানি কর এবং খাজনা আরোপ করায় অনেক দেশী-বিদেশী ব্যবসায়ী ঢাকা ত্যাগ করে। তখন থেকেই বাংলা অর্থনৈতিক রাজনৈতিক দিক থেকে ক্ষয়িষ্ণু হতে শুরু করে। ১৮২৮ সালে তা চূড়ান্তরূপ ধারণ করে যখন ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবের ফলে যন্ত্রচালিত কারখানায় উৎপাদিত বিলাতি কাপড় ব্যাপকভাবে দেশের বাজার দখল করে ফেলে। ডিওলাইয়ের (১৮১৪) ভাষ্যমতে, ১৭০০ থেকে ১৮৫৯ এই ১৫০ বছরে ঢাকার জনসংখ্যা ৯৪ শতাংশ এবং আয়তন ৯৭ শতাংশ হ্রাস পায়। ১৮২৪ সালে বিশপ হেবার (১৮৩০) ঢাকা সফর করেন এবং ঢাকার এই ধ্বংসপ্রায় বিধ্বস্ত এবং জনশূন্য অবস্থার কথা বর্ণনা করেন। ১৮৫৩ সালে ট্রিভেলিয়ান তার বিবরণে বলেন, ‘ঢাকা, ভারতবর্ষের ম্যানচেস্টার, এক উদীয়মান সমৃদ্ধ শহর হতে হতদরিদ্র ছোট শহরে পতিত হয়েছে।১৮৫৯ সালে প্রস্তুতকৃত সার্ভেয়ার জেনারেলের মানচিত্রে বন-জঙ্গলে আবৃত ঢাকা যেন তার যথাযথ চিত্র তুলে ধরে।

উনিশ শতকের মাঝামাঝি ব্রিটিশ সরকার ভারতবর্ষের অর্থনীতিতে বাংলার গুরুত্ব অনুধাবন করলে আবারো ঢাকার শ্রীবৃদ্ধি ঘটতে থাকে। কলকাতার পর ঢাকাই বাংলার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নগরীতে পরিণত হয়। বাঁধানো রাস্তা, উন্মুক্ত উদ্যান, স্ট্রিট ল্যাম্প এবং নলের মাধ্যমে পানীয় জল সরবরাহ ব্যবস্থা ঢাকাকে নতুন জীবন দান করে। শহরবাসীর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি তাদের গৃহশৈলীতেও প্রতিফলিত হতে থাকে। একতলা বা দোতলা ভবন প্রয়োজনের তাগিদে চারতলায় উন্নীত হয়। সমৃদ্ধি তাদের নতুন নতুন বাংলো প্রাসাদ নির্মাণের স্বাধীনতা দেয়। সম্মুখভাগের অলংকরণে তারা দেশী-বিদেশী অভিজাত ভবনের স্থাপত্যশৈলী নকল করতে শুরু করে। জেমস টেইলরের (১৮৪০) ভাষ্যমতে, সময়ে শাঁখারীবাজারের জমির খুবই উচ্চমূল্য ছিল এবং তখন প্রায় পাঁচশত শাঁখারী শঙ্খ বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

ইতিহাসের কালপ্রবাহে বাণিজ্যের উত্থান-পতনের ডামাডোলে অধিকাংশ মহল্লাতে এই পেশাজীবীদের ধারাবাহিকতা আর দেখা না গেলেও আদি নামগুলো আজও তার সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। তাঁতীবাজারে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত তিনঘর তাঁতি দেখা গেলেও আজ সেখানে কোনো তাঁত নেই, তা এখন স্বর্ণকারদের বাণিজ্য এলাকা। পান্নি টোলায় কোনো পান্নিওয়ালা বা টিনের পাতের সূক্ষ্ম কারুশিল্পীদের আজ আর কোনো অস্তিত্বই নেই। ঢাকার অন্যসব এলাকা ব্যাপক পুনর্নির্মাণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেলেও শাঁখারীবাজার ছিল তার ব্যতিক্রম। যার কারণ মূলত মহল্লার বিশেষায়িত হস্তশিল্প, জাতিভিত্তিক ধর্মীয় এবং সামাজিক কাঠামো, সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল, তাদের অর্থনৈতিক অবকাঠামো এবং অধিকতর স্থায়ী উপাদানে তৈরি স্বতন্ত্র স্থাপত্যধারা, যা মূলত স্থানীয় সামাজিক যাপিত জীবন এবং সাংস্কৃতিক অভিন্নতার এক স্পষ্ট প্রতিফলন। সর্বোপরি রাজনৈতিক পটপরিবর্তন যেমন সাতচল্লিশের দেশভাগ এবং একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে বর্বর পাকিস্তানি বাহিনীর নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।

