সোমবার | নভেম্বর ১৮, ২০১৯ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

টেরাকোটা-পর্ব ৩

শিবালয়ের তেওটা রাজবাড়ি

একরাম হোসেন নাঈম

সুলতানি  মোগল যুগের পর বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ঔপনিবেশিক শাসন। সীমাহীন লুটতরাজ, আধিপত্যবাদ বিস্তার আর সবকিছুর ওপর লাগামহীন হস্তক্ষেপ সময়ের বৈশিষ্ট্য। তবে এর বাইরে ব্রিটিশ শাসকদের সরাসরি প্রণোদনায় বাংলার নানা স্থানে গড়ে উঠেছিল অনেকগুলো নয়নাভিরাম স্থাপত্য। তার পাশাপাশি ব্রিটিশদের মদদপুষ্ট জমিদারদের তত্ত্বাবধানেও নানা স্থানে নির্মাণ করা হয় অসংখ্য ধর্মীয় লোকায়ত ইমারত। মানিকগঞ্জের শিবালয়ের অন্তর্গত তেওটা রাজবাড়ি এমনি এক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য, যা সময়ে নির্মিত হয়েছিল। যমুনা নদীর ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত বাম তীর ঘেঁষে এই স্থাপত্যটি নির্মাণ করা হয়েছিল। সম্প্রতি অত্যন্ত বিপজ্জনক অবস্থায় পরিত্যক্ত তেওটা প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ টিকে আছে। আরিচা ফেরিঘাট থেকে দেড় মাইল উত্তরে একটি ধূলিময় আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে তেওটা গ্রামে যাওয়া যায়। সেখানে দুটি পুষ্করিণীর মাঝে এক সারিতে নির্মিত দুটি প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ এখনো কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

টালির আচ্ছাদনযুক্ত, ঢালু ছাদসংবলিত দ্বিতলবিশিষ্ট কাছারি বাড়ি এবং অত্যন্ত সুরক্ষিত অবস্থায় নবরত্ন দোলমঞ্চ বিদ্যমান। উত্তর দিকের রাস্তা সংলগ্ন কাছারি ভবনটি জয়শংকর এস্টেটের অধিভুক্ত ছিল। শিলালিপি অনুসারে ভবনটি ১৯১৪ সালে নির্মিত। পূর্ব-পশ্চিমমুখী প্রায় ২১১৫ মিটার আয়তনবিশিষ্ট আয়তাকৃতির এই ইমারতটি পুরনো প্রাসাদের দক্ষিণ প্রান্তের ডান কোনায় অবস্থিত। অত্যন্ত সুন্দর সুচারুরূপে সংরক্ষিত ইমারতের উভয় তলার চারদিকের ঢালু ছাদ সম্পূর্ণরূপে রানীগঞ্জের লোহিত বর্ণের টালি দ্বারা আচ্ছাদিত। ভবনটির ঠিক পশ্চিমে পুষ্করিণীর দক্ষিণ-পূর্ব তীরে দক্ষিণে বারান্দাসহ একটি বর্গাকৃতির ছোট্ট চন্দ্রাতপ ধ্বংসস্তূপের মাঝে অপরূপ সৌন্দর্যে দণ্ডায়মান রয়েছে। এটির ছাদও রানীগঞ্জের টালি দ্বারা আচ্ছাদিত।

তেওটা রাজবাড়ির দুই প্রাসাদের মাঝে অবস্থিত পুষ্করিণীর পূর্ব পাড়ে নির্মিত দোলমঞ্চটি এখনো সুসংরক্ষিত রয়েছে। ধরনের স্থাপত্যশৈলীসম্পন্ন দোলমঞ্চ বাংলাদেশের পুঠিয়ায় একটি এবং ডেভিড ম্যাকাচ্চিয়ন প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী পশ্চিম বাংলায় বিদ্যমান বহু নিদর্শন পরিলক্ষিত হয়। এটি ১৫ মিটার বর্গাকৃতির এবং তিন স্তর বা তিনতলাবিশিষ্ট একটি সুরম্য অট্টালিকা। ইমারতটির দ্বিতীয় তৃতীয় স্তর ক্রমান্বয়ে সরু হয়ে উপরে উঠে গেছে। সর্বশেষ স্তরটির উপরিভাগ অলংকৃত নয়টি পিড় মন্দিরাকৃতির রত্নে শোভিত। এই নবরত্ন মন্দিরের প্রতি স্তরের প্রতি দিক অর্ধবৃত্তাকৃতির খিলানপথে উন্মুক্ত। ইমারতটির দেয়ালগাত্রে স্থাপিত এক শিলালিপি অনুসারে মন্দিরটি ১৮৫৮ সালে নির্মিত বলে জানা যায়। কিন্তু ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ইমারতটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে ১৯০৬ সালে এটি সংস্কার করা হয়।

পুকুরের পূর্ব পাড়ে প্রায় ৩০ মিটার ব্যবধানে নির্মিত রয়েছে তেওটার সবচেয়ে পুরনো প্রাসাদ। পশ্চিমমুখী এই প্রাসাদ উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ৬০ মিটার পূর্ব-পশ্চিমে ৩০ মিটার বিস্তৃত। প্রাসাদটির একদিকে কাছারি ভবন অন্যদিকে দোলমঞ্চ ছাড়াও প্রাসাদের পশ্চাতে দুদিকে দ্বিতলবিশিষ্ট দুটি ইমারত সংযোজিত রয়েছে। দ্বিতলবিশিষ্ট আয়তাকার ভূমি নকশায় নির্মিত প্রাসাদের ভেতরে রয়েছে ১৫৯ মিটার আয়তনবিশিষ্ট একটি অঙ্গন। অঙ্গনটি মূলত ঢেউটিনের ঢালু ছাদে আচ্ছাদিত। ইমারতটির সম্মুখের কেন্দ্রস্থলে অভিক্ষিপ্তাকারে নির্মিত অর্ধবৃত্তাকৃতির একটি গাড়িবারান্দা (বর্তমানে ধ্বংসপ্রাপ্ত) বিদ্যমান। বারান্দাটির ছাদ একসময় বারোটি যুগল গোলায়িত স্তম্ভের ওপর স্থাপিত ছিল।

তেওটা রাজবাড়ির বারান্দার সরু পথ দিয়ে ইমারতের ভেতর অঙ্গনে প্রবেশ করা যায়। ইমারতের সম্মুখে গোলায়িত স্তম্ভের সারিসহ .৭০ মিটার প্রশস্ত বারান্দাটিও গাড়িবারান্দার মতো ধ্বংসপ্রাপ্ত। গাড়িবারান্দার দুদিকে সম্মুখ বারান্দার পশ্চাতে নির্মিত কক্ষগুলোর সম্মুখে রয়েছে এক সারি অর্ধবৃত্তাকৃতির খিলানপথ। খিলানপথের প্রতিটি খিলান নলাকৃতির করিন্থীয় খাম্বার ওপর স্থাপন করা হয়েছে। এখানে রাজপ্রাসাদের অন্দর অঙ্গনের তিনদিকে রয়েছে দ্বিতলবিশিষ্ট তিনটি ব্লক এবং প্রতি ব্লকে রয়েছে বিভিন্ন আয়তনের ১০টি করে কক্ষ। অঙ্গনের চর্তুদিক অর্থাৎ উত্তর দিকে রয়েছে একতলাবিশিষ্ট একটি পারিবারিক মন্দির। সমগ্র ব্লকটির চর্তুদিকে অর্থাৎ অঙ্গনের চতুর্দিকে অবস্থিত কক্ষগুলোর সামনে দিয়ে রয়েছে .৭০ মিটার প্রশস্ত মজবুত আয়নীয় স্তম্ভের সারিসংবলিত একটি টানা বারান্দা।

রাজবাড়ির আঙিনার উত্তরে রয়েছে একটি মন্দির। প্রাপ্ত তথ্যসূত্রে মন্দিরটি দেবী দুর্গার নামে উৎসর্গীকৃত বলে জানা যায়। মন্দিরটির সম্মুখে রয়েছে তিন মিটার চওড়া চারটি যুগল আয়নীয় স্তম্ভসংবলিত একটি বারান্দা। এই বারান্দা দিয়ে মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করা হয়। বারান্দার উপরের টানা পাড় নকশাটি পলেস্তারায় কর্তিত পেঁচানো লতাপাতার মাঝে নারী মস্তকসহ অপূর্ব অলংকরণে সজ্জিত। মন্দিরের উপরের ছাদপাঁচিল ক্ষুদ্র খিলানপথবিশিষ্ট। মন্দিরটিতে ১১.৫০৩.৫০ মিটার আয়তনবিশিষ্ট একটি গর্ভগৃহ বিদ্যমান। বারান্দা গর্ভগৃহের মাঝে স্থাপিত রয়েছে তিনটি অর্ধবৃত্তাকৃতির খিলানপথ। প্রবেশপথের খিলানসমূহ ইটের নির্মিত ভারী গোছের তিনটি স্তম্ভের ওপর স্থাপিত। স্তম্ভগুলোর সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য প্রতিটি স্তম্ভের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে পাঁচটি করে শৈলীভূত নলাকৃতির তুশকান স্তম্ভ।