শাঁখারীবাজার ঢাকার প্রাচীনতম মহল্লাগুলোর একটি, যা বুড়িগঙ্গা নদী থেকে মাত্র একটি ব্লক উত্তরে একদিকে ইসলামপুর রোড এবং অন্যদিকে নওয়াবপুর রোডের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ১০০০ ফুট বিস্তৃত। আয়তন প্রায় সাড়ে চার একর। বর্তমানে ৫৬৬টি পরিবারে ২৬৫৬ জনের বসতি (২০১১ আদমশুমারি), যার মধ্যে এখনো বেশকিছু পরিবার তাদের পৈতৃক শঙ্খবাণিজ্য ধরে রেখেছে।

ভারতবর্ষে শঙ্খবাণিজ্য এবং শঙ্খের ব্যবহার সুপ্রাচীন পৌরাণিক যুগ থেকে। ব্রহ্মকৈবর্ত্তপুরাণে শঙ্খের উত্পত্তি সম্পর্কে বিবরণ রয়েছে। সুদাম নামে এক গোপ শ্রীরাধার শাপে দৈত্যরূপে জন্মগ্রহণ করে শঙ্খচূড় নামে বিখ্যাত হয়। শঙ্খচূড় তপস্যা দ্বারা দেবতাদের অজেয় হয়ে তাদের রাজ্যচ্যুত করে স্বর্গের আধিপত্য লাভ করে। শাপাবাসান সময় উপস্থিত হলে দেবাদিদেব মহাদেবের শূল যখন অসুর দানব শঙ্খচূড়ের ওপর নিক্ষিপ্ত হয়ে সেই দেহ ভস্মে পরিণত করে শিব সানন্দে সেই দানবের অস্থিসমূহ সমুদ্রের মধ্যে নিক্ষেপ করায় ওই সমস্ত অস্থি থেকে নানা প্রকার শঙ্খের উত্পত্তি হয়। যুক্তিকল্পতরু প্রভৃতিতে শঙ্খকে রত্নবিশেষের মধ্যে পরিগণিত করা হয়েছে। প্রাচীন হিন্দুদের কাছে শঙ্খধ্বনিপরম পবিত্র। স্বয়ং বিষ্ণু শঙ্খচক্রগদাপদ্মধারী। পুরাণে শঙ্খের যে মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হয়েছে সে মতে সনাতন শাস্ত্রে শঙ্খ এক অতি পবিত্র পদার্থ। শঙ্খের জল তীর্থ বারিতুল্য। যেকোনো জলাশয়ের জল হোক না কেন তা শঙ্খস্থ হলে গঙ্গাজলের সমতুল্য হয়। সাধারণত শঙ্খ ডান থেকে বাম আবর্তে পাক খায়, কিন্তু এর বিপরীত আবর্তের শঙ্খকে দক্ষিণাবর্তশঙ্খ বলে, যা সাধারণত দুষ্প্রাপ্য, মূল্যও অধিক। বিষ্ণুর হস্তস্থিত শঙ্খটিও দক্ষিণাবর্তশঙ্খ। শঙ্খ দ্বারা হরি অর্চনা করলে সপ্তজন্মজাত পাপ একেবারে দূরীভূত হয়।

অর্থাৎ পৌরাণিক যুগ থেকেই ভারতবর্ষে শঙ্খ বহুল ব্যবহূত হয়ে আসছে। তামিলের আদি রাজধানী কর্কীতে প্রথম শতাব্দীর শঙ্খ প্রত্ননিদর্শনের সন্ধান পাওয়া যায়। সেই সময় মত্স্য পুরাণে উল্লেখিত সাতকাহন রাজ্যের নৃপতি হল-এর প্রাকৃত ভাষায় সংকলিত গাঁথা সপ্তশতীতে শঙ্খ অলংকার ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। এদিকে দীনেশ চন্দ্র সেনের মতে, প্রাচীন বাংলা সাহিত্যেও শঙ্খবালা বা শাঁখার উল্লেখ আছে। প্রত্যেক বিবাহিত হিন্দু মহিলা শাঁখা পরিধান করে থাকে, যা কপালে পরা সিঁদুরের মতোই বিবাহিতদের চিহ্নস্বরূপ। এর পাশাপাশি বাদ্যশঙ্খযা শঙ্খধ্বনিতে এবং জলশঙ্খযা পূজার উপাচার হিসেবে ব্যবহূত হয়।

একমাত্র ভারত মহাসাগরে এবং বঙ্গোপসাগরে শঙ্খ জাতীয় শম্বুক পাওয়া যায়। শাঁখা তৈরির শঙ্খ মান্নার উপসাগর (শ্রীলংকা ভারতের সংযোগস্থল ভারতীয় মহাসাগরে অবস্থিত) থেকে আমদানি করা হতো। বর্ণ আকারভেদে অনেক প্রকারভেদ থাকলেও সাধারণত মাজ্জাশঙ্খ বা Turbinella pyrum শাঁখা তৈরিতে বহুল ব্যবহূত হতো। সাধারণত দুই থেকে আটটি শাঁখা তৈরি হয় একটি শঙ্খ থেকে। বহু প্রাচীনকাল থেকে শঙ্খবাণিজ্য বিস্তার লাভ করে অঞ্চলে। আবু যায়িদ দশম শতাব্দীতে শঙ্খবাণিজ্যের উল্লেখ করেন। ট্যাভারনিয়ার ১৬৬৬ সালে ঢাকার রফতানি পণ্যে শাঁখার উল্লেখ করেন। পাটনা বাংলায় দুই হাজারের উপরে শঙ্খশিল্পী ছিল। সপ্তদশ শতকের শেষার্ধ পর্যন্ত এই শঙ্খবাণিজ্য ওলন্দাজদের একচেটিয়া দখলে ছিল। শঙ্খ শিকার ইংরেজ সরকারেরও রাজস্ব আয়ের বড় উৎস ছিল। সেই সময় ছয়শ ডুবুরি এক মৌসুমে সাড়ে চার মিলিয়ন শঙ্খ তুলত। এই শঙ্খ ইংরেজ বণিকেরা কলকাতায় নিয়ে আসত এবং ধনী শাঁখারীরা তা ক্রয় করে স্থানীয় শঙ্খশিল্পীদের সরবরাহ করত।