রাজপ্রাসাদের ভেতর ব্লকের উত্তর-পূর্ব কোনার গলিপথ দিয়ে পেছনের দুদিকে অবস্থিত দ্বিতলবিশিষ্ট দুটি ইমারতে যাওয়া যায়। ওই দ্বিতলবিশিষ্ট ইমারত দুটির পরে আরো পূর্ব দিকে রয়েছে একটি পুষ্করিণী। সমগ্র প্রাসাদ চত্বরটি একটি ভগ্নদশাপ্রাপ্ত সীমানাপ্রাচীর দ্বারা পরিবেষ্টিত। উত্তর দিকে দোলমঞ্চের পশ্চাতে ৩০ মিটার দীর্ঘ পশ্চিমমুখী আরেকটি প্রাসাদ ভবন রয়েছে। ভবনটির মধ্যস্থলে রয়েছে একটি গাড়িবারান্দা। গাড়িবারান্দার সম্মুখে রয়েছে তিনটি কৌণিক খিলানপথ। খিলানপথগুলো সিমেন্ট-বালির আস্তরণে আচ্ছাদিত। এই প্রাসাদেরও অভ্যন্তরভাগে রয়েছে একটি আয়তাকৃতির কেন্দ্রীয় অঙ্গন। অঙ্গনকে ঘিরে নির্মিত কেবল দক্ষিণ দিকের দ্বিতলবিশিষ্ট ব্লকটি ব্যতীত অন্য তিনদিকের ইমারতগুলো একতলাবিশিষ্ট। অঙ্গনের চতুর্দিকে নির্মিত ইমারতগুলোর প্রায় ১৫টি কক্ষের সম্মুখ দিয়ে রয়েছে .৭০ মিটার প্রশস্ত একটি টানা বারান্দা।

বিশালাকৃতির রাজবাড়ির নিচতলার বারান্দার সম্মুখভাগ ইটের নির্মিত সাধারণ স্তম্ভসংবলিত হলেও দ্বিতলের ঝুলবারান্দার সম্মুখভাগের স্তম্ভগুলো অষ্টভুজাকৃতির স্তম্ভদণ্ডবিশিষ্ট এবং স্তম্ভশীর্ষ করিন্থীয় আকারে নির্মিত। ইমারতটির বিভিন্ন অংশের ক্ষুদ্র গলিপথগুলোকে আবৃত করার জন্য অর্ধবৃত্তাকৃতি দ্বিকেন্দ্রিক উভয় ধরনের খিলানের ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। প্রাসাদটির উত্তর দিকে রয়েছে আরেকটি ক্ষুদ্রাকৃতির পারিবারিক মন্দির। নয় মিটার গুণন তিন মিটার আয়তনের গর্ভগৃহবিশিষ্ট এই মন্দিরের সম্মুখে রয়েছে তিন মিটার প্রশস্ত একটি বারান্দা। বারান্দার সম্মুখভাগে রয়েছে ছয়টি লোহার নির্মিত নলাকৃতির করিন্থীয় স্তম্ভের ওপর স্থাপিত পাঁচটি খিলানপথ। খিলান স্প্যানড্রেলগুলো পত্রনকশায় সজ্জিত। এছাড়া গর্ভগৃহে প্রবেশের জন্য গর্ভগৃহ বারান্দার মধ্যবর্তী স্থানে রয়েছে পাঁচটি অর্ধবৃত্তাকৃতির খিলানপথ।

তেওটা রাজবাড়ির বেশির ভাগ খিলান স্প্যানড্রেলগুলোও পলেস্তারায় কর্তিত অত্যন্ত আকর্ষণীয় লতাপাতা নকশায় সজ্জিত। এতদ্ব্যতীত মন্দিরটির দেয়ালের উপরিভাগের পত্রসংবলিত টানা পাড় নকশার নিচে সমান্তরালভাবে পলেস্তারায় কর্তিত পেঁচানো লতাপাতার অপূর্ব অলংকরণ বিদ্যমান। মন্দিরটির গৃহমুখের অর্ধবৃত্তাকৃতির খিলানগুলোর উপরিভাগ অত্যন্ত সুরুচির সঙ্গে পেঁচানো লতাপাতায় অলংকৃত এবং ভারবাহী স্তম্ভগুলো নলাকৃতির করিন্থীয় কিংবা আয়নীয় পোস্তায় সজ্জিত, যা জয়দেবপুর রাজবাড়ির পারিবারিক মন্দিরের সঙ্গে তুলনীয়। যা বাংলার ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের বর্ণনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতীয়মান।

তেওটা জমিদারবাড়ির প্রাসাদ চত্বরটি ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে জয়শংকর এস্টেটের জমিদার কর্তৃক নির্মিত। দক্ষিণ দিকের পুরনো প্রাসাদটির মালিক ছিলেন চারুশংকর, কিরণশংকর দেবশংকর। উত্তর দিকের ইমারতটি অপেক্ষাকৃত পরে নির্মিত এবং এটির মালিক ছিলেন হেমাশংকর। তাঁরা সবাই ছিলেন মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয়ের সুশিক্ষিত জমিদার। স্বীয় জমিদারি এলাকায় জনহিতকর কর্ম এবং বিভিন্ন সামাজিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৃষ্ঠপোষকতা দানের জন্য তারা বিশেষভাবে সুপরিচিত ছিলেন।

 

একরাম হোসেন নাঈম: গবেষক

এই বিভাগের আরও খবর

আরও পড়ুন