পুরাণমতে শাঁখারী বা শঙ্খকারবর্ণসংকর জাতিবিশেষ, শূদ্রার গর্ভে বিশ্বকর্মার ঔরসে এই জাতির উত্পত্তি হয়। জেমস ওয়াইজের (১৮৮৩) বর্ণনামতে সুদীর্ঘকাল ধরে ঢাকার শঙ্খশিল্পীদের বেশ সুনাম ছিল। পুরো বাংলায় ছড়িয়ে থাকা ১১,৪৫৩ জন শাঁখারীর মধ্যে ঢাকায় ছিল ৮৫৩ জন। বাংলার অন্যান্য স্থানে যে শঙ্খশিল্পীদের পাওয়া যায় তারা শাঁখা কাটার কাজ করত না, কাটা শঙ্খ মসৃণ অলংকরণের কাজ করত। ঢাকার বাইরে রাজশাহীতে কুমারসম্প্রদায় এবং চট্টগ্রামে মুসলিমদের মধ্যে শঙ্খ কাটার কাজ করতে দেখা যায়। জনশ্রুতি আছে, শাঁখারীরা মূলত বল্লাল সেনের সঙ্গে পূর্ববঙ্গে এসে বসতি স্থাপন করে। বিক্রমপুরে বল্লাল সেনের প্রাসাদে শাঁখারী বাজারের অবস্থানের উল্লেখ রয়েছে। প্রাক-মোগল আমলেই ঢাকায় বর্তমান শাঁখারীবাজার এলাকায় শাঁখারীরা বসতি স্থাপন করে এবং সপ্তদশ শতকের শুরুর দিকে মোগলরা যখন ঢাকায় তাদের রাজধানী স্থানান্তর করে তখন শাঁখারীদের উৎসাহিতকরণের জন্য তাদের বসতি জমিকে লাখেরাজ ঘোষণার মধ্য দিয়ে খাজনার আওতামুক্ত করে দেয়। ঢাকার এই শাঁখারীবাজারই পরবর্তী সময়ে এতদঞ্চলের শঙ্খবাণিজ্যের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়। কোম্পানি আমলে ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময়ে এসব জমি আবার খাজনার আওতায় আসে। শাঁখারীরা শূদ্র সম্প্রদায়ভুক্ত এবং বড় ছোট দুটি বিভাগে বিভক্ত। ছোট ভাগ সোনারগাঁও শাঁখারী নামেও পরিচিত। এদের সংখ্যাও স্বল্প, বারো ঘরের বেশি নয়। যারা পরবর্তী সময়ে অন্যান্য ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে বড় অংশ বিক্রমপুর শাঁখারী নামে পরিচিত এবং ৩৫০ পরিবারভুক্ত। এরাই মূলত ঢাকার শাঁখারীবাজারের বাসিন্দা। এদের পদবি সুর, নাগ, নন্দী, সেন, ধর, দত্ত কারা। শাঁখারীরা বিষ্ণু কৃষ্ণের অনুসারী। অধিকাংশই নিরামিষভোজী। ভাদ্রসংক্রান্তিতে (আগস্ট-সেপ্টেম্বর) তাদের মূল উৎসব অগস্ত্য ঋষির পূজা, যা তারা পাঁচদিনের জন্য কর্মবিরতির মধ্য দিয়ে পালন করে, যিনি অজেয় শঙ্খ অসুরের কাছ থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করেছিলেন অর্ধচন্দ্রাকৃতি শাঁখের করাতের মাধ্যমে. যা তারা এখনো শাঁখা কাটার কাজে ব্যবহার করে। ঝুলনযাত্রা এবং জন্মাষ্টমী ভাদ্র মাসে কৃষ্ণের উদ্দেশে নিবেদিত, আরো দুটি উৎসব যা অন্যান্য বাঙালি বৈষ্ণবদের মতো শাঁখারীরাও পালন করে। শাঁখারীদের মধ্যে কেউ যদি বাজারের বাইরে জীবিকা নির্বাহ করত তবে তাকে সমাজচ্যুত হতে হতো। শাঁখারীরা খুবই কর্মঠ। আবালবৃদ্ধ অনেক রাত পর্যন্ত শাখার কাজে নিয়োজিত থাকত। বালকেরা খুব অল্প বয়স থেকেই শাঁখা কাটার পদ্ধতি রপ্ত করতে শুরু করত। অন্যথায় তাদের পেশি এই কাজের যোগ্য হয়ে উঠত না। কারণ যে বিশেষ ভঙ্গি স্বল্পতম স্থানে তাদের এই কাজ করতে হয় তা খুবই কষ্টসাধ্য। একদিকে শঙ্খ পায়ের আঙুল দিয়ে আর অন্যদিকে অর্ধচন্দ্রাকৃতি করাত হাত দিয়ে উল্লম্বভাবে ধরে রাখতে হয়, যা পাশাপাশি পরিচালনের মাধ্যমে এই শাঁখা কাটার কাজ করা হয়।

হাজার ফুট বিস্তৃত অপ্রশস্ত কিন্তু অন্তরঙ্গ রাস্তার দুই প্রান্তে ১০-১২ ফুট চওড়া এবং ৭০-১০০ ফুট গভীর, দুই থেকে তিনতলা বা কিছু চারতলা পর্যন্ত উন্নীত, মোগল ঔপনিবেশিক স্টাইলে সমৃদ্ধ সারি সারি ভবন যা পরস্পরসংলগ্ন, যে প্যানারোমিক ফাসাদের সৃষ্টি করে তা অতুলনীয়। সমৃদ্ধ অতীতের এক অনন্য দৃশ্যকল্পে অনুপম স্থাপত্যশৈলীর প্রকাশ। স্বল্পতম স্থানে নকশা বিন্যাসের সুদক্ষ আর্গোনমিকস, আবদ্ধ কক্ষের সঙ্গে উন্মুক্ত টেরাসের সংযোগ, ফর্ম ফাংশনের মেলবন্ধন, আলো বাতাসের সংস্থানসব মিলিয়ে পরিসরের দ্যোতনা বিশেষ ব্যঞ্জনাময়।

মোগল আমলের শেষার্ধ থেকে ঔপনিবেশিক আমল পর্যন্ত বিবর্তনের চিহ্ন রয়ে গেছে এই বাড়িগুলোতে। উনিশ শতকের শেষার্ধে নব্য-ধ্রুপদী বা নিও-ক্ল্যাসিক্যাল স্টাইলের প্রতিফলন দেখা যায়। সেক্ষেত্রে স্থাপত্যিক উপাদানে করিন্থিয়ান ধারার প্রাধান্য চোখে পড়ে। কিছু বাড়িতে তত্কালীন ব্রিটিশ স্থাপত্যধারার প্রভাব লক্ষ করা যায়। ঔপনিবেশিক আমলের শেষার্ধে বাড়িগুলোতে ব্যাপক সংস্কারের জোয়ার চোখে পড়ে। পেটা-লোহার রেলিং যুক্ত ঝুলবারান্দার উপস্থিতি সময়ের উল্লেখযোগ্য সংযোজন।

পরিসর বিন্যাসের ওপর ভিত্তি করে শাঁখারীবাজারের অধিকাংশ আপণালয় উঠান-সমৃদ্ধ চতুর্দিকে ঘেরা বা এনক্লোজড ধরনের। অল্পকিছু রয়েছে অতিসংকীর্ণ অন্তর্মুখীধরনের। এগুলোর প্রশস্ততা মাত্র ছয় ফুট। এক্ষেত্রে এক কক্ষের মধ্য দিয়ে পরবর্তী কক্ষে প্রবেশ করতে হয়, কোনো পৃথক করিডোর নেই। পুরান ঢাকার অন্যান্য মহল্লায় পৃথক দোকানসম্পন্ন বিচ্ছিন্নধরনের আপণালয় দেখা গেলেও শাঁখারীবাজারে প্রকারভেদ অনুপস্থিত।

প্রথমদিকে গড়ে ওঠা নগরের বাড়িগুলো মূলত গ্রামীণ বাড়ির শহুরে রূপান্তর ভিন্ন আর কিছু নয়। এগুলো গ্রামের বাড়িরই অধিক টেকসই উপকরণ, মূলত ইটের, নাগরিক সংস্করণ। পাশ্চাত্য ক্ল্যাসিক্যাল ধারা ঔপনিবেশিক আমলের আগ পর্যন্ত স্থানীয় স্থাপনার লে-আউট বা স্থানবিন্যাসে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। শাঁখারীবাজারের একেকটি বাড়ি যেন একেকটি প্রতিষ্ঠান। অধিকাংশ আপণালয়ের সম্মুখভাগ বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড এবং পশ্চাত্ভাগ গৃহস্থালি কর্মকাণ্ড ওপরতলাগুলো বসবাসের জন্য ব্যবহূত হতো। সরু গলিপথ যা সাধারণত যেকোনো এক পাশ দিয়ে বাড়ির অভ্যন্তরে প্রবেশ করত। করিডোরগুলো সাধারণত পার্শ্ববর্তী বাড়ির প্রাচীর দ্বারা পৃথক হতো এবং তা উপরে ওঠার সরু সিঁড়ি বা পেছনের সার্ভিস এলাকায় পৌঁছে যেত। অপ্রশস্ত সম্মুখভাগ আর সুগভীর দৈর্ঘ্য এসব বাড়ির সাধারণ বৈশিষ্ট্য। এর অন্যতম আরেক কারণ প্রাকৃতিক পানি এবং পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, যার জন্য সাধারণত বাড়িগুলোর পেছন দিকের নালা বা খালের ওপর নির্ভর করতে হতো। সম্মুখের রাস্তা পেছনের পয়োনিষ্কাশন সুবিধাপ্রাপ্তির জন্য জমির বিভাজন লম্বালম্বিভাবে হতো। এই বিশেষায়িত বাড়িগুলোর পরিসর বিন্যাসে তত্কালীন সামাজিক সাংস্কৃতিক ব্যবস্থার প্রভাব লক্ষণীয়। দোকান বাসাবাড়ির জন্য পৃথক প্রবেশপথ অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং একান্ততা নিশ্চিত করত। বাণিজ্যিক দৈনন্দিন গৃহস্থালি কর্মকাণ্ড এবং পারিবারিক পরিমণ্ডলকে পৃথক্করণে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা লক্ষ করা যায়। একটি সুনির্দিষ্ট ধারাবাহিকতায় এর পরিসর বিন্যস্ত হতো। সম্মুখভাগ সর্বগম্য, যা রাস্তার দিকে সংযুক্ত এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে একটি ছোট উঠান বাড়ির মধ্যস্থলে পুরুষ স্ত্রী পরিমণ্ডলকে পৃথক্করণের জন্য ব্যবহূত হতো। গৃহস্থালি কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো বাড়ির পেছনভাগে, যেখানে সাধারণত কোনো পানির উৎস থাকত। অধিকাংশ বাড়িতেই জলকূপ বা ইন্দিরাদেখা যেত।

দোকান বা বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড নিচতলার সম্মুখভাগে সীমাবদ্ধ থাকত। গৃহস্থালি কর্মকাণ্ড সাধারণত পেছন ভাগে এবং উপরের তলাগুলো আবাসিক ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট থাকত। দোকানগুলো রাস্তার সঙ্গে বারান্দা দিয়ে পৃথক করা হতো এবং বারান্দাগুলো শিল্পসামগ্রী প্রদর্শন এবং নির্মাণকাজে ব্যবহূত হতো। লম্বা সরু করিডোর দিয়ে ভেতরবাড়িতে প্রবেশ করতে হতো। সাধারণত একাধিক সরু খাড়া সিঁড়ি দিয়ে উপরের তলায় উঠতে হতো। সিঁড়িগুলো সাধারণত একই স্থানে উল্লম্বভাবে অবস্থিত না হয়ে এলোমেলোভাবে বিন্যস্ত হতো, যা অপরিচিত লোকেদের জন্য এক ধাঁধা তৈরি করত। কখনো কখনো সিঁড়ি কক্ষের মধ্য দিয়ে আবার পরবর্তী তলায় উঠত। সব বাড়িতেই দুই বা ততোধিক উঠান সংযুক্ত থাকত, যা আমাদের দেশীয় বাড়িগুলোর এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। সম্মুখ উঠান যা বাণিজ্যিক গৃহস্থালি কর্মকাণ্ডকে পৃথক করত, মধ্যবর্তী উঠান সাধারণত বাড়ির আবাসিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রস্থল এবং পশ্চাৎ উঠানে সাধারণত স্নানঘর শৌচাগার ব্যবস্থাদি করা হতো, যা সবসময় মূল বাড়ি থেকে পৃথক থাকত। উঠানগুলো শুধু আলো বা বাতাস প্রবেশের জন্য নয়, মূলত এদের কেন্দ্র করেই সমস্ত অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। অধিকাংশ বাড়ির ছাদে ওঠার ব্যবস্থা থাকত এবং এক বা একাধিক উন্মুক্ত টেরাস দেখা যেত। ছাদ উন্মুক্ত টেরাস মহিলাদের আড্ডা, কাপড় শুকানো থেকে শুরু করে বাচ্চাদের খেলাধুলা, ঘুড়ি ওড়ানো প্রভৃতি কাজে ব্যবহূত হতো। উপরের ঘরগুলো শোবার ঘর বা বিশ্রামাগার, পূজার ঘর, ভাণ্ডার বা স্টোররুম। মূলত সবগুলো কক্ষই দিনের বা বছরের বিভিন্ন সময়ে বহুবিধ কর্মকাণ্ডে ব্যবহূত হতো। রান্নাঘর নিচতলার উঠানে, ইন্দিরা বা কূপের অবস্থানও স্থানেই। অনেক সময় এর সঙ্গে জ্বালানি সংরক্ষণের ঘরও দেখা যেত। যেহেতু পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নালা বা কাঁচা ড্রেনের ওপর নির্ভরশীল ছিল তাই স্নান শৌচাগার পেছনের উঠানে সম্পাদিত হতো। উপরের তলার সম্মুখদিকে ঝুলবারান্দা দেখতে পাওয়া যায়। পৃথক গৃহ-মন্দির শাঁখারীবাজারের বাড়িগুলোর একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সাধারণত মন্দিরগুলো বাড়ির সর্বোচ্চ তলায় নির্মিত হতো। কারণ মন্দিরের ছাদে ওঠা নিষিদ্ধ ছিল। প্রথাগতভাবে হিন্দু মন্দির দক্ষিণমুখী হয়। যে কারণে শাঁখারীবাজারের দক্ষিণ দিকের বাড়িগুলোতে মন্দির রাস্তার দিকে অবস্থিত হওয়ায় রাস্তা থেকে মন্দিরের বদ্ধ পেছন ভাগ দেখা যায়। যদিও উত্তর দিকের বাড়িগুলোতে এর বিপরীত দিকে মন্দিরগুলো নির্মিত হতো, সেক্ষেত্রে রাস্তার দিকে মন্দিরের সামনের উন্মুক্ত টেরাস দেখা যায়।

কখনো কখনো দুই বা ততোধিক পাশাপাশি বাড়ির মধ্যে বিভিন্ন তলায় আন্তঃসংযোগ থাকত। করিডোর থেকে, সিঁড়ির ল্যান্ডিং থেকে, টেরাস বা ছাদ থেকে সংযোগগুলো প্রতিবেশী বাসিন্দারা এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে যাতায়াতের জন্য ব্যবহার করত। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অতীত ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে আগে বেশকিছু ব্যবহার অনুপযোগী বাড়ি ভেঙে পুরনো আদলে পুনর্নির্মিত হয়েছে।

ঐতিহ্যের যে শরীরী অবয়ব, শাঁখারীবাজারের বাড়িগুলোর প্রতিটি ইট এবং ইটের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা তার অধরা অবয়বের সঙ্গে মিলেমিশে যা এখনো বর্তমান, তা অতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ইতালো কালভিনো তার ইনভিজিবল সিটিজ- বলেছেন, ‘আগামী অর্জিত হয় না, তা শুধু অতীতের ডালপালা: মৃত ডালপালা।সংকীর্ণ পরিসরে সুদীর্ঘকালব্যাপী ইতিহাসের সাক্ষ্য বহনকারী এসব আপণালয়ের মধ্য দিয়ে এই যে পরিভ্রমণ, সে কি অতীত অবগাহনের যাত্রা?’ নাকি আগামী পুনরুদ্ধারের যাত্রা?’ পাঠকের মননে প্রতিভাত হোক সে প্রত্যুত্তর।

 

সৌমেন হাজরা: স্থপতি

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন